আওয়ামী লীগ ও লেখকের সংকট

Shafik Rehman শফিক রেহমান

হুমায়ূন আহমেদ যুক্তিবাদী ও মানবদরদি লেখক ছিলেন। নিজের প্রতিভার বিস্তৃতি এবং সীমাবদ্ধতা, উভয় বিষয়েই তিনি সচেতন ছিলেন। প্রতিভার বিস্তৃতির ফলে তিনি তার সময়ে উভয় বাংলার সর্বাধিক জনপ্রিয় লেখক হয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকে তার বই কিনতে বইমেলাতে পাঠকদের লাইন বেধে দাড়াতে হতো এবং সেই ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে থাকতে হতো। পাঠকপ্রিয়তা ছিল বলে হুমায়ূন আহমেদকে বাংলাদেশের কোনো লেখক অথবা সুধী গোষ্ঠির সঙ্গে, বিশেষত আওয়ামী ঘরানার কবি-লেখক চিন্তাবিদদের সঙ্গে গাটছড়া বাধতে হয়নি। আর সে জন্য হুমায়ূন আহমেদ হতে পেরেছিলেন স্বাধীন ও সাহসী।

অন্যদিকে তার প্রতিভার সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন তুলে কেউ যদি বলতেন তিনি কোনো কালজয়ী লেখা লিখতে পারেননি, সেই সমালোচনারও হুমায়ূন আহমেদ নিরহংকারী উত্তর দিতেন।

নিউ ইয়র্কে ক্যান্সার রোগে তার মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে হুমায়ূন আহমেদ ঢাকায় এসেছিলেন। তখন একটি ছোট এবং স্বল্প প্রচারিত ইন্টারভিউয়ে তিনি বলেছিলেন, এক. ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি কেউ থুথু ফেললে সেই থুথু নিজের গায়ের ওপরই পড়বে এবং দুই. প্রকাশিতব্য (তখন) দেয়াল উপন্যাসের কিছু অংশ (বিশেষত ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস প্রকাশের ঘটনা বিষয়ে) আওয়ামী সরকারের চাপ সত্ত্বেও তিনি বদলাবেন না। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ওই বইটি তিনি লিখেছিলেন অন্তত দুইশটি প্রকাশিত বই ও সূত্রে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। সুতরাং দেয়াল বইয়ের কোনো অংশ বদলাতে হলে, তার আগে ওই সব বইও বদলাতে হবে। হুমায়ূন আহমেদ আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং চারিত্রিকভাবে সাহসী ও স্বাধীনচেতা ছিলেন বলে আওয়ামী শাসন আমলেও এই উক্তি করতে পেরেছিলেন।

মৃত্যুর অতি কাছে দাড়িয়েও এবং মৃত্যুর পরে আওয়ামী সরকার ও সমর্থক গোষ্ঠি হাসান হাফিজুর রহমানের মতো তাকেও চতুরভাবে বিস্মৃতির সমুদ্রে ডুবিয়ে দেবে এমন বাস্তব সম্ভাবনা জানা সত্ত্বেও হুমায়ূন আহমেদ তার মতামত প্রকাশে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। কারণ, তার বিবেকের কোনো সংকট ছিল না। তিনি যেটা সত্য এবং উচিত মনে করেছিলেন, সেটাই বলেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পরে অন্যপ্রকাশ থেকে দেয়াল বইটি প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ২০১৩-তে।

কিন্তু এটি সংশোধিত দেয়াল!

সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা খুবই দুর্লভ যে প্রয়াত লেখকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংশোধিত বই প্রকাশিত হয়। এই সংশোধিত দেয়ালের তিন পৃষ্ঠাব্যাপী ভূমিকা লেখেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির বাংলার প্রফেসর আনিসুজ্জামান, যার জানার কথা সাধারণত লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখকের বইয়ের কোনো ভূমিকার প্রয়োজন হয় না। তবে, লেখক যদি প্রয়াত হন এবং তার অপ্রকাশিত রচনা প্রকাশে যদি কোনো ভূমিকার প্রয়োজন হয়, তাহলে, কোনো সৎ ব্যক্তি ভূমিকা লিখলে, প্রয়াত লেখকের ইচ্ছারই প্রতিফলন তিনি সেখানে ঘটান।

এ প্রসঙ্গে প্রয়াত হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পর্কে কিছু তথ্য উল্লেখ করা উচিত। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক কবি, লেখক ও সম্পাদক। ভাষা আন্দোলনে তার সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারি বইটি তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্বাধীনতার পরে তিনি সরকারি মালিকানাধীন দৈনিক বাংলা-র সম্পাদক ছিলেন। ১ জানুয়ারি ১৯৭৩-এ ঢাকায় পররাষ্ট্র দফতরের সামনের মোড়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে ছাত্র মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে দু’জন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়। মুক্ত বাংলাদেশে বাংলাদেশি পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার এটাই ছিল প্রথম ঘটনা।

