অবাধে হত্যার উৎসব

rezwan siddiqui কখনো কখনো চমকে চমকে উঠতে হয়। সন্ত্রাসী, প্রতিপক্ষ কিংবা রাজনৈতিক জিঘাংসার শিকার হয়ে প্রতিদিনই দেশের কোথাও-না-কোথাও অপঘাত মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশের নিরীহ সাধারণ নাগরিকেরা। এভাবে হিসাব মিলালে দেখা যায়, ডজন ডজন পরিবারে প্রতিদিনই কান্নার রোল উঠছে। এর ওপর আছে গুম। একটি জলজ্যান্ত মানুষ সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় ঘর থেকে বের হয়েছিলেন হয়তো কোনো কাজে, নয়তো চা খেতে; কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি। অদৃশ্য ঘাতকেরা তাকে তুলে নিয়ে গেছে। কোনো দূর বিজন প্রান্তে কোনো নদী-নালা, ডোবা-খাল, ধানক্ষেত, ডাস্টবিনের ম্যানহোলে এরা হারিয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা বুক ফাটা কান্নায় হৃদয়ের ভার যে কিছুটা লাঘব করবেন তারও কোনো উপায় থাকে না। হয়তো ভাবেন, এই বুঝি হারিয়ে যাওয়া স্বজন ঘরে ফিরে এলো। হয়তো সে আসবেই। আজ হোক কাল হোক। পরিবারজুড়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক। কেবল চাপা দীর্ঘশ্বাস আর ভয়। সংসারজুড়ে শীতের ঘন কুয়াশার মতো আবৃত হয়ে থাকে।

ভিন্ন দিকও আছে। হয়তো ঘর থেকে কোনো কাজে বের হলো জায়া, জননী, ভগ্নী। হয়তো যাবেন এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়ি। কোনো আত্মীয়স্বজনের বাসায়। সেও যে জীবিত ইজ্জত নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সর্বত্র ওঁৎ পেতে আছে সরকারদলীয় খুনি, মাস্তানেরা। এরা পথ আটকে যে কোনো নারী বা শিশুকে প্রায় প্রকাশ্যেই তুলে নিয়ে যাচ্ছে। শ্লীলতাহানি করছে। কখনো তারা দাঁড়াচ্ছে মুখোমুখি। প্রতিবাদ প্রতিরোধের মোকাবেলার আশঙ্কা থাকলে শ্বাসরোধ করে কিংবা গলা কেটে ওই নারী বা কন্যাশিশুকে হত্যা করছে। আবার একই কায়দার ঝোপঝাড়, ডোবা নালা, বনবাদাড়ে ফেলে দিয়ে যাচ্ছে। কখনো লাশ কুটি কুটি করে কেটে বস্তায় ভরে এখানে-সেখানে ফেলে দিচ্ছে। মুখের চেহারা এমনভাবে বিকৃত করছে যে, যাতে মুখ দেখে চেনাই না যায়। কে ছিল এই নারী বা কন্যাশিশু।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিকার। কখনো কখনো আমরা দেখি লাশ কিংবা লাশের টুকরো দিনের পর দিন ঘটনাস্থলে পড়ে থাকে। এ থানা বলে ওটা আমাদের এলাকা নয়, ও থানা বলে এটা আমাদের এলাকা নয়। তা হলে লাশের কী হবে? শিয়ালে-কুকুরে-কাকে-ঈগলে মানুষের লাশ খুবলে খুবলে খায়। যাদের চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটে, তারা কার্যত কিছুই করতে পারেন না। কেননা এই লাশ শনাক্ত করা, মৃত্যুর কারণ শনাক্ত করার দায়-দায়িত্ব দারোগাবাবুর। কেউ যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে এ লাশ দাফন করতে চান, তাহলে থানা পুলিশ তাকে নিয়েই টানা-হেঁচড়া শুরু করবে। থানায় যাও, আদালতে যাও, সাক্ষ্য দাওÑ এই টানা-হেঁচড়ার ভেতরে কে যাবে! ফলে হৃদয়বান-বিবেকবান মানুষ দাফনের মতো ফরজ কাজটিও করতে পারে না। তাদেরও দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়।

রাষ্ট্রে শাসনক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন যে প্রশাসন তাদের মুখের ভাষা, শরীরের ভাষা অত্যাচারী জমিদারের পাইক-পেয়াদাদের মতো। আর দেশের নাগরিকেরা যেন তাদের বশংবদ প্রজামাত্র। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় জনগণই দেশের মালিক। আর ওই সব প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাদের খেদমতগার; কিন্তু সাড়ে পাঁচ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনে এখন জনগণ সত্যি এক নিপীড়ক জমিদারতন্ত্রের শিকার। এই পীড়ন অ্যালেক্স হ্যালির ‘দি রুটস্’ উপন্যাসের মতো। এ দেশের নাগরিকদের সব সম্পদ জায়া-জননী-ভগ্নি সব কিছুই যেন আওয়ামী শাসক, সন্ত্রাসী ও প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নিবেদিত। এমন বিধানই করেছে সরকার।

