মৃত্যুদণ্ড দেশে বিদেশে যুগে যুগে: অজানা থাকতে পারে পূর্ণ সত্য

Shafik Rehman শফিক রেহমান

মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে শুধু প্রকৃত সত্যটা জানলেই চলবে না, পূর্ণ সত্যটাও জানতে হবে। আর সেজন্যই আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ে সাক্ষীকে শপথ করতে হয় যে, তিনি সত্য এবং পূর্ণ সত্যটাই বলবেন।বাংলাদেশে বর্তমানে আওয়ামী সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ও আওয়ামী মিডিয়ার সহায়তায় যে ইতিহাস বিকৃতি চলছে তাতে প্রকৃত সত্য এবং পূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠা করা দুষ্কর। তবু সেই চেষ্টা সচেতন নাগরিকদের করতে হবে, বিশেষত কারো মৃত্যুদণ্ডের দাবি যখন সরকারি উদ্যোগে উঠানো হয়।রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক ভিন্নমত প্রকাশ বন্ধ করার লক্ষ্যে সাজানো বিচার বিভাগের কাছে বানোয়াট অভিযোগ পেশ করে সরকার টার্গেটেড ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড আদায় করতে পারে। বিবেকবান নাগরিকদের ওপর তখন দায়িত্ব বর্তায় প্রকৃত সত্য এবং পূর্ণ সত্যটা জানার এবং জানানোর। বিশেষত মানুষ যখন তার নিজস্ব বিশ্বাসে অবিচল থেকে নীতি বিচ্যুত না হয়ে নীতিবিবর্জিত সরকারের বিরুদ্ধে তার একক প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় তখন এই দায়িত্ব পালন হয় আরো জরুরি, আরো দরকারি।

পূর্ণ সত্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা এবং নিজস্ব বিশ্বাসে অটল থাকলে মৃত্যুদণ্ডের ঝুকি যে মানুষকে নিতে হতে পারে সেটা আমি বুঝি পঞ্চাশের দশকে ছাত্র অবস্থায়।

এ প্লেইস ইন দি সান (A Place in the Sun) মুভিটি রিলিজড হওয়ার এক বছর পরেই ১৯৫৩-তে ঢাকায় মুক্তি পায় মন্টগোমারি কিফট অভিনীত আরেকটি মুভি, আই কনফেস (I Confess, আমি স্বীকার করছি)।এ প্লেইস ইন দি সান মুভির কাহিনীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে বিচারকের প্রকৃত সত্যটা জানা উচিত। আর আই কনফেস মুভির কাহিনীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে বিচারকের পূর্ণ সত্যটা জানা উচিত। এ প্লেইস ইন দি সান-এর মতোই আই কনফেসও ছিল একটি জনপ্রিয় সাহিত্যকর্ম নির্ভর। ফ্রেঞ্চ নাট্যকার পল অ্যানথেলম (Paul Anthelme)-এর নাটক, আওয়ার টু কনশেন্সেস (Our Two Consciences, আমাদের দুই বিবেক ১৯০২)-এর ওপর ভিত্তি করে ১৯৩০-এর দশকে যে মুভিটি হয়েছিল সেটা হিচককের নতুন করে বানানো এই মুভির নাম ছিল, আই কনফেস। নায়ক মন্টগোমারি কিফট, নায়িকা অ্যান ব্যাক্সটার এবং ডিটেকটিভ চরিত্রে কার্ল মলডেন।

