অনুবাদের শুদ্ধাশুদ্ধ

faruq mainuddin সত্তর দশকের শেষভাগে নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানগুলোতে অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য সব বইপত্র পাওয়া যেত। বাংলা এবং ইংরেজি ভাষার সেসব বই গ্রন্থপ্রেমীদের তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি সংগ্রহকেও সমৃদ্ধ করত। আজকাল সেসব ঝুপড়ি দোকানের অস্তিত্ব নেই, সে রকম পুরনো বইও বোধকরি আর পাওয়া যায় না। সে সময় একটি বই হাতে এসেছিল জন স্টাইনবেকের দ্য লং ভ্যালি। বারোটি গল্পের এই সংকলনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। বইটির গল্পগুলো পড়ে চমৎকৃত হয়ে একটি গল্প অনুবাদ করে ফেলি। গল্পটির নাম ‘সাপ’ (দ্য ক্লে)।

তরুণ জীববিজ্ঞান গবেষক ড. ফিলিপসের বাসায় এক রাতে তার গবেষণার মাঝখানে উপস্থিত হন সম্পূর্ণ অপরিচিত এক তরুণী। ‘তার পরনে ছিল কুচকুচে কালো পোশাক, সরল কালো চুলের কয়েকগাছি চ্যাপ্টা কপালের ওপর অবিন্যস্ত হয়ে বাতাসে ওড়ার মতো ঝুলছিল। উজ্জ্বল কড়া আলোয় চকচক করছিল তার কালো চোখ।’ ড. ফিলিপসের বিরক্তি এবং গবেষণার পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়াকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে মহিলা জানতে চান তার কাছে সাপ আছে কিনা। ডজনখানেক আছে জানার পর জানতে চান এদের মধ্যে পুরুষ সাপ আছে কিনা। সেই পুরুষ সাপটিকে মহিলাটি পাঁচ ডলার দিয়ে কিনে নিয়ে সেখানেই আলাদা একটা খাঁচায় স্থানান্তরিত করান। তারপর ফিলিপসের গবেষণার কাজে ব্যবহার করার জন্য রাখা একটা ইঁদুর সেই খাঁচায় দিয়ে সাপটির ইঁদুর ভক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে মহিলাটি চলে যান। সে রাতের পর থেকে ড. ফিলিপস মহিলাটিকে আর কখনোই দেখেননি কোথাও। গল্পটিতে রহস্যময়ী সেই মহিলার একটি পুরুষ সাপের মালিকানা লাভ এবং সেটিকে খাওয়ানোর ইচ্ছে তারামাছের প্রজনন প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যস্ত ড. ফিলিপসের গবেষণার পাশে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। সাপের ইঁদুর খাওয়ার দৃশ্য গল্পের গবেষকের কাছে নতুন কিছু নয়, কিন্তু অপ্রয়োজনে একটি জীবন্ত প্রাণীকে সাপের আহার হতে দেয়া পছন্দ না করলেও মহিলাটির অদম্য ইচ্ছের কাছে পরাভূত হয় ড. ফিলিপসের অনীহা। এখানে সর্পচরিত্র এবং নারীচরিত্রকে যেভাবে একই সমান্তরালে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে সেটি অভিনব হলেও গল্পের সূক্ষ্ম যৌন ইঙ্গিত এবং নারী চরিত্রের মনোঃবিশ্লেষণ ছিল গল্পটির মুখ্য বিষয়।

এ রকম একটি গল্পের বিভায় উজ্জীবিত হয়ে জীবনে প্রথম অনুবাদ করা গল্পটি জমা দিয়েছিলাম অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক আহসান হাবীবের কাছে। কয়েক সপ্তাহ পরে গল্পটি ছাপা হয়। সেটি ছাপার পর আহসান হাবীব জানান, স্টাইনবেক তার প্রিয় গল্পকারদের অন্যতম। এই লেখকের আরও কয়েকটা গল্প অনুবাদ করে দেয়ার অনুরোধও করেছিলেন তিনি। আহসান হাবীবের মতো সম্পাদকের সেই অনুরোধে কৃতার্থ হয়ে এরপর অনুবাদ করি স্টাইনবেকের ‘হনন’ (দ্য মার্ডার)। ক্যালিফোর্নিয়ার এক দুর্গম অঞ্চলের এক চাষি দম্পতির খুব সাদামাটা কাহিনী নিয়ে গল্পটি। জিম বিয়ে করেছিল এক যুগোস্লাভ মেয়েকে। জেলকা নামের মেয়েটি ছিল অপূর্ব সুন্দরী এবং শুধু সে কারণেই তাকে বিয়ে করে জিম, যদিও জেলকার ভিনদেশি পরিবার নিয়ে তার কোনো গর্ব ছিল না। ‘জেলকার ছিল হরিণীর মতো ডাগর প্রশ্নবহ চোখ। ছিল সরু এবং তীক্ষè নাক এবং ঠোঁট ছিল গভীর ও কোমল। জেলকার ত্বক সব সময়ই শিহরিত করত জিমকে . . .।’ মেয়েটি ছিল শান্ত, চুপচাপ ও নিখুঁত কর্তব্যপরায়ণ, অথচ তার নীরবতা দিয়েই নিজেকে একটা কঠিন বর্মের মধ্যে ঢেকে রাখত সে। এক রাত বাইরে থাকার কথা বললেও বিশেষ জরুরি অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসতে হয় জিমকে এবং বাড়ি ফিরে জেলকাকে তারই এক কাজিনের সঙ্গে বিছানায় দেখতে পায় সে। সঙ্গে থাকা বন্দুক দিয়ে বিছানায় ঘুমন্ত জেলকার কাজিনটিকে খুন করে জিম। তখনকার দিনে আমেরিকার সেসব অঞ্চলে অবিশ্বাসী স্ত্রী কিংবা তার প্রেমিককে খুন করা বোধ হয় গৌণ ব্যাপার ছিল, কারণ পুলিশ বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয় না, উল্টো জানায়, যে কেসটি উঠবে ঠিকই, তবে খারিজ হয়ে যাবে। এখানে গল্পের মূল ঘটনা খুন হলেও জিমের কিংবা তার শ্বশুরের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং জেলকার আচরণে এক ধরনের প্রভুভক্তির মতো বিষয় স্টাইনবেক চিত্রিত করেছেন তার নিজস্ব দক্ষতায় এবং কৌশলে।

আমার স্টাইনবেক আবিষ্কারের পর সেই নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানে পাওয়া যায় স্টাইনবেকের প্যাশচিওরস অভ হ্যাভেন উপন্যাসটির তালিম হোসেনকৃত অনুবাদগ্রন্থ স্বর্গচারণ। ক্যালিফোর্নিয়া উপত্যকায় এক সুখী কৃষিপ্রধান গ্রামের কাহিনী নিয়ে লেখা ষাটের দশকে বাংলায় অনূদিত এবং প্রকাশিত দুর্লভ এই গ্রন্থটির সেই আদি সংস্করণ এখন আর কার কাছে পাওয়া যাবে জানি না। সে সময় দেশের একমাত্র চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রতি শনিবার দেখানো হতো ক্লাসিক সব হলিউড সিনেমা। সেই সুবাদে দেখা হয়েছিল ১৯৪০ সালের পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া ত্রিশের মহমন্দা, খরা এবং কাজের সন্ধানে দলে দলে গৃহত্যাগী মানুষের যন্ত্রণা নিয়ে লেখা স্টাইনবেকের আরেক কালজয়ী উপন্যাস দ্য গ্রেপস অভ রথ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি। তারও কয়েক বছর পর বাংলা একাডেমী এই উপন্যাসটির একটি বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করে। কিন্তু বইটি অসাধারণ দ্রুততায় শেষ হয়ে যায় বলে বইটি কেনা দূরে থাক সেটির অনুবাদক কে সে তথ্যটিও সংগ্রহ করা যায়নি। বহু বছর পর স্টাইনবেকের দ্য পার্ল উপন্যাসটির দুটি বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ বের হয়েছিল, তার মধ্যে একটি বাংলা একাডেমীর প্রকাশনা।

সেই সত্তরের উপান্তে করা প্রথম অনুবাদ কর্মটির প্রায় এক দশক পর ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর অনুরোধে আরেকটা অনুবাদ কর্মে হাত দিতে হয়, এটি জাপানি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিক কেনজাবুরো ওয়ের উপন্যাস ‘শিকার’। অনুবাদ কর্মটি ছোট হলেও একচ্ছত্র ছিল না, কারণ ‘শিকার’ নামে একই উপন্যাসটির আরেকটি অনুবাদ প্রকাশ করেন আলী আহমেদ।

