গোলাকার ঈশ্বর, কয়েকজন আস্তিক ও একজন নাস্তিক

তৃতীয় শতকে রচিত Corpus Hermeticum-এর একটি বাক্য ধার করে দ্বাদশ শতকের ফরাসী ধর্মতাত্ত্বিক এঁলা দ্য লিলে একবার বলেছিলেন যে God is an intelligible sphere অর্থাৎ ‘ইশ্বর হচ্ছেন এক বোধগম্য গোলক’। ধর্মতাত্ত্বিক দার্শনিকদের খাঁচা থেকে এই ধারণাটিকে বের করে লাতিন আমেরিকার এই প্রজন্মের লেখক হুয়ান বিয়োরো যিনি স্পানঞলভাষী ফুটবলামোদীদের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত, তিনি প্রায় প্রতিধ্বনি করেই এ যুগে এসে ঘোষণা দিলেন: ‘ঈশ্বর গোলাকার (Dios es redondo)’। তবে প্রতিধ্বনির মতো শুনালেও মহাবিশ্বের গোলাকার পরিমন্ডল থেকে আত্মসাৎ করে একই ঈশ্বরকে তিনি ছড়িয়ে দিলেন ফুটবলের মাঠে। জয়পরাজয়ের এই ঈশ্বরের নাম ‘ফুটবল’।

ফুটবল নিয়ে মানুষের প্রবল মত্ততা, উম্মাদনা লক্ষ্য করলে হুয়ান বিয়োরোর এই অভিধাকে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। কেবল হুয়ানই নন, লাতিন আমেরিকার একালের প্রায় সব সেরা লেখকই ফুটবল দ্বারা কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত। হুয়ানের মতো ফুটবলকে তারা ‘ইশ্বর’ না ভাবলেও এর দোর্দন্ড প্রতাপকে তারা এড়াতে পারেননি। কেউ কেউ তো রীতিমত ফুটবলের প্রবল অনুরাগী।

জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের কথাই বোধহয় সবাই প্রথমে স্মরণ করবেন ফুটবল বিষয়ে তার ভাবনা ও মন্তব্যের কারণে । ফুটবল আর বেসবলের তিনি এতই অনুরাগী ছিলেন যে ছোট্টবেলা চামড়ার ফুটবলের পরিবর্তে ত্যানার গোলক বানিয়ে খেলেছিলেন লাতিন আমেরিকার অসংখ্য বিত্তহীন কিশোরের মতো। তার আত্মজীবনী যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন কম করে হলেও বিশবার ফুটবল প্রসঙ্গটি এসেছে। আত্মজীবনীর এক জায়গায় তিনি জানিয়েছেন যে, ভালো গোলরক্ষক পর্যন্ত হয়েছিলেন তিনি। একবার ছুটন্ত বল ধরতে গিয়ে তলপেটে বেশ ব্যাথাও পেয়েছিলেন। সাংবাদিক জীবনে ফুটবল খেলা নিয়ে লিখেছেনও পত্রপত্রিকায়। ব্রাজিলিয়ান খেলোয়ার এলেনো দে ফ্রেইতাসের দক্ষতায় চমৎকৃত হয়ে একবার তিনি বলেছিলেন এলেনোর পরিমাপ ক্ষমতা এবং অনুসন্ধানী শান্ত গতিবিধি গোয়েন্দা উপন্যাসের কোনো লেখকের বৈশিষ্টের মতো।