ঘটনাস্থল : ফ্রেঞ্চভাষী অধ্যুষিত কানাডার কুইবেক শহর। সাসপেন্স বাড়ানোর লক্ষ্যে হিচকক মুভিটি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে বানান। এ প্লেইস ইন দি সান-ও ছিল ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে। ঢাকায় আই কনফেস রিলিজড হয়েছিল ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে তদানীন্তন মুকুল সিনেমা হলে। এখন এটির নাম হয়েছে আজাদ। এ প্লেইস ইন দি সান রিলিজড হয়েছিল তদানীন্তন গুলিস্তান সিনেমা হলে। এখন আর সেই সিনেমা হলটি নেই। সেখানে হয়েছে গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্স।আই কনফেস রিলিজড হবার আগে মুকুল সিনেমা হলে নেক্সট এট্রাকশন বা পরবর্তী আকর্ষণের পোস্টারে একটা স্লোগান দেখে আমি কৌতূহলী হয়েছিলাম। সেই পোস্টারে ছবি ছিল, নায়ক সামনে থেকে নায়িকার মাথা দুই হাতে চেপে ধরে তাকে কি যেন আকুলভাবে বোঝাতে চাইছেন। নায়কের কোটে রিভার্স শাদা অক্ষরে লেখাছিল ইফ ইউ নিউ, হোয়াট হি নিউ, হোয়াট উড ইউ ডু? (If you knew, what he knew, what would you do? যদি তুমি জানতে, সে যা জানতো, তাহলে তুমি কি করতে?)
এই বিজ্ঞাপনী স্লোগানটি আমাকে প্রচণ্ডভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তখন আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ছিলাম। ইকনমিক্সের থিওরির বদলে ওই মুভির স্লোগানে বেশি কৌতূহলী হয়েছিলাম।নায়ক কি জানতো? আমি যদি সেটা জানতাম, তাহলে আমি কি করতাম?নায়ক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই একই সিদ্ধান্ত কি আমিও নিতাম?

আমি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম Ñ মুভি দেখার আগেই! অদম্য কৌতূহলী হয়েছিলাম, নায়ক কি জানতো, সেটা জানতে। আমার দৃঢ়বিশ্বাস এই লেখাটি পড়ার সময়ে আপনারও বিবেকের দ্বন্দ্ব হবে। তাই আপনাদের কৌতূহল মেটানোর জন্য আই কনফেস মুভির কাহিনী সারাংশ নিচে দেওয়া হলো।

কাহিনী সারাংশ
কানাডার জনগোষ্ঠির ২৩% ফ্রেঞ্চ বংশোদ্ভূত এবং এদের প্রায় সবাই কৃশ্চিয়ান ক্যাথলিক। এদের অনেকেই থাকেন কুইবেক সিটিতে যেখানে ক্যাথলিক ধর্মীয় বিশ্বাস গভীরভাবে প্রোথিত। এই শহরে সেইন্ট মেরিজ চার্চে ধর্ম প্রচারে নিয়োজিত ছিল এক তরুণ যাজক, ফাদার মাইকেল লোগান (মন্টগোমারি কিফট)। চার্চ ও তার রেসিডেনশিয়াল কোয়াটার্স দেখাশোনা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে ফাদার লোগান নিয়োগ করেছিল জার্মানি থেকে আসা মধ্যবয়সী দম্পতি Ñ স্বামী অটো কেলার ও তার স্ত্রী আলমাকে। কেয়ারটেকার ও হাউসকিপার এই দম্পতিও থাকত চার্চে তাদের নির্ধারিত কোয়ার্টার্সে। উপরি আয়ের জন্য অটো কেলার বাইরে পার্টটাইম মালির কাজ করত ভিলে নামে এক উকিলের বাড়িতে। ধান্ধাবাজ মানুষ হিসেবে ভিলের দুর্নাম ছিল।

মুভির সূচনায় দেখা যায় এক রাতে পাদরির শাদা কলার ও লম্বা কালো পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি দ্রুত হেটে বেরিয়ে যাচ্ছে ভিলে-র বাড়ি থেকে। ভিলে তার বাড়িতে মৃত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিল।

