Category: গল্প

চুরি যাওয়া ভোট

ভোট নিয়ে আমার আম্মার খুব দুঃখ। আম্মা প্রতিবার ভোট দিতে গিয়ে গড়বড় করে ফেলেন। একবার কলাগাছ মার্কায় ভোট দিতে গিয়ে আম্মা ভোট দিয়ে এলেন রিকশা মার্কায়। হুডঅলা রিকশার ছবি দেখে আম্মা ভেবেছিলেন ওটাই কলাগাছ। আরেকবার মোমবাতি মার্কায় ভোট দিতে গিয়ে আম্মা ভোট দিয়ে এলেন বল্লম মার্কায়। আম্মার দোষ নেই। জ্বলন্ত মোমবাতির আঁকা ছবি দেখতে তো বল্লমের মতোই। ভোট দিতে গিয়ে গড়বড় করেন—এই নার্ভাসনেসের কারণে গতবার সিল মারতে গিয়ে হাত কাঁপছিল। শেষ পর্যন্ত সিল মেরে দেখলেন, সিল গিয়ে পড়েছে দুটো মার্কার মাঝখানে! ক’দিন আগে ফোন করে বললাম, ‘আম্মা এইবার টেনশন নেই। কলাগাছ মনে করে রিকশায়, মোমবাতি মনে করে বল্লম আর হাত কাঁপাকাঁপি করতে গিয়ে যে মার্কাতেই গিয়ে সিল পড়ুক না কেন, ভোট পড়বে নৌকাতেই। এবার নির্বাচন কমিশন যে ব্যালট পেপার ছাপিয়েছে, তাতে নাকি সবই নৌকার প্রতীক…

একটি মৃত্যুর মানসিক তদন্ত

velvet_darkness

মাহতাব আমার ভাই। আমার অনেক ভাই। কিন্তু মাহতাব আমার খুব প্রিয়। মাহতাব গোধূলিসন্ধ্যা কালে মাছ ধরতে যায়। বাজার থেকে তরকারি কিনে আনে। আমরা মা ছেলেরা মিলেমিশে খাই। মাহতাব রাতে আট বছর আগে একদিন পাঠ করে, আবার চে গুয়েভারার গল্প বলে। আমরা বলি তোমার মনটা ভালো তো ভাই। একদিন জানালা ফাঁক করে দেখি ঝাউ গাছের মাথায় চাঁদ ওঠে। মাহতাব বলে ‘তোমরা ঘুমাও আমি একটু চাঁদ দেখে আসি।’ টিনের চালে ঝুপ করে বৃষ্টি পড়ে। মাহতাব বলে…

বারান্দার টবে তামাক চাষ

এই ৯ তলার ওপরের ফ্ল্যাটের সামনে আর কোনো উঁচু বিল্ডিং না থাকায় পুরো জায়গাটাই ফাঁকা। অ্যাপার্টমেন্টের সামনের খোলা ছাদে, যেখানে আরেকটি ফ্ল্যাট থাকার কথা ছিল, সেই খোলা ছাদটায় রুপালি আলো লুটোপুটি খাচ্ছে। ভরাট চাঁদের দিকে যতবার চোখ মেলে ধরি ততবারই মনে হয় বৃষ্টির ফোঁটা, ফোঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি এসে পড়ছে চোখের পাপড়িতে। সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউ আর ঢেউয়ের বিশাল জিব্বায় ব্যাপক ছুরির ফলা ঝলকাচ্ছে, চাঁদের আলোয় দুর্বার হয়ে ঝাপটে পড়ছে বিচে। বাম দিকে মাথা ঘুরিয়ে ইনানের এস্রাজ বাজানো শুনতে শুনতে এমন সব দৃশ্য মুভিং ইমেজ তৈরি করে যাচ্ছে। ইনান চাইলেও চোখ ঘুরিয়ে আমাকে দেখতে পারবে না, তারে তার ঘষার কোনো ফাঁকেও। আমরা পাশাপাশি বসে আছি অনেকক্ষণ। শব্দহীন।…

চিনুয়া আচেবের গল্প: যুদ্ধে মেয়েরা

তাদের প্রথমবার রাস্তা ধরে চলার সময় উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই ঘটেনি। তখন ছিল যুদ্ধ প্রস্তুতির উন্মাদনাকালীন সময় যখন হাজার হাজার যুবককে (এবং মাঝে মাঝে যুবতী নারীদেরকেও) যুদ্ধে নাম লেখানোর কেন্দ্র থেকে প্রত্যেকদিন সরিয়ে নিয়ে আসা হত। কারণ এদের অনেকেই নতুন গড়ে-ওঠা জাতিকে রক্ষা করতে উত্তেজিত অবস্থায় সাথে সাথে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে দলে দলে সামনের দিকে এগিয়ে আসছিল। দ্বিতীয়বার যাত্রার সময় তারা সম্মুখীন হয় আওকাতে অবস্থিত তল্লাশি কেন্দ্রের। তখন অবশ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এবং ধীরে ধীরে দূরবর্তী উত্তরাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্র হতে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সে অনিস্থা থেকে এনুগুর দিকে গাড়ি চালিয়ে আসছিল এবং ঐ সময় তার বেশ তাড়া ছিল। যদিও তল্লাশি চালানোর কেন্দ্রগুলোর ভেতর দিয়ে বিনা বাঁধায় চলে যাওয়ার অনুমোদন তার ছিল, তারপরও তাদের কাছে অনুবর্তী হতে সে সর্বদা মানসিকভাবে অস্বস্তি বোধ করত। বিষয়টাকে সে খুব একটা পাত্তা দিত তা নয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল এরকম: তোমাকে যদি তল্লাশির ভেতর দিয়ে যেতে হয় তাহলে তুমি নিশ্চয় বড় মাপের মানুষদের…