অনুবাদ সত্যিকার সাহিত্যকর্ম কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু অনুবাদের মুখ্য উদ্দেশ্য যে বেশিসংখ্যক স্বদেশি পাঠকের কাছে বিদেশি লেখকের কোনো একটি সৃষ্টি উপস্থাপন করাÑ সেটি আমরা প্রায়শই বিস্মৃত হই। তবে অনুবাদের আরও একটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে কারও কারও কাছে, যে কোনো একটি ভালো বিদেশি বই বা লেখা শুধু নিজে পড়ে উপভোগ করা নয়, অন্যদের সঙ্গে পাঠের আনন্দ ভাগ করে নেয়া। ঠিক একই উদ্দেশ্যে অনুবাদ করেছিলাম আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্মৃতিকথা অ্যা মুভেবল ফিস্ট। মুম্বাইর ফোর্ট-এর মতো বাণিজ্যিক এলাকায় বনেদি বইয়ের দোকান স্ট্র্যান্ড বুকস্টলটি নামে বড় হলেও মাপে ছোট। মুম্বাইর মতো শহরে বইয়ের দোকান, তা-ও বাণিজ্যিক এলাকায়, টিকিয়ে রাখাই যেখানে মুশকিল, সেখানে ছোট্ট পরিসরে দোকানটি চালিয়ে যাচ্ছেন টিএন শানবাগ। ১৯৪৮ সালে স্ট্র্যান্ড সিনেমার সামনে ছোট একটা বইয়ের খুপরি থেকে শুরু করেছিলেন তিনি। তার দোকানের সমৃদ্ধ সংগ্রহের কারণে মুম্বাইর সব শ্রেণীর গ্রন্থপ্রেমী দ্বারস্থ হন ফোর্ট এলাকার ছোট্ট দোকানটিতে। বরিস পাস্তেরনাকের ডক্টর জিভাগো যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পাচার করে নিয়ে ইতালি থেকে প্রকাশ করা হয়, সেটির একহাজার কপি নাকি অনিয়েছিলেন শানবাগ, তখনও নোবেল পাননি পাস্তেরনাক। সেই বইয়ের একটি কপি সংগ্রহ করার জন্য স্বয়ং জওহরলাল নেহরু রাত সাড়ে ১০টার সময় উপস্থিত হয়েছিলেন শানবাগের দোকানে। অবশ্য এক কপি কিনতে গিয়ে মোট ২১ কপি নাকি কিনেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের পড়–য়া কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা সময় বের করতে পারলে একবার হানা দিতেন স্ট্র্যান্ডে। এই লেখকের উপস্থিতিতে একদিন এসে ঢুকেছিলেন কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোয়ান্ত সিনহা। মন্ত্রীকে দেখে দোকানের কারও মধ্যে কোনো হেলদোল নেই, কেবল একজন একখানা চেয়ার দিয়ে গেলেন মন্ত্রীর পাশে যাতে, তিনি বই বাছাই করার সময় চেয়ারে বসে কাজটি করতে পারেন। এমন একটি দোকানের মালিক শুধু গ্রন্থবিপণনে অবদান রাখার জন্য যে ২০০৩ সালে ‘পদ্মশ্রী’ পদক পান, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। সেই স্ট্র্যান্ড বুকস্টল প্রত্যেক বছর মুম্বাইর নিউ মেরিন লাইনসের সুন্দরবাই হলে আয়োজন করে মাসব্যাপী বইমেলা বা উৎসব। যেহেতু মুম্বাইর মতো ব্যস্ত নগরে স্ট্র্যান্ড বুকস্টলে গ্রন্থপ্রেমী মানুষ সব সময় যেতে পারে না, তাই সুন্দরবাই হলের সেই বার্ষিক বইমেলাটি হয় বহু মানুষের আরাধ্য একটি উপলক্ষ। উল্লেখ্য, শানবাগের প্রয়াণ ঘটে ২০০৯ সালে।

