এমনেস্টির রিপোর্ট: মৃত্যুদণ্ড বেড়েছে বাংলাদেশে

loring-amnesty-international-logo

ইসরেলের রামিয়া জেলখানায় ৩১ মে ১৯৬২-তে মাঝ রাতে জার্মান নাৎসি লেফটেনান্ট কর্নেল এডলফ আইখম্যানকে ফাসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তিনি অভিযুক্ত হয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়ে গণহারে ইহুদি হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে।

তার বিচারকালে এবং মৃত্যুর পরেও মৃত্যুদণ্ডের যৌক্তিকতা ও নৈতিকতা বিষয়ে পশ্চিমে জোরালো বিতর্ক চলতে থাকে। মৃত্যুদণ্ড বিরোধীরা তখন বলেন, যেহেতু ইহুদিরা নিজেরাই মৃত্যুদণ্ডের ভিকটিম হয়েছিল, সেহেতু ইসরেলে বসবাসকারী ইহুদিদের বোঝা উচিত ছিল মৃত্যুদণ্ডের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা। তারা বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরে ১৯৪৮-এ ইহুদি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ইসরেল প্রতিষ্ঠিত হবার পর, ইসরেলি সরকার প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য আইখম্যানকে ফাসি দিয়েছে।

হয়তো এই সমালোচনার যথার্থতা উপলব্ধির ফলে আইখম্যানের মৃত্যুদণ্ডের পরে ইসরেলের বেসামরিক আদালত আর কোনো মৃত্যুদণ্ড দেয়নি। তবে ইসরেলের একটি সামরিক আদালত এক সেনা অফিসারের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল এবং সেটা কার্যকর হয়েছিল। অর্থাৎ, ইসরেলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও ১৯৪৮-এর পরে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি মৃত্যুদণ্ড দেয়া এবং কার্যকর করা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি
কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে কি হয়েছে? মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত হবার জন্য বিশ্বে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী লন্ডন ভিত্তিক সংস্থার নাম এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সংক্ষেপে এমনেস্টি নামেও পরিচিত।

প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে মৃত্যুদণ্ড এবং সেটা কার্যকর করা বিষয়ে এমনেস্টি তাদের বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করে। মার্চ ২০১৪-তে প্রকাশিত এমনেস্টি তাদের বার্ষিক রিপোর্টে জানিয়েছে:

২০০৪-২০১৩ পর্যন্ত দশ বছরে মৃত্যুদণ্ড বিলোপকারী দেশের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৩-র শেষে বিশ্বের মোট ৯৮টি দেশ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আইন তুলে দিয়েছে। দশ বছর আগে ২০১৪-তে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ ছিল ৮৫টি দেশে। কিছু দেশে আইনত মৃত্যুদণ্ড চালু থাকলেও তা কার্যকর করা হয় না। এই ধরনের দেশের সংখ্যা ৫২। অর্থাৎ মোট (৯৮+৫২) = ১৪০টি দেশে এখন মৃত্যুদণ্ড, হয় আইনত নিষিদ্ধ অথবা নিষিদ্ধ না হলেও, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় না। মোট ৫৮টি দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে, যাদের অন্যতম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কাছাকাছি দেশগুলোর মধ্যে ভুটান, নেপাল ও মায়ানমার ও মরিশাস মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে। শ্রী লংকা, মায়ানমার ও মালদ্বীপে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও সেখানে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইনডিয়া, মালয়শিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে এবং কার্যকর করেছে।

এমনেস্টির রিপোর্টে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে: ২০১৩-তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে দুটি। তবে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে কমপক্ষে ২২০ জনকে। এদের মধ্যে ১৫২টি মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ মামলায়। এই মামলায় অভিযুক্তরা অভিযোগ করেন, বিচারের আগে আটক অবস্থায় তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে।

এমনেস্টির পাওয়া হিসাব মতে, ২০১৩ সালে ২২টি দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এই সংখ্যা ২০১২ সালের চাইতে একটি বেশি। বছর শেষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় ছিল কমপক্ষে ১,১০০ মানুষ।