সেই সময়ে ওই মোড়ে একটি বিশাল রেইনটৃকে ঘিরে জড়িয়ে আকাশ পানে উঠে গিয়েছিল বগেনভিলিয়ার ঝাড়। সেখানে ফুটত শত শত লাল বগেনভিলিয়া। সম্ভবত রাজধানীতে সেখানেই ছিল সবচেয়ে বেশি বগেনভিলিয়ার সমারোহ। তারই নিচে সবুজ ঘাসে নিহতদের লাল রক্তের সঙ্গে ঝরে যাওয়া লাল বগেনভিলিয়ার তুলনা করে কিছু কবিতা তখন প্রকাশিত হয়েছিল।

মার্চ একাত্তরের আগে এই ভূখণ্ডের মানুষের একটা ধারণা ছিল, কোনো মুসলিম একজন মুসলিমকে নির্বিচারে হত্যা করতে পারে না। মার্চ একাত্তরের পর মানুষের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশিরা একতাবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশিদের ধারণা হয়েছিল, কোনো বাংলাদেশি সরকার কোনো বাংলাদেশিকে নির্বিচারে হত্যা করতে পারে না।

তাই পহেলা জানুয়ারি তেহাত্তরে এই ঘটনার বিশাল তাৎপর্য উপলব্ধি করে হাসান হাফিজুর রহমান দৈনিক বাংলার একটি সান্ধ্য সংস্করণ প্রকাশ করেন। বর্তমান কালের টিভিতে স্ক্রল নিউজ অথবা মোবাইল ফোনের নিউজ এলার্ট তখন ছিল না। বেসরকারি সব পত্রিকার (ইত্তেফাক, সংবাদ, বাংলাদেশ অবজার্ভার) তুলনায় হাসান হাফিজুর রহমানের সুযোগ্য ও নিরপেক্ষ সম্পাদনায় দৈনিক বাংলা সরকারি পত্রিকা হলেও তার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং পাঠকচাহিদা ছিল বেশি। এসব গুরুত্ব বুঝে সান্ধ্য সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

কিন্তু তার পরিণতি হয়েছিল খারাপ। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। পরদিনই হাসান হাফিজুর রহমানকে তার পদ থেকে সরিয়ে কবি শামসুর রাহমানকে করা হয় দৈনিক বাংলার সম্পাদক। কিছুকাল পরে হাসান হাফিজুর রহমানকে মস্কোর দূতাবাসে একটি চাকরি দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একটি সময়োচিত সঠিক সম্পাদনা সিদ্ধান্ত (এডিটোরিয়াল জাজমেন্ট)-এর জন্য হাসান হাফিজুর রহমানকে আওয়ামী আমলে এভাবে দণ্ডিত হতে হয়েছিল।

আরো পরে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলে হাসান হাফিজুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য সংকলন সম্পাদনা করতে। হাসান হাফিজুর রহমান নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৮ খণ্ডে প্রকাশিত প্রথমে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক এবং পরে হাক্কানী পাবলিশার্স কর্তৃক (সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি কর্তৃক নয়)। এ বইটি বোধগম্য কারণেই আওয়ামী সরকার ও সমর্থক দ্বারা উপেক্ষিত হয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র পরিবেশকের স্টেটাস প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী তবু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বেশি প্রামাণ্য প্রকাশনাটিকে অবহেলিত রেখেছে।

বলা বাহুল্য, এর কারণ হাসান হাফিজুর রহমান চিহ্নিত হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান তথা আওয়ামী লীগের অপ্রিয়ভাজন রূপে এবং জিয়াউর রহমান তথা বিএনপির আস্থাভাজন রূপে।

সেই সমস্যাটি বর্তমান সময়ে আরো গুরুতর হয়েছে। পঞ্চাশের দশকে বাংলা বিভাগের ছাত্র হাসান হাফিজুর রহমান ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমার সিনিয়র হলেও বিভিন্ন কারণে আমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।