সংকেত

পাহাড়ি ঢালে বাগানসংলগ্ন খুব পুরোনো বাড়ি, মেরামত করার পর আধুনিক সরঞ্জাম আর ফিটিংস যোগ করলে চমৎকার একটা রিসোর্ট তৈরি হয়ে যাবে। আজকাল শুধু সাগর দেখতে নয়, গাঢ় সবুজ জঙ্গলে মোড়া পাহাড় দেখতেও এদিকটায় ভিড় করছে পর্যটকেরা। অনেক আগে হাটহাজারী পর্যন্ত রেলপথ ছিল, সেটাকে আরও লম্বা করার জন্য নতুন লাইন বসানো হয়েছে, আমাদের ভবিষ্যৎ রিসোর্টের কাছাকাছি পাহাড়গুলোর ওপর দিয়ে পথ করে নিয়ে পার্বত্য এলাকার আরও অনেক গভীর প্রদেশে চলে গেছে এই নতুন লাইন। আমরা দুই বন্ধু নতুন উদ্যোক্তা। বাড়ির বাইরেরটা সাজানো আমার দায়িত্ব, ভেতরটা…

ঈশ্বরণ

ঈশ্বরণ ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের সবার মধ্যে বয়োজেষ্ঠ্য হবার খ্যাতি অর্জন করেছিল। সে অ্যালবার্ট মিশন স্কুলে এসেছিল ঠোঁটের উপর অস্পষ্ট গোঁফের রেখা নিয়ে, একজন তেজী তরুণ হিসেবে। এখনও অবশ্য তাকে সেখানেই দেখা যাচ্ছিল। শুধু তার গঠন হয়ে উঠেছিল আরও বলিষ্ঠ ও পেশিবহুল এবং চিবুকও তামাটে আর দৃঢ় দেখাচ্ছিল। কেউ কেউ এমনকি এ কথাও বলে যে ঈশ্বরণের মাথায় নাকি…

মৃত্যুপুরী

স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার হওয়া স্বত্তেও বাংলাদেশ এই মুহূর্তে চরম সংকটময় দিন পার করছে। চারিদিকে হত্যা, খুন, ক্রসফায়ার, অপহরণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। অসুস্থ রাজনীতি অতিষ্ট করে তুলেছে জন-জীবন। আর ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে প্রতিবাদের ঝড়ো বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হয় নীল। কলম দিয়ে একের পর এক প্রতিবাদী কন্ঠের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে থাকে সে। আর তাতেই সরকার ক্ষেপে ওঠে তার ওপর। দু’দিন আগে তাকে রাস্তা থেকে কয়েকজন সাদা পোশাকধারী পুলিশ তুলে নিয়ে এসে অজ্ঞান করে এখানে রেখে যায় একটা মর্গের ভেতর । অজ্ঞাত এক মর্গ। জীবন্ত নীল কে অনেকগুলো লাশের সাথে বন্দী করে রাখা হয়েছে। এটা শুধু কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সরকারী কর্মকর্তা ছাড়া কেউ জানে না। তবে আর একজন জানে… একটা মেয়ে…

খোলস

চিৎকার, শোরগোল আর সংগীতের আবহের মধ্যে আমি তার গলা একেবারেই শুনতে পাইনি। তার মুখ অন্ধকারে ছিল। কিন্তু ঘুরে চলা ফ্ল্যাশলাইটের আলো যখন তার মুখে পড়ল, দেখলাম, আমার দিকে তাকিয়ে আছে সে, দৃষ্টি স্থির। সেই চাহনিতে রয়েছে আমার সঙ্গে নাচার প্রবল আগ্রহ—আমার সঙ্গেই সে নাচতে চায়। আমরা সেদিন সারা রাত নেচেছিলাম। বিজয় আমাকে রাম আর কোক কিনে দিয়েছিল। একসঙ্গে সিগারেটও ফুঁকেছি আমরা। বাড়ি ফেরার আগে জিজ্ঞাসা করল, ‘আবার কবে দেখা হবে…’

ফলসিফিকেশন উইথ ওউন সোল

গল্পটা শুক্রবার ভোরের। ঠিক ভোর হয়ত নয় কিন্তু খানিকটা কুয়াশা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বলে সকাল পৌনে আটটাকে ঠিক সকাল বলা যায়না তারপর আবার সরকারি ছুটির দিন। কাওরান বাজার জনমানুষহীন প্রায়। কি গান শুনছিলাম মনে নেই তবে কানে এয়ার ফোন দিয়ে আমি এক মনে গান শুনতে শুনতে হাঁটছি কাওরান বাজারের রাস্তায়। আপন মনে হাটায় হটাৎ অস্বস্তি হলো, পায়ে তরল কিছু লেগেছে…