‘ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র’ নিয়ে মাসরুর আরেফিনের সাক্ষাৎকার

kafka-shamagra লেখক ও অনুবাদক মাসরুর আরেফিনের এই ইন্টারভিউ নেয়া হয়েছিল ২০১৩ সালের মার্চে। সে বছর ফেব্রুয়ারি বইমেলায় তার অনুবাদে ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। আলাপে তিনি তার প্রথম কাফকা পড়ার ঘটনা শেয়ার করেন। কথাপ্রসঙ্গে জানা যায় ইংরেজি ভাষায়ই অনেক রকমভাবে কাফকা অনুবাদ করা হয়েছে। সবসময় সিরিয়াস চোখ দিয়ে দেখার ফলে কাফকার লেখার সূক্ষ্ম সেন্স অব হিউমারের বিষয়টি চাপা পড়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি। — মৃদুল শাওন
________________________________________

মৃদুল শাওন: কাফকা প্রথম পড়ছেন কবে?
মাসরুর আরেফিন: কাফকা প্রথম পড়ি ১৯৯০ সালের দিকে। প্রথম আসলে পড়ি, ক্যাডেট কলেজে যখন পড়তাম, আই বিলিভ ১৯৮৬-র দিকে, প্রথম পড়ি আলবেয়ার কামু, দ্য ‘আউটসাইডার’ গল্পটা, আউটসাইডার উপন্যাস — বাংলায়। বাংলা অনুবাদে কলকাতা থেকে বইটা বের হয়েছিল। ওই আউটসাইডার পড়ার সূত্রে, কামু পড়ার সূত্রে, কাফকার নাম জানি অ্যারাউন্ড দ্যাট টাইম। বাট বাংলায় তখন কোনো কাফকা পাওয়াও যেত না, পড়াও হয় নি। পরে ফ্রানৎস কাফকা প্রথম পড়ি আমার মনে হয় ১৯৯০ সালে। যখন আমি মুম্বাইতে, বোম্বে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ওই সময় কোনো একটা লাইব্রেরিতে ফ্রানৎস কাফকার মেটামরফসিস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ বইটা পড়ি। এবং ঠিক ওই ‘রূপান্তর’ গল্পের প্রথম লাইনটা যেটা গার্সিয়া মার্কেজ এবং অনেক সাহিত্যিকের যেটা দিয়ে লেখালেখি শুরু: এক সকালে গ্রেগর সামসা ঘুম থেকে উঠে দেখে সে একটা পোকা হয়ে গেছে। ওই ওইটা আমার মধ্যে একই অভিঘাত আনে। ওইটা প্রথম পড়া কাফকা। তারপরে আমার ধারণা আমি ‘রূপান্তর’ গল্পটাই প্রথম গল্প যেটা পড়ি। সবই আসলে ১৯৯০, ৯১, ৯২ এর মধ্যে বেশ অনেকখানি খ্যাতিমান গল্পের যে কাফকা সেটুকু সবই ওই সময়ে পড়া। ইনক্লুডিং বিচার উপন্যাসটা ওই সময়ে পড়া। আমার এখনো মনে পড়ে, প্যারালালি আমি দুইটা বই পড়েছিলাম। একটা হচ্ছে কাজুও ইশিগুরোর একটা উপন্যাস, রিমেইনস অব দ্য ডে আর ফ্রানৎস কাফকার উপন্যাস, দ্য ট্রায়াল। সবই ওই ৯০, ৯১, ৯২ এর দিকে।

তারপরে একটা যা হয়, একটা পড়তে গিয়ে, একটা পড়তে গিয়ে আরেকটা পড়া, একটা পড়তে গিয়ে আরেকটা পড়া। তারপরে যেমন ‘গ্রেট ওয়াল অব চায়না’ গল্পটা ওই সময়ই পড়ি। কাফকার যেটা বোর্হেসের ভাষায় সবচেয়ে সেরা লেখা, ওটা ওই সময়ে পড়া। কারণ আমি যদি তারিখটা দেখি, ‘গ্রেট ওয়াল অব চায়না’ মানে ‘চীনের মহাপ্রাচীর’ নাম আমি দেখছি আমার অনুবাদের ডেট দেওয়া আছে অগাস্ট ১৯৯২। তার মানে আমি পড়ি এবং আমার যতদূর — আসলে বিশ বছর আগের মেমোরি — বোঝা যাচ্ছে, আমার কাছে যে কাগজগুলো আছে তা দেখেই বুঝতে পারছি যে আমি যখন পড়ি আমি অনুবাদও তখন শুরু করি। তখন আমি ভারতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অনুবাদগুলি ভালো না, উন্নত অনুবাদ না, বাট বেসিক অনুবাদ তো একই, বেসিক কাঠামো ঠিকই আছে। আমার অসংখ্য অনুবাদ আমি খুঁজে পাচ্ছি যেগুলো ১৯৯২/৯৩ এর। এর মানে পড়া ও অনুবাদ একই সময়ে শুরু হয়।

