সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা চাই

Ibn-Golam-Samad

একসময় ‘সংবাদমাধ্যম’ বলতে কেবল সংবাদপত্রকেই বুঝিয়েছে। পরে এর সাথে যুক্ত হয়েছে রেডিও। সবশেষে এর সাথে যুক্ত হয়েছে টেলিভিশন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আর গণতন্ত্র, এ দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দেশে গণতন্ত্র না থাকলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকতে পারে না। আবার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা না থাকলে গণতন্ত্র হয়ে পড়তে চায় অচল। কেননা, ভোটাররা যদি যথাযথ সংবাদ না পেতে পারে, তবে তারা ভেবেচিন্তে ভোট দিতে পারে না। তাই গণতন্ত্রের অন্যতম সূত্র হলো: জনগণের জানার অধিকার অবিচ্ছেদ্য। বিশেষ করে সেই সব ব্যাপারে, যার সাথে জনস্বার্থ প্রত্যভাবে জড়িত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটাররা হলো রাষ্ট্রের অন্যতম অংশ। তাদের বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চলতে পারে না। আর তারা যদি প্রাসঙ্গিক তথ্য না জানে, তবে তারা কখনোই উপযুক্তভাবে ভোট প্রদান করতে সম হয় না।

উদার গণতন্ত্রে তাই বলা হয়Ñ মানুষকে তথ্য সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ার অধিকার প্রদান করতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো রাষ্ট্রিক গোপনীয়তা রা করার প্রয়োজনীয়তা থাকে; কিন্তু সব েেত্রই নয়। গণতন্ত্রে বলা হয়Ñ যা সবাইকে স্পর্শ করে, সে বিষয়ে সবারই অধিকার আছে ভাবার। এই হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌল ভিত্তি। গণতন্ত্রের ব্যবহারিক সাফল্য নির্ভর করে জনমত, রাজনৈতিক দল এবং অবাধ ও নিরপে নির্বাচনের ওপর। জনমত গঠন করে সংবাদপত্র। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা না থাকলে জনমত গঠিত হতে পারে না মুক্তভাবে। কেবল সংবাদপত্র ও অন্যান্য প্রচারমাধ্যমই যে জনমত গঠন করে, তা নয়। ভোটদাতারা নিজেরাও মূল্যায়ন করেন প্রাপ্ত তথ্যের। সব সংবাদ তারা যে মেনে নেন, তা নয়। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে কমন কোনো ভালো জিনিস বাজারে চালু করতে হলে বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন, তেমনি রাজনীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের প্রয়োজন হয় ‘বিজ্ঞাপিত’ হওয়ার; কিন্তু ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে যেমন কেবল বিজ্ঞাপনই কোনো পণ্য বাজারে চালু হওয়ার জন্য যথেষ্ট হয় না, তেমনি রাজনৈতিক দলও কেবল প্রচারের জোরে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না। উপমা দিয়ে বলা যায়, কোনো বহুবিজ্ঞাপিত ওষুধে যদি রোগ না সারে, তবে শেষ পর্যন্ত তা বাজার পেতে পারে না। লোকে ফল দিয়ে বিচার করে রাজনৈতিক দলকে। এভাবেই চলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। জনমত বদলায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো একটি দল তাই একটানা চিরদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। এ হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাজনীতি মতার সাথে জড়িত। ক্ষমতা মানুষকে স্বার্থপর, জেদি ও পীড়ক করে তুলতে চায়। মানুষ তাই অনুভব করেছে মতাকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। উদ্ভব হয়েছে গণতন্ত্রের দর্শন।

একসময় যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি যতবার ইচ্ছা প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন; কিন্তু এখন আইন করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুইবারের বেশি, অর্থাৎ আট বছরের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকতে পারবেন না। আইনটি করা হয়েছে রাজনীতিতে ক্ষমতাকে সীমিত রাখার জন্য। আমাদের দেশে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির গণতন্ত্র প্রচলিত নয়। আমরা অনুসরণ করতে চাচ্ছি পার্লামেন্টারি পদ্ধতি; কিন্তু আমাদের পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়াতে চাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সরকার। তাই মনে হয়, আমাদের দেশেও আইন করা প্রয়োজন, একজন ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। অর্থাৎ কেউ হতে পারবেন না ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকবার অধিকারী। আমাদের দেশেও প্রয়োজন হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক মতা নিয়ন্ত্রণ; কিন্তু যারা এখন মতায় আছেন, তারা যেন চাচ্ছেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এ কারণে জনমনে জাগছে শঙ্কা। এখন যেভাবে প্রচারমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ চাপানো হচ্ছে, সেটাকে মনে হচ্ছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই। আর এ জন্য উঠছে এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিপে প্রতিবাদ।

শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল গঠন করেন ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা ছিল একটা বড় রকমের রাজনৈতিক ভুল। শেখ মুজিব নিজের ইচ্ছায় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, না রুশ-ভারত চক্রান্তে তিনি বাকশাল গড়তে বাধ্য হয়েছিলেনÑ সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। তখন চলছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি বিশেষ অংশকে সমর্থন করত। অন্য দিকে রুশ-ভারত অ সমর্থন করত আর একটি অংশকে। শেখ মুজিব পড়েছিলেন এই দুই পরে মাঝে প্রবল চাপে। ঠিক করতে পারছিলেন না তার ইতিকর্তব্য। রুশ-ভারত অ সমর্থন করছিল তাজউদ্দীনকে। পান্তরে পশ্চিমা দুনিয়া সমর্থন দিচ্ছিল খন্দকার মোশতাক আহমদকে। শেখ মুজিব হয়ে গিয়েছিলেন একান্তভাবেই একা। এই অবস্থায় ব্রেজনেভ ও ইন্দিরা গান্ধী তাকে উপদেশ দেন বাকশাল গঠন করতে। ধারণা করা যায়, শেখ মুজিব বাকশাল গঠন করেছিলেন ব্রেজনেভ ও ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে। ভারতের রাজনৈতিক অবস্থাও হয়ে উঠেছিল খুবই জটিল। ইন্দিরা গান্ধী ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন ১৯৭৫ সালের ২৬ জুন। ফলে ভারতের মানুষ হারায় মৌলিক অধিকার। সেখানে থাকে না সংবাদপত্র ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের কোনো স্বাধীনতা। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ইন্দিরা গান্ধী পড়েছিলেন বিরাট রাজনৈতিক বিপর্যয়ে।

শেখ মুজিব নিহত হন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। দিনটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। ভারত মেতে উঠেছিল স্বাধীনতা দিবসের উৎসবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণে সারা ভারতে জনগণ হয়েছিল ক্ষুব্ধ। ফলে নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। জীবনে এটাই তার প্রধান এবং একমাত্র পরাজয়। রুশ সহায়তায়ও তিনি এই পরাজয় এড়াতে পারেননি। যেহেতু ইন্দিরা গান্ধী নিজেই পড়েছিলেন চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে, তাই তার পে এগিয়ে আসা সম্ভব হয়নি শেখ মুজিবকে রার জন্য। ইন্দিরা গান্ধী তার জীবনের একপর্যায়ে হয়ে ওঠেন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। মনে করেন, তাকে কেউ মতাচ্যুত করতে পারবে না। তিনি শিখদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করেন চরম সিদ্ধান্ত। সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন অমৃতসরে শিখ ধর্মমন্দিরকে আক্রমণ করে ভেঙে ফেলার (Operation Blue Star)। শিখরা এর প্রতিশোধ নেয় ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করে। ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে তার সরকারি বাসভবনের আঙিনায় নিহত হন ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। শেখ মুজিব যেমন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ভুল করেছিলেন, একই রকম ভুল করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীও। গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে রাজনীতি করতে গেলে তার ফল শুভ হয় না। বাড়তে থাকে খুনখারাবি। আমাদের দেশে এটা যতটা হয়েছে, ভারতে ঠিক ততটা হয়নি। এর কারণ ভারতে গণতন্ত্র অনেক দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা আলোচনা করছিলাম সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে। ভারতে সংবাদমাধ্যমের যে পরিমাণ স্বাধীনতা আছে, আমাদের দেশেও তা থাকা উচিত।

