হিন্দি ছবির প্রতি আমাদের প্রেম!

Bidhan Rebeiru বিধান রিবেরু প্রত্যেক বছরেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে চলেছে। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৬০৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার মূল্যমানের পণ্য। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা।* বোঝাই যাচ্ছে এই ঘাটতির ফারাক প্রায় ১৪ গুণ। এবছর ভারত থেকে নতুন আমদানি করা পণ্য- হিন্দি ছবি- পৌঁছে গেছে ভোক্তা বা দর্শকের কাছে। এই আমদানি পণ্যের পক্ষে কেউ কথা বলছেন, কেউ বলছেন বিপক্ষে।

পক্ষের লোকদের যুক্তি– গরু, শাড়ি, পেঁয়াজ থেকে এতোকিছু এদেশে আমদানি হয় ভারত থেকে, তো হিন্দি ছবি আমদানি হলে সমস্যা কি? তাদের আরও যুক্তি, এদেশের টিভিতে হিন্দি ছবি দেখতে পারেন আর সিনেমা হলে দেখালেই দোষ? পক্ষের লোকেদের আরও কিছু যুক্তি তুলে ধরছি- তারা বলছেন, হিন্দি ছবির জন্য দুয়ার খুলে দিলে চাপের ভেতর পড়বে বাংলাদেশী চলচ্চিত্র। আর এর ফলে উন্নতি হবে এদেশের চলচ্চিত্রের। আর একটি যুক্তি হলো হিন্দিসহ অন্যান্য ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য যদি উন্মুক্ত হয় এদেশের বাজার তাহলে এখানকার মানুষ নানা ভাষার নানান রকম চলচ্চিত্র দেখতে পাবে। আরও একটি শক্তিশালী যুক্তি হলো সিনেমাহলগুলোতে যদি হিন্দি ছবি দেখিয়ে ব্যবসা চাঙ্গা করা যায় তাহলে হলগুলো টিকে যাবে, সেই সূত্রে টিকে যাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও। আবার অনেকে অনুযোগের সুরে বলেন, এদেশের নির্মাতারাই তো হিন্দি ছবির নকল করেন এখন আবার তারাই এর বিরোধিতা করছে!

সকলেই যে একই পক্ষে অবস্থান নেবেন এবং সকলেই যে একই যুক্তির পক্ষে কথা বলবেন তা তো নয়! অন্য মত ও চিন্তা আছে বলেই কিন্তু চিন্তার জগত এত বর্ণিল। তো এবার আসা যাক বিপক্ষের যুক্তিতে। এবং যুক্তিসঙ্গত কারণেই আমার অবস্থান বিপক্ষে।

অনেকেই হয়তো বলবেন ‘প্রাণে’র মতো কোম্পানি তো জি বাংলায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। দিচ্ছে একারণে যতটা না যে ঐ জায়গার বাজার ধরতে হবে তারচেয়েও বড় কারণ হল বাংলাদেশে যে হারে মানুষ জি বাংলা ও স্টার জলসা দেখে তাতে বিজ্ঞাপন নিয়ে হাজির না থাকলে দেশের বাজারও হারাতে হবে।