জামালপুরে তার পরিবার ছিল সমৃদ্ধিশালী। তিনি বন্ধু বৎসল ছিলেন। মধুর ক্যান্টিনে অনেকেই তার একাউন্টে খেত এবং বিল পাচশ টাকার বেশি ওঠার পরে তিনি সবুজ পাচশ টাকার নোটে অন একাউন্ট পেমেন্ট করতেন। আমি নিজেও তাই করতাম। পার্টটাইম সাংবাদিকতা, স্কলারশিপ ও রেডিওতে গিটার প্রোগ্রাম করায়, আমি সচ্ছল ছাত্র ছিলাম এবং পাচশ টাকার সবুজ নোটে মধুর বিলের আংশিক পেমেন্ট করতাম। সেটি তিনি লক্ষ্য করেছিলেন এবং সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলেন। বলেছিলেন, আপনার সঙ্গে আমি একটা অদ্ভুত মিল দেখতে পাচ্ছি।

বয়সে ছোট এবং জুনিয়র ছাত্র হলেও হাসান বন্ধু সম্পর্ক স্থাপনে এগিয়ে এসেছিলেন যদিও তিনি সব সময় আমাকে আপনি বলে সম্বোধন করতেন।

ঢাকায় তিনি ফজলুল হক হলের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রায়ই থাকতেন তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোহাম্মদ সুলতান-এর প্রকাশনী দোকান পুথিপত্র-র পেছন দিকে একটি ছোট ঘরে। এখন যেখানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অবস্থিত তার কাছে এই দোকানটি ছিল। দোকানটির দেয়াল ছিল বাশের চাটাইয়ের এবং ছাদ ছিল টিনের। পুথিপত্র থেকে মার্চ ১৯৫৩-তে প্রকাশিত হয়েছিল হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলন। কভার, সিংগল লাল কালারের, একেছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম এবং ভেতরে ছবি একেছিলেন মুর্তজা বশীর ও অন্যরা। বইটি মুসলিম লিগ সরকারের রোষানলে পড়লে হাসান আত্মগোপন করেন আমার ঘরে, উমেশ চন্দ্র দত্ত রোড, বকশিবাজারে।

আমাদের বাড়ির দেয়াল ঘেষে ছিল ঢাকা সেন্ট্র্রাল জেলের কৃষিক্ষেত। সেখানে জেল বন্দিদের কৃষিকাজ করতে হতো এবং সেটা আমার ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যেত। একদিন সেই দৃশ্য দেখিয়ে হাসানকে বলেছিলাম, আপনার তো থাকার কথা ছিল দেয়ালের ওই দিকে, জেলখানায়।

হাসান উত্তর দিয়েছিলেন, না। আমি জেলে থাকতে চাই না। জেলে থাকলে কাজ করব কি করে?

বস্তুত হাসান ছাত্র অবস্থা থেকেই কাজ পাগল এবং উদ্যোগী ছিলেন বলে তিনিই ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক প্রথম লেখাগুলোর একটি সংকলন করেন। ছাত্রজীবন শেষে তিনি জগন্নাথ কলেজে কিছুকাল শিক্ষকতা করেন। তখন আমার পিতা সাইদুর রহমান ছিলেন ওই কলেজের পৃন্সিপাল। এরপরে তিনি দৈনিক পাকিস্তান-এ সাংবাদিকতায় যোগ দেন। স্বাধীনতার পরে দৈনিক পাকিস্তানের নাম বদলে গিয়ে হয় দৈনিক বাংলা। হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন সম্পাদক এবং অন্য সব পত্রিকার তুলনায় দৈনিক বাংলা হয় আধুনিক চরিত্র ও লে-আউটের।

ফেব্রুয়ারি ১৯৭২-এ আমি দেশে ফিরে আসার দুই মাস পরে জহুরুল ইসলাম গ্রুপের ফাইনান্স ডিরেক্টর রূপে যোগ দিই। মতিঝিলে মেইন রোডে আমাদের অফিস (যেটি টয়োটা ভবন নামে পরিচিত ছিল) থেকে অল্প দূরে ছিল ডিআইটি মোড়ে দৈনিক বাংলা ভবন। আমার কাজের শেষে প্রায়ই যেতাম ওই ভবনের চার তলায় হাসানের অফিসে। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা-র জন্য একটা ম্যানেজমেন্ট ইনফর্মেশন সিসটেম তৈরি করে দিতে। এই কারণে তার সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। উল্লেখ করা যেতে পারে স্বাধীনতার পরে হাসানের উদ্যোগে শাহাদত চৌধুরীর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক বিচিত্রা প্রকাশিত হয়েছিল এবং সেটি জনপ্রিয় হয়েছিল।

১ জানুয়ারি ১৯৭৩-এ পুলিশের গুলি চালনার রিপোর্ট দৈনিক বাংলার সান্ধ্য সংস্করণে প্রকাশিত হওয়ার পরদিন প্রধানমন্ত্রী তাকে ডেকে পাঠান হেয়ার রোডে তৎকালীন অফিস-কাম-বাসভবন সুগন্ধা-তে। সম্পাদক পদ থেকে ট্রান্সফার হওয়ার দুঃসংবাদটি পেয়ে হাসান ছুটে আসেন কাছেই ইস্কাটন গার্ডেনে আমার বাড়িতে।

তখন শীতের বিকাল। সংবাদটি জানিয়ে চিন্তিত মুখে হাসান জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা, কমপেনসেট মানে কি?