রিপোর্টে আরো বলা হয় হয়েছে, বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের পরিধি বাড়ানো হয়েছে ১৬ জুন ২০১৩-তে। তখন জাতীয় সংসদ শিশুদের সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহারের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন দেয় চিলড্রেন অ্যাক্ট ২০১৩ বা শিশু আইন ২০১৩-এর মাধ্যমে।

২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার কার্যক্রমের বিষয়ে অব্যাহতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক নয়, জাতীয় পর্যায়ের এই আদালত গঠন করা হয় ২০১০ সালে। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বিচার করা। এতে যারা ওইসব অপরাধের জন্য দায়ী বলে আটক করা হয় তাদের বেশির ভাগই বিরোধী দুটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। যে আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার চলছিল, সরকার সে আইন জাতীয় সংসদের মাধ্যমে ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সংশোধন করে। এতে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করে। ওই সংশোধিত আইনের অধীনে আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন আপিল করার সুযোগ পায়।

২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এর মধ্যে দুটি মামলার একটিতে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সংশোধিত আইনের অধীনে প্রসিকিউশন এই শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করে। ৫ ডিসেম্বর এর জবাবে সুপৃম কোর্ট ওই শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে। এ ক্ষেত্রে আপিল করার সুযোগ না দিয়ে আবদুল কাদের মোল্লার ফাসি কার্যকর করা হয় ১২ ডিসেম্বর ২০১৩-তে।

২৯ শে এপৃল জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক কাউন্সিল (ইউএন হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল) তার ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ-এর অধীনে বাংলাদেশকে পর্যালোচনা করে। এতে সরকারকে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান পুনর্বিবেচনা করার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। মৃত্যুদণ্ডের শাস্তিকে শিথিল করতে অথবা মৃত্যুদণ্ডকে বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছিল।

এমনেস্টির এই রিপোর্টে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে এ অঞ্চলের ১০টি দেশে কমপক্ষে ৩৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল আফগানিস্তানে ২টি, বাংলাদেশে ২টি, ইনডিয়াতে ১টি, ইন্দোনেশিয়ায় ৫টি, জাপানে ৮টি, মালয়শিয়ায় কমপক্ষে ২টি, তাইওয়ানে ৬টি, ভিয়েতনামে ৭টি। ১৭টি দেশে এ সময়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে মোট ১,০৩০টি। এর মধ্যে ছিল আফগানিস্তানে ১৭৪টি, বাংলাদেশে ২২০টি, ইনডিয়াতে ৭২টি, ইন্দোনেশিয়ায় ১৬টি, জাপানে ৫টি, লাওসে ৩টি, মালয়শিয়ায় ৭৬টি, মালদ্বীপে ১৩টি, পাকিস্তানে ২২৬টি, সিঙ্গাপুরে ১টি, সাউথ কোরিয়ায় ২টি, শ্রীলঙ্কায় ১৩টি, তাইওয়ানে ৭টি, থাইল্যান্ডে ৫০টি ও ভিয়েতনামে ১৪৮টি। তবে চায়না ও নর্থ কোরিয়ায় কি সংখ্যায় মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বা কি সংখ্যায় মানুষের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়েছে তা জানা যায়নি। কারণ এ দেশ দুটিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় গোপনীয়ভাবে। এ বিষয়ে সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই। কোনো মিডিয়াও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

২০১৩ সালের নথিপত্র অনুযায়ী সারা বিশ্বে ২২টি দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে মোট ৭৭৮টি। আগের বছর অর্থাৎ ২০১২ সালের তুলনায় এ সংখ্যা শতকরা ১৫ ভাগ বেশি। চায়নাকে বাদ রেখে বিশ্বে যে পরিমাণ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে তার মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে মাত্র তিনটি দেশে। এ দেশগুলো হলো: ইরান, ইরাক ও সৌদি আরব।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০১৩ সালে মৃত্যুদণ্ডকে বাতিল করার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। এ সময় উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে টেক্সাস। যুক্তরাষ্ট্রে যেসব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তার ৪১% হয় শুধু টেক্সাসে। ইওরোপ ও মধ্য এশিয়ায় এ সময়ে কোনো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। ২০০৯ সালের পর এটাই ওই অঞ্চলে প্রথম মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ার ঘটনা।