ভারতে কি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র মুক্তি পায়? ন্যূনতম পশ্চিমবঙ্গে কি বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল দেখা যায়? দুই প্রশ্নের উত্তরই হচ্ছে “না”। কলকাতার মানুষ কি বাংলাদেশের লেখকদের বই, আমরা যেভাবে ভারতীয় লেখকদের বই পাই, সেভাবে হাতে পায়? মুক্তবাজার অর্থনীতির কি কেবল আমাদের জন্যই? বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ভারতের বাজার বন্ধ আর বাংলাদেশের বাজার তাদের জন্য খোলা! অনেকেই হয়তো বলবেন ‘প্রাণে’র মতো কোম্পানি তো জি বাংলায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। দিচ্ছে একারণে যতটা না যে ঐ জায়গার বাজার ধরতে হবে তারচেয়েও বড় কারণ হল বাংলাদেশে যে হারে মানুষ জি বাংলা ও স্টার জলসা দেখে তাতে বিজ্ঞাপন নিয়ে হাজির না থাকলে দেশের বাজারও হারাতে হবে। কারণ ভারতীয় চ্যানেলের কোটি কোটি একনিষ্ঠ দর্শক তৈরি হয়েছে এদেশে। এবং এভাবেই ভারতীয় পণ্যের একটা বাজার তৈরি হয়েছে এখানে। ভারতীয় টেলিভিশনে ভারতীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। ফলে পণ্যের জন্য বাজারও তৈরি হয় এখানে। এটাকে আপনি বলতে পারেন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পথ বেয়ে অর্থনৈতিক আগ্রাসন।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলতে বুঝাচ্ছি অন্য দেশের ভাষা, পোশাক, খাদ্য ইত্যাদি দ্বারা আমার দেশের ভাষা, পোশাক ও খাদ্য আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাকে। মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়। শিশুরা আজকাল ইঁদুরকে ইঁদুর বলে সম্বোধন করে না, বলে ‘চুহা’। তো ধীরেধীরে আমাদের সন্তান হিন্দি বলা শিখবে সেটাই বোধহয় আমরা চাচ্ছি। উল্টো যুক্তি দেখাতে পারেন- কেন বাসায় যে হিন্দি চ্যানেল দেখেন সেটা বন্ধ করবেন কিভাবে? এই “কিভাবের” উত্তর আমার জানা নেই। তবে যা হচ্ছে তাতে যে সমূহ বিপদ সামনে সেটাই বলতে পারছি শুধু। অবশ্য বিপদও আপেক্ষিক। এখন আমাদের সন্তানরা বাংলার চেয়ে হিন্দিতেই বেশি কথা বলবে- এটা যদি আপনি ‘বিপদ’ হিসেবে গণ্য করেন তো ‘বিপদ’ আর না করলে তো কিছুই না।

বলছিলাম এমনিতেই এই টেলিভিশনে ভারতীয় সিরিয়ালের অত্যাচারে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। প্রাণ ওষ্ঠাগত বলছি কেন, প্রাণ তো একেবারেই বিগত হয়েছ এই কিছুদিন আগেও। ‘বোঝেনা সে বোঝে না’ সিরিয়াল দেখে মেয়েদের বায়না- পাখি পোশাক কিনে দিতে হবে- এরপর একাধিক আত্মহত্যার কথা তো কারও অজানা নয়! আমাদের সংস্কৃতিকে নানাভাবেই এই ভারতীয় সংস্কৃতি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে।

খাবারের কথা বলবেন? রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে দোসা, পানিপুরি, দই ফুচকা থেকে শুরু করে ভারতীয় মোগল খাবারের ছড়াছড়ি। এমনকি এদেশে শাখা খুলেছে ভারতের খানাখাজানা নামের এক বিখ্যাত খাবারের দোকান। এটি বিখ্যাত ভারতীয় খাবারের জন্যই। কেন খুলেছে শাখা এখানে? কারণ খানাখাজানার সঞ্জীব বাবু ভারতীয় টেলিভিশনের কল্যাণেই এদেশে খ্যাতি পেয়েছেন। এবং যখন একপর্যায়ে বুঝেছেন এদেশে ভোক্তা একেবারে প্রস্তুত তখনই একখানা শাখা খুলে ব্যবসা জুড়ে দিয়েছেন! আমরাও ভারতীয় টকঝালমিষ্টি দিয়ে উদরপূর্তি করতে পেরে খুশি! যদিও গলিটলিতে দুয়েকটা আমাদের দেশীয় পিঠাপুলির গরীবি “আল ছালাদিয়া” মানে ছালা বা চাটাই দিয়ে বানানো দোকান দেখা যায়!

