এক সপ্তাহের একটি পরিবার

kaptai-lake

(২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রছাত্রিদের নিয়ে একটি স্টাডি ট্যুর)

আগে আনন্দ না দেশ!
অনেক দিন পর ডিপার্টমেন্টে ফিরে এসেছি। কিছুদিন হল ক্লাস নিচ্ছি। এরই মাঝে ডিপার্টমেন্ট আমাকে বলল চতুর্থ বর্ষের ছেলেমেয়েদের সাথে ইন্ডিয়ায় স্টাডি ট্যুরে যাওয়ার জন্য। আমি রাজী হলাম না। মারিয়াকে বলা মাত্র ও রাজী হয়ে গেল। মারিয়া আমার প্রথম দিকের ছাত্রী এখন ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক। অন্য কোন পুরুষ শিক্ষক রাজী না হওয়াতে ডিপার্টমেন্ট আমাকেই বাধ্য করল নিয়ে যেতে। আমি অন্য কোন উপায়ান্তর না দেখে রাজী হলাম। রাজী হলেও অস্বস্তি যাচ্ছে না। ছাত্রদের কাউকেই চিনিনা। কেবল কিছুদিন ধরে ওদের ক্লাস নেওয়া শুরু করেছি। আর ইন্ডিয়াতে আমি কখনো যাইনি। একটি অপরিচিত দেশে কিভাবে কি করব কিছুই ভেবে উঠতে পারছি না। ছাত্রদের সাথে কথা বললাম, চল দেশের কোথাও বেড়াতে যাই। আনন্দ করার জন্য কিছু তরুণ মন দরকার আর কিছুর দরকার নেই। কিন্তু ওরা রাজী না। ওদের প্রথম আকর্ষণ ইন্ডিয়া, আনন্দ পরে। আরেক দিন কিছু বিস্কুট কিনে শেষ বারের মত রাজী করানোর চেষ্টা করলাম। এর মধ্যে মারিয়া আমাকে জানিয়ে দিয়েছে ও ইন্ডিয়া যাবে না। আমি ছাত্রদের হাঁতে বিস্কুট দিয়ে অনেক কথা বললাম। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। শেষমেশ বললাম তোমরা চাইলে আমি এই স্টাডি ট্যুরকে ডিপার্টমেন্ট প্রতি বছর স্মরণ করবে তার ব্যাবস্থা করে দিতে পারি। তার জন্য তিনজন ভলান্টিয়ার লাগবে। ওরা শুনতে চাইল কিভাবে। খুব সহ্জ একটি উপায়, তিনজন ভলান্টিয়ারের একজন মহিলা, যিনি সাঁতার জানবেন না। বাকী দুজন ভদ্রলোক, একজন সাঁতার জানেন আরেক জন সাঁতার জানেন না। ভদ্রমহিলা ব্রিজ থেকে পড়ে যাবেন নদীতে (এটা ভলান্টিয়ার না হলেও চলবে, আমরাই ব্যাবস্থা করব)। এই দেখে যে ভদ্রলোক সাঁতার জানেন না তিনি লাফ দিয়ে ভদ্রমহিলাকে উদ্ধার করতে যাবেন। আমরা তাঁকে ধরে শান্ত করব, যেন লাফ না দেন। আর যিনি সাঁতার জানেন তিনি আস্তে ধীরে ব্রিজের গোঁড়ায় গিয়ে পানিতে নেমে কিছুক্ষণ সাঁতার দিয়ে পাড়ে এসে হাঁপাতে থাকবেন। আমরা তার সেবা করব। এমন সময় একজন ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন – যে ভেসে গেলে তার কি হবে? আমরা ডিপার্টমেন্টে ফিরে প্রতিবছর তার জন্য অনুষ্ঠান করব। কেঁদে কেঁদে বলব কেমন করে চোখের সামনে ভেসে গেল, কেমন করে আমার দুজন সাহসী ছাত্র জীবন বাজী রেখে তাঁকে উদ্ধার করতে গিয়েছিল, কেমন করে চোখ বন্ধ করলেই দৃশ্যটি চোখের সামনে ভেসে উঠে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এত কিছু বলার পরেও তারা ইন্ডিয়ার ব্যাপারে অনড়। কিন্তু পাজী গুলো আমার বিস্কুট ঠিকই খেয়ে শেষ করল (অথচ ওরা আমার পরিকল্পনায় রাজী হলে আজ এই লেখাটি ভেসে যাওয়া ভদ্রমহিলাকেই উৎসর্গ করতে পারতাম)।

লেকচার ইন দ্যা কার্জন হল
আমি যেহেতু ওদেরকে ট্যুরে নিয়ে যেতে রাজী হয়েছি, আমি নিয়ে যাবই। মারিয়া যাক বা না যাক। বিপদ দেখব, বিপদে চলব; কে জানে ইন্ডিয়া গেলে হয়ত আমাদের ট্যুরটা ডিপার্টমেন্ট আরো বড় করে মনে রাখবে, একজন ছাত্রীর সাথে হয়ত একজন ছাত্রও মরবে। কিন্তু শিক্ষক মরতে হলে আমি যে একাই, এটাই আমার একমাত্র কষ্ট। মারিয়া গেলে অন্যভাবে ম্যানেজ করা যেত। এরই মাঝে একটি জিনিষ পরিষ্কার হয়ে গেল – সময় আছে খুব অল্প। এবং এই অল্প সময়ে সবার পাসপোর্ট আর ভিসা করা সম্ভব নয়। আমাদের ট্যুর শেষপর্যন্ত বাংলাদেশেই হচ্ছে। আমি শুনে খুব খুশী হলাম এবং সাথে সাথে মারিয়াকে ফোন করলাম। ওকে বললাম আমাদের সাথে ওকে যেতেই হবে, আমি ওর সব দেকভাল করব, এমনকি ও মরে গেলে আমি ডেড বডি আনার ব্যাবস্থাও করব। ও রাজী হয়ে গেল। আমার এত আনন্দের মাঝেও বিস্কুটের কথা মনে পড়ল, সময়ের হিসেবটা আগে করতে পারলে অত গুলো টাকা গচ্চা যেত না।

দেশে বেড়ানোর জন্য আমার নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা ছিল। সেগুলোর জন্য লোক মারফত খোঁজ নিতে থাকলাম। কিন্তু সবই অনেক আগে থেকে বলে রাখতে হয়। কিছুই পেলাম না। এগিয়ে এল ইকবাল, আসাদ, সহ আর কয়েকজন। ওরা একজন ট্যুর গাইড ম্যানেজ করে ফেলল। গাইডেড ট্যুর নিয়ে আমার কোন ধারণা নেই। আর এর ছাড়া অন্য কিছু করাও সম্ভব নয়, খুশী মনেই মেনে নিলাম। একদিন রাতে আমাদের ট্যুর শুরু হল কার্জন হল থেকে। সন্ধ্যায় দোয়েল চত্বরের পাশে কার্জন হলের গেটে এসে দেখি একটি বাস দাঁড়িয়ে আছে। ছাত্রদের অনেকেই চলে এসেছে। আমার ব্যাগটি বাসে রাখলাম। নিচে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম ওদের আসতে। কেউ রিক্সা দিয়ে এল, কাউকে বাসা থেকে দিয়ে গেল। সবার পড়ে এল দিহান, ওর জন্য বেশ খানিকটা দেড়ি হয়েছে আমাদের। শুরু করার আগে সবাইকে নিয়ে গেলাম কার্জন হলের সিঁড়িতে। কিছু ছবি তুলা হল। ওদের বসিয়ে বেশ বড় একটি লেকচার দেয়ার ইচ্ছে ছিল, একটু হাড় জ্বালানোর জন্য। প্রথম দিনই ওরকম জ্বালানো ঠিক হবে না বলে শুধু বললাম – তোমার বন্ধুদের চিনে নেয়ার এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ। তার চেয়েও বড় নিজেকে জানতে পারবে, অন্যদের চোখে। জীবনে এতজন প্রায় সমমনা বন্ধু একসাথে আর পাবে না, যতটুকু পার আনন্দ করে নিও। আমার ধারণা খুব সংক্ষেপ একটি লেকচার দিয়েছি (ছাত্ররা পাজী, ঐ যে বিস্কুট খেয়ে শেষ করেছে, ওরা ভিন্ন কথা বলতে পারে)।

আমি গেইটে দাঁড়িয়ে সবাইকে বাসে উঠার সময় শুভেচ্ছা জানালাম। ট্যুর গাইড, বাস ড্রাইভার, এবং বাসের কনডাক্টর সবাইকে বেশ নিরীহ ভদ্রলোক মনে হল। আমাদের বাস ছাড়ল রাত দশটায়। বাসের ইঞ্জিন অনেক পুরানো ছিল বলে অনেক শব্দ করেছে। প্রথমে কানে কষ্ট লাগলেও পরে শব্দের জন্য বেশ সুবিধা পেয়েছি। বাস ছাড়ার পর দেখা গেল ছাত্রদের কেউই গানের সিডি বা ডিভিডি আনেনি। একজনের কাছে আছে তাও মমতাজের গান। সেটিই বাজানোর চেষ্টা করা হল। সাউন্ড সিস্টেম খুবই বাজে, ঘড়র ঘড়র শব্দ বেরোচ্ছে। এর উপর কনডাক্টরের গালি, টেম্পো, রিকশাওয়ালা, মিনিবাসের ড্রাইভার, যেই ওর গাড়ির সামনে আসে তাকেই গালি দিচ্ছে। আর গালি গুলো মানুষের জন্মের সাথে মানুষ সহ বিভিন্ন প্রানিকে জড়িয়ে। খুবই অবাস্তব এবং শ্রুতিকটু হলেও গালির গঠন খুবই চিন্তা কর্ষক। কিন্তু পাশে একজন মহিলা থাকার কারণে খুবই অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। আমি তার গালি বন্ধ করার জন্য তার সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। সে বাসের বনেটে বসে আমার দিকে ঘুরে কথা শুরু করল। একটি শব্দ বলেই হয় আমার পায়ে হাত দিচ্ছে না হয় আমার হাতে হাত দিচ্ছে। মাঝেমাঝে অনেকক্ষণ ধরেই তার একটি হাত আমার পায়ে রেখে দিচ্ছে। এটি আমার খুবই অপছন্দের একটি কাজ। কিন্তু গালির চেয়ে ওটাই মেনে নিলাম। ব্যাড ইজ বেটার দেন ওয়ার্স।

বাসের ইঞ্জিনের শব্দ, বাজে সাউন্ডের মমতাজের গান, আর কনডাক্টরের স্পষ্ট গালিতে মোটামুটি একটি দুর্বিষহ অবস্থা। একসময় খেয়াল করে দেখি আমি চাইলে কিছু না শুনেই বাইরে তাকিয়ে থাকতে পারি। বেশ মজা লাগল, কেউ চাইলে গান শুনতে পারে, চাইলে ইঞ্জিনের শব্দ শুনবে, অথবা কিছুই না। কিন্তু একটিই যদি স্পষ্ট করে শুনার অবস্থা থাকত তাহলে সবাই বাধ্য হয়েই একটিই শুনতাম, তাতে অনেকেরই আমার মত কষ্ট হত। জীবনে একটি কিছু খারাপ থাকার চেয়ে অনেক কিছু একসাথে খারাপ থাকলে ভালো থাকার একটি পরিবেশ তৈরি করে নেয়া যায় বৈকি!

থার্মোডাইনামিক্সের কৃষ্ণ বস্তু
আমাদের বাস কিছুদূর যাওয়ার পর রাতের খাবার দেয়া হল। চিকেন স্যান্ডউইচ এর সাথে ড্রিংক এবং আপেল। আমরা খাওয়া শুরু করলাম। দেখলাম কেউ কেউ বোতল আর টিস্যু পেপার জানালা খুলে এমনি বাইরে ফেলে দিচ্ছে। পরে কয়েকজন একটি বড় পলিথিন ব্যাগে সব জড়ো করে। ব্যাগটি ভরে গেলে বাসের বনেটে রেখা দেয়া হয়, ইচ্ছে ছিল পরের কোন হোটেলে গাড়ি থামলে ওখানে ফেলে দেব। আমার চোখের সামনেই কনডাক্টর গাড়ির জানালা আগে খুলল এবং কেউ কিছু বুঝার আগেই ময়লার ব্যাগটি রাস্তার উপর ফেলে দিল। যেখানে কিছু করার নেই সেখানে কিছু বলেও লাভ নেই! আমাদের গাড়ি চলল। মমতাজের গান একসময় থেমে গিয়েছে। অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমিও কিছুটা ঘুমিয়েছি। মাঝে মাঝে জেগে উঠে দুপাশের সুন্দর গাছপালা দেখেছি। এই করেই খুব ভোরে রাঙ্গামাটি পৌঁছে যাই। এটিই আমাদের প্রথম স্টপেজ।

হোটেল টি কাপ্তাই লেকের পাড়ে। খুব সুন্দর পরিবেশ। সবাই বাস থেকে নেমে বাইরে দেখছি। হোটেলের নরমাল চেকইন টাইম সকাল এগারোটা। আমরা তার অনেক আগেই চলে এসেছি। আমাদের গাইড কয়েকটি রুমের ব্যাবস্থা করে ফেললেন। ছেলেদের রুমের একটি আমি পেলাম। মেয়েদের জন্যও কয়েকটি রুম পাওয়া গেল। আমি রুমে ঢুকেই ফ্রেস হয়ে নিচে নেমে এলাম, ইচ্ছে ভোরের প্রকৃতি দেখা। নেমেই দেখি মারিয়া নিচে একা দাঁড়িয়ে, মুখটি গম্ভীর এবং বিরক্তির সাথে রাগের ভাব স্পষ্ট, তবে বাংলায় যে অগ্নিমূর্তি শব্দটি আছে তা এখানে খুব একটা চালানো যায় না বলেই মেনে নিলাম। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে। উত্তরে বলল মেয়ে গুলো রুমে ঢুকে ওকে জিজ্ঞেস না করেই সব বেড গুলো নিয়ে নিয়েছে। ও কষ্ট পেয়ে নিচে চলে এসেছে। আমি খুব দ্রুত ইকবাল কে খুঁজে বের করলাম। এবং খুব দ্রুত ওর জন্য একটি রুম ব্যাবস্থা করা হয়েছে। ওকে বললাম রেডি হয়ে নিতে, সবাই মিলে ভোরের লেইকটি দেখতে যাব।

আমি আবার রুমে ফিরে এলাম। বিছানায় শুয়ে হঠাৎ মনে হল কৃষ্ণ বস্তুর কথা। যা কিনা থার্মোডাইনামিক্সের একটি বিশেষ ধারণা, থার্মোডাইনামিক্স বুঝতে এটি বিশেষ কাজে লাগে। মনে করার চেষ্টা করলাম কৃষ্ণ বস্তুর সংজ্ঞার কথা – যা সব ধরণের আলো শুষে নেয়; এ টুকোই পুরো সংজ্ঞা নাকি এর বিকিরণ নিয়েও সংজ্ঞাতে কিছু আছে, মনে করতে পারলাম না। ইন্টারনেট থাকলে দেখে নিতে পারতাম। হারুন স্যার কথা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন – ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম ভুলে যাওয়া একটি ক্রিমিনাল অফেন্স। তিনি যদি জানেন আমি কৃষ্ণ বস্তুর সংজ্ঞা ভুলে গেছি তিনি নির্ঘাত বলবেন – এটি একটি পাপ না একেবারে মহাপাপ! এই প্যারাগ্রাফটি উল্ল্যেখ করলাম শুধুমাত্র আমার পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বুঝানোর জন্য, পদার্থবিজ্ঞান ভুলে যেতে পারি কিন্তু ওতে আগ্রহ ঠিকই আছে। ট্যুরের আরো কয়েকটি সময়ে কৃষ্ণ বস্তু নিয়ে আমার এরকম আগ্রহ জন্মেছিল, শুধুমাত্র বিকিরণের অংশটুকু নিয়ে।

সকালের প্রথম আলোয় কাপ্তাই লেইক
সকালে নাস্তা খেয়ে আমরা বেড়িয়ে গেলাম। একটি অংশ চলে গেল লেইক দেখতে। আমি কয়েকজনের সাথে গেলাম একটি ছোট বাজারে। পাহাড়ি লোকেরা অনেক কিছু নিয়ে রাস্তার উপর বসে আছে। লোকাল ফল দেখতে এবং কিনতে আমার খুব ভালো লাগে। তেমন ভালো কিছু খুঁজে পেলাম না। একটা কিছু পছন্দ হল সেটা এক ধরণের আলু। একজন ভদ্র মহিলা আলুগুলো নিয়ে বসেছিলেন। দামাদামি করে কিছু আলু কিনলাম। কেনার পর জানতে পারলাম সে আলু সেদ্ধ না করে খাওয়া যাবে না। এই কথাটিই শুধু বুঝেছিলাম মহিলার কাছ থেকে, তাঁর আর কোন কথা আমি বুঝতে পারিনি। সিদ্ধ না করে খেতে পারবে না বলার পরেও দুজন ছাত্র আলু গুলো এমনি চিবিয়ে দেখল।

সূর্য বেশ খানিকটা উঠে গেছে। তবু গাছের নিচে বেশ ঠাণ্ডার একটি ভাব রয়ে গেছে। রাতের কুয়াসায় গাছের পাতা তখনো ভেজা। আমরা কাপ্তাই লেইকের দিকে হাঁটতে থাকলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখি একটি নৌকো করে স্কুলের বাচ্চারা ঘাঁটে এসে নামছে, ঘাটটি রাস্তা থেকে অনেক নিচে। পায়ে হাঁটার পথ দিয়ে নিচে নামতে হয়, পথটি যথেষ্ট খাড়া এবং এবড়ো থেবড়ো। আমরা নৌকাতে উঠতে চাই বলে ঢালু পথ ধরে নামতে শুরু করলাম। নামতে গিয়ে একটু ভয়ের সাথে অনেক আনন্দও হল। একটি নৌকা ভাড়া করে উঠে পড়েছি সবাই। পেছনে তাকিয়ে দেখি একজন তখনো পাহাড়ের উপরে রাস্তায়ই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি নামতে খুবই ভয় পাচ্ছেন। আমাদের একজন আবার উঠে গিয়ে তাঁকে ধরে ধরে নামিয়ে আনলেন। ইনিই তিনি, যিনি আমাকে ইন্ডিয়া ট্যুরে নেয়ার জন্য বেশ লম্বা কথায় বুঝাচ্ছিলেন তাঁরাই আমার পরিবার… কারণ আমি ফ্যামিলি ছাড়া ইন্ডিয়া যেতে চাইনি। আমি ভেবেছিলাম ও কথা গুলো অনেক প্র্যাকটিস করে এসে বলছিল। আজ দেখলাম তাঁর নিজের সুবিধার জন্যই অমন করে বলেছেন। তাঁকে উপর থেকে ধরে নামাতে হয়, নিচে থেকে টেনে তুলতে হয়, আর সমতলে একটু ধরে রাখলে ঠিকই চলতে পারেন; পরিবারের কেউ না হলে এগুলো কে করবে! তাঁর নাম এখানে দিব না (তাঁর নাম নিশাত)। এখন থেকে কোন ঝামেলার কথা আসলে নাম গুলো ব্র্যাকেটে দেব যেন কেউ বুঝতে না পারে।
নৌকাতে চরে গন্তব্যহীন এলোমেলো ঘুরে বেড়ালাম। পাহাড় দিয়ে ঘেরা কাপ্তাই লেইক, সকালের আলোয় আড়মোড়া ভেঙে উঠতে চাচ্ছে। খুব সুন্দর মনোরম একটি পরিবেশ। এখানে যেন কোনই ব্যাস্ততা নেই। শুধু দেখ আর উপভোগ কর। এত সকালে অন্য কিছু চোখে পড়ছে না। কিছু জেলেদের নৌকা জাল নিয়ে যাচ্ছে দূরে মাছ ধরবে বলে। কয়েকটি অলস কালো পানকৌড়ি পানির উপর কোন ডালে বসে আছে। ছায়াঘেরা পাহাড়ের পাড়ের কাছে তখনো ধুয়ার মত কুয়াশা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমরা ঘুরে বেড়ালাম। কয়েকজন নৌকার কিনারে বসে পা ডুবিয়ে দিয়েছে পানিতে। কিছুটা ঘুরেই আমরা ফিরে এলাম হোটেলে, সবাইকে যেতে হবে দূরে। যেহেতু অল্প কয়েকজন নৌকা নিয়ে গেছি, তাই ঠিক করলাম আমাদের এই ছোট নৌকা ভ্রমণটার কথা কাউকে না বলতে (মনে খুব ইচ্ছে ছিল সবাই জানুক, তাই এই নিষেধ করা)।

কেহই রাগিল না
হোটেলে ফিরে এসে যে যার মত রেডি হয়ে নিলাম। আমরা কিছু দর্শনীয় স্থান দেখতে সবাই মিলে বড় একটি ট্রলারে উঠে পড়লাম। এতক্ষণে রোদ উঠে পড়েছে। কাপ্তাই লেকের অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। চারিদিকেই পাহাড় ঘেরা টলমলে পানি। ছাত্রদের কয়েকজন খুব নিবিষ্ট মনে ছবি তুলছে। বাকীরা দেখছে আর কথা বলছে। এখন পানকৌড়িরা পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। মাথার উপর নীল আকাশে কয়েকটি ঈগলও দেখতে পেলাম। সেদিনের আকাশ ছিল নীল, কিছু সাদা মেঘও ছিল। পাহাড়ের গাঁয়ের গাছ গুলো ছিল সবুজ। বাতাসে নুয়ে পড়া বাঁশ গাছ গুলোকে মনে হচ্ছিল গাঁয়ের ঘোমটা টানা বউ।

আমি কয়েক জনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। কিছুও মজাও করলাম। অনেকের সাথে সহজ হতে পারলেও সবার সাথে সহজ হওয়া গেল না। মনে পড়ে গেল আমার ছাত্রকালিন সময়ের কথা। আমার ধারণা মতে প্রতিটি ক্লাসেই একজন থাকে যার সাথে চলা খুব দুষ্কর। এই একজনের অনেক কিছু নিয়েই কঠোর অবস্থান থাকে। আমাদের ক্লাসে এরকম ছিল দু’জন। ছাত্র থাকা অবস্থায় আমি সবার সাথেই মিশেছি। দিনে একদলের সাথে, বিকালে আরেক দল, সন্ধ্যায় কারোর বাড়ি, রাতে ফিরে অন্যদের সাথে আড্ডা। যত রাত বাড়ত তত গ্রুপ চেঞ্জ করতাম। কিন্তু যখন পাশ করে বের হলাম তখন দেখি আমি একেবারেই একা।

আমরা প্রথমেই গেলাম উঁচু একটি পাহাড় দেখতে। নৌকা থেকে নেমেই সবাই মারিয়ার সাথে চলে গেল উঁচু পাশটার দিকে। আমি লেইকের পাড়েই ছোট্ট একটি সুন্দর জায়গা পেয়ে একা কিছুটা সময় কাটালাম। তারপর এক কাপ চা খেয়ে ওদেরকে খুঁজে বের করি। দুজন কে দেখলাম অনেক উচুতে উঠে গেছে। আমি আমার কাঁধের বড় ব্যাগটি নিয়ে উঠে গেলাম। নামার সময় দেখি যায়গাটা খুব খাড়া। এতটা উচুতে উঠা ঠিক হয়নি। খুব কষ্ট করে ভয়ে ভয়ে নেমে আসলাম বাকিদের নিয়ে। নেমে আশা মাত্র মারিয়াকে পেলাম আমার সামনে। খুব হাঁসিমুখে আমাকে জিজ্ঞেস করল – স্যার আপনি কেন ওখানে উঠলেন? ওর হাঁসি মুখ দেখে মনে হল নামতে গিয়ে পা পিছলিয়ে পড়ে একটা কিছু হলেও আমার এত বেশী কষ্ট হত না। দুটো ঢোঁক গিলে বললাম – পড়ে গেলে সবাই অভিকর্ষজ বলের কারণে (যা কিনা নিউটনের অভিকর্ষজ বল বলে পরিচিত। কোন একদিন মহামতি নিউটনের কপালে একটি আপেল পড়ে। ঐ আপেল থেকেই পরে তিনি অভিকর্ষজ বল আবিষ্কার করেন।) এখানেই নেমে আসতাম। কয়েক কেজি চা পাতা দিয়ে প্যাকেট করে ফেললেই সব ঝামেলা শেষ। আমি থাকার কারণে বাকী ছাত্র যারা উপরে উঠেছিল মারিয়ার হাসিমুখের জিজ্ঞাসা থেকে রেহাই পেল।

ফেরার পথে দুটি লেবু কিনে আবার ট্রলারে উঠলাম। এবার গন্তব্য ঝুলন্ত ব্রিজ। আমরা ট্রলারে উঠেই লেবু খেয়ে শেষ করলাম। আমাদের ক্ষুধা লাগতে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। দুপুরের খাবার ব্যাবস্থা করা আছে ঝুলন্ত ব্রিজের কাছে। আমরা ঝুলন্ত ব্রিজের স্বপ্ন নিয়ে চলতে থাকলাম। লেইকের টলমলে পানি আর সবুজ পাহাড় আগের মত টানছে না। কিছুদূর আসার পর একটি ছোট দ্বীপমত জায়গায় থামলাম। সেখানে একটি দোকান ছিল। মেয়েদের স্কার্ফ, চাদর, ওড়না, হাবিজাবি আরো অনেক কিছুই। আমরা খুব দ্রুত দেখে আবার নৌকাতে উঠে বসলাম। পেটে অনেক ক্ষুধা। সবাই উঠে গেলেও দুজন উঠেনি (নিশাত আর মোবাশ্বেরা)। ওরা দুজন আমাদের দৃষ্টি সীমার মাঝেই একবার এদিকে হাঁটছে আরেকবার ওদিকে হাঁটছে, ট্রলারের দিকে আসছে না। ওরা হাঁটতে লাগল, মারিয়া রাগ করল না, আমার থারমোডাইনামিক্স নিয়ে কোন প্রশ্ন জাগল না, হারুন স্যার কি শুনে কি বলতে পারেন তার কিছুই মনে এল না। সকলেই আমুদে আহ্লাদিত হইয়া লেইকের পানি পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিলাম। এত আমুদের মাঝেও ক্ষণে ক্ষণে ঝুলন্ত ব্রিজের কথা মনে পড়িলেই পেটে একটি মোচড় দিয়া উঠিত।
প্রত্যেকেরই নিজস্ব রেডিয়েশন আছেঃ স্টেফান’স ল (ভুল বললাম নাকি!)

একটি বেশ মজার জিনিষ খেয়াল করলাম। যেহেতু ইকবাল ট্যুরের দায়িত্ব নিয়েছে আমরা কিছু হলেই ওকে জিজ্ঞেস করি। চোখের সামনে সব দেখেও ওকেই জিজ্ঞেস করি (আমিই সবচেয়ে বেশী করেছি)। ঝুলন্ত ব্রিজে যেতে দেড়ি কেন – ইকবাল। খাবার কেন ঝুলন্ত ব্রিজে – ইকবাল। আর কতক্ষণ লাগবে যেতে – ইকবাল। নিশাত আর মোবাশ্বেরা দেড়ি করছে কেন – ইকবাল। কয়েক প্যাকেট বিস্কুট কেন আনা হয়নি – ইকবাল। ওত আমাদের সাথেই এসেছে আনন্দ করতে! কিন্তু ও একবারের জন্যও বিরক্ত হয় নি। কেমন করে যেন খুবই সুন্দর করে ম্যানেজ করে নিয়েছে। নিজের আনন্দও করেছে অন্যদের আনন্দের ব্যাবস্থাও করেছে।

কোন এক সময় বাকী দুজন উঠে পড়ল ট্রলারে। আমাদের ট্রলার চলল ঝুলন্ত ব্রিজের দিকে। আমি একটি তক্তার উপর লম্বা হয়ে একটি ঘুম দিলাম। জেগে উঠে দেখি বাকী অনেকেই ঘুমাচ্ছে অথবা ঘুম থেকে উঠে গেছে। একসময় ট্রলার চলে এল ঝুলন্ত ব্রিজের নিচে। সেখানে খুব ভালো একটি খাবার দোকান দেখে ক্ষুধা আরো বেড়ে গেল। কিন্তু আমাদের খাবারের ব্যাবস্থা করা হয়েছে অন্য হোটেলে। পরে খাবার ট্রলারেই আনা হল। আমরা খেয়ে দেয়ে বেড়িয়ে গেলাম ঘুরতে।

ঝুলন্ত ব্রিজের পাশের যায়গাটা খুবই সুন্দর। একপাশে দাঁড়ালে মনে হয় পাহাড়টি সোজা উঠে গেছে পানি থেকে। পেছনে সবুজ আর সামনে নীল পরিষ্কার পানি। ছাত্ররা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আনন্দ করে বেড়াচ্ছে। ওদের দেখে খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে যখন দেখি ওরা খুব হাঁসি মুখে একজন আরেক জনের সাথে কথা বলছে। আমি একটি কফি শপে বসে আছি। একটু পরে মারিয়াও চলে আসে, সাথে একজন বা দুজন ছাত্র ছিল। মারিয়া আমাকে কফি কিনে দিল, আমি তাই খাচ্ছি আর দূরে তাকিয়ে দেখছি। কথা প্রসঙ্গে মারিয়াকে জিজ্ঞেষ করলাম – ডিপার্টমেন্ট যে টাকা দিয়েছে তা দিয়ে কি করতে পারি। ও বলল ওগুলো ছাত্রদের টাকা, ওরা যা খুশী করুক, শেখান থেকে ওর নিজের জন্য কিছু নিতে রাজী নয়। এই কথাটি বলার আগে আরো বেশ কিছু কথা বলেছে, যা আমার মনে আছে, কিন্তু শেয়ার করছি না। শুনে খুবই ভালো লাগলো, আমার চেয়ে বয়সে যথেষ্ট ছোট, ছাত্রদের সাথে সবসময় (যে সময়টুকুতে আমার থারমোডাইনামিক্স নিয়ে প্রশ্ন জাগে সেটুকু বাদে) হেঁসে খেলে আনন্দ করে বেড়াচ্ছে, সেই কিনা এত গভীর ভাবে কথা করতে পারে! খুব কাছ থেকে যেন একটি মানুষ কে দেখতে পেলাম।

বেলা ডুবে যাওয়ার আগেই ঝুলন্ত ব্রিজে থেকে আবার ট্রলারে উঠে গেলাম। আমি কয়েক জনের সাথে ট্রলারের ছাদে পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম। বাকীরাও তাই করল। চারিদিকের আলো মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে, শুধু আকাশটিই দেখা যায়। পাহাড় গুলো অতিকায় হাতির হয়ে যেন উদাসীনের মত দাঁড়িয়ে আছে। কিছু পাখি উড়ে যাচ্ছে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে। এবার ট্রলারের শব্দটি খুব কানে লাগল। এই সময়ে একটু নিশ্চুপ হয়ে থাকলে খুব ভালো হত। বাতাস থেমে যাচ্ছে, লেইকের পানির ঢেওও থেমে যাচ্ছে। থামছে না শুধু ট্রলারটি, ভট ভট কট কট শব্দ করে যেন নিস্তব্ধ সন্ধ্যাটিকে তছনছ করে দিতে চাইছে। আর থামতে চাইছে না কিছু মানুষের মন, ওরা উদাসী হয়ে কার সাথে যেন মিলে যেতে চাইছে, পারছে না, একটু পেয়েই আবার যেন হারিয়ে যাচ্ছে, কিছুতেই স্থির হতে পারছে না। এমনি করেই আমরা চলে আসি একটি রাজ প্রাসাদে। সেখানে কিছুক্ষণ থেকে বাকি পথ টুকু হেঁটেই চলে আসি হোটেলের কাছে একটি ছোট বাজারে। এখানে এসে কিছুক্ষণ সবাই দ্বিধায় পড়ে যায়, কে শহরের মার্কেটে যাবে আর কে যাবে না। ওরা কথা বলার ফাঁকে মারিয়া কিছু বাদাম কিনে ফেলে। ও নিজে কিছু খেল, আমাকে অল্প কিছু দিল। কোন বিশেষ কারণে ছাত্রদের কাউকে বাদাম না দিয়ে বাকি বাদাম গুলো নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল। একটি অংশ শহরের মার্কেটে গেল, আমি বাকি অংশের সাথে হোটেলে ফিরে এলাম। রুমে ঢুকেই প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে গেলাম।

আবার শুরু হল পথচলা
আমার ঘুম ভাঙল অনেক ফোন আর দরজা ধাক্কানোর শব্দে। আমি ঘুমের মাঝেও টের পাচ্ছিলাম ফোন বাজার শব্দ আর দরজা ধাক্কানোর শব্দ। কিন্তু এত ক্লান্ত ছিলাম উঠতে পারছিলাম না। ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দেখি বেশ রাত হয়ে গেছে। নিচে নেমে ছাত্রদের সাথে ডিনার সারলাম। ডিনারের পর কিছু গল্প হল। গল্প শেষে ইকবাল বলল সকালে উঠতে হবে। আমরা যে যার রুমে ফিরে গেলাম। ঘড়ি দেখে সকালে উঠে গেলাম। ব্যাগ গুছিয়ে নিচে নামে দেখি আর কেউ নেই। বাস দাঁড়িয়ে আছে, তার মানে ওরা আমাকে ফেলে রেখে যায়নি। আমি আমার মত রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম। সূর্য তখনো উঠেনি। রাস্তার উপর আমার মতই একটি নিঃসঙ্গ বাছুর দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম আরো সামনে। চোখে পড়ল ছোট বাঁশের বেড়া দেয়া একটি হোটেল। ভেতরে কয়েকজন বয়স্ক লোক খাচ্ছে, লুচি আর চা। আমিও গরম লুচি আর চা খেলাম। তাদের ভাষা বুঝিনা বলে কোন কথা হল না। খেয়ে দেয়ে একটু চারিদিক দেখে আবার ফিরে এলাম। এসে দেখি অনেকেই নামতে শুরু করেছে। জিজ্ঞেস করলাম একজনকে এত দেরি কেন। ও বলল দেরি না, ইকবাল গতকাল নাকি বলেছে সকাল আটটায় বাস ছাড়বে। বুঝতে পারলাম ভুল শুনে আমি সকাল সাতটাতেই নেমে এসেছি। দুঃখ নেই, গরম লুচি, চা, আর সকালের কাপ্তাই লেইক আমাকে পুষিয়ে দিয়েছে।

আমাদের বাস ছাড়ল একটু দেড়িতে। নাস্তা খেয়ে বেড়িয়েছে সবাই। নাস্তার টেবিলে ওদের সাথে চা খেলাম আর বললাম সকালের গরম লুচির কথা। কয়েকজন দুঃখ পাওয়ার ভাণ করল, যার জন্যই লুচির কথা বলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুঃখ ভুলে সবাই বাসে উঠে গেলাম। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে চলল বাস। দুপাশের পাহাড়, ঝর্ণা, কখনো সমতল দেখে দেখে আমরা যাচ্ছি। পাহাড়ের গায়ে ছন গাছ একেবারে দুরন্ত ছেলের চুলের মত, বাতাসে এলো মেলো দুলে উঠে। চলতি পথে আবার গান বাজানো হলে। কিছুদূর যাওয়ার পর আমি বন্ধ করে দেই। কেননা পথটি ছিল একেবারেই আঁকাবাঁকা। কিছু কিছু টার্ন নিতে উল্টা দিক থেকে আসা বাস বা ট্রাকের হর্নই একমাত্র ভরসা। শব্দের কারণে ড্রাইভার না শুনতে পেলে একটি এক্সিডেন্ট হতে পারে। আমি আনন্দের পক্ষে, ছাত্ররা আনন্দের জন্যই গিয়েছে, তবে আমাকে একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হল। আমি জানি অনেক ছাত্রই এতে কষ্ট পেয়েছে। আশা করি পরে হয়ত তারা বুঝতে পেরেছে যে আমি ওদের কিছুতেই বাঁধা হতে চাইনি। আমি চাই আমার ছোটরা নিজের আনন্দ নিজেরা করুক, জীবনের প্রয়োজনীয়তা বুঝে নিক, গড়ে তুলুক নিজেদের এবং ঠিক সে ভাবেই চলুক। বড়দের কাজ হল চাপিয়ে না দিয়ে একটু দেখে রাখা। এতে নিজেদের পারস্পারিক সম্মান এবং বন্ধুত্ব দুটোই বারে।

যে বিচারে অপরাধীর জন্য বিচারকের হৃদয় ভিজে না উঠে সে বিচার মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না
কর্ণফুলী নদী ফেরি দিয়ে পাড় হলাম। ওপারে গিয়ে চা আর বিস্কুট খেয়ে বান্দরবনের দিকে চলতে শুরু করলাম। কিছুদূর গিয়েই ড্রাইভার বাস থামিয়ে দিলেন। সামনে একটি বাস আর ট্রাক মিলে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। আমরা কয়েক জন নেমে বুঝার চেষ্টা করলাম কি হয়েছে। ছোট খাট একটি এক্সিডেন্ট, ট্রাক বাসের গায়ে একটি আঁচর বসিয়ে দিয়েছে। এই নিয়েই ঝগড়া চলছে। ভাষাটা আঞ্চলিক বলে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমরা কয়েক জন মিলে বাসের ড্রাইভারকে অনুরোধ করলাম একটু সাইড দেয়ার জন্য, যেন আমরা চলে যেতে পারি। আমাদের কথা কেউ কানে তুলল না, বরং ঝগড়া আরো বাড়তে লাগল। কিছুক্ষণ পর আরো একটি বাস এসে থামল, সেই বাসের ড্রাইভারও নেমে এলেন। অনেক কথাবার্তার পর শেষের ড্রাইভার ট্রাকের ড্রাইভার কে বাস ঠিক করা বাবদ চারশ টাকা দিতে বললেন। ট্রাকের ড্রাইভারের আর কোন উপায় নেই বলে তিনি টাকাটা দিয়ে দিলেন। তিনি টাকা দিলেও বিচারটা মেনে নিতে পারলেন না। তিনি আল্লাহ্‌র কাছে অনেক অভিশাপ দিলেন বিচার নিয়ে এবং এই অভিশাপ গুলো যেন কাজে লাগে তার জন্য পাঁচ টাকার মোমবাতিও কিনে দিতে চাইলেন কোন মাজারে। এই কথাগুলো আঞ্চলিক হওয়া স্বত্বেও আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আমি জানিনা কার দোষে এক্সিডেন্ট হয়েছিল। কিন্তু আঁচ করতে পারছিলাম দুটো বাসের ড্রাইভারই সেখানকার আর ট্রাকের ড্রাইভার অন্য এলাকার।
আবার বাসে উঠে বিকাল তিনটার দিকে বান্দরবন পৌঁছে গেলাম। হোটেলে গিয়ে ফ্রেস হয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। বেশ ঝাল করে রুই মাছের ঝোল, সবজি, আর ডাল। রুই মাছের টুকরা গুলো ঢাকার টুকরার মত স্লিম না, অনেক মোটাসোটা। ছাত্রদের কয়েকজন রুই মাছ না খেয়ে মুরগী খেল। খেয়েদেয়ে শেষ বিকেলের দিকে আমরা চলে গেলাম স্বর্ণ মন্দির দেখতে। যাওয়ার পথটি খুব সুন্দর। মন্দিরে উঠার সিঁড়িও অনেক সুন্দর। আমরা আনন্দ করতে করতে উঠে গেলাম। আমি ছিলাম পেছনের দিকে। মন্দিরে জুতা স্যান্ডেল নিয়ে ঢোকা যায় না। গেটের কাছে একটি ছোট ছেলে আছে জুতা রাখার জন্য। প্রতি জোড়া জুতার জন্য দুটাকা। আমার সাথে আরো দু’জন ছিল। আমি ছেলেটিকে বললাম তিন জোড়ার জন্য পাঁচ টাকা দিতে পারি কিনা। ছেলেটি আমার কথার উত্তর না দিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়াল, মাথাটা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে তারপর বলল – এই ধরণের কথা আমাকে অনেক কষ্ট দেয়। তার কথাতে এই পরিমাণ বিরক্তি আর রাগ ছিল যে আমি খুবই দ্রুত কেটে পড়লাম সেখান থেকে।

প্রেম ব্যর্থ কিন্তু গল্প বিশ্বব্যাপী
স্বর্ণ মন্দিরে অনেক ছবি তুলা হল। মন্দিরটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় আর খুব সুন্দর। সেখান থেকে চারপাশ দেখতে অপূর্ব। রোদের তেজ কমে গিয়ে লালচে আভা ধারণ করেছে। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি একটি নদী চলে গেছে পাহাড় আর ক্ষেতের পাশ দিয়ে, এই নদীটিই আমাদের হোটেলের কাছে দিয়ে চলে গেছে। আমি ভাবলাম যাওয়ার পথে নদীর পাড় ধরে হেঁটে যাব। কয়েকজনকে বললাম, ওরাও রাজী হল। শেষে আর কিছু ছবি তুলে আমরা নামতে থাকলাম। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে। আমি যে কয়েকজনের সাথে নামছিলাম ওদেরকে জানালাম – নদীর পাড় দিয়ে যাব না, এমনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাব, ওরা ওতেই রাজী হল। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই কয়েকটি পাকা পেঁপে কিনে ফেললাম। বাসের কাছে এসে আমি একটি দাগ টেনে দিলাম, বাসে যারা যাবে তারা একদিক, আর বাকীরা আমার দিকে হেঁটে যাওয়ার জন্য। বাসের সাথে আমার পেঁপে গুলো দিয়ে দিলাম। বাস চলে গেলে হাঁটতে লাগলাম, অপূর্ব আলো আধারির পথে, আমার খুবই প্রিয় এই আলো আধারি।

পথ চলতে গিয়েই শুরু করলাম গান আর কবিতা। কয়েকজন আমার সাথে যোগ দিল। এলাকার লোক মনেহয় এই ধরণের পাগলামিতে অভ্যস্ত। কেউ কিছু বলল না। ওগুলো আসলে গান ছিল না, গানের কথাগুলোকে ইট ভেঙ্গে খোয়া বানানোর মেশিনে ঢুকিয়ে দিয়ে গানের এবড়ো থেবড়ো টুকরা বানাচ্ছিলাম। এই করেই সবাই হাঁটছি। কিছুদূর হাঁটার পর একজন জিজ্ঞেস করল – স্যার নদী কোথায়? নামতে গিয়ে নদীর প্ল্যান যে চেঞ্জ করা হয়েছে তার মত অনেকেই জানত না, নদীর পাড় দিয়ে হাঁটবে বলেই আমার সাথে এসেছে তা না হলে বাসে চলে যেত; অহেতুক পাঁচ কিলোমিটার কে হাঁটতে চায়! ক্ষমা চাইলাম এবং শিক্ষক হিসেবে ধরেই নিলাম ওরা আমাকে ক্ষমা করেছে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে সবাইকে চা খাওয়াতে চাইলাম। দু’একজন বাটার বন্ড খেল। কিন্তু চা খাওয়ার পর মারিয়া সবার বিল দিল, যদিও প্রথমে ও বাটার বণ্ডের দাম দিতে চায়নি।

হোটেলে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে একটি রুমে সবাই বসলাম। একজন আমাদের অনেক কথা বলে আনন্দ দিয়েছে। সঞ্চিতা একটি গানের কিছুটা গাইল, ওটা শুনতেও গানের মতই লাগল। আমাকেও একজন গাইতে বলল। যেহেতু হোটেলটি কমার্শিয়াল, আমরা ছাড়াও আরো অনেকেই আছে, ম্যানেজারের কথা বিবেচনা করে আমি গাইলাম না। বরং ওদেরকে একটি ব্যর্থ প্রেমের অনেক সফল একটি গল্প শুনিয়ে দিলাম। ব্যাপারটি এরকম – ছাত্র থাকা কালীন সময়ে প্রেমের গল্পটি শুনেছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করিনি। শিক্ষক হওয়ার পর আবার শুনলাম, এবার বিশ্বাস করলাম কিন্তু বুঝলাম না। নিউমার্কেটে একটি পুরানো সাদা কালো ছবি দেখে ভালোই বুঝতে পারলাম। আমেরিকা দেশে বসে পাকিস্তানীর মুখে প্রেমের গল্প শুনে প্রেমের ব্যাপকতা অনুধাবন করেছি। আর দেশে ফিরে ঘটনার স্থান কাল সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেলাম। অনেক মনে করার চেষ্টা করার পরেও দুজনের একজনের নামও আজ মনে পড়ল না। স্মৃতি শক্তি লোপ পাচ্ছে কিছুটা।

হারাইনি কিছুই পেয়েছি অনেক
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সবাই রেডি হয়ে গেছে নীলগিরি যাওয়ার জন্য। সকালে গেলে মেঘ ধরতে পারবে। আমিও উঠেছি কিন্তু মন ভালো লাগছিল না। সবার অলক্ষ্যে আরো দুজন মহিলা আমার সাথেই গিয়েছে। তাদের জন্য মনটা খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। মারিয়াকে বললাম সবাইকে নিয়ে যেতে, আমি আর নীলগিরি গেলাম না। ওদেরকে বিদায় দিয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম। শুরু হল নিঃসঙ্গতা, ওদের সাথে না গিয়ে খুব ভুল করেছি। বাইরে গিয়ে পায়চারি করেছি পুরোটা সময়, এই দুইদিনে ওরা আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে গেছে। দুপুরের পরে ওরা ফিরে আসল, আমি তখনো ওদের জন্য বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওদেরকে দেখেই নিজে নিজেই খুব খুশি হয়ে গেলাম। আসাদ নেমেই বলল আমি নীলগিরি মিস করেছি। দিহান বলল ওরা আমাকে মিস করেছে। আর মারিয়া নেমেই একটি সুন্দর মাফলার আমার হাঁতে দিল। ওদের সাথে না গিয়ে কিছুই হারায়নি, বরং পেলাম অনেক। যদিও প্রথমেই দাবী করেছিলাম ওরা আমার ফ্যামিলি মেম্বার, কিন্তু উপলব্ধি করতে এই দুদিন লেগেছে।

মারিয়ার লেখায় নীলগিরির ঘটনাঃ সকালে আমরা হোটেলের সামনে থেকে ৩ টা চাঁদের গাড়ি তে উঠলাম। কেন এটার নাম চাঁদের গাড়ি আমার মাথায় প্রথমে ঢুকে নি। কয়েকজন ছেলে আগেই এই যাত্রাপথের সাথে পরিচিত তাই তারা মেয়েদের সাথে উঠবে না। কিছু মেয়ে আবার তাদের কয়েকজন বন্ধুর সাথেই উঠবে। ভালকথা একটা চাঁদের গাড়িতে আমি সামনের সিটে (ড্রাইভারে পাশে। খুব সম্ভবত তারা আমাকে সম্মান দিয়ে আরাম করে বসাতে চেয়েছিল) আর বাকি মেয়েরা পিছনে। গাড়ি ছুটল, পাহাড়ী রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে এবং আমরা প্রথম সেন্ট্রিফিউগাল ফরসের তীব্রতা টের পেতে থাকলাম। আমার এত ঘুম পাচ্ছিল কিন্তু ভয়ে পুরো পথ জেগে থাকলাম। মাঝখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে উচু জায়গায় গাড়ি থামানো হল, সকালের নাস্তা খাওয়ার জন্য। সেটা যে কি ভুল ছিল টা পরে লিখছি। খেয়ে , ছবি তুলে রওনা দিলাম নীলগিরির দিকে। যেতে যেতে সেসব নাস্তা অনেকের পেট থেকে বের হয়ে আসছিল!!!! নীলগিরিতে পৌঁছে সবাই সবার মত ঘুরাঘুরি করা শুরু করলো। আমি কখনও এই দলের পিছনে কিছুটা, আবার অন্যদলের পিছনে কিছুটা ঘুরে একটা বেঞ্চে বসে থাকলাম। একটা আজব ব্যাপার ছিল নীলগিরিতে, বসার মত জায়গা কিন্তু লেখা ছিল বসা যাবে না, রেলিং দেয়া কিন্তু হেলান দেয়া যাবে না!!!! কিন্তু আমাদের স্টুডেন্টরা সব করেছে। এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটল। আমি তখন ওদেরকে বা আপনাকে বলিনি, ট্যুর মাটি হয়ে যাবে। আমাদের এক স্টুডেন্ট নীলগিরির গাছ থেকে পেঁপে পেড়ে দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে খেয়ে ফেলেছে!!! তো নীলগিরির দুজন আমাকে এসে কমপ্লেইন করলো এবং কিছু উপদেশ দিলো কিভাবে না বসে থেকে স্টুডেন্টদেরকে দেখে শুনে রাখতে হয়!!! আমি রাগে ফুটতে থাকলাম!!!! ওদেরকে নিয়ে রওনা দেয়ার সময় কয়েকজন খুব দেরি করলো তারপর হাসিমুখে(?) ইকবালকে বললাম এখনই যেতে হবে। কয়েকজন মনে হয় চায়ের জন্য পে করে বসে ছিল কিন্তু আমার রাগের কারনে চা না খেয়ে দৌড়ে চলে আসলো। আমি খুবই দুঃখিত এবং দেশে গেলে ওদের চা এর বিল দিয়ে দিবো!!!। তারপর এলাম অনেক সুন্দর একটা ঝরনা আছে এমন জায়গায়। সেখান থেকে সবাই টুকটাক শপিং করলো। পাহাড়িরা বেশ চালাক। দামাদামি করে কিনতে হল। মাফ্লার, চাদর, তেঁতুল কেনা হল। এখানেও কয়েকজন ওদের গাছের ফল চুরি করলো। নিজেকে চোরদের সর্দারনী মনে হচ্ছিল। তারমাঝে আসাদ গেলো পানিতে পরে। সে উঠে এসে আমার সাথে ছবিও তুললো যদিও আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম যে তাঁর গা থেকে পানি পরে মাটি পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছিলো। ওদের আনন্দও দেখে এখানে আমার মন কেন জানি ভাল হয়ে গিয়েছিল। তারপর ফেরার পথে আমাদের দুর্বল সঞ্চিতা আমার পাশে বসেছিল কারন তাঁর শরীর খারাপ করেছিল। কিন্তু আমি খুবই টেনশনে ছিলাম কারন চাঁদের গাড়ির ঘূর্ণনে যদি আমি তাঁর উপর পড়ে যাই তাহলে ঢাকায় সত্যিই একটা লাশ পাঠাতে হতো (মারিয়ার কথা এখানেই শেষ)। আমার কয়েকটি জিনিষ এখানে ভালো লেগেছেঃ এক – মারিয়া নিজের মুখে বলেছে ও রেগে যায়, যা আমি এতক্ষণ হাঁসি বলে চালিয়ে এসছি। ও রেগে গেলে আমি পর্যন্ত ভয় পেতাম, ছাত্রদের কথা কিছু বলছি না। দুই – চোরের সর্দারনী, সত্যিই ব্যাপারটি বেশ ভালোই মানিয়ে যায়। তিন – একটি লাশ ঢাকায় পাঠানো। তা করতে পারলে আমাদের ট্যুরটা সবাই মনে রাখতো, আর আমি আমার এই লেখাটি ওকে উৎসর্গ করে যে কোন দৈনিকে পাঠালে তা ছাপা হয়ে যেত।

ওরা নীলগিরি থেকে আসার পরেই দুপুরের খাবার খেতে বসে গেছি। ঠিক তখনো মেসেজ পেলাম আমেনা ম্যাডাম মাস্টার্সের ছাত্রদের নিয়ে আমাদের হোটেলেই আসছেন। তাঁরাও আমাদের মতই স্টাডি ট্যুরে বেড়িয়েছেন। আমি মারিয়াকে বললাম কাউকে চিনব না। কিন্তু তাঁদেরকে দেখার পর দুজনেরই খুব ভালো লাগলো। মনে হল খুব কাছের আর আপন কয়েকজনকে দেখলাম। তাঁদেরকে বিদায় দিয়ে আমরা চললাম কক্সবাজারের দিকে। মাঝখানে ইকো পার্কে ঘণ্টা তিনেক কাটিয়েছি। সেখানে বেশ কিছু জিনিষ ছিল। যার যা পছন্দ তাই করেছে। অন্ধকার শুরু হওয়ার আগেই চললাম কক্সবাজারের দিকে। দুপাশের সবুজ পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ বেয়ে চলল আমাদের বাস। অস্তগামী সূর্য একবার ডানে, আরেকবার বাম, কখনো একেবারে রাস্তার মাঝখানে। এই দেখে দেখেই চলছি। একটি দোকান দেখে গাড়ি থামান হল। ইকবাল সবার জন্য কলা আর বিস্কুট কিনেছে। আমি কয়কটি পরাটা আর ডিম ভাজি কিনেছি। বাসে উঠে আমি সবাইকে কলা আর বিস্কুট দিতে চাইলাম, বাসের কন্ডাক্টর আমাকে নিষেধ করেছে। রাস্তা আঁকাবাঁকা আর ঝাঁকুনি ছিল বলে। কিন্তু আমি ঠিকই সবাইকে কলা আর বিস্কুট দিয়ে নিজের সিটে ফিরে এলাম। কনডাক্টর আমার দিকে তাকিয়ে বলল – স্যার একটা মানুষ। কি অর্থে বলেছে বুঝলাম না, আমি প্রশংসা করেছে বলেই মেনে নিলাম।

আমার পরাটা গুলো মারিয়া সহ আসে পাশের কয়েকজনের সাথে শেয়ার করলাম। প্রথমেই ইকবাল কে দিতে গিয়ে সব পরাটা নিচে পরে যায়। আমি ভাবলাম সবার নিচেরটা ফেলে দেব, বাকি গুলো সবাইকে দিয়ে দেখি নিচেরটা একেবারেই পরিষ্কার, আমি ওটা খেয়ে ফেললাম। ইকবালকে বুঝালাম ময়লা পরাটা ওই খেয়েছে এবং বাস যে কিরকম ময়লা হতে পারে তা অত্যন্ত নিচুভাবে বর্ণনা করেছি। ওর কত ধরণের অসুখ হতে পারে তাও বলেছি। কিন্তু কক্সবাজার গিয়ে পেটের অসুখ হয়েছে মারিয়ার।

অন্ধকার হতে শুরু করেছে। সবাই নীলগিরি আর ইকো পার্কের পর কোন রেস্ট পায়নি। সবাই ঘুমাতে শুরু করেছে। আমি যেহেতু নীলগিরি যাইনি, আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি। এমন সময় আমার ঠিক পেছনের সিট থেকে আওয়াজ এল – ইকবাল, এই ইকবাল। অত্যন্ত মিহি গলায় ডাকছে। সাহিত্য জানা লোকেরা এটাকে অন্যভাবে নিতে পারে। আমি যদিও তাদের কেউ নই, তার পরেও একটু অস্বস্তি লেগেছে। ইকবার আমার পাশের সিটেই গভীর ঘুমে। বেশ ডাকাডাকিতে উঠে একটু ধাতস্ত হয়ে বলল – কি? মিহি গলায় আওয়াজ এল – কলার খোসা কোথায় ফেলব? আমি আর হাঁসি চেপে রাখতে পারলাম না। যেখানে সব ময়লা রাস্তার উপর ফেলে ফেলেই আসছি, সেখানে ট্যুরের দায়িত্বে থাকা লোকটিকে গভীর ঘুম থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করছি কলার খোসা কোথায় ফেলব! বেচারা ইকবাল! (যে মহিলা ইকবাল কে ডেকেছে তার নাম সঞ্চিতা)

আমরা রাত আটটার দিকে কক্সবাজার পৌঁছে যাই। হোটেলটি সুন্দর এবং আমি খুবই ভালো একটি রুম পাই। এখানে বাথরুমে গিজার আছে, বান্দরবনের পানি ভালো ছিল না। আমি রুমে ঢুকেই একটি ভালো গোসল সেরে নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটি বই পড়ার চেষ্টা করছিলাম। ইচ্ছে সবাই রেডি হয়ে গেলে একসাথে খেতে যাব। একটু পরেই একজন এসে বলল পাশের রুমে বাথরুম নেই। ওরা আমার বাথরুম ব্যবহার করতে চায়। আমার কোন আপত্তি নেই। আমি দরজা খুলে রেখে বই পরছি। একটু পরে আমার চোখের সামনেই একজন উত্তমার্ধে কিছু না দিয়েই রুমে ঢুকে পড়ল। আরেকটু পরে আরেকজন। তারও একই অবস্থা। আমি দুজনকেই ডেকে বললাম – তোমরা যে কোন সময় আমার রুমের বাথরুম ব্যবহার করবে কিন্তু উত্তমার্ধে কিছু থাকতে হবে। ওরা রাজী হলেও আমি তেমন ভরসা করতে পারলাম না। উপায় ইকবাল, ওকে বলে অন্য একটি রুমের ব্যবস্থা করলাম, আর কোন দুশ্চিন্তা রইল না।

রাতে সবাই মিলে ঢাকা বিরিয়ানি হাউজে খেলাম। খাওয়ার পর ড্রাইভার আর কনডাক্টর মিলে আমাকে সহ কয়েকজনকে পান খাওয়ালেন। আমি পান চিবুতে চিবুতে অন্যদের সাথে চলে গেলাম সমুদ্র ধারে। সমুদ্রের আগেই সাড়ি সাড়ি শুঁটকির দোকান। শুঁটকি গুলো দেখতে খুবই লোভনীয় এবং ওরকম করেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আমি নিজে শুঁটকির খুব ভক্ত। মনে হচ্ছিল তখনই রেঁধে খাই। ছাত্রদেরও তাই মত। কিন্তু কিছু করার নেই। মনে মনে শুঁটকি রাঁধতে রাঁধতে চলে যাই সমুদ্র ধারে। বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আসি। অন্ধকার রাতের আকাশ অনেক পরিষ্কার ছিল। দূরে দূরে কয়েকটি আলো ঘুরে বেড়াচ্ছে সমুদ্রের উপর দিয়ে। বুঝলাম ওরা জাহাজ। মাথার উপরেও কিছু বিন্দু বিন্দু আলো, ওরা রাতের তারা, দিনে ঘুমিয়ে থাকে। উপরে তারা আর সামনে অন্ধকার সমুদ্র রেখে বসে রইলাম। আরো কয়েকজন জড়ো হল। ওদেরকে রামায়ণের গল্প শুনিয়েছি। আমার গল্প শুনে সাকিব জিজ্ঞেস করেছে – আমার এক্সপার্টিজ কিসে রামায়ণ না বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেটের উপর! আমার আসলে কিছুতেই এক্সপার্টিজ নেই, যখন যা খুশী করে বেড়াই। রাতে ফিরে এসে ঘুম দিলাম। ঘুমের মাঝেও হাসির শব্দ শুনেছি – তারুণ্যের উচ্ছ্বাস আটকে রাখা যায় না, আর তা সবসময়ই সুন্দর।

ভোর সকালে উঠে চলে গেলাম সমুদ্রে। খুব ইচ্ছে সূর্যোদয় দেখব। মারিয়ার সাথে বড় দলটি পানিতে নেমে গেল, বাতাসে তখনো বেশ ঠাণ্ডা আছে। আমি নাফিস আর রঞ্জুর সাথে পূব দিক বরাবর সমুদ্র ধরে হাঁটতে লাগলাম। বাকীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতিতে আনন্দের অভাব নেই, শুধু খুঁজে নিতে হয়। রঞ্জু আর নাফিস ছবি তুলছে, তেমন কোন কথা হচ্ছে না। কিন্তু ওদের সঙ্গটা আমি খুবই উপভোগ করেছি। অনেক হাঁটার পরেও সূর্য দেখছি না। অধৈর্য হয়ে উঠেছি। তবু ওর উঠার নাম নেই। হাঁটছি তিনজনে, অনেক দূর চলে গেছি। ফিরে আসার চিন্তা করছি, এমন সময় তিনি উঠলেন, মুখটি বের করে দিলেন একটি বিল্ডিং এর উপর থেকে। মনে হল আমাদের দেখিয়ে একটি বিটকেলে হাঁসি দিল। ভালো লাগলো না। কোন কারণ ছাড়াই আশা করেছিলাম সূর্য উঠবে সকালের সমুদ্র স্নান করে, নির্মল একটি সূর্য উঠে আসবে সমুদ্র থেকে আকাশে। তাই বলে আমার আনন্দ কেড়ে নিতে দেইনি ওকে। আমি বালুতে খুঁজে পেলাম কাঁকড়ার বাসা। অনেকটুকু গর্ত করার পর বেড়িয়ে এল ছোট হালকা পাতলা একটি কাঁকড়া। ওর সাথে কয়েকটি ছবি তুলে তারপর ছেড়ে দিয়েছি (কাঁকড়া যেন কোন ব্যাথা না পায় সেদিকে সচেষ্ট ছিলাম)।

ফিরে এসে নাস্তা খেয়ে চললাম ইনানি বিচে। পুরো আকাশ সূর্যের দখলে। একটুও মেঘ নেই। চারিদিক ঝকঝক করছে। কক্সবাজার শহর ছাড়ানো মাত্র শুরু হল একপাশে অবারিত সমুদ্র আরেক পাশে সবুজ ঘেরা পাহাড়। সমুদ্রের ঢেউ গুলো আছড়ে পড়ছে সাদা বালুতে। কিছুতেই বসে থাকতে পারলাম না। উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম বনেটের পাশে। ছাত্ররাও দাঁড়িয়ে গেছে। শুরু হলো প্রাণের সাথে প্রাণের প্রকাশ। পুরোটা পথ আনন্দ করেছি। ইনানি বিচে গিয়ে আমরা একটি ভিড় কম জায়গায় বসে গেলাম। মারিয়ার সাথে বড় গ্রুপটি চলে গেল পানিতে। আমি ওদেরকে দেখছিলাম দূরে বসে। এরই মাঝে চলে এল জোয়ার। পানি বেড়ে যাচ্ছে। মারিয়ারা চলে এল। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি একটি ছোট ছেলে আর তার মা পানিতে ডুবে যাচ্ছে। যায়গাটা ছিল পাথরে ঘেরা ডোবার মত। জোয়ার আসাতে ওরা ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছে। ছেলেটার বাবাও দৌড়ে গেছে ওখানে, কিন্তু তিনিও ব্যালেন্স রাখতে পারলেন না। আমাদের থেকে চারজনের মত দৌড়ে গিয়ে তিনজনকেই তুলে আনল। ভদ্রলোক আর ভদ্র মহিলা খুব ভয় পেয়েছেন। তুলে নিয়ে আসার পরেও তারা কাঁপছিল। আমার কাছে ফার্স্ট এইড ছিল। ভদ্রলোকের পা কেটে গেছে, আমি মলম দিয়ে দিলাম। ভদ্রমহিলাকে দুটো প্যারাসিটামল দিলাম। আর ডিমটার কিছু হয়নি বলে কোলে বসিয়ে একটু ধমক দিলাম – কাঁদছ কেন? যে যার মত কিছুক্ষণ ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। সবচেয়ে বেশী পেলেন তিনি, যিনি এই সবকিছুর মূলে।

আরো ঘণ্টা দুয়েক আমরা ইনানি বিচে ছিলাম। সব ছেলেরা মিলে হাডুডু খেলেছি। ফুটবলও খেললাম, সবাই মিলে। একটি গোল হল। কে দিয়েছে মনে নেই। একদল দিয়েছে আরেক দল খেয়ছে, এতে বলার কি আছে। খেলা শেষ হলে আরো কিছু করেছি, ডাব কিনে খেয়েছে অনেকেই। সবাই বাসে উঠে গেলাম। ফেরার পথে আরেকটি দর্শনীয় স্থানে বাস থেমেছে। অনেক উঁচু একটি পাহাড়। দু একজন বাদে সবাই উঠে গেলাম। উঁচু থেকে সমুদ্র দেখতে অপূর্ব, আসলে উপর থেকে দেখলে সবই সুন্দর মনে হয়। উপড়ে যারা উঠেছি তারা ছোট ছোট ভাগ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাবিব কে দেখলাম একটি গাছে উঠে গেল। নিচে দাঁড়িয়ে যিসা ওর ছবি তুলছে আর আমি ডারউইনের তত্ত্ব কিভাবে উল্টাভাবে কাজ করে তাই বুঝাচ্ছিলাম বাকিদের। সবার পেটে খুব ক্ষুধা, তাড়াহুড়া করে সবাইকে নামিয়ে আনলাম। বাসে উঠার পর কেউ একজন বলল রানা নেই। সবাই খুঁজে দেখি সত্যিই রানা বাসে নেই। কেন নেই – ইকবাল। ও রানাকে ফোন করল, ফোনটি গাড়িতেই বেজে উঠল। কি করব! বাস আর থামল না, চলতে লাগল কক্সবাজারের দিকে। ইকবালের মুখ দেখি একেবারে কালো (ইকবালের মুখেরও রং বদলাতে পারে টা না দেখলে বুঝতাম না)। পুরো সময়টা ইকবাল মুখ অসম্ভব কালো করে রাখলো (আচ্ছা ইকবাল কি আমার অনেক পিছনে ছিল না! তাহলে ওকে কি করে আমি পুরোটা পথ দেখলাম! আমি কি বউকে মেরে ঝিকে বুঝানোর চেষ্টা করছি। ভুলে গেছি। দয়া করে সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে। অনেক দিন আগের কথা)। আমরা সরাসরি ঢাকা বিরিয়ানি হাউজে চলে এলাম। শহরে ঢুকেই ইকবাল বাস থেকে নেমে হোটেলে চলে গেছে। একটু পর ইকবাল হোটেল থেকে রানাকে নিয়ে ফিরে এল। সবাই একটি দমবন্ধ অবস্থা থেকে রেহাই পেলাম। মারিয়া অত্যন্ত হাসিমুখে ওকে জিজ্ঞেস করল কেন আমাদের কাউকে ফোন করেনি। কপট রাগে ইকবাল কে বলল কনডাক্টরকে দিয়ে রানাকে দশ মিনিট গালি দিতে। আমি বুঝলাম না ছেচল্লিশ জনের মধ্যে একজন হারালে কিইবা এমন হবে! খেয়াল করলাম যারা থাকে তাদের দাম নেই, হারিয়ে গেলেই ভালো।

সকালে সূর্যোদয় দেখিনি। তাই হোটেলে ফিরে মারিয়াকে বারবার বলে রাখলাম ওরা সমুদ্র সৈকতে যাবার সময় আমাকে যেন নিয়ে যায়, আমি সূর্যাস্ত মিস করতে চাই না। রুমে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে হোটেল লবিতে বসে আছি, মারিয়া আমাকে ফোন করবে। দুদল ছাত্র আমাকে ওদের সাথে সৈকতে যেতে বলল, আমি না করলাম; মারিয়াকে কথা দিয়েছি ওদের সাথে যাব। শেষ দলে ইকবাল এল, ও জানাল মারিয়া অনেক আগেই আরেক দলের সাথে চলে গেছে সৈকতে। ততক্ষণে প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। আমি যখন সৈকতে গেলাম, সূর্য অনেক আগেই ডুবে গেছে। আমার সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত কিছুই দেখা হল না।

আমি যখন সৈকতে গেলাম তখন মারিয়ারা ফিরে গেল হোটেলে। আমি কয়েকজনের সাথে অন্ধকারে বসে রইলাম। সেখানে কিছু হেলান চেয়ার ছিল। ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া দিতে হয়। আমরা ছাড়া আর তেমন কেউ নেই। একটি ছোট ছেলের সাথে অনেক দামাদামি করে দুটি চেয়ার নিলাম। দুটো চেয়ারেই আমরা দশজন বসেছি। আমরা বালুতেই বসতে পারতাম, শুধু ছেলেটার সাথে দামাদামি করার জন্যই চেয়ার নেয়া। বসে দেখছি অন্ধকার সমুদ্র। সামনে এসে দাঁড়াল খুবই ছোট একটি ছেলে। ও আমাদের গান শুনাতে চায়। বিনিময়ে কিছু টাকা দিতে হবে। জিজ্ঞেস করলাম কত টাকা – ছার আফনে খুশি হয়ে দিয়েন। আমি ছাড়ছি না, গান শুনব কিন্তু দাম ঠিক করে। নাতি দীর্ঘ একটি লেকচার দিলাম – তোমার গান পছন্দ হল না অথচ তুমি বেশী টাকা দাবী করলে অথবা তুমি অনেক গান গাইলে আমরা কম টাকা দিলাম,… অহেতুক হাজারটা কথা। অনেক কথার পর ঠিক হল পাঁচটি গানের জন্য সে দশ টাকা পাবে। হাত বাজিয়ে বাজিয়ে বেশ সুন্দর করে গাইল। আমার খুব গান গাওয়ার সখ। ছোটকালে বাবা মা না থাকলে হয়ত পথে ঘুরতে ঘুরতে আজ একটা কিছু হয়ে যেতাম। বাবা মা থাকাতে বড় একটি সুযোগ হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। তবে বুঝলাম মানুষ কিছুতেই খুশী হতে পারে না।

দশটার দিকে উঠে পড়লাম। ঠাণ্ডা লাগছে। হাঁটতে গিয়ে ওদেরকে বললাম পেঁয়াজু খাবে কিনা। ঠাণ্ডায় গরম পেঁয়াজু খুব ভালো লাগবে। সবাই এক কথায় রাজী। বিশ টাকা করে উঠানো হল। কিন্তু কোথাও পেঁয়াজু খুঁজে পেলাম না, হোটেলে তখন মোগলাই পরাটা ভাজা হচ্ছে। প্রতিটার দাম পঞ্চাশ টাকা। আমরা আরো পাঁচ টাকা করে দিলাম। পাঁচটি মোগলাই পরাটার অর্ডার দিয়ে বসে আছি। এমন সময় মারিয়ার ফোন। ও আবার আসছে। ও এলে ওর কাছ থেকে কেন জানি পঞ্চাশ টাকা নিলাম। আরো একটি মোগলাই পরাটা যোগ হল। আমরা একটি গোল টেবিল নিয়ে বাইরে বসে আছি। পনের ষোল বছরের একটি ছেলে এক বোতল মিনারেল ওয়াটার দিয়ে গেল। ঠিক করলাম পানি খাব না, শুধু শুধু পানির জন্য টাকা দেব না। হোটেলে ফিরে পানি খাব। একটু পরেই গরম মোগলাই পরাটা হাজির। অনেক গল্পের সাথে খুব মজা করে খেলাম, সাথে পানিও শেষ। বিল চলে এল, তিনশ তিরিশ টাকা। আমাদের উঠেছে দুশ পঁচানব্বই (কোন একজন পাজী পাঁচ টাকা কম দিয়েছে)। শুরু হল পানি নিয়ে দামাদামি – আমরা যেন জানিই না পানির দাম দিতে হয়!

আমরা আকাশ থেকে ছাঁদ ফুরে চেয়ারে পড়ার ভাণ করলাম – মিনারেল ওয়াটারের দাম দিতে হবে! বিল কমানোর জন্য শুরু হল …, কি বলব একজন ওয়েটারের সাথে এগারোজন মানুষের অতিদীর্ঘ বাদানুবাদ। আমি কোন বাংলা সিনেমায়ও দুই উকিলের মধ্যে এরকম কিছু দেখিনি। চলে অনেকক্ষণ দরে। হরেক রকম কথা হচ্ছে। আমার চোখে মনে হল একটি ছোট নিরীহ ছেলেকে খেজুর কাটা দিয়ে মোরব্বা বানানোর চেষ্টা করছে। আর ছেলেটি দাঁত মুখ কামড়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েদের কথা চেঁচামেচিতেই সীমাবদ্ধ, কি বলছে স্পষ্ট শুনা যাচ্ছে না। মারিয়ার গলার স্বর উঁচু এবং স্পষ্ট। অনেক কথা বলার পর মারিয়া ওয়েটারকে বলল – আমি তোমাকে তিনটি গান শুনাই পানির দাম মাফ করে দাও। ওয়েটার রাজী না। আবার কথা, স্পষ্ট অস্পষ্ট, খেজুর কাঁটার গুঁতা। আমরা কোন ভাবেই পানির দাম দেব না। সাথের পাজী গুলোরও তাই মত। ওয়েটার রক্ত ঝরা গা নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। আর পারল না, একটি ছেলে মানুষ কতক্ষণই বা টিকে থাকতে পারে। সে মেনে নিল, পানির দাম ছেড়ে দিয়ে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করে। এমনি না, শেষমেশ মারিয়া টাকা না দেয়ার জন্য বলল – তাইলে আমাকে গালি দাও। ছেলেটি তখনো হয়ত কোন ভদ্র মহিলাকে গালি দিতে শিখেনি। স্বাভাবিক নিয়মেই ভদ্রমহিলারা সবসময় জিতেন, এখানেও তাই হল। তাই বলে ঘটনা শেষ হল না। আমিও হয়ত ওদের পাল্লায় পরে দু একটি কথা বলে থাকতে পারি। তবে আমরা পানির দামও দিয়েছি সাথে কিছু বকশিসও দিয়েছি। আমাদের কাজ ছিল আনন্দ পাওয়া।

আমরা বাইরে আসতেই মারিয়ার চোখে পড়ল একটি তিলেখাজার দোকান। ও তিলেখাজা কিনবে। কেনার জন্য দোকানদারকে দাম জিজ্ঞাসা করল। দোকানদার একজন বয়স্ক ভদ্রলোক, তিনি দাম বললেন এবং দামাদামি করা যাবেনা তাও বললেন; তিলের খাজার একদাম। মারিয়ার একদামে কিনতে আপত্তি নেই, তবে তাঁকে একটি বড় টুকরা ফ্রী দিতে হবে। ভদ্রলোক রাজী না, মারিয়া ছাড়বে না। কথা চলল, মারিয়া তাঁকে চাচা জ্যাঠা নানান কথা বলে মুহূর্তে ধরাশায়ী করে ফেলল। ভদ্রলোক বেশী কিছু বলতে পারলেন না। তিনি ওকে একটি বড় তিলেখাজার টুকরা ফ্রী দিলেন। আমি ভাবলাম একটু চেষ্টা করে দেখি যদি ফ্রি এক টুকরা তিলে খাজা পাই। আমি কেবল কথা বলা শুরু করেছি ওমনি ভদ্রলোক আমাকে কড়া একটি ধমক দিলেন – আফনে হ্যার মতন পারবেন না। বলেই আমার হাঁতে এক টুকরা তিলেখাজা ধরিয়ে দিলেন। আমি টের পেলাম মারিয়ার উপর তাঁর সমস্ত রাগ আমার উপর ঝাড়লেন, কিন্তু আমার নিরীহ মুখ দেখে তাঁর স্বভাব সুলভ দয়ালু মনটাও চেপে রাখতে পারলেন না।

অনেক বড় কয়েকটি বিজয় নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। যার যার রুমে ঘুমাতে গেলাম। পরদিন খুব সকালে উঠতে হবে। সে রাতেই জনি ভাই চলে এলেন, জনি ভাই মারিয়ার হাসবেন্ড, খুবই আনন্দ প্রিয় মানুষ। রাতে আমাদের সাথে তার দেখা হয়নি। খুব ভোরে দেখা হল বাসে উঠার সময়, তাঁকে পেয়ে আমাদের অনেকেরই সময় আরো ভালো গেল।। আমরা যাচ্ছি টেকনাফের দিকে। অন্ধকার ভাব তখনো যায়নি। রাস্তার উপর সকালের কুয়াশায় ভিড় করে রেখেছে মাঝেমাঝে। সাথে নাস্তা নিয়ে নেয়া হয়েছে। বাসে বসেই খেয়ে নিলাম। বাস যাচ্ছে আর সূর্য উঠছে, চারদিক অপূর্ব হয়ে ধরা দিচ্ছে চোখে। ঢাকার ভিড় থেক চলে এসেছি অনেক দূরে, ভুলে গেছি ঢাকার কথা। আমরা যেন এখানকার মানুষ, আর কোনদিন ফিরে যেতে হবে না ঢাকায়। এ কয়দিনে ছাত্রদের সাথে ভালো পরিচয় হয়ে গেছে, আমার সাথে না, মারিয়ার সাথে। ওরা সবাই মারিয়ার সাথে অনেক আনন্দ করে বেড়াচ্ছে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে একটি সহজ বন্ধুত্বের বন্ধন। আমি ওদের নাম গুলো মনে রাখতে পারলে বেশ সুবিধা হত। কক্সবাজার হোটেল লবিতে মারিয়া আমাকে নাম গুলো মুখস্থ করানোর চেষ্টা করেছে। ওর সাথে আরো সাত আট জনের মত ছাত্র ছিল। নাম গুলো বলে আমাকে দিয়ে বারবার বলানোর চেষ্টা করছে। আমিও মনে করি এবিসি একটি সমকোণী ত্রিভুজ, মনে করি এবিসি একটি সমকোণী ত্রিভুজ, … অমন করে নাম গুলো বলে যাচ্ছিলাম। বেশ কাজে দিল। কিন্তু যখন বাইরে গেলাম এবিসি গুলো আগের মত সাজানো নেই, যাকে বলি এ সে আসলে বি বা সি। বিড়ম্বনার চূড়ান্ত। নাম মুখস্থ বাদ দিতে হল কারণ মারিয়া আমার জন্য কোন প্রকারেই ভালো শিক্ষক না। মারিয়াও হয়ত কোথাও লিখে রেখেছে আমি ওর জীবনে সবচেয়ে পচা ছাত্র। যাহোক সময়ের পার্থক্যের কারণে দুজন দুজনের কাছ থেকে বেঁচে গেছি।

টেকনাফের কাছাকাছি এসে দেখি সমুদ্রের পাড় ধরে লবণের ক্ষেত, লবণের চাষ হচ্ছে, ছোটকালে বইয়ে পড়েছিলাম লবণ সংগ্রহ কে লবণ চাষ বলে। শুনতে খুব সুন্দর – লবণের চাষ। কথাটি শুনলে মনে হয় যেন ছোট ছোট বাচ্চা লবণ লাগিয়েছে অনেক আগে এখন বাচ্চা গুলো অনেক বড় হয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক লবণ হয়ে গেছে। ট্রাকে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে প্রাপ্ত বয়স্ক ময়লা লবণ গুলোকে। লবণ প্রথমে ময়লা হলেও বড় হয়ে একবারে ধবধবে সাদা হয়ে যায়। মানুষের বাচ্চা মনে হয় উল্টো, প্রথমে সাদা ধবধবে হয়ে জন্ম নেয় এবং পরে ময়লা লেগে যায় (আমি এখানে মানুষের গায়ের রঙের কথা বলেছি। ছোট কালের ফর্সা মানুষেরা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কালো হয়ে যায়। প্রমাণ আমার পাশেই ছিল)।

টেকনাফে পৌঁছে বাস ছেড়ে দিলাম। বাস নিয়ে ড্রাইভার আর কনডাক্টর টেকনাফেই থেকে গেলেন। আমরা বড় একটি ফেরি করে চললাম সেইন্ট মারটিনের দিকে। সেদিনের আকাশ টা ছিল একেবারে নীল আর রোদে ঝকমকে। খুবই চমৎকার একটি ভ্রমণ হল ফেরিতে চড়ে। আমরা চেটেপুটে সব উপভোগ করে চলছি। ফেরিতে একটি ক্যান্টিন ছিল। ওখানে গিয়ে দেখি গরম সিঙ্গারা ভাজা হচ্ছে। গরম সিঙ্গারা কার না প্রিয় – যখন মিলন ভাইয়ের দোকানের সিঙ্গারা প্রায় দশ বছর ধরে খেয়েছি। আমি কেন ডিপার্টমেন্টের অনেক সিনিয়র শিক্ষকদের জন্যও মিলন ভাইয়ের সিঙ্গারা একটি প্রিয় খাবার। আমি প্রস্তাব দিলাম কেউ সিঙ্গারা খাবে কিনা। একবাক্যে রাজী, কিন্তু এটা ফ্রী না। দশ টাকা করে দিতে হবে, পাজীদের মধ্যে সতের জন টাকা দিল, বেশি পাজীরা ফাঁকি দিল। আমি একশ সত্তর টাকা নিয়ে গেলাম সিঙ্গারা আনতে। মারিয়ার শেখানো দামাদামিটা একটু প্র্যাকটিস করলাম, সে টাকা দিয়ে চল্লিশটি সিঙ্গারা পেলাম, যদিও একেকটির দাম পাঁচ টাকা। আমরা খেয়ে যা বাকি ছিল তা বিক্রি করে দিলাম অন্যদের কাছে। মিলন ভাইয়ের ব্যাবসাটা হাঁতে নেয়ার একটি প্র্যাকটিস হয়ে গেল।

দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম সেইন্ট মারটিন দ্বীপে। অপূর্ব সুন্দর লাগল, চারদিকে নীল সাগর আর মাঝখানে সাদা বালুর দ্বীপ, মাঝে মাঝে সবুজের ঝোপ। একেবারে স্বপ্নের মত। ঘাঁট থেকে বালুর উপর দিয়ে হেঁটে চলে গেলাম হোটেলে। বালুতে আমাকে যিসার ব্যাগটি টানতে হল। ব্যাগটা ভারী ছিল, অমানুষের মত ভারী না (যা দস্তগীরের ব্যাগ) একেবারে শয়তানের মত ভারী। কি ছিল ওতে! পুরোটাতে যদি পাথরও থাকে তাও অত ভারী হওয়ার কথা নয়। আমি শিক্ষক – না পারলাম অভিশাপ দিতে না পারলাম মনে মনে বকা দিতে। ভারী ব্যাগ টানার চাইতেও আমার সীমাবদ্ধতা আমাকে বেশী কষ্ট দিয়েছে। এই কষ্ট নিয়েই হোটেলে পৌঁছে গেলাম। একতলা টিনের ঘর। আমার কাছে খুব ভালো লাগলো। সামনে ছোট একটি রাস্তা। অনেকটাই গ্রামের বাড়ির মত। কয়েকজন রুমে ব্যাগ রেখেই চলে গেল সৈকতে। বাকীরা ক্ষুধা পেটে রেডি হয়ে বসে রইলাম গাইডের সিগন্যালের অপেক্ষায় – কখন খাবার রেডি।

আমাদের ঘরগুলোর সামনে একটি ছোট দোকান ছিল। ক্ষুধার জ্বালায় এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে খাচ্ছি। এমন সময় যারা সমুদ্র দেখতে গিয়েছিল তারা ফিরে এল। অধিকাংশেরই পায়ের এখানে ওখানে ছুলে গেছে। আমার ফার্স্ট এইড লাগিয়ে দিলাম। এর মধ্যে অরুপের পায়ের কাটাটি বেশ গভীর। আমার যা ছিল তাই দিয়ে ওর ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি। ভেবেছিলাম ও আর পানিতে নামবে না। কিন্তু পরে দেখেছি ও অন্য কারো চেয়ে কম লাফায়নি। আমি দুপুরে খেয়ে রুমেই ছিলাম, ক্লান্ত ছিলাম বলে। বাকীরা চলে গেছে মারিয়ার আর জনি ভাইয়ের সাথে সৈকতে। আমি সৈকতে গেলাম সন্ধ্যার দিকে। হেঁটে বেড়াতে খুব ভালো লাগলো।

রাতে খাবার পর আবার চলে গেলাম ফেরি ঘাঁটে। বেশ খানিকটা ঠাণ্ডা বাতাস ছিল। তা না হলে একেবারেই স্বর্গীয়। আমরা ডকে বসে গল্প, ভূতের গল্প, কবিতা, গান, … যা মনে এসেছি তাই করেছি। আমাদের সামনে একটি ন্যাভাল শিপ নোঙ্গর করা ছিল। লাইটের কারণে চেনা যাচ্ছিল। ঠিক যেন একটি নক্ষত্রপুঞ্জ সাগরে নেমে এসেছে। কালো আকাশেও অনেক রাতজাগা তারা উঠে পড়েছে। একসময় মারিয়ার ঠাণ্ডা লেগেছে বলে জনি ভাইয়ের সাথে ফিরে গেল রুমে। সাথে আরও কয়েকজন ছাত্রও চলে গেল। আমি রইলাম বাকিদের সাথে। বাতাস একটু পরে কমে গেল। আমরা হাঁটতে লাগলাম বালুচরে। শুধু হেঁটে বেড়ানো, কোন কথা হচ্ছে না। একটু দূরে দেখলাম কয়েকটি বড় নৌকা বালুচরে তুলে রাখা। আমরা ওদের পাশেই বসে রইলাম। দুই একজন নৌকায় উঠে গেল। হঠাৎ করে কেউ একজন বলল চাঁদ উঠেছে। এতরাতে চাঁদ? বেশ কিছুক্ষণ খুঁজার পর দেখতে পেলাম একফালি বিষণ্ণ হলুদাভ চাঁদ পূব আকাশে উঁকি দিয়েছে। সে চাঁদটুকুর আলো সমুদ্রে ফেলেছে একদি দীর্ঘ রেখা, ঠিক যেন একটি মেঠো পথ সাগরের পানিতে। যে পথ ধরে গেলে শেষ মাথায় চাঁদের বাড়ি। কথা না বলে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। আমার দেখা অনেক সুন্দর রাতের একটি ছিল সেদিন। একসময় উঠে পড়লাম। হোটেলের দিকে হাঁটছি, এতক্ষণ খেয়াল করিনি, আমাদের সাথে আরো অনেকেই জেগে ছিল। ওরা পুরো সৈকত জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মোবাইল ফোনের আলো ধরে দেখি ছোট ছোট অনেক কাঁকড়া। অনেক দ্রুত দৌড়াতে পারে ওরা। আমরাও কম না। কয়েকজন লাইট ধরল, আমি আর কয়েকজন মিলে দুটি কাঁকড়া ধরলাম। একেবারে হালকা কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর। ব্যাথা না দিয়ে ছেড়ে দিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। রুমে ঢুকে দেখি আমার বিছানায় কোন কম্বল নেই। শীতের রাতটি তোষকের নিচেই পারে করে দিলাম।

পরদিন সকালেও খুব সুন্দর রোদ। আমরা দুটো ট্রলারে করে ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। একটি ট্রলার হলেই আমাদের সবার হয়ে যেত। ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট দেখে খুব অবাক হয়েছি। আমি আমার ট্রলারের সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরতে একরকম বাধ্য করেছি। পরিষ্কার পানি ভেঙ্গে ভটভট শব্দ করে যাচ্ছে ট্রলার দুটো। আমাদের একপাশে সেইন্ট মারটিন দ্বীপ আর অন্যপাশে মুক্ত সমুদ্র। আকাশ আর পানির নীলে এক স্বপ্নিল পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। আমার খুব ইচ্ছে হল সে মুক্ত নীল পানিতে ভেসে থাকতে (আমি সাঁতার জানিনা, কিন্তু লাইফ জ্যাকেট আছে)। আমি সে উদ্দেশ্যে জুতা খুলে ফেলেছি, পকেটের সব জিনিষ মোবাশ্বেরার কাছে দিয়ে দিলাম। একটি সুযোগের অপেক্ষা করছি। আমার ইচ্ছা ট্রলারের মাঝি বুঝে ফেলেছে। সে আমার কাছে এসে ঝাঁপ দিতে নিষেধ করল, আমি ঝাঁপ দিলে বাকীরাও তাই করবে। একটু এদিক সেদিক হলেই ট্রলারের ব্লেডে কাটা পড়ব। আমার এখনো ইচ্ছে করে নীল মুক্ত পানিতে ভেসে থাকতে, অপূর্ণ ইচ্ছেটি প্রায়ই মনের মাঝে খোঁচা দিয়ে উঠে।

ছেঁড়া দ্বীপে ট্রলার ভেড়ানোর ব্যবস্থা নেই। তাই ট্রলার থেকে নেমে ছোট ডিঙি নৌকায় উঠে দ্বীপে নামতে হয়ে। সাগরের ঢেউয়ে ট্রলার টলছে, সে অবস্থায় ট্রলার থেকে নৌকাতে নামা বেশ কষ্টের। আমি একজন একজন করে নামালাম। এর মাঝে একজনের আবার ফোবিয়া আছে, কিসের জানিনা। ওকে নৌকার পুরো সময়টাতেই সাহস দিতে হয়েছে। ছেঁড়া দ্বীপে নেমে সবাই উচ্ছ্বাসে পানিতে চলে গেল। আমি দূরে থেকে দেখেছি সবার আনন্দ। আমি একা একা অল্প পানিতে কাঁকড়া ধরার চেষ্টা করেছি। দুটো কাঁকড়া ধরেছি, একই সাকিব হারিয়ে ফেলেছে, বাকিটা নিজে নিজেই চলে গেছে। আমার সাথে শেষের দিকে হাবিব যোগ দিয়েছিল। আমরা দুজন তখন অল্প পানিতে রঙিন ছোট ছোট মাছ ধরার চেষ্টা করেছি। দুপুরের ক্ষুধার কারণে ফিরতে হল, তা না হলে পুরো দিনটিই সেখানে থাকতাম। ফেরার পথে তিন চারজন পায়ে হাঁটা পথে ফিরে এসেছে, বাকীরা সকালের মতই ট্রলারে করে ফিরেছি।

পানিতে একজন কখনোই নামেনি। সে হল সঞ্চিতা। সবাই পানিতে নামলে ও একটি রঙিন ছাতা মাথার উপড়ে ধরে হাঁটাহাঁটি করত, যাকে বলে পায়চারি। কিন্তু সমুদ্রে নামার ইচ্ছেটা নিশ্চয়ই প্রবল থাকার কথা। সেইন্ট মারটিনে জিজ্ঞেস করলাম পানিতে কেন নামেনি। ও নাকি এমনিই পড়ে যায়, এই বলতে গিয়ে আমার সামনেই পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পেল। এই কথাটি আগে জানলে ওকে বলতাম পানিতে নামতে, আমি দেখে রাখতাম। ওর জন্য সামান্য দুঃখ এখনো আছে। ফেইস বুক থেকে জানতে পেরেছি ওর পাশে কেউ একজন এসেছে। আশাকরি ওকে সবকিছুতেই দেখে রাখবে এবং একদিন ওরা সমুদ্র দেখতে গিয়ে পানিতে নামবে।

সেইন্ট মারটিনে ফিরে এসেই খাবার হোটেলে চলে গেছি। খেয়েদেয়ে ঘরে ফিরে আবার বিকালে বেড়িয়ে গেল সবাই। আজ রাতটিই আমাদের শেষ রাত। কাল চলে যাব। রাতে বারবিকিউ হবে সাথে আরো কিছু স্পেশাল আয়োজন আছে। আমরা সন্ধ্যায়ই রেডি হয়ে জমা হয়েছি যেখানে বারবিকিউ হবে। ছেলেদের আর মেয়েদের ঘরের মাঝখানে এক টুকরো উঠান, সেখানেই সব আয়োজন। মিউজিক প্লেয়ার আনা হয়েছে। ছেলেরা মেয়েরা সবাই ভালো জামা কাপড় পরে আছে। জনি ভাই এবং মারিয়াও রেডি হয়ে বসে আছেন। বারবিকিউ হচ্ছে একপাশে আরেক পাশে মিউজিক সিস্টেম বাজানোর চেষ্টা চলছে। ওটা একটু চলেই থেমে যাচ্ছে, আমি বুঝতে পারিনি প্রথমে, আমার ধারণা ছিল ওরা চেক করছে। কিন্তু চেক করতে করতেই আমাদের খাবার দাবার শেষ। তারপর ঘুরতে বেরলাম। একসাথে দলবেঁধে হেঁটে বেড়ালাম। হাঁটতে গিয়ে দেখি জেলেরা জাল ফেলেছে। অন্যদিন হলে আমি সেখানেই বসে থাকতাম। যেহেতু শেষ রাত আমরা হেঁটে হেঁটে পুরো দ্বীপটিই ঘুরতে চাই। ঘুরতে ঘুরতে দ্বীপের অন্য পাশে চলে এসেছি যেখানে হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি। তাঁর বাড়ির সামনেই একটি ছোট বাজার, বেশীরভাগই শুঁটকির দোকান। কুপি বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে দোকানে। আমি কিছু শুঁটকি মাছ কিনতে চাই। বাকীরাও কিনবে। আমরা দুদলে ভাগ হয়ে গেছি, পেছনে আমি আর কয়েকজন ছাত্র। সামনে মারিয়া আর জনি ভাইয়ের সাথে বাকীরা।
একটি শুঁটকির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার সাথে কিছু ছাত্র। শুঁটকির দাম জিজ্ঞাসা করলাম, উত্তর পেলাম পাঁচশ টাকা কেজি। আমি বললাম আড়াইশ টাকা কেজি। দাম না কমাতে পারলেও আমি দামাদামি বেশ ভালো পারি। কিছুদিন আগে আমেরিকা যাওয়ার সময় কিছু ডলার কিনতে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম ডলার কত করে। দোকানী বলল – থ্রি পয়েন্ট সিক্স এইট। আমি তিন থেকে শুরু করে অনেক কথা বলে সাড়ে তিনে গিয়ে থামলাম। ততক্ষণে দোকানী রেগে গেছে – এটা কাঁচা বাজার না, এখানে কোন দামাদামি নেই। আমি অনেক গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম – এটা কি ফিক্সড প্রাইসের দোকান? লোকটা উত্তর দিল হ্যাঁ, আমি কিছু ডলার নিয়ে চলে আসলাম।

যাহোক আড়াই শ টাকা দড়ে শুঁটকি বেচতে দোকানী রাজী না। আমি আর বিশ টাকা বাড়াই, তাতেও দোকানী রাজী না। হঠাৎ খেয়াল করি পাশে থাকা ছাত্ররা দোকানী না করা মাত্রই বলে উঠে – আপনি একজন শিক্ষক কে সম্মান করবেন না! একেবারে কোরাসে। আমি বলি তিনশ টাকা, দোকানী বলে না, ছাত্ররা বলে আপনি একজন শিক্ষক কে সম্মান করবেন না। আমি বলি তিনশ বিশ টাকা, দোকানী বলে না, ছাত্ররা বলে আপনি একজন শিক্ষক কে সম্মান করবেন না। চলতে থাকে অনেকক্ষণ। দোকানী আমাদের থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই শেষপর্যন্ত তিনশ পঁচাত্তর টাকায় রাজী হয়ে যায়। এর আগে “আপনি একজন শিক্ষক কে সম্মান করবেন না” শুনতে শুনতে ওর কান ঝালাপালা। ও কি বুঝেছে কে জানে, কিন্তু আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি শুঁটকির দোকানিকে কেন একজন শিক্ষক কে সম্মান করতে হবে। এটা কি এতদিন ক্লাস না করার জন্য নাকি নিজেরা সম্মান করেননি তাতে কি, অন্যের কাছ থেকে তো ঠিকই সম্মান আদায় করে দিয়েছে (কমেন্ট বক্সে না সবাই দাবী করে বসেন – আমি তো ক্লাস করেছি)! ছাত্ররাও শুঁটকি কিনেছে।

আমরা কেনাকাটা শেষ করে একটু হেঁটে সামনে এসে দেখি একটি দোকানের সামনে ভীষণ জটলা। মারিয়া রেগে আগুন (এখানে অনেক রেগেছিল মারিয়া, আগুন শব্দটি রূপক অর্থে ব্যাবহার করা হয়েছে)। মারিয়া আমাকে দেখা মাত্র জিজ্ঞেস করল – স্যার এগুলো কি রাক্ষুসে মাছের শুঁটকি? আমি উত্তর দেয়ার আগে একজনের কাছে একটু শুনতে চাইলাম ঘটনাটা। যা শুনলাম তা এই রকম – মারিয়া শুঁটকি কেজি দরে কিনবে না। পিস হিসেবে কিনতে চেয়েছে। দাম ঠিক করা হল। দোকানী মারিয়ার হাঁতে শুঁটকি দেয়ার আগে একটু মেপে দেখে অনেক বেশী শুঁটকি অনেক কম দামে চলে যাচ্ছে। সে মারিয়ার কাছ থেকে শুঁটকি গুলো নিজেই আবার বেশী দামে কিনে নিতে চায়। মারিয়া রাজী না। এক পর্যায়ে দোকানী ওকে বলে এটি রাক্ষুসে মাছের শুঁটকি, মুসলমানেরা খেতে পারে না, শুধু উপজাতীয়রা খায়, মারিয়া খেলে নাকি স্বপ্ন দেখবেন মাছ এসে ওকে ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। মারিয়া তেমন মাছ চিনে না। জনি ভাইয়ের অবস্থাও ওরকমই। মারিয়া চায় না এটি রাক্ষুসে মাছের শুঁটকি হোক, ও ফেরত দিবে না, আবার স্বপ্নে মাছ এসে ওকে কামড় দিবে তাও মানতে পারছে না। শেষ অবলম্বন আমি। আমি দোকানীকে বেশ একটু কথা শুনানোর চেষ্টা করলাম – আপনি একটি অবলা নারীকে ভয় দেখিয়েছেন, … ইত্যাদি, ইত্যাদি। মারিয়াকে আশ্বস্ত করলাম ওগুলো ভালো মাছের শুঁটকি। তারপর খানিকটা ঘুরে ফিরে এলাম ঘরে।
পরদিন সকালে শেষবারের মত সমুদ্রে গেল সবাই। আমি বাইরে বসে কাটিয়ে দিয়েছি। দুপুরে খাবার আগেই খবর পেলাম আমেনা ম্যাডামরা চলে এসেছেন। মারিয়াকে সহ কয়েকজন গেলাম ম্যাডামের সাথে দেখা করতে। তাঁরা ফেরিতে করে এইমাত্র নেমেছেন, আর আমরা সে ফেরিতে করে ফিরে যাব। তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাই হোটেলে, দুপুরের খাবারের জন্য। ছাত্রদের খাওয়া প্রায় শেষ। আমি, মারিয়া, আর জনি ভাই একটি ছোট টেবিলে বসলাম। বেশ কিছু আইটেমের মাঝে লবস্টার ছিল, বেশি বড় না। আমার কাছে অবাক লাগল এতজনের জন্য এক সাথে এত লবস্টার কোথা থেকে জড়ো করেছে। খাওয়া শেষে ইকবালের সাথে কথা হলে বুঝলাম লবস্টার শুধু আমাদের তিনজনের জন্যই ছিল। খুবই লজ্জা লেগেছে। আমি আর মারিয়া সবসময়ই ভিন্ন ভিন্ন ছাত্রদের সাথে বসে খাওয়ার চেষ্টা করেছি। এবং ওদের থেকে ভিন্নতর কিছুই আশা করিনি কখনো। ঘটনাটি মারিয়া আর জনি ভাই শুনার পর বেশ কষ্ট পেয়েছেন। এর জন্য আমরা দায়ী নই, ট্যুর গাইডরা হয়ত এভাবেই করে অভ্যস্ত। পুরা ট্যুরে এটিই আমাদের একমাত্র লজ্জা।

লাঞ্চ সেরে বের হয়েই দেখি একটি দোকানে কেবল জিলাপি ভাজা শুরু করছে। আমি সবার জন্য আগুন গরম জিলাপি কিনে দৌড়ে গিয়ে ফেরিতে উঠলাম। ভাবলাম সবাই বসে গেলে জিলাপি দেব। ফেরির ক্যান্টিন থেকে বিশ টাকা দিয়ে একটি ট্রে ভাড়া করে এনেছি। জিলাপি ট্রেতে ঢেলে দেখি একেবারে নেতিয়ে গেছে। হঠাৎ মনে হল এমনি না দিয়ে ছাত্রদের কাছে বিক্রি করি। কিন্তু মারিয়া আর জনি ভাই ছাড়া কেউ আমার কাছ থেকে কিনল না। এগিয়ে এল রেজা আর মোবাশ্বেরা – ওরা বিক্রি করে দেবে বিনিময়ে ওরা নিজেরা ফ্রি খাবে। আমার আর কোন উপায় নেই। রাজী হলাম। রেজা আমাদের মাঝেই বিক্রি করার চেষ্টা করল। তেমন সফল না। মোবাশ্বেরা ট্রে টা নিয়েই বাইরের লোকের কাছে চলে গেল। আমার সামনেই জিলাপি বলে একজনের কাছে গেল। লোকটি জিলাপি কিনবেন। তিনি বুঝতে পারছেন কি হচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর আর মোবাশ্বেরার মাঝে নিচের কথা গুলো শুনলাম:

– জিলাপি এমন নেতিয়ে গেছে কেন।
– বাড়ি থেকে ভেজে এনেছি তো সেজন্যে।
– তুমি কি কর?
– জিলাপি বিক্রি করি।
– সেতো বুঝলাম, কিন্তু পড়াশুনা কিসে কর?
– ক্লাস সিক্সে।

লোকটি আর কিছু না বলে মুচকি হেঁসে জিলাপি নিলেন। বাকি জিলাপি গুলোও একই ভাবে বিক্রি হয়ে গেল। দেখে ভালো লাগল, মেয়েটি কোথাও আটকাবে না। এখন আমার জীবনে কিছুই করতে না পারার একটি সম্ভাবনা আছে। ভাবছি মোবাশ্বেরার কাছে কিছুদিন ট্রেনিং নেব, তখন আমাকে আর কেউ আটকাতে পারবে না।

আমাদের ফেরি চলল টেকনাফের দিকে। পড়ে রইল স্মৃতিময় সেইন্ট মারটিন। আমরা চলে এসেছি, আরেক দল আছে, তারাও ফিরে আসবে। দ্বীপটি মানুষের আশা যাওয়ার মাঝেই বেঁচে থাকবে। সেইন্ট মারটিন দ্বীপটি প্রকৃতিগত ভাবে খুবই সুন্দর। চারিদিকেই মুক্ত সমুদ্র। নীল ঢেও আছড়ে পড়ে বালুতে। দ্বীপে বেশ কিছু সবুজ গাছ আর ঝোপ ঝাড়ও আছে। এক কথায় খুব সুন্দর প্রকৃতি। কিন্তু দ্বীপটিতে যে মানুষ গুলো থাকে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারেই ভালো মনে হল না। অনেক ছোট ছোট ছেলে মানুষের ব্যাগ টানছে। রাস্তায় আট বছরের বেশী বয়সী কোন মহিলা দেখিনি। শীতে ওদের গায়ে যথেষ্ট গরম জামা এবং পায়ে স্যান্ডেল না থাকলেও মাথায় ওড়না বা স্কার্ফ আছে। কিছুদূর পরপর একটি মাদ্রাসা বা এতিম খানা বা মসজিদ আছে। সেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো লেখাপড়া করছে। তাই দেখে অনেক বারই মনটা ভারী হয়ে উঠেছে। আবার অন্য ভাবেও ভাবতে পেরেছি। নিজের উপর দায়িত্বের ভার না থাকলে মানুষের মনে খুব সহজেই করুণা আসতে পারে। আরেকটি জিনিষ হল আমার চোখের উপর একটি পর্দা চলে এসেছে। আমি ধরেই নিয়েছি যেখানে তিন বেলা পেট পুড়ে খাবারের সংস্থান নেই তা যেন আর মানুষের জীবন নয়। অথচ ওদের জীবনটাও ওদের মত করেই সুন্দর। ওদের জীবনে আছে নীল সমুদ্রের জোয়ার ভাটা। স্বপ্নের জাহাজ গুলো রাতে আলো জ্বালিয়ে আস্তে ধীরে মিলিয়ে যায় একেবারে দূর দিগন্তে। কিছু স্বপ্ন রাতের উল্কার মত বাতাসে জ্বলে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর বুকে। আবার কিছু স্বপ্ন দূর আকাশের রাতের তারার মতই জ্বলজ্বল করে, ওদেরকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায়না; ওগুলোই স্বপ্ন, বেঁচে থাকার একমাত্র আলো। ওদের জীবনও অনেক সুন্দর জীবন যেমন আমার জীবনও একটি জীবন। একটি জীবন কে আরেকটি জীবনের সাথে তুলনা করা শুধু বোকামিই নয় ক্ষেত্র বিশেষে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

টেকনাফে এসে বাসে উঠেই সবাইকে অনেক করে ধন্যবাদ দিলাম। আমার নিজের আনন্দের জন্য। ওদের সাথে অনেক ভালো সময় গেছে। আনুষ্ঠানিক ভাবেই ট্যুরের সমাপ্তি ঘোষণা করলাম। বাস চলতে শুরু করল ঢাকার দিকে। সবাই বেশ নিস্তেজ আর বিষণ্ণ। রাত এসে বিষণ্ণতা ঢেকে রাখতে চাইছে। অন্ধকার আঁকাবাঁকা পথে বেশ ঝাঁকির দিয়ে দিয়ে গাড়ি চলছে। যারা সামনে বসেছি তাদের তেমন ঝাঁকির লাগছে না। পিছনে যারা বসেছে তারা বেশ কাহিল হয়ে গেছে, আগের আর উদ্দীপনা নেই। ওদের একজন এসে ড্রাইভারকে আস্তে গাড়ি চালাতে বলল। কনডাক্টর উল্টো ওকেই দুচার কথা শুনিয়ে দিল। এমন সময় শুনলাম জাফরের পেটে অনেক ব্যাথা। ও পেছনে বসে ছিল। সামনে এনে দুটো সিট খালি করে ওকে শুইয়ে দেয়া হল। কিন্তু পেট ব্যাথা ভালো না হয়ে আরো বাড়ছে। আমি আমার গাইনকলজিস্ট ভাবীকে ফোন করলাম, তাঁকে জানালাম জাফরের কথা। তিনি জাফরের সাথে কথা বলতে চাইলেন। আমি জাফরকে ফোন দিলাম। জাফর যখন ভাবীর সাথে কথা বলছে, পুরো বাস জেনে গেলে জাফর পেটের ব্যাথার জন্য একজন গাইনকলজিস্টের সাথে কথা বলছে। সবাই জোরে জোরে হেঁসে উঠল (এতে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি, নিজের বন্ধুর কষ্টে কখনো হাঁসতে নেই। তবে যে জানিয়েছে সে ঠিক কাজটিই করেছে বলে আমি দাবী করি। কেননা একসাথে আছি বলে সবারই সবকিছু নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার)। জাফরের সাথে কথা শেষ করে ভাবী আমাকে বললেন কিছু ওষুধ দিতে, যা আমাদের কাছে আছে। কিন্তু জাফর সে ওষুধ খায়নি। ও ওর বড়ভাইকে, তিনি মেডিসিনের অধ্যাপক, ফোন করে ওষুধ খেয়েছে। যার ওষুধই খাক না কেন, একটু পর ভালো বোধ করছে।

সামনের আরো কিছু সিট খালি করে পেছনেরদের বসতে দিলাম। একপর্যায়ে মাঝে চলে গেলাম। শুধু গেলামই না, বুঝিয়ে ছাড়লাম আমি গেছি। শুরু করলাম গান (ইট ভাঙ্গা মেশিনে খোয়া বানানো), আমি না শুধু আরোও মানুষ ছিল। আমার পছন্দের একমাত্র ব্যান্ডের গান রেনেসাঁর “হৃদয় কাঁদা মাটির কোন মূর্তি নয়…” গাওয়ার পর আসাদ বলল – ড্যাম অ্যান্ড গুড। কি বুঝাতে চাইছে জানিনা, কমপ্লিমেন্ট হিসেবেই মেনে নিয়েছি। এই গানটি শুনেছিলাম উনিশশ ছিয়ানব্বই সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেভেন্টি ফিফথ এনিভারসারিতে। অনেক পাওয়ারফুল সাউন্ড সিস্টেমের ব্যাবস্থা করা হয়েছিল তখন। আমরা সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি আর তার কিছুদিন আগেই ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্ট দিয়েছে; আমার জীবনের একমাত্র অভিশাপ বা আশীর্বাদ, যা এখনো অনির্ণেয় অবস্থায় রয়ে গেছে। তখন যারা পাশে ছিল তাদের জন্যই গানটি এত ভালো লেগেছে। আরো কিছু গান গাইলাম। এর মাঝে ছিল “এক বসন্ত, দুই বসন্ত, তিন বসন্ত গেল, তোমার লাগি বন্ধু আমার মন যে কেমন করে”। কিন্তু এই গানের এই দুই লাইন বাদে আর জানিনা। তাতে কিছুই এসে গেল না, আমি এক … দুই … তিন … গেল, তোমার লাগি বন্ধু আমার মন যে কেমন করে। এই করে করেই অনেক দূর চলে এলাম। মাঝখানে একটি হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। বাসে উঠার আগে শেষ বারের মত চারকাপ চা শেয়ার করলাম – আমি, মারিয়া, জনি ভাই, আর সৌরভ। বাসে উঠে যে যার মত ঘুম দিয়ে দিয়ে ফিরছি ঢাকার পথে। সায়েদাবাদ থেকে একজন একজন করে নামতে শুরু করল। বাকি সবাই খুব ভোরে কার্জন হলের সামনে থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে গেল যে যার বাড়িতে। আমি একটি রিক্সা নিয়ে চললাম পরিবাগের দিকে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ছিল সেদিন। রিক্সায় উঠার পরেই মন হল এই জগতটা একেবারেই মিছে। অর্থহীন জগতের এক ভয়াবহ শূন্যতা টেনে নিয়ে চলল রিক্সাওয়ালা; আমি বুঝলাম না এতে আমার কি ভূমিকা, আমাকেই বা জড়ানো হয়েছে কেন!

আমাদের ট্যুরের শুরুতে আমি কাউকে চিনতাম না। এই কয়েকদিনে তাদের সাথে যতটুকু সম্ভব কথা বলেছি, আনন্দ করেছি, উপভোগ করেছি; অনেক কিছুই শেয়ার করার চেষ্টা করেছি। এই আনন্দের মাঝেই আমি যেন দেখতে শুরু করেছি ওদেরকে, অথবা ওরাই যেন আমার কাছে নিজেকে প্রকাশ করছে। সবাইকে দেখলাম খুবই বন্ধুত্ব পরায়ণ, ওদের মনও মানুষের সহজাত ভালোবাসায় পূর্ণ। ওদের সামাজিক বোধও খুব চমৎকার। ওরা নিজেরা মিলে ইকবাল, আসাদ, আর নাজিমের জন্য গিফট কিনছে; ওরা তিনজন মিলেই ট্যুরের আয়োজন করেছিল। আবার সবাই মিলে আমার, মারিয়ার, আর চেয়ারম্যান স্যারের জন্যও গিফট কিনেছে। ওদের নিজেদের মাঝেও একজনের প্রতি আরেক জনের সমবেদনা আছে। অথচ তাদের সবারই নিজস্বতাও আছে। তারা সবাই যেন সুন্দর একটি মানব আত্মার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। আমি ছেচল্লিশটি নতুন আত্মাকে জানতে পেরে নিজেকে খুবই গর্বিত বোধ করছি, নিজেকেও আরেকটু জানতে পেরেছি, ওদের চোখে। আমি অনেক সময় ব্যয় করেছি প্রকৃতি দেখার জন্য। আমার বিশ্বাস প্রকৃতির নিজস্ব একটি গভীর সৌন্দর্য আছে। অনেক চেষ্টা করার পরেও যা আমার চোখে কখনো ধরা পরেনি। কিছু ভাগ্যবান মানুষ আছে যারা প্রকৃতির গোপন সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছে বলেও মনে করি। আমি তাদের কেউ নই। কিন্তু আমি মানব মনের গোপন সৌন্দর্য দেখেছি আর আমার কাছে প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর হল মানুষের মন। তারপরেও আমরা অনেক সময়ই আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষটির মনের সৌন্দর্যটি দেখতে পাইনা; এটিই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।