মৃত্যুদণ্ড বাতিল করতে সংবিধান ও আইন পর্যালোচনা করা হয়েছে বেনিন, কমোরোস, ঘানা ও সিয়েরা লিওনে। আরো একবার মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের বিষয়টি স্থগিত করেছে পাকিস্তান। দ্বিতীয় বছরের মতো সিঙ্গাপুরে কোনো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। সেখানে ৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি শিথিল করা হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস-এর ১০ সদস্যের মধ্যে তিনটি দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। এগুলো হলোÑ ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া ও ভিয়েতনাম। কমনওয়েলথের ৫৪ সদস্যের মধ্যে ৫টি দেশে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এগুলো হলোÑ বাংলাদেশ, বোতসোয়ানা, ইনডিয়া, মালয়শিয়া ও নাইজেরিয়া।

২০১৩ সালে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৭৩টি সদস্য রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ডমুক্ত ছিল। রিপোর্টে ইনডিয়া সম্পর্কে বলা হয়, ওই বছর ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩-তে রাজধানী দিল্লির তিহার জেলে গোপনে মোহাম্মদ আফজাল গুরুর ফাসি কার্যকর করা হয়। ইনডিয়ার পার্লামেন্টে হামলা ষড়যন্ত্রের দায়ে তাকে ২০০২ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। পৃভেনশন অফ টেররিজম অ্যাক্ট আইনের অধীনে বিশেষ আদালতে তার বিচার করা হয়। যে আইনের অধীনে ওই বিচার করা হয় তাতে আন্তর্জাতিক সুষ্ঠু আইনের মানদণ্ডের ঘাটতি রয়েছে। ২০০৫ সালের আগস্টে ইনডিয়ার সুপৃম কোর্ট আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করে। ফেব্রুয়ারি তার প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রেসিডেন্ট প্রত্যাখ্যান করেন। রিপোর্টে বলা হয়, আফজাল গুরুর সুষ্ঠু বিচারের গুরুতর উদ্বেগের বিষয়ে মনোযোগ দেয়া হয়নি। তাকে ফাসি দেয়ার আগে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়নি। শেষ শ্রদ্ধা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য মৃতদেহ দেওয়া হয়নি পরিবারের সদস্যদের কাছে। এটা ছিল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে এক মেডিকাল পড়–য়া ছাত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়। এরপর তার মৃত্যু হয়। নারীদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের আইন পর্যালোচনা করতে আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠন করা হয় জাস্টিস বর্মা কমিটি। ২৩ জানুয়ারি ২০১৩-তে ওই কমিটি সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করে। ওই রিপোর্টে ধর্ষণ ও অন্য কোনো যৌন অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করা হয়। তা সত্ত্বেও এপৃল ২০১৩-তে ইনডিয়ার পার্লামেন্ট পাস করে কৃমিনাল ল (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০১৩। এতে মৃত্যুদণ্ডের পরিধি বাড়ানো হয়। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০১৩ ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ ও তার মৃত্যুর ঘটনায় দিল্লির এক আদালত চার অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সারা বছরে নতুন ৭২টি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। বছর শেষে সেখানে কমপক্ষে ৪০০ মানুষের ফাসি কার্যকরের অপেক্ষায় ছিল।

দশ বছর আগে ২০০৪-এ এই সংখ্যা ছিল ২৫। এর তাৎপর্য হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