মৃদুল: কাফকা তাইলে প্রথম পড়ছেন মুম্বাইয়ে? মানে…
মাসরুর: হ্যাঁ বোম্বোতে।

মৃদুল: ওই সময় ওটা কি বাংলা ছিল নাকি?
মাসরুর: না, না, ইংরেজিতে কাফকা ছিল। কাফকা যা হয়, ফ্রানৎস কাফকা, আমরা আমাদের সময়ে পড়ি কিন্তু সবাই উইলা অ্যান্ড এডুইন মুয়ির এর কাফকা। তখন তো এত কাফকা পাওয়া যেত না। পেঙ্গুইন থেকে বলেন, পিকাডোর থেকে বলেন, যা কাফকা পেতাম — ফ্রানৎস কাফকার প্রথম অনুবাদক যার ইংরেজিতে সেই দম্পতি উইলা অ্যান্ড এডুইন মুয়ির। ওই মুয়ির পড়া কাফকা এই পৃথিবীতে একটা জেনারেশনের কাফকা। তারপরে আরো অনেকগুলা কাফকা আসে ইংরেজি ভাষায়। যেমন ম্যালকম প্যাস্লির অনুবাদগুলা পাওয়া শুরু হয়, যেগুলাকে বলা হয় ডেফিনেটিভ এডিশন। যেমন এডুইন মুয়ির অ্যান্ড উইলা মুয়িরের অনুবাদে, তারা বিশ্বাস করত যে কাফকা ধর্মপ্রচারক, তারা বিশ্বাস করতেন যে কাফকার লেখা আধ্যাত্মিকতায় ভরা, স্পিরিচুয়াল রাইটিং। তাদের লেখাগুলার মধ্যে সবকিছু স্পিরিচুয়াল — যদি কাফকা লিখতেন একটা স্বচ্ছ আলো, ওনারা লিখতেন একটা অনির্বাণ দীপ্তি। আমার কথাটা বুঝছেন। সো উনারা আধ্যাত্মিক একটা টোন নিয়ে আসতেন। ধরেন দূরে একটা দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, ওনারা এমনভাবে ইংলিশ বাক্যটা লিখতেন দেখে মনে হচ্ছে যে ওটা বোধহয় ঈশ্বরের কোনো আবাস-টাবাস।

তো এই জিনিসগুলাতে দুষ্ট ছিল উইলা অ্যান্ড এডুইন মুয়ির। পরে ম্যালকম প্যাস্লি, অ্যান্ড আপনার জে এ আন্ডারউড, তারপরে আরন্স্ট্ কাইজার, এইথ্নে উইলকিনস, মাইকেল হফমান, মার্ক হারম্যান এদের অনুবাদগুলো আসতে থাকে পঁচানব্বই সালের পরের থেকে। সো এই কাফকাটা তখন আর আমরা পাই নাই, এই কাফকা আমি হাতে পাইছি ২০০৫ এরও পর। এখন ডেফিনেটিভ বা ক্রিটিক্যাল এডিশন যেগুলিকে বলা হচ্ছে, যেগুলার কারণে এক কথায় বলতে গেলে উইলা এডুইন মুয়িরের এত ভালো অনুবাদও বাতিল হয়ে গেছে, মানে মানুষ ওইভাবে আর পড়ে না। ডেফিনেটিভ এডিশন সবাই কিনতে চায়, পাশাপাশি দুটো বই রাখা থাকে, যে দ্য ট্রায়াল — ফ্রানৎস কাফকা বা উইলা অ্যান্ড এডুইন মুয়ির.. আপনার একটা এর ঐতিহাসিক মূল্য আছে, কারণ ওইটাই প্রথম ট্র্যায়াল, ১৯২৬ বা সাতাশ আটাশ সালে বিশ্বসাহিত্য কাঁপাইয়া ফেলছে। ওটার জন্য হয়তো কিনবেন বাট পড়বেন কিন্তু যেটার গায়ে সিল দেওয়া আছে ‘ডেফিনেটিভ এডিশন’ বা ‘ক্রিটিক্যাল এডিশন’ — ইউ আন্ডাস্ট্যান্ড? সো এই এই ব্যাপার আছে। তো কী যেন আপনি বলছিলেন যে আমি প্রথম বাংলায় পড়ি কিনা, বাংলায় তো প্রশ্ন আসেই না, তখনও বাংলায় কোনো কাফকা পাওয়াও যেত না। বাংলায় আমি আজ পর্যন্ত কাফকা পড়ি নি।