মার্কেসের বন্ধু, পরে শক্রু হিসেবে বিবেচিত লেখক মারিও বার্গাস যোসাও ফুটবলের এক মহাপ্রেমিক। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে খেলেছেন্ও একটি ফুটবল টিমের পক্ষে। এমনকি তিনি যখন লাতিন আমেরিকার প্রথম সারির ঔপন্যাসিক ও গল্পকার হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত তখনও তিনি ফুটবলের প্রবল আকর্ষণ এড়াতে পারেন নি। ৮২ সালে স্পানঞায় যখন বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় তখন তিনি ফুটবল বিষয়ে লেখার জন্য প্রবল আবেগ নিয়ে ছুটে গেছেন বার্সেলোনার মাঠে। আর ইনিই ফুটবল নিয়ে সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাসকে দেখেছিলেন সেই দৃষ্টিকোন থেকে যা একসময় কেবল ধর্মীয় উপলক্ষ্যেই মানুষ প্রকাশ করতো বেপরোয়া আকর্ষণ ও উন্মত্ততায় তাড়িত হয়ে। কিন্তু আজকের দুনিয়ার মানুষ ফুটবলের জন্য যে প্রগায় আবেগ ও মবিয়াপ্রবণ অভিব্যক্তিকে তুলে ধরে তা প্রায় যুক্তিরহিত এক মানসিক অবস্থারই সমকক্ষ। আর তাই বার্গাস যোসার দ্বিধাহীন উক্তি হচ্ছে:“ফুটবল হচ্ছে ঈশ্বর-নিরপেক্ষ(Laica) এক ধর্ম। আগের যুগে কেবল ধর্মগুলোই এই ধরনের অযৌক্তিক ও সম্মিলিত অভিব্যক্তিকে তুলে ধরতো। আর এখন, একদা যা ছিলো ধর্মের আদিরূপ তা আজ হয়ে উঠেছে আমাদের কালের এক ঈশ্বর-নিরপেক্ষ ধর্ম।”

ফুটবল নিয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একবার বলেছিলেন যে:“ভালো ফুটবল খেলোয়াড় আমি কখনোই ছিলাম না। কিন্তু আমার গভীর উৎসাহ দক্ষতার অভাবকে পুষিয়ে দিয়েছিলো। আমার জীবনের একটি সুখী দিন ছিলো সেই রোববার যেদিন আমাদের পাড়ার নামকরা খেলোয়াড় তোতো তেররি আমাকে মিউনিসিপাল স্পোর্টসের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস বিভাগের কালিঞ্চে দলের হয়ে খেলার জন্য জাতীয় খেলার মাঠে নিয়ে যায়। ক্রীমকালার ইউনিফর্ম পরে বিশাল মাঠে আত্মপ্রকাশ করাটা কি পৃথিবীতে কারোর জন্য একটা বিরাট ব্যাপার ছিলো না?”

লাতিন আমেরিকার আরেকজন বিখ্যাত লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেসও ফুটবলের জনপ্রিয়তার দিকটিকে উপেক্ষা করতে পারেননি। পারার কথাও নয়। মার্কেস ও বার্গাস যোসার মতো প্রবল আবেগ নিয়ে এ বিষয়ে না লিখলেও এটা অন্তত স্বীকার করেছেন যে ফুটবল যুদ্ধকে ঠেকায়, অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে বরং খেলার মাঠে লাথি মারাটাকেই তিনি অনেক বেশি ভালো কাজ বলে মনে করতেন।

তবে লাতিন আমেরিকার, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় আর্হেন্তিনার, যে-আর্হেন্তিনার বিশ্বব্যাপী খ্যাতি রয়েছে ফুটবলের জন্য, ফুটবলের রাজা মারাদোনা এবং মেসির জন্য, সেই দেশেই কিনা হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো বিশ্বখ্যাত লেখক, প্রবল উপেক্ষা, কটুক্তি আর নাস্তিবচনে ফুটবল নামক সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটিকে নিষ্ঠুর ও নির্মমভঙ্গীতে লাথি মেরে বের করে দিয়েছেন তার আগ্রহের মাঠ থেকে। বিভিন্ন সময় সাক্ষাৎকারে ও মন্তব্যে তিনি ফুটবল নিয়ে এমন সব কথা বলেছেন যা ফুটবলপ্রেমীদের ক্ষোভ উস্কে দিতে পারে অনায়াসেই। কোনো রকম রাখডাক ছাড়াই তিনি বলেছিলেন যে “ফুটবল জনপ্রিয় কারণ বোকামি জনপ্রিয়”। কিংবা অন্যত্র এই কথাটাকেই একটু ঘুরিয়ে বলেছেন এভাবে, “বোকামির চেয়ে জনপ্রিয় আর কিছু নেই।” “এগারজনের বিরুদ্ধে এগার জন খেলোয়ার একটা বলের পেছনে দৌড়াচ্ছে– এটা এমন কী সুন্দর ব্যাপার!”

