নারী দিবসের খোলা চিঠি

হে আধুনিক নারীগণ,

তোমরা যারা দেহ-প্রদর্শনীকে আর্ট হিসাবে দেখো, আমি তাদের সমর্থক নই। আমি দুঃখিত যে এতটা আধুনিক আমি আজও হতে পারি নি। সুন্দরী প্রতিযোগিতা, মডেলিং ও পতিতাবৃত্তিকে তোমরা যারা নারী স্বাধীনতার অংশ বলে মনে করো, আমি তাদেরও সহযোগী নই। আমি দুঃখিত যে আমি এখনো সাংঘাতিক রক্ষণশীল একজন মানুষ।

একদিন চার দেওয়ালের মধ্যে আমরাই তোমাদেরকে বন্দি করে রেখেছিলাম। আমরা আমাদের যার যার স্ত্রীকে তার তার private property বলে বিবেচনা করতাম। আমাদের কাছে তোমাদের সৌন্দর্য চার দেওয়ালের মধ্যেই বেশী উপভোগ্য ছিল। ঘরের বাইরে তোমাদের সামান্যতম দেহপ্রদর্শনীও এই পুরুষ শাসিত সমাজে তখন যঘন্য অপরাধ বলেই বিবেচিত হতো। তোমাদের মধ্যে যারা রুপালী পর্দার নায়িকা ও মডেল ছিলে, তাদের ছবি আমরা বালিশের নীচে রেখে ঘুমাতাম সত্য, কিন্তু তাদেরকে সম্মানের চোখে আমরা কেউ দেখি নি কোনোদিন। তোমাদেরকে অন্তঃপুরের বন্দি বানিয়ে রাখাটা নিঃসন্দেহে এই পুরুষ শাসিত সমাজের সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল। আজকের এইদিনে পুরুষ শাসিত সমাজের পক্ষ থেকে আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাই, যদিও আমি এখনো মনে করি আমাদেরকে কোনো ক্ষমা করা তোমাদের উচিৎ নয়।

কিন্তু তোমরা যখন মুক্তি পেতে শুরু করলে, ঘর হতে বেরিয়েই কি তোমাদের তখন উচিৎ ছিল না প্রথম সুযোগেই পুরুষদের এই জঘন্য অপরাধের শাস্তি দেওয়া? তোমরা কি বলতে পারতে না যে, যারা তোমাদেরকে ভোগ্য পণ্য করে রেখেছিল, তাদের ভোগের সামগ্রী আর কোনোদিন তোমরা হবে না? কিন্তু না, তোমরা তা করো নি। বরং উল্টো ঘর থেকে বেরিয়েই তোমরা তোমাদের গায়ের বসন ফেলে দিতে শুরু করলে। অন্তঃপুরের বন্দি বানানোর অপরাধে কোনো শাস্তি তোমরা আমাদেরকে দিতে পারো নি; বরং অন্তঃপুরের অর্গল ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রতিবাদে আমরাই তোমাদেরকে উলঙ্গ করে ছেড়েছি। পর্দা প্রথার প্রতিবাদ হিসাবে নগ্ন বা অর্ধনগ্ন হওয়াকেই তোমরা স্বাধীনতা বলে মেনে নিলে। এই ধারণাটাও কিন্তু আমরাই তোমাদেরকে দিয়েছি। এতে লাভ হয়েছে কার? একদিন তোমরা আমাদের private property ছিলে, আজ তোমরা হয়ে গেছ আমাদের public property।

আমরাই তোমাদেরকে শিখিয়েছি অর্ধনগ্ন পোষাক পরাই আধুনিকতা, ঐ পোষাকে বাইরে চলতে পারাই স্বাধীনতা। পৃথিবীর অধিকাংশ fashion house-এর মালিক আমরা; আমরাই তোমাদের আধুনিকতা ও স্বাধীনতা বিক্রি করি। আবার আমরাই বিনা পয়সায় তোমাদের অর্ধনগ্ন শরীর উপভোগ করি। মুখে মেইক আপ, চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক, নাকে-কানে-গলায় গহনা আমরা পরি না। অথচ এগুলোই তোমাদের সৌন্দর্যের প্রতীক বলে আমরাই তোমাদেরকে শিখিয়েছি। পৃথিবীর অধিকাংশ cosmetics company ও jewellery shop এর মালিক আমরা; আমরাই তোমাদের সৌন্দর্য বিক্রি করি। আবার আমরাই বিনা পয়সায় তোমাদের সে সৌন্দর্য উপভোগ করি। সুন্দরী প্রতিযোগিতা, মডেলিং আর রুপালী পর্দায় নগ্ন অভিনয়কে আমরা সম্মাজনক কাজের স্বীকৃতি দিয়েছি, যাতে তোমাদের দেহ দেখিয়ে আমাদের পণ্যগুলো সহজেই আমরা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে পারি। তোমাদের দেহ বিক্রি করেই আমরা অনেকেই আজ কোটিপতি। অথচ আজও আমাদের চালাকি তোমরা একটুও ধরতে পারো নি।

আজকের এই দিনে তোমাদের কাছে তাই আমার একটাই প্রশ্ন: তোমরা কি সত্যিই আধুনিক হতে পেরেছ? আমার তো মনে হয় নারী স্বাধীনতার সংজ্ঞা যেদিন তোমরা নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবে, কেবল সেদিনই তোমরা সত্যিকারের স্বাধীন ও আধুনিক হয়ে উঠতে পারবে। আমি জানি পুরুষরা কোনোদিনও তোমাদের সত্যিকারের বন্ধু ছিল না, আজও নয়, হতে পারবেও না কোনোদিন। স্বামী-প্রেমিক-বন্ধু সেজে কোনো না কোনো ভাবে তোমাদেরকে ভোগ-উপভোগ করাই পুরুষের আসল উদ্দেশ্য। তবুও যদি আজকের এইদিনে আমাকে তোমরা তোমাদের বন্ধু বলে ভাবতে পারো, তোমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা ও আধুনিকতার একটা সহজ সংজ্ঞা দিয়ে আমি তোমাদের একটু সাহায্য করতে চাই: “যা করলে নারীরা কখনোই পুরুষের ভোগ্য পণ্য বলে বিবেচিত হবে না, তা করতে পারা-ই নারীর প্রকৃত স্বাধীনতা, আর তা মনে-প্রাণে ধারণ করা-ই প্রকৃত আধুনিকতা”। এবার ভেবে দেখো তোমরা কতটা স্বাধীন আর কতটা আধুনিক; এবার ভেবে দেখো তোমরা কতটা বোকা, আর আমরা কতটা ধূর্ত।

ইতি

তোমাদের পুরুষরূপী ভণ্ড বন্ধু