মৃদুল: ওই সময় যখন পড়ছিলেন মুম্বাইতে, মেটামরফসিস বা অন্যান্য, তখন কি মনে হইছিল অনুবাদ করবেন?
মাসরুর: মনে হইছিল কেন, হয় কী, আমরা সবারই একটা বয়স থাকে, আমাদের যাদের মধ্যে সাহিত্যের পোকাটা আছে বা আমরা যারা সাহিত্য পছন্দ করি — একটা ব্যাপার থাকে কী, একটা বয়সে দেখবেন বামপন্থী রাজনীতি — এটা খুব আমাদেরকে আকর্ষণ করে। আমরা সবাই, গড়পড়তা সব সাহিত্যের ছেলেদের। ওই আপনার কী বলে, ম্যাক্সিম গোর্কির লেখা, তারপরে আপনার কী বলে, চে গুয়েভারার… পোস্টার…

মৃদুল: পোস্টার, ক্যাপ, টিশার্ট?
মাসরুর: চে গুয়েভারার মোটরসাইকেল ডায়েরি, একটা বয়সই থাকে এই সবের। মানুষের। ঠিক তেমনি ওই সময়ে একটা বয়স থাকে মানুষের–নব্বই দশকে, আশির দশকের দিকে দেখবেন– অস্তিত্ববাদের দিকে ঝোঁকার। অস্তিত্ববাদী রাইটিং আমাদের–ভালো না লাগলেও অনেক ভালো লাগে, কারণ বেসিক প্রশ্নগুলা করা হচ্ছে, মানুষ এই পৃথিবীতে কেন এসছে? এই অস্তিত্বের মূল প্রশ্ন, আস্তিত্বের অর্থ কী? আমার সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক কী, পৃথিবীর সম্পর্ক কী, আমি কোন জায়গায় দাঁড়ায়া আছি? তো ফ্রানৎস কাফকা ভালো লাগার কারণ হচ্ছে বয়স একটা। ওই বয়সটা তো অস্তিত্ববাদী সাহিত্য ভালো লাগার বয়স। বললাম না, আলবেয়ার কামুরআউটসাইডার যখন পড়ি একটা লোক অকারণে একটা লোককে খুন করল। করে তার কোনো দুঃখ নাই যে তার ফাঁসি হচ্ছে। সো ওই বয়সে কাফকা পড়া তো, সো ওই বয়সে কাফকা কিন্তু অটোমেটিক্যালি প্রচণ্ড ভালো লাগা তৈরি হয়। কারণ ফ্রানৎস কাফকার প্রশ্নগুলাই বেসিক প্রশ্ন।

তো আমার ১৯৯০ এর শুরুর দিকের কাফকা আর এখন কাফকা কিন্তু আলাদা। এখন আমি কিন্তু কাফকা প্যাশন নিয়ে পড়ি। আর এখন ওই বয়সটাও পার হয়ে গেছে। ওই উচ্ছ্বাসটা আমার মধ্যে নাই। ওইটা হল, যে কোনো সাহিত্যের দিকে একটু ঝোঁকসম্পন্ন মানুষেরই ওই বয়সটা কেমন — টিপিক্যালি বাইশ থেকে ছাব্বিশ-সাতাশের বয়স যেটা? — ওই সময় বেসিক্যালি যেকোনো কিছুই, একটু স্পিরিচুয়াল রাইটিং, একটু, ইউ নো, একটু আত্মহত্যামূলক লেখা, সুইসাইডাল নোট, একটু জেলবন্দিদের কথা, কিছু সার্টেন জিনিস আছে একটা বয়সে ভালো লাগার বিষয়। ফ্রানৎস কাফকার জোসেফ কে এক সকালে বিনা অপরাধে গ্রেফতার হয়ে গেল — এটা পড়ার বয়সও তো ওইটা। তা বলে বলছি না যে, ফ্রানৎস কাফকা — মানে কী বলে — উঠতি বয়সের লোকের জন্য লেখক।

তখন ওই উচ্ছ্বাসটা থেকে কাফকাকে দেখে, একটা সার্টেন ব্যাখ্যার মধ্যে কাফকাকে দেখতাম — ফ্রানৎস কাফকা মানেই কাফকায়েস্ক। এখন যেমন কাফকার হিউমারটা ধরতে পারি। তখন ফ্রানৎস কাফকার হিউমার বলতে যে কিছু আছে আমরা তো ওই বয়সে বুঝি নাই। আমরা ওই বয়সে কাফকাকে বুঝতাম ভীতি, নৈরাজ্য, ভয়, আতঙ্ক, ইউ আন্ডাস্ট্যান্ড, সো দুঃস্বপ্ন–ফ্রানৎস কাফকা মানেই তাই। এখন যেমন আমরা বুঝতে পারি যে কাফকা কেন — দেখেন আমি একটা ইন্টারেস্টিং কথা যে — ট্রায়াল উপন্যাসটা এত নামকরা উপন্যাস, যেটা আমি ১৯৯০, ৯১ তে পড়ি, বিচার উপন্যাসটা, যে এক ব্যাংকার মানুষ অ্যারেস্টেড হয়ে যায়। পুরো উপন্যাস, সবাই গল্পের আউটলাইনটা সবাই জানে, যে না পড়ছে সেও কিন্তু জানে। যে কেউ কিন্তু বলতে পারে, আমি ট্রায়াল উপন্যাস পড়ছি। কারণ সবাই এত বেশি এটা জানে, যে কেউ বলতে পারে রূপান্তর গল্প আমার পড়া হয়ে গেছে। সবাই তেলাপোকার ব্যাপারে এত জানে, ফ্রানৎস কাফকার মজা তো ওইটাই যে ফ্রানৎস কাফকা বোধহয় প্রথম সাহিত্যিক, আধুনিক মানুষের, আধুনিকতারই আরেক রূপ ফ্রানৎস কাফকা। আধুনিক বিশ্বাসে এত বেশি কাফকা ঢুকে গেছে, দ্য কনশান্স অব মডার্ন ম্যান — আধুনিক মানুষের বিবেক কাফকা, এভাবে বলা হয়। বিচার উপন্যাসে যেমন ধরেন, এই পরে এসে জানলাম যে, কাফকা যখন ওই বিচার উপন্যাসটা বন্ধুদের কাছে পড়তেছে, প্রথম লাইন যে ওয়ান… এক সকালবেলা জোসেফ কে শুয়ে আছে তার বিছানায়, দুইজন লোক রুমে ঢুকল, তাকে অ্যারেস্ট করে বসল। সে বলল আমার অপরাধ কি? সে বলল যে না তোমাকে অ্যারেস্ট করা হয় নাই, তুমি ঘুরে বেড়াও অসুবিধা নাই। তোমার অ্যারেস্টটা এটাই যে তুমি ঘুরে বেড়াও, বাট তুমি অ্যারেস্টেড। এখনও সারা উপন্যাস জুড়ে সে চেষ্টা করতেছে ওর দোষটা কী তা জানার জন্য। ইন্টারেস্টিং গল্প, একটার পর একটা সিন হয় ওদের বাড়িওলির সাথে, অনেক ইউ নো অনেকগুলা পরতের ব্যাপার আছে, অনেক। সারা উপন্যাসে বহু কিছু ঘটে। ক্যাথেড্রাল সিন আছে, গির্জার সিন আছে, বিভিন্ন জায়গায় সে যায়, আদালতে যায়, আদালতের বিচারকার্য তারে নিয়াই হচ্ছে, সে হিয়ারিং শুনতে যায়, ওইখানে হিয়ারিংয়ে পার্টিসিপেট করতে যায়। তা এত বড় একটা সিরিয়াস ফ্রানৎস কাফকা, বিশ্বসাহিত্যে অসংখ্য হয়রানি, আমলাতান্ত্রিক হয়রানিতে নির্যাতিত মানুষের… প্রথম এইরকমভাবে বলছে–একটা লোক সে অ্যারেস্টেড। অস্তিত্ববাদীরা ব্যাখ্যা করে বসল মানুষের জন্মই হচ্ছে একটা গ্রেফতারের মতন, এই পৃথিবীটাই একটা কারাগার, কাফকা বোধহয় এইটাই ফুটায় তুলতে চাইছেন!

আমরা এই কিছুদিন আগে জানলাম, ধরেন ২০০৫-০৬ সালের দিকে যে কাফকা যখন নিজে প্রথমে পাণ্ডুলিপি বন্ধুদের কাছে পড়ে, ক্যাফে স্যাভয়তে, প্রাগে — কাফকা হাসির চোটে আর পড়তেই পারতেছিলেন না।

এত সিরিয়াস জিনিস কিন্তু কাফকার কাছে এত হাসির ছিল। অ্যান্ড কাফকার ফ্রেন্ডরাও হাসি– একটা টিপিক্যাল ক্যারিকেচার অব জোসেফ কে, সে ভাবতেছে সে অ্যারেস্টেড, হ্যাঁ। এটার মধ্যে একটা বিরাট একটা হাস্যরস আছে, এটার মধ্যে যে বিরাট একটা ফাইজলামি আছে এই কাফকাটা আমি বুঝি নাই — তখনই আসল কাফকাটা বুঝি যে কাফকা আসলে বহুত বুদ্ধিমান একটা লোক ছিলেন। ইউ আন্ডাস্ট্যান্ড?

কাফকা আমাদেরকে এমন একটা সিরিয়াস টোনে গল্পগুলা বলে গেছে, আমরাও এই ওয়াল্টার বেনজামিন থেকে শুরু করে থিওডোর অ্যাডর্নো থেকে শুরু করে, জ্যাঁ পল সার্ত্রে থেকে শুরু করে সিরিয়াস লেখকদের ব্যাখ্যাতে কাফকা এমন এক সিরিয়াস রূপ নিয়ে নিছে, ইদানীংকালে আবার কাফকার ডিকন্সট্রাকশন হচ্ছে। বুঝছেন, কাফকাকে অনেক দিক থেকে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে যেখানে… যেটা আমার মনে হয় যে মোর একটা ম্যাচিউরড ভিউ অব ফ্রানৎস কাফকা। কাফকা কি আসলেই এত ডার্ক, কাফকা কি আসলেই এত প্রোফেটিক?

কাফকাকে বলা হয় যে একেবারে দিব্যদর্শী লেখক–ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। পেনাল কলোনি– আমার বইতে যেটা গল্প আছে দণ্ড উপনিবেশে–ওখানে ভয়ঙ্কর একটা মেশিন আছে, ওই মেশিনের মধ্যে একটা মানুষকে কীভাবে মেরে ফেলা হয়, কীভাবে একটা মানুষকে… পুরা বিশ তিরিশ পাতার একটা গল্প। একটা মানুষ আর একটা মেশিন… একটা মানুষের মৃত্যু… তো থিওডোর অ্যাডর্নো বললেন যে ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালাইজেশনের রূপক। সো আবার ওয়াল্টার বেনজামিনের এই গল্পের ব্যাপারে ভাষ্য আছে যে, যেহেতু পরবর্তীকালে জার্মান বন্দিশিবিরগুলা হলো, সো যে কাফকা, ১৯২২ সালে বোধহয় গল্পটা লেখা বা ২০ সালের দিকে, যে প্রায় বিশ বছর আগেই উনি কী করে বিশ্বযুদ্ধটা বুঝলেন?

সো এগুলা আমার মনে হয় খুব বেশি ফার-ফেচিং, এগুলা মনে হয় খুব বেশি মানে টেনে ধরা, আমার কাছে প্রোফেটিক মনে হয় না। কাফকা তার সময়ে বসেই তার সময়কেই লিখছেন। ঊনি বিরাট পয়গম্বরও ছিলেন উনি বিরাট কোনো ভবিষ্যৎ জ্ঞান বক্তাও… ভবিষ্যৎ বক্তা হওয়া সম্ভব নাকি মানুষের পক্ষে!

কাফকা তার সময়টাকেই দেখছেন। খুব একটা কষ্টের পরিবেশে, পরিবারে থাকতেন। অ্যান্ড মানুষটা বেসিক্যালি ছিলেন দুঃখবাদী। এবং তার ডায়েরি, তার চিঠিগুলা পড়লে বোঝা যায় সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করার স্বভাব ছিল। আর উনি তো বললাম তো তার একটা অদ্ভুত বুদ্ধি ছিল, যে বুদ্ধির বলে, উনি আধুনিক পৃথিবীর যাবতীয় খেলাগুলো না উনি ধরে ফেলছিলেন বলে আমার বিশ্বাস।