বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশে!

Monaco_Monte_Carlo
প্যারিস, নাকি মনাকো? মন বলছে মনাকো। প্যারিস শিল্প-সাহিত্যের তীর্থভূমি হতে পারে কিন্তু মনাকোর মহিমা অন্যত্র।

ভ্যাটিকান সিটির পরে, ফ্রান্সের প্রায় পেটের ভেতরে সেঁধিয়ে থাকা এই দেশটিই পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম। জেমস বন্ডের প্রিয় আখড়া মন্টে কার্লো ক্যাসিনো এই দেশে। হলিউড অভিনেত্রী গ্রেস কেলি এই দেশেরই যুবরাজকে বিয়ে করে শোরগোল ফেলেছিলেন সেই ১৯৫৬ সালে। এর বাইরে মনাকো মূলত বিখ্যাত কার রেসিং গ্রাঁ প্রি আর টেনিসের জন্য। আর সবচেয়ে বড় কথা, কান থেকে প্যারিসে যেতে বিমানেই লাগে ঘণ্টা দুয়েক। সেখানে মনাকোর মতো আস্ত একটা নতুন দেশে ট্রেনে মাত্র ৪৫ মিনিট। তো মনাকোই সই। হোক না মোটে এক বেলার ঝটিকা সফর।

সময় ভরদুপুর। কান থেকে ট্রেনযোগে ‘এলেম নতুন দেশে’। মনাকোর ঝকমকে নীল আকাশে মেঘের চিহ্ন বলতে নেই। ট্রেন স্টেশন থেকে বেরোবার পথেই মিলল গ্রেস কেলির স্মৃতি। একটা মনুমেন্টের সঙ্গে বাঁধানো সাদাকালো ছবিতে প্রিন্স তৃতীয় রেঁনর সঙ্গে হলিউড অভিনেত্রী। গ্রেস কেলির জীবন নিয়ে তৈরি ছবি গ্রেস অব মনাকো ছিল ৬৭তম কান উৎসবের উদ্বোধনী ছবি।

মনাকো যাওয়ার সুযোগও এসেছে গত মে মাসের কান চলচ্চিত্র উৎসবে যোগদানের সুবাদেই।

চল মন মনাকো

ভরদুপুরবেলায় স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি রাস্তায় মানুষজন খুব নেই। মনাকোতে শুরুতেই যেটি নজর আসবে, সেটি উঁচু উঁচু পাহাড়ের ঢালে মনোরম সব বাড়ি। সারা বিশ্বের ধনকুবেরদের অন্যতম পছন্দের জায়গা এই মনাকো। মনাকোর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে যতই তাদের সমৃদ্ধ জাদুঘর নিয়ে গর্ব করুক, মনাকোর মূল পরিচিতি মন্টে কার্লো ক্যাসিনোর জন্যই। রেলস্টেশন পেরোতেই চোখে পড়ল কার রেসিং ট্র্যাক। ওপরে ফিরেলির বড়সড় বিলবোর্ড। পাশে ডাঁই করে রাখা টায়ারের সারি। কদিন আগেই এখানে আয়োজন করা হয়েছে ফর্মুলা ওয়ান গ্রাঁ প্রি ২০১৪। চোখের সামনে দিয়ে শাঁই করে চলে যায় ঝাঁ চকচকে স্পোর্টস কার। সেই দৃশ্য এক নজর দেখার জন্য হামলে পড়ে রাজ্যের মানুষ। টিকিটের দামও বেশ চড়া।

monte-carlo-circuit-monaco-formula-1-grand-prix-picures-03

মন্টে কার্লো ক্যাসিনোর সামনে গিয়ে কার রেসিং দেখতে না পারার দুঃখ খানিক ঘুচল। গুনে গুনে ছয়খানা দুর্দান্ত দেখতে স্পোর্টস কার রাখা ক্যাসিনোর সামনে। পর্যটকদের ভিড় লেগে গেছে সেগুলো দেখতে। গাড়ির সামনে ছবি ওঠানোর সূত্রেই আলাপ নরওয়ের দুই তরুণ সাংবাদিকের সঙ্গে। ওঁরাও কান উৎসব শেষ করে আমার মতো এসেছেন মনাকো ঘুরতে। তাঁদের বদান্যতায় দু-দুটো ঝকমকে ফেরারি আর একটা ম্যাকলারেন গাড়ির সঙ্গে ছবি ওঠানো হয়ে গেল। ক্যাসিনোর সদর দরজায় উর্দি পরা অভ্যর্থনাকারীরা দাঁড়িয়ে। ভেতরে ছাদে ঝুলন্ত ঝাড়বাতি থেকে দেয়ালের মনোরম কারুকাজ। ঐতিহ্য আর আভিজাত্য চুইয়ে পড়ছে সবখানে। সাধে কি আর এটা জেমস বন্ডের আস্তানা!

বিলিয়ার্ড টেবিল আর স্লট মেশিনগুলোও মনে করিয়ে দেবে জেমস বন্ডের কথাই। ক্যাসিনো রয়াল, গোল্ডেন আই, নেভার সে নেভার অ্যাগেইন-এর মতো বন্ড সিরিজের ছবিগুলোর চিত্রায়ণ হয়েছে এই ক্যাসিনোতে। আর জেমস বন্ডের ছবিই যদি সত্যি হয়, তাহলে হয়তো আশপাশেই আছে পাজির পা-ঝাড়া ভিলেনদের দল। ক্যাসিনো মানেই টাকার খেলা, আর টাকার কুমিরেরা সব সময় যে সুবিধের মানুষ হবেন, এমন তো নয়।

Monte-Carlo2

ক্যাসিনো দর্শন শেষে, প্রয়াত প্রাতঃস্মরণীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে স্মরণ। তিনি বলেছিলেন, কোনো জায়গা সম্পর্কে জানতে হলে সবার আগে সেখানকার কাঁচা বাজার আর বইয়ের দোকান ঘুরে আসা জরুরি। কিন্তু ঐশ্বর্য আর প্রাচুর্যের এই দেশে আমাদের চেনা ‘কাঁচা বাজার’ মিলবে কোথায়? তাই শেষমেশ শপিং মলই সই। চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে ভেতরে ঢুকতেই

আবারও সেই ঝাড়বাতি। মনাকো দেশটাজুড়েই দেখা যাচ্ছে ঝাড়বাতির ছড়াছড়ি। আর ঝাড়বাতি জিনিসটা যে কী দামি, সেটা গুলশান ডিসিসি মার্কেট গিয়েও আপনি বুঝতে পারবেন। শপিং মলটা মূলত ইলেকট্রনিকস পণ্যসামগ্রীর। বিশেষ ধরনের এইচডি (হাই ডেফিনিশন) কিছু টিভি দেখালেন দোকানের কর্মীরা। বাংলাদেশি টাকায় দাম লাখ দশেক টাকার কমে নয় কোনোটা। কেনার চেয়ে তাই দেখা উত্তম।
মনাকোর একটা জাদুঘরে ঘুরে আসার শখ ছিল কিন্তু সেই শখ পূরণ হলো না। জাদুঘর খোলা নেই। তাই আরও ঘণ্টা দুয়েক পথেঘাটে ঘুরঘুর। মোটমাট প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার আয়তন বাড়াবাড়ি রকমের ধনী এই দেশটার। কে জানে ঘণ্টা খানেকের হাঁটাহাঁটিতে পুরো দেশটাই পদব্রজে পাড়ি দেওয়া হয়ে গেল কি না!