এর একটু পরেই দেখা যায় অটো কেলার তার পাপ লাঘবের জন্য সেই রাতেই নির্জন চার্চে ফাদার লোগানের কাছে গিয়ে স্বীকার করছে, চুরি করতে গিয়ে দুর্ঘটনাক্রমে সে খুন করে ফেলেছে ভিলে-কে। কেলার তার স্ত্রী আলমাকেও একই কথা বলে। এতে আলমা ভীত হলে কেলার তাকে আশ্বস্ত করে, ফাদার লোগান কখনোই বিষয়টি পুলিশকে বলবে না কারণ চার্চে স্বীকারোক্তির মাধ্যমে পাওয়া কোনো তথ্য প্রকাশ করা তাদের ধর্মে নিষিদ্ধ।

পরদিন সকালে কেলার তার নিয়মিত ডিউটিতে ভিলের বাড়িতে যায় এবং ভিলের মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশকে জানায়। এদিকে চার্চে আলমা-র কাছে ভিলের মৃত্যুসংবাদ শোনে ফাদার লোগান। আলমা বলে তার স্বামী ভিলের বাড়িতে গিয়েছে। ফাদার লোগান তখন দ্রুত অকুস্থলে যায়। পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

এরপর দুজন তরুণী থানায় গিয়ে ইন্সপেক্টর ল্যারুকে বলে, তারা গত রাতে ভিলের বাড়ি থেকে একজন পাদরিকে বের হয়ে যেতে দেখেছিল। ইন্সপেক্টর ল্যারু তখন ফাদার লোগানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু খুন বিষয়ে লোগান কোনো তথ্য দিতে রাজি হন না। ইন্সপেক্টর ল্যারু তখন লোগানকেই খুনি রূপে সন্দেহ শুরু করেন। তার সব তদন্ত কাজ তখন লোগানকে ঘিরে হতে থাকে। ল্যারু একজন ডিটেকটিভকে দায়িত্ব দেন সার্বক্ষণিকভাবে লোগানকে ফলো করার। সরকারি উকিল রবার্টসনকেও বিষয়টি জানান ল্যারু।

রবার্টসন তখন একটি পার্টিতে ছিলেন। এই পার্টি দিয়েছিল রুথ ও তার স্বামী পিয়ের। পিয়ের ছিলেন কুইবেক সংসদের একজন সদস্য। রবার্টসন যখন ল্যারুর সঙ্গে লোগানের বিষয়ে কথা বলছিলেন তখন সেটা শুনে ফেলে রুথ।

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রুথ তখনই স্থির করে লোগানকে যে খুনের দায়ে সন্দেহ করা হচ্ছে সেটা তাকে অবিলম্বে জানাতে হবে।

পরদিন রুথ যায় লোগানের সঙ্গে দেখা করতে। দেখা হওয়ার পরে বাড়িতে ফেরার পথে রুথকে ফলো করে ল্যারুর ডিটেকটিভ। রুথের পূর্ণ পরিচয় সম্পর্কে এই ডিটেকটিভ নিশ্চিত হয়।

ইন্সপেক্টর ল্যারু তখন রুথ এবং লোগানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বিভিন্ন ফ্যাশব্যাকের মাধ্যমে রুথ বুঝিয়ে বলে, তাদের দুজনার মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল।

রুথ বলে, লোগান ছিল তার শৈশবের বন্ধু। যৌবনে তারা পরস্পরের প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু সরকারি নির্দেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লোগানকে চলে যেতে হয়। তখন লোগানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, একপর্যায়ে রুথ বিয়ে করেছিল পিয়েরকে।

যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পরে লোগান দেখা করতে চায় রুথের সঙ্গে। একদিন তারা একটা দ্বীপে দেখা করে। হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি এসে পড়ায় তারা দুজনা বাগানের এক কোনায় একটা গাজেবো অর্থাৎ বাগানঘরে আশ্রয় নেয়। রুথ ও লোগান সেই রাতে সেই বাগানঘরে কাটাতে বাধ্য হয়। আর সেখানেই সকাল বেলায় তাদের দেখে ফেলে ভিলে।

রুথ যে বিবাহিতা সেই রূঢ় সত্যটা মেনে নিয়ে লোগান আজীবন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে পাদরি হয়।

ইতিমধ্যে ভিলে ট্যাক্স দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য সে রুথের সঙ্গে দেখা করে তার স্বামী পিয়েরের সাহায্য চায়। কিন্তু রুথ এতে রাজি হয় না। তখন ভিলে ব্ল্যাকমেইলের হুমকি দিয়ে বলে, যদি পিয়ের তাকে সাহায্য না করে, তাহলে রুথ ও লোগান যে এক রাত বাগানঘরে কাটিয়েছিল সেটা সবাইকে জানিয়ে দেবে।

ভিলেকে সামলাতে কি করতে হবে সে বিষয়ে কথা বলার জন্য এক রাতে রুথ দেখা করে লোগানের সঙ্গে। তারা স্থির করে পরদিন সকালে ভিলের সঙ্গে দেখা করবে।

কিন্তু সেই সেই রাতেই ভিলে খুন হয়।

রুথ যে লোগানের সঙ্গে খুনের রাতে ছিল, সেটা লোগানকে একটা অ্যালাবাই দিলেও, তাতে সন্তুষ্ট হন না ল্যারু। তাদের পারস্পরিক দেখা হবার পরে ভিলে যে খুন হয়েছিল সেই প্রমাণ ল্যারুর কাছে ছিল। তাছাড়া রুথের কাছে ভিলে কর্তৃক তার (রুথের) ব্ল্যাকমেইল হবার বিষয়টি জানার পর ল্যারু সিদ্ধান্তে আসেন ভিলে-কে খুন করার একটা মোটিভ ছিল লোগানের।

লোগান যখন বুঝতে পারে, খুনের দায়ে তাকে গ্রেফতার করা হবে তখন সে নিজেই ল্যারুর অফিসে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে।

ইতিমধ্যে পাদরির পোশাকে রক্ত মাখিয়ে অটো রেখে দেয় লোগানের আলমারিতে।

লোগানের বিচার শুরু হয়। অটো মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় যে, সে দেখেছিল খুনের রাতে চার্চে লোগানকে ফিরে এসে উদভ্রান্তভাবে চলাফেরা করতে।
মামলা চলার সময়ে লোগান তার অবস্থানে অটল থাকে। আদালতে তীব্র জেরার মুখেও সে কখনোই বলে না, আসল খুনি অটো এবং সেই রাতেই অটো অপরাধ স্বীকার করেছিল তার কাছে। দোষী প্রমাণিত হবার ঝুকি সত্ত্বেও লোগান তার ধর্মীয় অঙ্গীকার থেকে একবারও বিচ্যুত হয় না। লোগান বারবার বলে, সে (লোগান) খুন করেনি। এটা ছিল সত্য Ñ কিন্তু অর্ধ সত্য। লোগান কখনোই বলে না অটো খুন করেছিল- যেটা ছিল পূর্ণ সত্য।

অল্প ব্যবধানে জুরি রায় দেয় লোগান নির্দোষ।

ইতিমধ্যে আদালত প্রাঙ্গণে বহু মানুষের ভিড় হয়েছিল। রায়ের পর লোগান যখন আদালত থেকে বেরিয়ে আসে তখন ক্ষুব্ধ জনতা তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। তারা নিশ্চিত ছিল লোগানই খুনি। তারা ক্ষুব্ধ হয়েছিল একজন পাদরি ধর্মীয় অনুশাসন ভেঙ্গে কেন পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছিল, সেটা ভেবে। লোগানের প্রতি তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। এক পর্যায়ে লোগানের অসম্মান অটোর স্ত্রী আলমা আর সহ্য করতে পারে না। সে চিৎকার করে বলে ওঠে, ফাদার লোগান নয় Ñ তার স্বামী অটোই খুনি।