ভারত চলেছে ব্রিটিশ গণতন্ত্রকে অনুসরণ করে। ব্রিটেনে সংবাদপত্রের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এখন আর নেই। সেখানে কেবল যুদ্ধের সময় কোন খবর ছাপা যাবে আর কোন খবর ছাপা যাবে না, সেটা সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়; কিন্তু শান্তির সময় এ রকম কোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা (Censorship) থাকে না। বিলাতে আছে Law of Libel। এই আইন অনুসারে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও তিকর খবর প্রকাশিত হলে, সংশ্লিষ্ট পত্রিকার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যায়। বিচারকেরা পত্রিকাটিকে দোষি সাব্যস্ত করলে তাকে দিতে হয় ক্ষতিপূরণ। কিন্তু এটা তাকে দিতে হয় খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে। কারণ, মামলা হয় খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে; কিন্তু খবর প্রকাশের আগে পত্রিকাকে খবর প্রকাশে বাধা দেয়া চলে না। ব্রিটিশ পত্রপত্রিকা এমনিতেই এখন যথেষ্ট দায়িত্বশীল। সাংবাদিকেরা খবর পরিবেশন করেন যথেষ্ট সতর্ক হয়েই। মিথ্যা খবর কখনো তারা দিলেও দেন এমনভাবে যে, তা Law of Libe-এর মধ্যে পড়ে না। যেমন, বিলাতে কোনো পত্রিকায় খবর কখনো দেবে না যে, অমুক ব্যাংক ফেল করতে যাচ্ছে। কারণ, তা হলে লোকে চাইবে ওই ব্যাংক থেকে তাদের টাকা তুলে নিতে। আর তাই ব্যাংকটি সত্যি সত্যিই পড়ে যাবে। যদি কোনো ব্যাংক ফেল করার সম্ভাবনা থাকে, তথাপিও ব্রিটিশ পত্রিকা সে খবর দেবে না। কারণ, এর ফলে দেখা দিতে পারে দেশে অর্থনৈতিক সঙ্কট। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করার একটি কারণ হলোÑ এই দুই দেশের প্রশাসন হয়ে উঠেছে খুবই গণতন্ত্রমনা। আসলে ইংরেজি ভাষাভাষী সব দেশেই গণতন্ত্র শক্তিশালী ভিত্তি পেয়েছে সরকারি কর্মচারীরা গণতন্ত্রমনা হওয়ার কারণে। সরকারি কর্মচারীরা ভোট দিতে পারেন। তারা প্রত্যেকেই কোনো-না-কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। কিন্তু তাই বলে তারা কোনো দলের প্রতি বিশেষ পপাতিত্ব করতে চান না। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা থাকেন দলনিরপে হয়ে।

বিখ্যাত মার্কিন দার্শনিক জন ডিউই (১৮৫৯-১৯৫২) বলেছিলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃতির ওপর রাষ্ট্রের প্রকৃতি নির্ভর করে’ (The state is as its officials are)। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে সরকারি কর্মচারীরা জড়িয়ে পড়তে চাচ্ছেন দলীয় রাজনীতিতে। এ দেশে যদি প্রচারমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো আইন করা হয়, তবে তার প্রয়োগ হতে পারে খুবই দলভিত্তিকভাবে, যেটা বাঞ্ছিত নয়। তাই সংবাদনিয়ন্ত্রণ আইনের বিপে উঠছে প্রতিবাদ। কোনো একজন মন্ত্রী নাকি বলেছেন ( নয়া দিগন্ত, ১১ আগস্ট; ২০১৪), ‘সাংবাদিকরা বদমাশ চরিত্রহীন লম্পট।’ জানি না, এ কথা তিনি সত্যই বলেছেন কি না। তবে শুনেছি এই মন্ত্রীর কন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এমএ ডিগ্রি নিয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনিও হতে পারেন একজন সাংবাদিক। সব সাংবাদিক সম্পর্কে এ রকম ঢালাও অশিষ্ট মন্তব্য কোনো মন্ত্রীর মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কি না, সেটা নিয়েও জনমনে উঠছে প্রশ্ন। শুনলাম তিনি পরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন তার বক্তব্যের জন্য। আমরা রাজনীতি করি না; কিন্তু রাজনীতি সম্পর্কে কিছু বইপত্র পড়েছি। তা থেকে আমাদের এই ধারণাই হয়েছে যে, রাজনীতিতে যতটা কম কথা বলা যায়, ততই ভালো। গণতান্ত্রিক সরকারের একটি সংজ্ঞা হলো, আলোচনার মাধ্যমে পরিচালিত সরকার (Government by discussion)। মনে রাখা দরকার, আলোচনা আর ঝগড়া সমার্থক নয়। এমন শব্দ রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত নয়, যা হতে পারে ক্রোধ-উৎপাদক। এই যুগে দেশবাসীকে চটিয়ে দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের পে দেশ চালানো সম্ভব হয় না। সব দেশেই কিছু-না-কিছু হলুদ সাংবাদিকতা (Yellow Journalism) ছিল এবং আছে। এটা কমাতে হলে সাংবাদিকদের সাথে বৈঠক করতে হয়, অন্যথায় সাংবাদিকেরা হয়ে উঠতে পারেন ক্ষুব্ধ।