সেই বইমেলা থেকে হেমিংওয়ের অ্যা মুভেবল ফিস্ট বইটি কিনে গোগ্রাসে পড়ে ফেলার পর প্রথম যে অনুভূতিটা হয় সেটি হচ্ছে বাংলাভাষী পাঠকের সঙ্গে বইটির পরিচয় ঘটানো এবং তার একমাত্র উপায় বইটি অনুবাদ করে প্রকাশ করা। বিশেষ করে বইটির মূল আকর্ষণ ছিল নতুন গল্পকার হেমিংওয়ের লেখার প্রক্রিয়া, তার দারিদ্র্য, হতাশা এবং বারবার হেরে গিয়েও অপরাজেয় মনোভাব নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রামরত হেমিংওয়ে গল্প লেখার জন্য চলে যেতেন কোনো কাফেতে, আর স্ত্রীকে বলে যেতেন যে তার নিমন্ত্রণ আছে, অথচ এক পেয়ালা কফি বা একটুকরো সসেজ ছাড়া আর কিছু কিনে খাওয়ার মতো পয়সা তার পকেটে থাকত না। যুবক হেমিংওয়ে যখন সত্যিকার হেমিংওয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন, সেই সময়কার স্মৃতিকথাটি আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। হেমিংওয়ের পাঠাভ্যাস, লেখালেখির নিরন্তর প্রচেষ্টা এবং অনুশীলন, সমসাময়িক অন্যান্য লেখকের সঙ্গে তার সম্পর্কÑ এসব প্রসঙ্গ ছিল খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। তার অধ্যাবসায়, গল্প লেখার প্রক্রিয়া এবং লেখালেখি সম্পর্কে তার মতামত ও প্রতিক্রিয়া অনেকের কাছে শিক্ষণীয় হতে পারে বলে বাংলাদেশের নবীন গল্পকারদের সঙ্গে বইটি পাঠের আনন্দ ও শিক্ষা ভাগ করে নেয়ার উদ্যম থেকেই বিশ অধ্যায়সংবলিত বইটি অনুবাদ করার অবকাশ ঘটে, যেটি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের প্যারিসের স্মৃতিকথা নামে ‘দিব্য প্রকাশ’ থেকে বের করেছিলেন কথাশিল্পী মঈনুল আহসান সাবের ২০০৪ সালের বইমেলায়। এটি অনুবাদ করার সময় প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করি যে, অনুবাদ নিছক ভাষান্তর নয়, প্রয়োজনে তার সঙ্গে দিতে হয় প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও টিকা। বইটি যে সময়ের পটভূমিতে লেখা, সে সময়কার বহু লেখক ও চিত্রশিল্পীর নাম ছিল এটিতে, যাদের নাম সাধারণ পাঠকের কাছে অপরিচিত ঠেকতে পারে, তাই পরিচিত-অপরিচিত সবার নামেই সন্নিবিষ্ট করতে হয় টিকা। সে কাজের জন্য বহু ঘাটে ঘুরতে হয়, কারণ কিছু কিছু নাম আজকালকার অগতির গতি ইন্টারনেটেও পাওয়া যায়নি। প্যারিসের পটভূমিতে লেখা বলে বইটিতে রয়েছে অজস্র ফরাসি নাম ও শব্দ। সেসবের সঠিক উচ্চারণ ও অর্থ জানার জন্য মুম্বাইর বায়কুল্লার পার্সি কলোনিতে শ্রীমতি খুরশিদ আদারবাদ নামের এক ফরাসি শিক্ষিকাকে নিযুক্ত করেছিলাম। এই সাহায্যের বিনিময়ে অবশ্য তিনি কোনো সম্মানী গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

গ্রন্থটি আমাদের তরুণ লেখক বা অন্য পাঠকের কোনো উপকারে এসেছে কিনা, কিংবা বইটি পাঠে কেউ আনন্দ লাভ করেছেন কিনা কিংবা প্রকাশকের বাণিজ্যিক কোনো ফায়দা হয়েছে কিনা জানি না, কিন্তু এ রকম একটি গ্রন্থের স্বতঃস্ফূর্ত অনুবাদ করতে পেরে আশ্চর্যরকম তৃপ্তি ও আনন্দ অনুভব করেছিলাম। কারণ প্রথমত বইটি হেমিংওয়ের অন্যসব বইয়ের মতো বাংলাদেশের সাধারণ পাঠকদের কাছে পরিচিত নয়, কেবল লেখক বা সমগোত্রীয়দের কাছেই বইটি পরিচিত এবং পঠিত। দ্বিতীয়ত বইটিতে হেমিংওয়ের লেখালেখির প্রাথমিক অভিজ্ঞতা ও সবক আছে বলে মনে হয়েছিল, এটি আমাদের নতুন লেখকদের করছে সমাদৃত হবে।

এই গ্রন্থটি অনুবাদের আরও আট বছর পর যে বিশাল গ্রন্থটি অনুবাদ করার সুযোগ ঘটে সেটি গবেষক ও মার্কিন অধ্যাপক ক্লিন্টন বি সিলির অ্যা পোয়েট অ্যাপার্ট নামের জীবনানন্দের সাহিত্যিক জীবনী। এটি অনুবাদের সুবাদে ঘটেছিল কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতা, সেসব এই লেখার ক্ষুদ্র পরিসরে জানানোর সুযোগ নেই। তবে অনুবাদ নিয়ে কিংবা তার প্রক্রিয়া বা কৌশল নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে।

রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলীর জন্য যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন সেটিও কিন্তু অনুবাদ-নির্ভর একটি কাজ। সংস অফারিং-এর কবিতাগুলো কি কোনোভাবেই তার মূল রচনার দ্যোতনার কাছাকাছি আছে? কিন্তু তবুও সেই অনুবাদের ওপর ভিত্তি করেই তাকে দেয়া হয় নোবেল পুরস্কার। এখানে অন্য অনুবাদের সঙ্গে একটিই পার্থক্য, সেটি হচ্ছে অনুবাদ কর্মটি দ্বিতীয় কোনো অনুবাদকের হাতে ঘটেনি, কবি স্বয়ং অনুবাদ করেছিলেন কবিতাগুলো। অন্য কারও হাতে অনূদিত হলে কিংবা গ্রন্থটিতে কবি ইয়েটসের মতো ব্যক্তিত্বের দীর্ঘ ভূমিকা না থাকলে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেতেন কি না সেটাও ভাববার বিষয়। অতএব, অনুবাদের সীমাবদ্ধতা থাকবেই, কিন্তু তাই বলে মূল রচনা পাঠের দৃঢ় সংকল্পে কেউ যদি অনুবাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখেন, সেটি হবে বিশ্ব সাহিত্যের বিশাল ভুবন থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার শামিল। এ প্রসঙ্গে পাবলো নেরুদার স্পেনিশ আত্মজীবনী ঈড়হভরবংড় য়ঁব যব ারারফড় : গবসড়ৎরধং (স্বীকার করছি যে আমি বেঁচে আছি : স্মৃতিকথা) অবলম্বনে হার্ডি সেন্ট মার্টিনের ইংরেজি অনুবাদ মেময়রস-এর বংলা অনুবাদ অনুস্মৃতির ভূমিকায় ভবানীপ্রসাদ দত্ত যা লিখেছেন সেটি উদ্ধৃত করা যায়,

‘আমার জানতে ইচ্ছে করে, যদি মূলভাষা থেকে কোনো রচনা অনূদিত না হয়, তা হলে যারা অহমিকা ও অনীহায় নিন্দা ও তাচ্ছিল্যের অন্ধ অবজ্ঞা ছুড়ে দেন তারা কোনো অচিকিৎস্য ব্যাধিতে ব্যাধিগ্রস্ত কিনা। নির্মম দারিদ্র্যে পাবলো যখন শৈশব থেকে কৈশোরে বিব্রত তখন তার প্রিয় বইগুলোর মধ্যে ছিল উগো, দ্যুমা, দিদেরো, গোর্কি, জুল ভের্ন্ প্রমুখ অসংখ্য লেখকের বই। এসব ছিল তার অতি প্রিয় এবং বারবার তিনি তা পড়তেন। নিশ্চয়ই তখন অনুবাদই পড়তেন। . . . আমার জানতে ইচ্ছে করে, এইসব বিদগ্ধ বাঙালি যারা শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে বৃদ্ধবয়সেও বাংলাভাষার দ-মু-বিধাতা তারা কি উগো, ব্রেখট, বোদলেয়ার থেকে শুরু করে হামসুন, মান, পুশকিন, দস্তয়ভস্কি, দ্যুমা মূল ভাষাতেই পড়েছেন?’

অনুবাদ পাঠের এবং অনুবাদ কর্মের বিষয়ে এইসব বিতর্ক এবং ভাবনা একসময় যে রকম সক্রিয়ভাবে সচল ছিল, আজকালের বিশ্ববীক্ষায় সেসব বহুলাংশে দূরীভূত, তার কারণ ওপরের উদ্ধৃতি থেকেই স্পষ্ট। আজকাল এমনকি অনুবাদ কর্মকে বিশেষভাবে স্বীকৃতিও দেয়া হচ্ছে বিভিন্নভাবে।

তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে বিশ্বপল্লীর বিভিন্ন অলিগলিতে যেসব সাহিত্য রচিত হচ্ছে সেসব মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষীর কাছে, ফলে সেসবের ভাষান্তরও হয়ে উঠেছে অপেক্ষাকৃত ‘সহজ’। সহজ শব্দটি ঊর্ধ্বকমার মধ্যে রাখার উদ্দেশ্য এই সহজতাকে বিশেষভাবে দেখানো। কারণ গ্রন্থস্বত্বের তোয়াক্কা না করে, মূল লেখকের অনুমতির প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করে আমাদের দেশে প্রায় প্রত্যেকটি বিদেশি গ্রন্থের যে অবিশ্বস্ত অনুবাদ সংঘটিত এবং প্রকাশিত হওয়ার প্রবণতা চলছে, সেটি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সাহিত্যরুচির উৎকর্ষের জন্য যে মঙ্গলকর নয় তা বুঝতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে না। এই প্রবণতার জন্য অনুবাদক এবং প্রকাশক উভয়ই সমভাবে দায়ী। অনুবাদ কর্মের বিশ্বস্ততা এবং মান বজায় রাখার জন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সরল পাঠক যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন মূল সাহিত্যকর্মটির সারাৎসার থেকে, তেমনি অন্য একজন তন্বিষ্ট অনুবাদক হারাচ্ছেন সেই গ্রন্থটি অনুবাদের সুযোগ ও স্পৃহা। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় মূল গ্রন্থের সঙ্গে তুলনা করে গবেষণা করলে অবিশ্বস্ত ও ভুল অনুবাদের ভূরি ভূরি প্রমাণ দেখানো যাবে, কিন্তু অনুবাদ কর্মের শুদ্ধতা রক্ষায় সেই কাজটি করতেও কেউ এগিয়ে আসবেন কিনা জানি না। নিতান্ত দায়সারাভাবে কোনো বিদেশি লেখা অনুবাদ করে ফেলার এই অগ্রহণযোগ্য প্রবণতাকে রোধ করার জন্য লেখক, অনুবাদক ও প্রকাশককে সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। তার সঙ্গে কিছু উদাহরণ পাঠকদের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করতে পারলে বঙ্গানুবাদধর্মী অনুবাদকরা হয়তো কিছুটা সচেতন হতেন।

ইংরেজি থেকে বাংলায় ট্রান্সলেশন করাই যদি সাহিত্য অনুবাদের ধারা হয়, তাহলে সেটি হবে আমাদের বিদেশি সাহিত্যের পাঠাভ্যাস এবং সাহিত্যের অগ্রগতির জন্য চূড়ান্ত একটি ক্ষতিকর প্রক্রিয়া, যার দৌরাত্ম্য এবং প্রবণতার কথা এরই মধ্যে বলা হয়েছে। কোনো সাহিত্যকর্মই অনুবাদকের হাতে সমভাবে সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না, কিন্তু মূল লেখার স্থান, কাল এবং পাত্রের বিষয়ে অনুবাদককে হতে হয় সবিশেষ যতœশীল। সেরকম কিছু চমৎকার অনুবাদ কর্ম আমাদের উপহার দিয়েছিলেন ননী ভৌমিক, হায়াৎ মামুদ, সত্য গুপ্ত, অরুণ সোম, সমর সেন প্রমুখ অনুবাদক। তাদের হাতে রাশিয়ান কালজয়ী সাহিত্যের প্রায় সবই বাংলা ভাষাভাষী পাঠককুল প্রায় মৌলিকজ্ঞানেই উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন। একথা স্বীকার করতে কারোরই কোনো দ্বিধা নেই যে, রাশিয়ান গ্রন্থগুলোর সমকক্ষ অনুবাদ বাংলা ভাষায় অনূদিত বইয়ের মধ্যে খুব বেশি পাওয়া যাবে না। অথচ তার পরও অনুবাদ বিষয়ে কিছু কিছু পাঠকের অতৃপ্তি এবং অভিযোগ থেকেই যায়, কারণ অনুবাদ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই মূল রচনাটির স্বাদ অন্তর্হিত হয়ে যায় এবং সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে অনুবাদকের ভূমিকা। তাই অনুবাদকের দায়িত্ব হয়ে পড়ে মূল ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রায় নতুন একটি সৃষ্টিকর্ম সমাধা করা। এটি সাফল্যের সঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই কেবল অনুবাদ কর্মটি লাভ করে নতুন সাহিত্যমাত্রা।

ই-মেইল: fmainuddin@hotmail.com