২০১৩-তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল নিচের কয়েকটি দেশে:
চায়না: ১০০০-এর বেশি। চায়নাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বিষয়ে তথ্য পাওয়া দুষ্কর।
ইরান ন্যূনপক্ষে ৩৬৯
ইরাক ন্যূনপক্ষে ১৬৯
সৌদি আরব ন্যূনপক্ষে ৭৯
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- ন্যূনপক্ষে ৩৯৯
সোমালিয়া ন্যূনপক্ষে ৩৪
সুদান ন্যূনপক্ষে ২১
ইয়েমেন ন্যূনপক্ষে ১৩
জাপান ন্যূনপক্ষে ৮
ভিয়েতনাম ন্যূনপক্ষে ৭
তাইওয়ান ন্যূনপক্ষে ৬
ইন্দোনেশিয়া ন্যূনপক্ষে ৫
কুয়েত ন্যূনপক্ষে ৫
সাউথ সুদান ন্যূনপক্ষে ৪
নাইজেরিয়া ন্যূনপক্ষে ৪
প্যালেস্টাইন অথরিটি (গাজা) ন্যূনপক্ষে ৪
আফগানিস্তান ন্যূনপক্ষে ২
বাংলাদেশ ন্যূনপক্ষে ২
মালয়শিয়া ন্যূনপক্ষে ২
বতসোয়ানা ন্যূনপক্ষে ১
ইনডিয়া ন্যূনপক্ষে ১
নর্থ কোরিয়া অজানা

যে ৯টি দেশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেই চলেছে ২০০৯-২০১৩ বছরগুলোতে:
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র: তবে আগের তুলনায় কম।
ইরাক: পরপর তিন বছর জুড়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বেড়েছে।
সুদান: রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করার লক্ষ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
সৌদি আরব: যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই বিদেশী নাগরিক।
ইয়েমেন: কিশোর অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার জন্য রাষ্ট্রপতি আদেশ দিয়েছেন।
ইরান: যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে তাদের পরিবার এবং উকিলদের প্রায় সময়েই জানানো হয়নি।
বাংলাদেশ: একটি মামলাতে ১৫২টি নতুন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
চায়না: প্রতি বছর হাজার হাজার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। কিন্তু সংখ্যা রাষ্ট্রীয়ভাবে গোপন রাখা হয়।
নর্থ কোরিয়া: অধিকাংশ মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্যে কার্যকর করা হয়। রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

পজিটিভমুখী নেগেটিভমুখী
এমনেস্টির এই সর্বশেষ রিপোর্টে ২০১৩ সালের কয়েকটি পজিটিভমুখী এবং কয়েকটি নেগেটিভমুখী ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে।

পজিটিভমুখী ঘটনাসমূহ
বেলারুশ, সিঙ্গাপুর ও ইউনাইটেড আরব এমিরেটস (ইউএই)-তে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।
গামবিয়া ও পাকিস্তানে ২০১৩-তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আবার শুরু হলেও পরে সেটা স্থগিত করা হয়।
বাহরেইন, বেনিন, শাদ ও জ্যামাইকাতে কোনো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি।
গ্রেনাডা, গুয়াতেমালা ও সেইন্ট লুসিয়াতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো জেলবন্দি নেই।
সিঙ্গাপুরে কয়েকটি বিশেষ অপরাধে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের যে বিধান ছিল, সেটা বিলোপ করা হয়।
বলিভিয়া, ল্যাটভিয়া, গিনি বাসাউ ও অ্যাংগোলা মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করতে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর দিতে রাজি হয়।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ৩৯টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০১২-র তুলনায় এই সংখ্যা ১০% কম।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্য মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করতে রাজি হয়। ফলে এখন আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধকারী অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৮।

নেগেটিভমুখী ঘটনাসমূহ
গত পাচ বছর জুড়ে ৯টি দেশ প্রতি বছরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।
৬টি দেশ বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আইন প্রয়োগ করেছে।
১৩টি দেশ ড্রাগস সম্পর্কিত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া চালু রেখেছে।
৩টি দেশ অর্থনৈতিক (যেমন, দুর্নীতি) কারণে মৃত্যুদণ্ড চালু রেখেছে।
ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত, নাইজেরিয়া ও ভিয়েতনামে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ হয়ে গেলেও ২০১৩ থেকে আবার চালু হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংখ্যা ইরানে ১৮% এবং ইরাকে ৩০%-এর বেশি বেড়েছে।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে যেসব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তার ৪১%-ই হয় টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে এবং এই সংখ্যা ২০১২-র তুলনায় ৩৪% বেড়েছে।
সৌদি আরব এবং সম্ভবত ইরান ও ইয়েমেনে ১৮ অনূর্ধ্ব ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