এই যে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে, সেগুলো নিয়ে এক ধরনের ঠাট্টামশকারা করতে শুরু করেছেন সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা। সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যা, ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম হত্যা, তার আগে নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যাÑ এসব ঘটনার পরপরই সরকারের শীর্ষপর্যায়ের লোকেরা একবাক্যে রায় দিয়ে দেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিএনপি-জামায়াত জড়িত। কিন্তু সত্য তো সব সময় ধামাচাপা দেয়া যায় না। দেখা গেল নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যায় জড়িত আছে সরকারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং র‌্যারেব দায়িত্বশীল সদস্যরা। হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি কমিশনার নূর হোসেনের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে এরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ। র‌্যাবের যে কর্মকর্তা প্রধান অপারেটর, সেই লে. ক. তারেক সাইদ সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর জামাতা। এই মন্ত্রীর ছেলের নামও এখানে বারবার উচ্চারিত হয়েছে। আরো যারা দৃশ্যপটে আবির্ভূত, তারাও র‌্যাবেরই সদস্য। যারা খুন হয়েছেন আর যারা খুন করিয়েছেন উভয়ই আওয়ামী লীগের সদস্য সমর্থক। অভিযোগে প্রকাশ, তাদের পেছনে আছেন নারায়ণগঞ্জের গডফাদার বলে খ্যাত শামীম ওসমান। তিনি নূর হোসেনকে ভারতে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। তাকে বিচারের আওতায় না এনে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, শামীম ওসমান পরিবারের যেকোনো বিপদ-আপদে তিনি তাদের পাশে থাকবেন। আশকারা আর কাকে বলে!

এদিকে আবার নারায়ণগঞ্জের সাত খুন থেকে শুরু করে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের খবর খুব স্বাভাবিকভাবে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। গণমাধ্যমে এসব কথা প্রচার হওয়ায় সরকার মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে। সরকারের এক মন্ত্রী এমন তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন যে, নারায়ণগঞ্জের সাতটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মিডিয়াগুলো যা করেছে পৃথিবীর ইতিহাসে তা নাকি কোথাও হয়নি। সুতরাং সাংবাদিকদের এমন কষে গালি দিলেন যে, যা কেবল বিশেষ শ্রেণীর মুখেই মানায়, সবার মুখে নয়। এরপর তিনি জানান দিলেন, এমন সম্প্রচার আইন করা হবে যে, সাংবাদিকেরা যাতে টুঁ শব্দটি করতে না পারেন। তারপর সত্যি সত্যি সে আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়ে গেল।

কিন্তু এরকম আইনের হঠাৎ কেন প্রয়োজন পড়ল? বিরোধী মতের যা কিছু সংবাদপত্র বা ইলেকট্রকিন মিডিয়া ছিল, তা সবই তো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এসএসবি বন্ধ, চ্যানেল ওয়ান বন্ধ, দিগন্ত টিভি বন্ধ, ইসলামিক টিভি বন্ধ, আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ, সম্পাদক কারাগারে, দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক কিছু দিন কারাভোগ করে এসেছেন। দৈনিক ইনকিলাবও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। গণহারে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছিল। এখন আবার ঠুনকো অজুহাতে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে এর বার্তা সম্পাদককে রিমান্ড শেষে কারাগারে রাখা হয়েছে।

আর যারা এখন বাজারে সচল তাদের প্রায় সবই সরকারের তাঁবেদার ও স্তাবক। সরকারের খাস লোক। তারপরও কেন এমন আইন করা হচ্ছে। তার কারণ, জনভিত্তিহীন সরকার আসলে কাউকেই বিশ্বাস করতে পারে না। সরকারও তার আপনজনকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কখন কোন ফাঁক দিয়ে কোন অপকর্ম প্রকাশ হয়ে পড়ে? সব সময় সেই ভয় আর আতঙ্কে সরকার থরহরিকম্প।

সেই কারণেই সম্প্রচার নীতিমালায় সরকার এমন বিধান রেখেছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হয় এমন কিছু প্রচার বা প্রকাশ করা যাবে না। অর্থাৎ পুলিশের চাঁদাবাজি, গ্রেফতার বাণিজ্য, চাঁদার দাবিতে খুনÑ কোনো কিছুই প্রচার বা প্রকাশ করা যাবে না।

আর ছাত্রলীগ তো খুনি-টেন্ডারবাজ-দখলবাজ বাহিনী হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে। হেন অপরাধ নেই যা তারা করে না। নারী নির্যাতনও তাদের জন্য ডালভাত, সম্ভবত অধিকারও। ফলে সমাজে অপরাধ, হত্যা, গুম, নারী নির্যাতন এখন ডালভাতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় ইসলামিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক, মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে খুুন করে কিছু যুবক। হাত-পা বেঁধে, গলা কেটে পূর্ব রাজাবাজারের বাসার ডাইনিং রুমে হত্যা করে নির্বিঘেœ চলে যায়। তিনি সুন্নিভিত্তিক সংগঠন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও ইসলামিক ফ্রন্টের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। এ ঘটনার পরপরই সরকারি মহল থেকে রটানোর চেষ্টা হলো যে, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের লোকেরা তাকে হত্যা করেছে। এমনিতেই প্রতিদিন শত শত বিএনপি ও জামায়াতের লোকদের গ্রেফাতার করা হচ্ছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ সংখ্যা হয়তো আরো বাড়বে।

মাওলানা ফারুকীর রক্তের দাগ শুকাবার আগেই ৩৬ ঘণ্টার মাথায় মগবাজারের এক বাসায় ঢুকে দুর্বৃত্তরা একই পরিবারের তিনজনকে হত্যা ও একজনকে গুরুতর জখম করেছে। টেলিভিশনে দেখলাম প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত তৃপ্তির হাসি দিয়ে কাদের সাথে যেন কথা বলছেন। মতিয়া চৌধুরী খিচ্চে বিএনপিকে গাল দিচ্ছেন আর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কামাল মগবাজারে খুনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

এভাবেই এসব লোমহর্ষক ঘটনার ইতি ঘটে। ইতি ঘটে যায়; কিন্তু মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ থামে না। ক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে।