আমি শাহরুখ খান

shahrukh-khan-644px

[অভিনেতা শাহরুখ খান এই লেখাটি দি নিউইয়র্ক টাইমস এর ‘আউটলুক টার্নিং পয়েন্টস’ এর জন্যে ২০১৩ সালে লিখেছিলেন। তার নামের শেষে ‘খান’ থাকায় আমেরিকার এয়ারপোর্ট কর্মকর্তাদের দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার পরের লেখা এটি। এই লেখায় শাহ রুখ খান তার নিজের ধর্ম, পেশোয়ার থেকে আসা তার পিতা, শৈশবের শিক্ষা, তার হিন্দু স্ত্রী, দুই সন্তান, নাইন ইলেভেনের পরে মুসলমান সংখ্যালঘু হিসাবে ইন্ডিয়ায় জীবনযাপনের কৌশল ও নিজের দর্শন বিষয়ে অনেক কথা বলেছেন।]

আমি একজন অভিনেতা। ইমেজ যতটা দৃঢ়ভাবে আমার দিনগুলিকে ধরে রাখে সময় ততটা রাখে না। মুহূর্ত এবং স্মৃতিগুলি আমি এক্সপ্রেশনের মাধ্যমে যে স্ন্যাপশটগুলিতে থাকি সেগুলিতে নিজেদের এঁকে রাখে। আমার আর্টের মূল বিষয় হলো সেগুলি যারা দেখে তাদের আবেগী কল্পনার সাথে অণুরণিত হতে পারে এমন ইমেজ তৈরি করা।

আমি একজন খান। এই নামটি নিজেই আমার মনের ভিতর অনেকগুলি ইমেজ মেলে ধরে — লাগাম ধরে ঘোড়ায় চড়া একজন লোক, তার মাথার পাগড়ি থেকে তার বেপরোয়া চুল বেরিয়ে আসছে। মুখের মাসলগুলি স্পষ্ট এবং আলাদা করা যায় এমন বড় একটি নাকের কারণে তার বিশেষ হ্যান্ডসাম চেহারা।

একজন বাঁধাধরা চরমপন্থী; না নাচ, না মদ, না তার ঠোঁটের ফাঁকে কোনো সিগারেট, না একগামিতা, না অধার্মিক কোনো কিছু; একটি সুন্দর, নীরব মুখ সহিংস ক্রোধের ধোঁয়ায় দৃঢ় হয়ে আছে। একটি বিদ্যুৎ চমকের কারণে সে তার সৃষ্টিকর্তার নামে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। তারপর আসে একজন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নামে নামকরণকৃত আমেরিকার বিশাল একটি এয়ারপোর্টের পিছনের রুমে আমাকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইমেজ (আরেকটি প্যারালাল ইমেজ — লি নামের একজন ব্যক্তির দ্বারা প্রেসিডেন্টের হত্যা, ভাগ্য ভালো সে মুসলিম নয়, অনেকেই ভাবতে পারে কিন্তু সে চাইনিজও নয়, আমি তাড়াতাড়ি সেই রুমের ইমেজটি আমার মাথা থেকে সরিয়ে দেই।)

পোশাক খুলে নেওয়া, হয়রানি এবং অনেক প্রশ্নের পরে আমাকে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল (এক ধরনের): “আপনার নাম আমাদের সিস্টেমে পপ আপ করেছে, আমরা দুঃখিত।” আমি নিজে নিজেই ভাবলাম, “আমি আসলে তাই, এখন কি আমি আমার আন্ডারওয়্যার ফেরত পেতে পারি প্লিজ?” তারপর আসে যে ইমেজটি আমি সবচেয়ে বেশি দেখি, আমার নিজের দেশে আমি — মেগাস্টার হিসেবে স্বীকৃত, ভালোবাসা প্রাপ্ত এবং মহিমান্বিত, আমার ভক্তরা আমার জন্য ভালোবাসা এবং প্রশংসা নিয়ে ভিড় করে।

আমি একজন খান।

আমি বলতে পারি এইসব ইমেজের প্রত্যেকটিতেই আমি খাপ খাই — আমি ছয় ফুট লম্বা লাগাম ধরা কেউ হতে পারতাম — ওকে, কিছুটা বাদ দিতে হবে, তিন ইঞ্চির মত কমপক্ষে, যদিও ঘোড়ায় চড়া নিয়ে আমি বেশি একটা জানি না। একবার একটি ঘোড়া আমাকে নিয়ে টগবগ করে ছুটছিল আর আমি এটার উপর অসহায়ভাবে ঝুলে ছিলাম এবং ‘কোনো হর্স রাইডিং না’ বাক্যাংশটি আমি চিরদিনের জন্য আমার খাতায় খোদাই করে নিয়েছি।