আপনি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে দেখুন, গিয়ে দেখবেন ভারতীয় পাঠ্যবই পড়ানো হচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে কোনও কথা নেই বললেই চলে। অথচ ঠিকই ভারতীয় ইতিহাস ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পর্কে সেখানে অধ্যায় রয়েছে। পাঠ্যবই তো একপ্রকার গণমাধ্যম। এটা কি আমরা ভুলে গেছি? টেলিভিশন ও পাঠ্যবই দুই গণমাধ্যমের কথা রেখে এবার আসল কথায় আসি। যেটা নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম- বাংলাদেশে হিন্দি ছবির প্রদর্শনী।

চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ভিন্ন মাধ্যম আবিষ্কৃত হবে। ভুলে যাবেন না এখন উচ্চগতির ইন্টারনেটের যুগ। পশ্চিমা বিশ্বে ইউটিউবেও চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়া হয় এবং সেখান থেকে আয় রোজগারও হয়।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিষয়টি খুব ধীরে ধীরে হয় বলে আমাদের চোখে পড়ে না কিন্তু অর্থনৈতিক আগ্রাসনের বিষয়টি তো চোখে পড়া উচিৎ, না কি! এই যে হল মালিকেরা যে বলছেন তারা হল বাঁচাতে চান; তাদের কাছে প্রশ্ন- কোন ব্যবসা পৃথিবীতে চিরস্থায়ী হয়েছে? আপনি ব্যবসা করতে নেমেছেন, যখন দেখছেন ব্যবসা হচ্ছে না, অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করুন। কে বলেছে চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীতেই লেগে থাকতে হবে? তাও আবার দেশীয় সংস্কৃতির বারোটা বাজিয়ে? শুধু তাই তো নয়, দেশীয় চলচ্চিত্রের বাজার ধ্বংস করে?এই দায়িত্ব তো আপনাদের কেউ দেয় নি। হল বন্ধ হয়ে গেলে চলচ্চিত্র নির্মাণও কমে যাবে- এই ধারণা ভুল। চলচ্চিত্র এখন মোবাইল ফোনেও তৈরি হয়। কাজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ হবে না, চলচ্চিত্র দেখার মাধ্যমও সংকুচিত হবে না। চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ভিন্ন মাধ্যম আবিষ্কৃত হবে। ভুলে যাবেন না এখন উচ্চগতির ইন্টারনেটের যুগ। পশ্চিমা বিশ্বে ইউটিউবেও চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়া হয় এবং সেখান থেকে আয় রোজগারও হয়।

আর যারা বলছেন আমাদের দেশের নির্মাতারা তো হিন্দি ছবির নকলই করেন তাহলে হিন্দি ছবি চালালে সমস্যা কি? তাদের জন্য বলছি- নকল করে কোনও পণ্য দেশীয় বাজারে ছাড়লে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কিন্তু আপনি যদি দেশের স্থানীয় বাজারকে সুরক্ষিত করতে না পারেন তাহলে পথে বসে যাবে এদেশের মানুষ। বিপর্যয় ঘটতে পারে বিরাট আকারে। আবারও বলছি কলকাতায় কেন বাংলাদেশি চ্যানেল দেখা যায় না? কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমানা। এখন ঐ দেশে যদি বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যায় তাহলে সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার তৈরি হবে এবং সীমান্ত উপচে পণ্য ঢুকবে ভারতে। একবার এমন হয়েছিলো। বাংলাদেশি সাবানে ছেয়ে গিয়েছিলো ভারতীয় সীমান্ত অঞ্চল। এরপর থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক হয়েছেন।

তাই বলে ভাববেন না বাংলাদেশের পরিচালকদের নকল করাকে সমর্থন করছি। এই বিষয়টাকে প্রতিনিয়ত, ধারাবাহিকভাবে সমালোচনা করতে হবে, প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে, তাহলে পরিচালকেরা তাদের ভুলত্রুটি শুধরে নিতে পারবেন। এজন্য এদেশে নানা মাত্রার চলচ্চিত্র সাহিত্য প্রয়োজন।