কমপেনসেট মানে তো ক্ষতিপূরণ করা। উত্তর দিলাম।

সেটা তো জানি। কিন্তু আমাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিভাবে আমাকে কমপেনসেট করবেন? আমি সেটা বোঝার চেষ্টা করছি।

তিনি আপনাকে একসাকটলি কি বলেছেন? প্রশ্ন করলাম।

তিনি বলেছেন, তুমি চিন্তা করো না। আমি তোমাকে কমপেনসেট করব।

কোনো টাকা দিয়ে তিনি আপনার ক্ষতিপূরণ করবেন না। খুব সম্ভবত আপনাকে আরেকটা ভালো চাকরি দেবেন। আমি তাকে আশ্বাস দিলাম।

তাই হয়েছিল। তৎকালীন সভিয়েট ইউনিয়নে, মস্কোতে বাংলাদেশের দূতাবাসে হাসান হাফিজুর রহমানকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীকালে মস্কো থেকে হাসান এসেছিলেন লন্ডন সফরে। তখন আমি লন্ডনে ছিলাম এবং তিনি ফিঞ্চলিতে আমার অতিথি ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে একদিন তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, মস্কো এপয়েন্টমেন্ট আমার জন্য কোনো কমপেনসেশন হয়নি। আমি তো একটা আধুনিক ও জনপ্রিয় পত্রিকার সম্পাদনা করতে চেয়েছিলাম।

হাসান হাফিজুর রহমানের অকাল প্রস্থানের পর দৈনিক বাংলা হয়ে যায় স্রেফ সরকারি মুখপত্র এবং জনপ্রিয়তা হারায় দ্রুত। এর বহু বছর পরে দৈনিক বাংলা প্রকাশ হয়ে যায় বন্ধ।

হাসান হাফিজুর রহমান (১৪.৭.১৯৩২-১.৪.১৯৮৩) এবং হুমায়ুন আহমেদ (১৩.১১.১৯৪৮-১৯.৭.২০১২) তাদের সৃজনশীল জীবনের প্রায় চার দশকে (১৯৭৩-২০১২) যে সমস্যার মুখে পড়েছিলেন সেই সমস্যা আজো আছে। আওয়ামী লীগের কোনো অতীত এবং বর্তমান শীর্ষ নেতার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা যদি কোনো লেখক করেন তাহলে তিনি হবেন বিরাগভাজন, সন্দেহভাজন এবং হয়তো বা নজরদারিভাজন। ভিন্ন মত প্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করণের বিষয়ে কেউ যদি লেখেন তাহলে তিনি আওয়ামী লীগ দ্বারা চিহ্নিত হতে পারেন নিম্নভাবে:

এক. শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড বিরোধী এই লেখক।

দুই. যুদ্ধ অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড বিরোধী এই লেখক।

তিন. সুতরাং নিশ্চয়ই রাজাকার ও দেশদ্রোহী এই লেখক।

বাংলাদেশে বহু লেখক কলামিস্ট, সম্পাদক ও টিভি টকশো বক্তাদের বিবেকের সংকট এখানেই।

তাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুদণ্ড বিরোধী হলেও আওয়ামী নির্যাতনের ভয়ে সেই মত প্রকাশ করতে তারা সাহাসী হন না। এদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, আগে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের এবং যুদ্ধ অপরাধীদের ফাসি হয়ে যাক, তারপর মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বলা যাবে।

অর্থাৎ, প্রকৃতপক্ষে এরা মৃত্যুদণ্ডের পক্ষপাতী।

আওয়ামী ভীতি ছাড়াও মালিকপক্ষের নীতিও লেখককে মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে নিশ্চুপ থাকতে প্রভাবিত করতে পারে। দৈনিক প্রথম আলো এবং দি ডেইলি স্টার-এর কর্ণধার লতিফুর রহমানের কিশোরী কন্যা শাজনীনকে (১৫) হত্যার দায়ে অভিযুক্ত পাচ ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। এই পাচ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত হয়তো এই দুটি পত্রিকা মৃত্যুদণ্ড বিরোধী কোনো সবল ভূমিকা রাখবে না। যদিও এক সময়ে প্রথম আলোর সেøাগান ছিল বদলে যাও, বদলে দাও – তবু তারা মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে জনমত বদলাতে এগিয়ে আসবে না। দুঃখজনক।