আমার মুখ অনেক পেশীবহুল, আমার বাচ্চারা প্রায়ই আমাকে বলে থাকে, এবং আমি ফর্সাও ছিলাম, কিন্তু এখন আমার রঙ চিরস্থায়ীভাবে তাম্র বর্ণের অথবা আমি বলতে পছন্দ করি জলপাই রঙ — যদিও আমার বাহুর খাঁজের গভীরে আমি সেই ফর্সা থাকার অবশিষ্ট চিহ্ন এখনো খুঁজে পাই। সঠিক ধরনের আলোর নিচে আমি হ্যান্ডসাম এবং আসলেই আমার আলাদা করা যায় এমন বড় একটি নাক আছে। আমার মেগাস্টার-প্রবেশের ঠিক আগেই দরজা দিয়ে ঢুকে এটা আসলে আমার আগমন ঘোষণা করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার নাক, আমার নাম আমার কাছে কোনো অর্থই বহন করে না যতক্ষণ না আমি এটাকে কনটেকচুয়ালাইজ করি।

সরলীকরণ করা এবং কনটেকচুয়ালাইজিং করা আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি তার নিয়ম — একটি পৃথিবীতে যেখানে সংজ্ঞা নিরাপত্তার কেন্দ্র হয়ে গেছে। খুব সামান্য জ্ঞান এবং চেনাজানা মাপকাঠি দিয়ে ঘটনা, বস্তু এবং মানুষকে সংজ্ঞায়িত করে আমরা আরাম পাই। এইসব সংজ্ঞা থেকে প্রাকৃতিকভাবেই যে অনুমান উঠে আসে তা আমাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাদের নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়।

আমরা আমাদের নিজেদের ছোট ইমেজ বক্স তৈরি করি। এই ধরনের বক্সের ঢাকনা বর্তমানে আরো আঁটোসাটো হয়ে এসেছে। এই বক্স মিলিয়ন সংখ্যক মানুষের মনে আমার ধর্মের একটি ইমেজ ধারণ করে আছে।

সংজ্ঞার এই আঁটোসাঁটো হয়ে আসার বিষয়টি আমি প্রতিবার এনকাউন্টার করেছি যে আমার দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বারা মডারেশন পাবলিকলি প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন। যখনই ইসলামের নামে কোনো সহিংস ঘটনা ঘটেছে, আমাকে ডাকা হয়েছে তার উপর আমার মতামত প্রচার করার জন্য মুসলিম হওয়ার গুণের মাধ্যমে সেই ধারণা নিরসন করার জন্য। আমি এই ধরনের জ্ঞানহীন নৃশংসতা ক্ষমা করে দেই। আমি আমার সম্প্রদায়কে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বেছে নেয়া কণ্ঠস্বরগুলির একজন যাতে অন্যান্য সম্প্রদায়কে তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত রাখা যায়। আমাদের সবার প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া এমন যেন না হয় যে আমরা সংঘর্ষ করছি অথবা একটি ধর্মের নামে ঘটানো অপরাধের জন্য আমরা দায়ী। এই অপরাধগুলি আমরা প্রত্যক্ষ করছি এইসব ঘটনার অপরাধীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে।

মাঝে মাঝে আমি রাজনৈতিক নেতাদের অসাবধানী শিকার হয়ে যাই। তারা ভারতের মুসলমানদের নিয়ে যা ভাবে তা ভুল এবং দেশপ্রেমহীন, তার উদাহরণ বানানোর জন্য আমাকে বেছে নেয়। অনেক বার আমার নিজের দেশের চেয়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশের প্রতি আনুগত্যের জন্য আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে — যদিও আমি ভারতীয় এবং আমার বাবা ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন। অনেক মিছিল হয়েছে যেখানে নেতারা আমাকে বলেছেন আমার দেশ ছেড়ে তারা আমার ‘আসল দেশ’ বলে যাকে সেখানে ফিরে যেতে। অবশ্যই প্রতিবার আমি ভদ্রভাবে তা নাকচ করেছি। আমার বাড়িতে আমি এমন ভাষা ব্যবহার করেছি সেগুলি দূর করার জন্য যার ফলে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে গেলে ভালো করে যে গোসল করতে হয় তা আমাকে করতে হয় নি। যদিও আমি জানি না কতদিন এই অজুহাত সবকিছু ধরে রাখবে।