সোজা কথা হল নিজেদের বাজার রক্ষা করা এবং নিজেদের কাজের উন্নতির জন্য সবসময় নিজেদের কাজের সমালোচনা করা- তাহলেই এদেশে ভালো চলচ্চিত্র তৈরির শর্ত তৈরি হবে।

আমাদের দেশে যদি হিন্দি ছবি চালানো হয় তাহলে চলচ্চিত্রের প্রথম দিককার সংশ্লিষ্ট মানুষেরা ধীরে ধীরে ঝরে যাবেন। সিনেমা হল চলচ্চিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কিন্তু প্রথম সারিতে তার অবস্থান নয়। চলচ্চিত্রের জন্য জরুরী – পরিচালক, প্রযোজক, অভিনয়শিল্পী ও কলাকূশলীরা। সিনেমা হল না থাকলেও চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ খোলা থাকে কিন্তু চলচ্চিত্র বন্ধ হতে থাকলে সিনেমা হলে শুধু ভিনদেশী ভাষার ছবিই চলবে। তাতে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র যে বিশাল শিল্প হিসেবে আজকে গড়ে উঠেছে তা আর থাকবে না। এই শক্তিশালী গণমাধ্যমকে এভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার কোনও অর্থ নেই।

অন্যান্য দেশের সরকার চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য অনেক কিছুই করেন। আমাদের দেশের সরকারও অনেক কিছু করছেন। যেমন চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা। একটি ফিল্ম ইন্সটিটিউটও হয়েছে। এখন যদি আরেকটু মনোযোগ দেওয়া যেত তাহলেই এদেশের চলচ্চিত্র উন্নতির পথে হাঁটতো।

হিন্দি চলচ্চিত্রে যা দেখানো হয় সেটা কি আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের চেয়ে আলাদা কিছু? সেই একই যৌন সুরসরি, একই মারামারি। এরচেয়ে ভালো কিছু কি দেখানো হবে সিনেমা হলগুলোতে?

আরেকটি প্রশ্ন না করে পারছি না, সেটা হলো হিন্দি চলচ্চিত্রে যা দেখানো হয় সেটা কি আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের চেয়ে আলাদা কিছু? সেই একই যৌন সুরসরি, একই মারামারি। এরচেয়ে ভালো কিছু কি দেখানো হবে সিনেমা হলগুলোতে? অনেকেই বলছেন, এই আমদানির সুযোগে বিভিন্ন দেশের ভালো চলচ্চিত্রও আসবে এখানে। কিন্তু প্রশ্ন হলো হল মালিকেরা কি নিশ্চিত ব্যবসা সফল ছবি বাদ দিয়ে আপনাদের কল্পিত ‘আর্টফিল্ম’ দেখাবে বড় পর্দায়? আর আজকালকার যুগে আর্টফিল্ম দেখা কি খুব কষ্টের কোনও বিষয়? বিষয়টা কষ্টকর নেই বলেই তো এখনকার সিনেসোসাইটিগুলো ঝিমিয়ে যাচ্ছে।

লিবারেল ডেমোক্রেসির যুগে আমরা সবাই উদার হতে চাই। কিন্তু ভুলবেন না অন্যরা কিন্তু আপনার বেলায় এত উদার নন। শুধু তাই না, মুখে আপনাকে উদারনীতির কথা শেখালেও কাজে দেখবেন সেই “বিগ ব্রাদার” উল্টো কাজ করছেন। কাজেই এতো উদার হয়ে নিজের সংস্কৃতি ও বাজার জলে ভাসিয়ে দেওয়ার দরকার আছে কি?

হিন্দি ছবি টেলিভিশনে দেখে মন ভরছে না? বড় পর্দাতেই দেখতে হবে? এই ইচ্ছা প্রকাশের মাধ্যমে আপনি যে নয়া সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন সেটা কি আপনি জানেন? এতো কথার পরও আপনি উদার হবেন না অনুদার সেটা আপনার বিবেচনা। এই বিবেচনা উস্কে দিতে আমি তো উছিলা মাত্র!