ধরা পড়ে গিয়েছে বুঝে আলমাকে গুলি করে অটো পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

অবশেষে ইন্সপেক্টর ল্যারু জানতে পারেন অটোই খুনি।

ল্যারু তার পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে কোণঠাসা করে ফেলেন অটোকে এবং কৌশলে তাকে বাধ্য করেন স্বীকারোক্তি দিতে। কিন্তু তা সত্বেও লোগানকে দেখে অটো তাকে গুলির চেষ্টা করে। তার আগেই এক শার্পশুটার পুলিশের গুলিতে মারাত্মক আহত হয় অটো। অটোর মৃত্যুর আগে লোগান তার মাথা কোলে তুলে নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দেয়।

অজানা থাকতে পারে পূর্ণ সত্য

এখন পাঠককে প্রশ্ন করা যেতে পারে, যদি তুমি জানতে, সে যা জানত, তাহলে তুমি কি করতে?

ইফ ইউ নিউ, হোয়াট হি নিউ, হোয়াট উড ইউ ডু?

যদি তুমি জানতে, লোগান যা জানত, তাহলে তুমি কি করতে?

তুমি কি আদালতে জেরার মুখে বলে দিতে অটোই খুনি?

ভিলেকে সদ্য খুনের পর অটো যখন চার্চে ফিরে গিয়ে তার পাপ লাঘবের জন্য কৃশ্চিয়ান রীতি অনুযায়ী লোগানের কাছে গিয়ে কনফেস করে বা স্বীকার করে, তখন অটো জানত না যে ভিলের স্ত্রী রুথের সঙ্গে লোগানের পূর্বপরিচয় ছিল। আর লোগানও জানত না যে, অটো যে খুনি সেই সত্য জানাটাই তার নিজের বিপদ টেনে আনবে। এই জানাটাই তার কাল হয়েছিল। লোগান এটাও জানত যে অটো যখন তার ধর্মবিশ্বাস থেকে লোগানকে বিশ্বাস করে কনফেস করেছিল তখন সে আস্থা রেখেছিল লোগান কখনোই সেটা প্রকাশ করবে না।

কিন্তু লোগান যখন ভিলে হত্যায় সন্দেহভাজন হয়ে পড়ল তখন সে বিবেকের দংশনে পড়ে যায়। আত্মরক্ষার জন্য সে কি আদালতে পূর্ণ সত্যটা প্রকাশ করে দেবে? নাকি ধর্মবিশ্বাস রক্ষার জন্য আংশিক সত্যটাই শুধু বলবে?

লোগান বেছে নিয়েছিল দ্বিতীয় পথ। লোগান বলেছিল সে (লোগান) খুনি নয়। এটা ছিল আংশিক সত্য। কিন্তু লোগান বলেনি অটোই খুনি, যেটা ছিল পূর্ণ সত্য।

এই পথ বেছে নেওয়ার ফলে জুরিরা, যারা পূর্ণ সত্য জানতেন না, তারা লোগানকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে পারতেন। ফলে বিচারক একটা অন্যায় মৃত্যুদণ্ড দিতে পারতেন লোগানকে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, লোগান ছিল বোকা।

কিন্তু কেউ কেউ বলবেন, কিছু মানুষ যে তার বিশ্বাসে অটল থাকতে পারে সেটাও সত্য। এসব মানুষ বোকা নয় Ñ এরা বিশ্বাসী।

মুভির কল্পিত কাহিনীতে সেই অন্যায়টি ঘটাননি স্কৃপ্ট রাইটার দুজন, টাবোরি ও আর্চিবল্ড।

কিন্তু বাস্তবে তো এমন ঘটনা ঘটতেও পারে।

ইংরেজিতে কথাই আছে, ট্রুথ ইজ স্ট্রেইনজার দ্যান ফিকশন (Truth is stranger than fiction, কল্পিত কাহিনীর চাইতে সত্যটা বেশি অদ্ভুত)।