আমি আমার ছেলে এবং মেয়ের এমন নাম (ভারতীয় বৈশিষ্ট্যের এবং ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের) দিয়েছি যাতে এইসব জাতিগত ব্যাপার পাস করে যায় — আরিয়ান এবং সুহানা। ‘খান’ নামটি আমি অর্পণ করেছি যাতে তারা এটা বাদ দিতে না পারে। মুসলিমরা যখন জিজ্ঞাসা করে তখন আমি এটা আমার আলজিভ থেকে উচ্চারণ করি এবং অমুসলিমদের জিজ্ঞাসায় আরিয়ান নামটি তাদের সামনে ছুঁড়ে দেই তাদের গোত্রের প্রমাণ হিসাবে।

আমি মনে করি এটা আমার সন্তানদেরকে ভবিষ্যতে অন্যায্য আক্রমণ এবং যত্রতত্র ফতোয়া থেকে রক্ষা করবে। এটা আমার দুই সন্তানকে পুরোপুরি সংশয়েও রাখবে। মাঝে মাঝে তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে তারা কোন ধর্মের এবং হিন্দী ছবির একজন ভালো নায়কের মত আমি আমার চোখ ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তুলি এবং দার্শনিকভাবে বলি, তোমরা প্রথমে ভারতীয় এবং তোমাদের ধর্ম হলো মানবতা অথবা তাদের পুরাতন হিন্দী সিনেমার একটি গান শোনাই, ‘তু হিন্দু বানেগা না মুসলমান বানেগা — ইনসান কি আওলাদ হ্যায় ইনসান বানেগা’ গ্যাংনাম স্টাইলে।

এটা তাদের কোনোরকম স্বচ্ছ ধারণা দেয় না, এটা শুধু তাদের আরো সংশয়ে ফেলে দেয় এবং তাদের পিতা সম্পর্কে আরো সাবধানী করে।

এই স্বাধীন দেশে সম্মানিত হওয়ার জন্য আমি অনেকবার আমন্ত্রিত হয়েছি, হঠাৎ করে আমার মাথায় এমন আইডিয়া এসেছে যেটা আমাকে আলাদা একটি কনটেক্সটে রাখে। উদাহরণ হিসেবে, এয়ারপোর্টের দেরির জন্য আমাকে আমার ভাড়া শেয়ার করতে হয়েছে।

কিছু উদ্ভ্রান্ত সন্ত্রাসী কাকতালীয়ভাবে আমার নামের শেষ অংশ বহন করে বলে আমাকে ভুলভাবে নেওয়ার ঘটনায় আমি আহত হয়েছি, একটা পয়েন্ট প্রমাণ করার জন্য সেটা আমি একটি ছবি বানিয়েছি যার নাম মাই নেইম ইজ খান (অ্যান্ড আই অ্যাম নট এ টেরোরিস্ট)। পরিহাসমূলকভাবে আমি যখন আমেরিকায় প্রথমবারের মত ছবিটি প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম আমাকে আমার নামের শেষ অংশের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আমি অবাক হই যাদের নামের শেষে ম্যাকভেইগ (টিমোথি-তে যেমন) আছে তাদের প্রত্যেকের সাথেই একই আচরণ করা হয় কিনা।

কোনো সেন্টিমেন্টে আঘাত করার ইচ্ছা আমার নেই, কিন্তু সত্য বলতে হবে। আক্রমণকারী এবং জীবনগ্রহণকারী তার নিজের মনের ইচ্ছায় এসব করে। এর সাথে একটি নামের, একটি স্থানের অথবা তার ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এই মনের নিজস্ব শৃংখলা আছে, নিজের মত করে সঠিক থেকে ভুলকে আলাদা করার ব্যাপার আছে এবং নিজস্ব আদর্শের সেট আছে। আসলে, একজন বলতে পারে, এর নিজেরই একটা ‘ধর্ম’ আছে। এই ধর্মগুলির সাথে মসজিদে বা চার্চে শিক্ষা দেওয়া শত শত বছরের ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এইসব ব্যক্তিদের আত্মায় আজানের ডাক বা মানুষের কথার কোনো তাৎপর্য নেই। তার আত্মা অশুভ শক্তি দ্বারা তাড়িত। আমি এই ক্ষেত্রে তার অবস্থানকে কন্টেকচুয়ালাইজ করি না।