বোর্হেসের কাজের মেয়ে এপিফানিয়া উবেদা দে রোবলেদো একটা বই লিখেছিলেন বোর্হেস সম্পর্কে: El señor Borges। সেখানে তিনি ফুটবল নিয়ে বোর্হেসের একটা ঘটনা উল্লেখ করেছিলেন। সেখানে তিনি যা বলেছিলেন তা হলো এই যে সেসার লুইস মেনোত্তি তখন আর্হেন্তিনার ফুটবল জগতের সবচেয়ে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। গোটা আর্হেন্তিনাতেই তখন তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। মেনোত্তি একবার বোর্হেসের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য তাঁর বাসায় এলেন। ফানির ভাষায়: “বোর্হেসের একটা উদ্ধৃতি দিয়ে মেনোত্তি তাঁর প্রশ্ন শুরু করেন। উদ্ধৃতিটি ছিলো এই যে বোর্হেস নাকি বলেছিলেন ফুটবল নির্বোধদের খেলা। বোর্হেস ঘাবড়ে না গিয়ে উত্তরে বললেন যে আসলে ঠিক সেভাবে বলেননি কথাটা। তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন তাহলো ফুটবল “ভীষণ তুচ্ছ খেলা। আমরা হল্যান্ডকে পরাজিত করেছি”– যদি কেউ এ রকম বলে তাহলে সেটা আমার কাছে ভীষণ বেখাপ্পা মনে হয়। রটারডেম বা আমস্টার্ডেম কিংবা তাদের দেশাত্ববোধের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেই না। কেবল এগারজন খেলোয়াড় বিপরীত দলের এগারজনের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। এই বিজয়ের কী গুরুত্ব থাকতে পারে?ফুটবল বিষয়ক বোর্হেস সাহেবের ধারণার সাথে সবাই পরিচিত ছিলেন। সবসময়ই বলতেন “ফুটবল খেলোয়াড়দেরকে আমার নির্বোধ মনে হয়। সবাই একটা বলের পেছনে দৌড়াচ্ছে। ভালো হতো বরং প্রত্যেককে একটা করে বল দিলে।” সাক্ষাৎকার শেষ হলে মেনোত্তি চলে গেলেন। পরে আমার কাছে তিনি জানতে চাইলেন ভদ্রলোকের পরিচয়। বললাম, উনি হচ্ছেন আর্হেন্তিনার সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি, ফুটবল দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। শুনে তিনি বেশ রেগে গেলেন: ফানি, আমাকে আপনি আগে বলেননি কেন। কিন্তু পরক্ষণেই হাসতে শুরু করলেন সাক্ষাৎকারে দেয়া তাঁর উত্তেজক বক্তব্যের কথা স্মরণ করে।”ফুটবলের একমাত্র লাতিন আমেরিকান নাস্তিক বোর্হেসের এসব মন্তব্যকে সাধারণ মানুষ যে থোড়াই কেয়ার করেন তা তো আমরা স্বচক্ষেই দেখতে পাচ্ছি। শুধু ধর্মীয় ঈশ্বরই নয়, এমনকি গোলাকার ঈশ্বরের প্রতি্ও মানুষের আসক্তি যে আগের তুলনায় দুর্বার গতিতে বাড়ছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পত্রিকাগুলোও আজ ফুটবলের আস্তিকতাকে তোয়াজ করে চলে বলে প্রতিদিন একাধিক পাতার ফরাস পেতে দিচ্ছে ফুটবলামোদীদের জন্য। ফুটবল আজ, হুয়ানের অব্যর্থ অভিধায়, ‘গোলাকার ঈশ্বর’ই বটে।