আর সেই কারণেই বিচারের সময়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। যেন নিরপরাধ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় না। কিন্তু সর্বোচ্চ সতর্ক থাকলেও নিরপরাধ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে, এমন ঝুকি থেকেই যাবে। আর সেই ঝুকি শতকরা একশ ভাগ এড়ানোর জন্য মৃত্যুদণ্ডই নিষিদ্ধ করা উচিত।

আই কনফেস মুভি দেখে আমি সেই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম।

মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে ১০টি সেরা মুভি
এই লেখায় মৃত্যুদণ্ড সম্পৃক্ত কয়েকটি মুভির উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও আরো মুভি আছে যেসব দেখলে মানবতা বোধ বাড়বে। নিচে একটি লিস্ট দেওয়া হলো :

১. পাথস অফ গ্লোরি (Paths of Glory) : স্ট্যাপলি কুবরিক পরিচালিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কোর্ট মার্শালে সেনাসদস্যদের বিচারের কাহিনী। উইনস্টন চার্চিলের মতে এই মুভিটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো ফুটিয়ে তুলেছিল।

২. দি থিন ব্লু লাইন (The Thin Blue Line) : টেক্সাসে এক ব্যক্তির অভিযুক্ত ও গ্রেফতার হবার একটি ডকুমেন্টারি মুভি। সে খুনি ছিল না। কিন্তু বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল।

৩. দি গৃণ মাইল (The Green Mile) : স্টিফেন কিং রচিত উপন্যাস নির্ভর মুভিতে দুজন তরুণীকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হয় এক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান। সে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে কনডেমড সেলে যায়। কিন্তু নির্দোষ জানা সত্ত্বেও তাকে বাচানোর কোনো পথ পাওয়া যায় না।

৪. পিয়েরপয়েন্ট : দি লাস্ট হ্যাংম্যান (Pierrepoint : The Last Hangman) : ১৯৩২ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত বৃটেনের সরকারি জল্লাদ এলবার্ট পিয়েরপয়েন্টের জীবনী নির্ভর। সে চার শতাধিক ব্যক্তিকে ফাসিতে ঝুলিয়েছিল।

৫. কাপোট (Capote) : আমেরিকান ক্রাইম লেখক ট্রুম্যান কাপোট ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন দণ্ডিত খুনি পার্সি স্মিথ-এর। সেই ইন্টারভিউ ভিত্তিক কাপোটের উপন্যাস ইন কোল্ড ব্লাড (In Cold Blood) হয় এই মুভির কাহিনী।

৬. ডেড ম্যান ওয়াকিং (Dead Man Walking) : তরুণ-তরুণী যুগলকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তি যখন কনডেমড সেলে তখন সে তার শেষ দিনগুলোতে একজন ধর্মপরায়ণ নারীর সাহায্য চায়।

৭. দি স্টার চেম্বার (The Star Chamber) : বিচার ব্যবস্থার ফাকফোকর দিয়ে যেসব অপরাধীরা বেরিয়ে যায় তাদের বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য কিছু বিচারক একটি বিশেষ আদালত করেছিলেন।

৮. শকার (Shocker) : একজন সিরিয়াল খুনি ডিল করেছিল শয়তানের সাথে। সে খুন করেই চলতে পারে।

৯. ট্রু ক্রাইম (True Crime) : একজন সাংবাদিককে ডিউটি দেওয়া হয়েছিল দণ্ডিত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে রিপোর্ট করতে। সেই সাংবাদিক যখন বুঝতে পারে দণ্ডিত ব্যক্তি নিরপরাধ তখন সে সত্যটা আবিষ্কারে তৎপর হয়।

১০. দি লাইফ অফ ডেভিড গেইল (The Life of David Gale) : রাষ্ট্র যখন একজন নিষ্পাপ ব্যক্তিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় তখন কি হতে পারে সেটা দেখান হয়েছে এই মুভিতে।