আমি একজন খান।

আমি ছয় ফুট লম্বাও না হ্যান্ডসামও না (যদিও আমি বিনয়ী) আমি সেই মুসলিমও না যে অন্য ধর্মগুলিকে ছোট করে দেখে। আমাকে আমার ধর্ম শিক্ষা দিয়েছে আমার ছয় ফুট লম্বা, হ্যান্ডসাম পেশোয়ারী পাঠান পিতা। সেখানে এখনও তার এবং আমার গর্বিত পরিবার বসবাস করে। তিনি ছিলেন অহিংস পাঠান আন্দোলন ‘খুদায়ে খিদমতগার’ এর একজন সদস্য এবং গান্ধীজি ও খান আব্দুল গাফফার, যাকে সীমান্তের গান্ধী বলা হতো, দুজনেরই অনুসরণকারী।

তার কাছে থেকে আমার ইসলামের প্রথম শিক্ষা ছিল নারীদের এবং শিশুদের সম্মান করা এবং প্রতিটা মানুষের মর্যাদাকে উপরে রাখা। আমি অন্যদের বৈশিষ্ট্য এবং ভদ্রতা শিখেছিলাম, শিখেছিলাম তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের দর্শন এবং তাদের ধর্ম আমার নিজের ধর্মের মতই সম্মান দাবি করে এবং তাদেরকে খোলা মনে গ্রহণ করতে হবে। আমি আল্লাহর ক্ষমতা এবং দয়ায় বিশ্বাস করতে এবং আমার অধীনস্ত মানুষদের প্রতি ভদ্র হতে, যারা আমার চেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত তাদেরকে আমার নিজের থেকে দিতে এবং অন্যের একই ভাবে জীবন কাটানোর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে সম্পূর্ণ সুখের, উচ্ছ্বাসের, হাসির ও আনন্দের জীবন কাটানো শিখেছিলাম।

দি ইনার ওয়ার্ল্ড অব শাহ রুখ খান (ভিডিও)

তাই আমি একজন খান, কিন্তু আমি কে সে ব্যাপারে আমার ধারণায় কোনো সরলীকৃত বাঁধাধরা ইমেজ নেই। বরং আমার জীবন কাটানোর ধরন ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা গভীরভাবে পেতে আমাকে সমর্থ করেছে। গত বিশ বছর ধরে আমি এই ভালোবাসা অনুভব করে আসছি এই সত্যটাকে অগ্রাহ্য করে যে আমার সম্প্রদায় ভারতের জনসংখ্যায় সংখ্যালঘু। আমি জাতীয় এবং সাংস্কৃতিক সীমানার বাইরেও এই ভালোবাসা দ্বারা স্নাত হয়েছি, সুরিনেম থেকে জাপান এবং সৌদি আরব থেকে জার্মানি পর্যন্ত, এমন জায়গায় যেখানে মানুষ আমার ভাষা পর্যন্ত বোঝে না। একজন বিনোদনকারী হিসাবে আমি তাদের জন্য যা করেছি তারা তার প্রশংসা করেছে — এটাই সব। আমার জীবন আমাকে দেখিয়েছে এবং বুঝিয়েছে যে ভালোবাসা একদম শুদ্ধভাবে বিনিময় হয়, সংজ্ঞায়িত করার থেকে আঘাতমুক্ত থাকে এবং সংকীর্ণ চিন্তার সীমাবদ্ধতার বন্দিত্ব থেকে মুক্ত থাকে। আমাদের প্রত্যেকেরই যদি এই শুদ্ধ ভালোবাসা গ্রহণ করার এবং ফিরিয়ে দেয়ার অনুমোদন থাকত তাহলে আমাদের নিরাপত্তার দেয়াল তৈরি করার জন্য কোনো ইমেজ বক্সের দরকার হত না।

আমি বিশ্বাস করি এত পরিমাণ ভালোবাসা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাওয়ার কারণে আমি আশীর্বাদপ্রাপ্ত। কিন্তু আমি এটাও জানি যে এই মাপকাঠি অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের ছোট ছোট উপায়ে, সাধারণভাবেই মানুষ হিসাবে, আমাদের জীবন যেভাবে অন্যদের জীবনকে স্পর্শ করে এবং আমাদের আলদা আলাদা ধর্ম এবং আমাদের সংজ্ঞায়িত করা নামের শেষ অংশ করে না তার জন্য আমাদের একে অন্যকে প্রশংসা করা উচিৎ।

আমার সুপারস্টারডমের আবরণের ভিতরে আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমার হিন্দু স্ত্রী’র সাথে আমার ইসলাম বোধের কোনো সংঘর্ষ হয় না। গৌরির সাথে আমার শুধু আমাদের লিভিং রুমের দেয়ালের রঙ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, এবং ভারতে মসজিদ থেকে মন্দিরের সীমানা নির্ধারণকারী দেয়ালের অবস্থান নিয়েও নয়।

আমরা আমাদের মেয়েকে মানুষ করছি যে নিজের ব্যালে নাচের পোশাক নিজেই তৈরি করে এবং নিজের ব্যালে নৃত্যের কোরিওগ্রাফি নিজেই করে। সে পশ্চিমা গান গায় যেগুলি আমাকে হতবুদ্ধি করে দেয় এবং সে একজন অভিনেত্রী হতে চায়। সে যখন এমন কোনো মুসলিম দেশে থাকে যে দেশ মাথা ঢাকার ব্যাপারটি প্র্যাকটিস করে, সে তখন মাথা ঢাকার জন্য জেদ করে, এটা সত্যিই অনেক সুন্দর এবং ইসলামের সবচেয়ে ভুল বোঝা একটি মতবাদ।

আমাদের ছেলের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি তার পাঠান বংশের প্রতি ইঙ্গিত করে, যোদ্ধার জিনের কিছুটা পরিবর্তনসহ যদিও তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সে সারাদিন কাটায় হয় রাগবিতে লোকজনকে ধাক্কা দিয়ে, তায়-কোন-দো-তে কারো পিছনে লাথি মেরে অথবা কল অব ডিউটি ভিডিও গেমে অনলাইন দুনিয়ায় অজানা কাউকে বাতিল করে দিয়ে গেমের দুনিয়া হ্যান্ডেল করে। এবং তারপরও সে গতবছর মুম্বাইয়ের ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আমার খান হওয়া নিয়ে কিছু ধর্মান্ধের বাজে আচরণ করার কারণে ছোটোখাটো বিশৃঙ্খলা করার জন্য সে আমাকে দৃঢ়ভাবে অনুযোগ করেছিল।

জুলাই ১, ২০১৪ তারিখে মুম্বাইয়ের তাজমহল প্যালেস হোটেলে এক অনুষ্ঠানে শাহ রুখ খানকে চলচ্চিত্র ও সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মাননা নাইট অব দ্য লিজিওন অব অনার প্রদান করছেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ ফাবিয়া।

আমরা চারজন ব্যতিক্রম কিছু গ্রহণযোগ্যতার এবং বৈধতার বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব করি যে, কোনো ব্যাপারের সূক্ষ্মতার মধ্যে ভালোবাসার বিনিময় হলে তা মানুষকে বড় করে তোলে, যে ব্যাপারগুলি অন্যভাবে সাধারণ হিসাবে সংজ্ঞায়িত।

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের ধর্ম চূড়ান্তভাবেই ব্যক্তিগত পছন্দ, আমরা কে তা জনগণের কাছে ঘোষণা করার বিষয় না। এটা একজন ব্যক্তি হিসেবে আমার বাবার দৃষ্টিভঙ্গি যিনি বিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন। সেই দৃষ্টিভঙ্গিগুলি আমি আমার সবচেয়ে বড় পুরষ্কার এবং তার স্মৃতি, তার দেয়া শিক্ষা এবং পাঠান হওয়ার সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করি। আমি কখনো আমার বন্ধুদের সাথে এগুলি তুলনা করি নি, যাদের পিতামাতা এবং দাদা-দাদিদের উত্তরাধিকারের একই রকম সম্পদ রয়েছে। আমি কখনো বলিনি আমার বাবার দৃষ্টিভঙ্গি তোমার মায়ের শাড়ির চেয়ে ভালো। তাহলে ধর্মের ব্যাপারে আমাদের এরকম তুলনা কেন থাকা উচিৎ, যেটা আপনার গুরুজনের স্মৃতির মতই ব্যক্তিগত এবং পুরস্কারস্বরূপ একটি বিশ্বাস। আমরা নিজেদের সংজ্ঞায়িত করতে নামের শেষ অংশের পরিবর্তে কেন শেষ শব্দ হিসেবে ভালোবাসা শেয়ার করব না? আপনাকে ভালোবাসা দিতে পারার জন্য একজন সুপারস্টার হতে হয় না। এর জন্য শুধু একটি হৃদয়ের প্রয়োজন এবং আমি যতদূর জানি, পৃথিবীতে কোনো শক্তিই এই জিনিস থেকে কাউকে বঞ্চিত করে রাখতে পারে না।

আমি একজন খান, এবং এটা হওয়া মানে যা আমি তাই, শুধু আমাকে ঘিরে যে সরলীকৃত ইমেজগুলি আছে সেগুলি বাদ দিয়ে। খান হওয়া হলো ভালোবাসা পাওয়া এবং ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়া — এই প্রতিজ্ঞা যে আমার জন্য ওই পারের কোথাও কুমারীরা অপেক্ষা করছে।

অনুবাদ: মৃদুল শাওন