কয়েকটি আলোচিত ঘটনা
মার্চ ২০১৪-তে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ডেথ সেনটেন্সেস অ্যান্ড একজিকিউশনস ২০১৩ (Death Sentences and Executions 2013) রিপোর্টটি প্রত্যাশিতভাবে বিশ্ব জুড়ে আলোচিত হয়। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে আরো কয়েকটি ঘটনা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

রাজীব হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই
ইনডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তিন আসামির শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির সুপৃম কোর্ট। আসামিরা হলেন Ñ সন্থান, মুরুগান ও পেরারিভালন। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মওকুফ করে আসামিদের মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি তামিলনাড়– সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এনডিটিভি অনলাইনে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪-তে ভারতের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপৃম কোর্টের একটি বেঞ্চ এ আদেশ দিয়েছেন।

১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধীকে হত্যা করা হয়। রাজীব হত্যা মামলায় ওই তিন আসামিকে ১৯৯৮ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিলেও আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল থাকে। এরপর আসামিরা ২০০০ সালে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করেন। ১১ বছর পর ওই আবেদন নাকচ করা হয়। তবে রাষ্ট্রপতির কাছে করা ক্ষমার আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ার যুক্তিতে মাদ্রাজ হাই কোর্ট আসামিদের ফাসি কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পেরারিভালনের পরিবারের দাবি, আসামিকে ২৩ বছর জেলে রেখে সরকার ইতিমধ্যে তাকে হত্যা করেছে। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তিন আসামির শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়ার পক্ষে সুপৃম কোর্ট যুক্তি দিয়েছেন যে, আসামিদের ক্ষমার আবেদনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সিদ্ধান্ত আসতে ১১ বছর লেগেছে এবং সেটা ছিল সুদীর্ঘ।

ইয়াকুব মেননের ফাসি স্থগিত করেছে ইনডিয়ার সুপৃম কোর্ট
১৯৯৩ সালে ইনডিয়ার মুম্বাই জুড়ে ধারাবাহিক বোমা হামলার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি ইয়াকুব মেননের ফাসি স্থগিত করেছেন দেশটির সুপৃম কোর্ট। টাইমস অফ ইনডিয়ার খবরে বলা হয়, ইয়াকুব মেননের আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপৃম কোর্টের একটি বেঞ্চ মহারাষ্ট্র সরকার এবং অন্যদেরকে নোটিশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে মেননের ফাসির প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে বলে আদেশ দেন।

১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ের ১২টি জনবহুল এলাকায় ধারাবাহিক বোমা হামলায় ২৫৭ ব্যক্তি প্রাণ হারান ও আরো প্রায় ৭০০ আহত হন। হামলার ঘটনায় ১২৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে এদের মধ্যে ১০০ জনকে ২০০৬ সালে দেশটির একটি আদালত দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেন। এর মধ্যে ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ২০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর বাকিদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
সুপৃম কোর্টের আরেকটি বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে ১০ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন। তবে অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় ইয়াকুব মেননের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। মেনন পেশায় একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট।

রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে ইয়াকুব মেনন আবেদন করেছিলেন। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপৃম কোর্টে আবেদন করেছিলেন মেনন। এর প্রেক্ষিতে সুপৃম কোর্টের ওই বেঞ্চ মেননের ফাসির কার্যক্রম স্থগিত করেন।

জনপ্রিয় ইরানি কবি হাশেম শাবানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪-তে ইরান হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টেশন সেন্টার জানায়, ইরানে জনপ্রিয় কবি ও মানবাধিকার কর্মী হাশেম শাবানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। শাবানি ছিলেন ইরানের আহওয়াজি (Ahwazi) সম্প্রদায়ভুক্ত এবং মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৩২। ২০১১-তে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ওই সময়ে তার সঙ্গে অন্ততপক্ষে আরো চারজন আরবকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এদের মধ্যে শাবানির বন্ধু হাদি রাশেদিও ছিলেন এবং তারও মৃত্যুদণ্ড একই সময়ে কার্যকর করা হয়।

হাশেম শাবানি ও হাদি রাশেদি উভয়েই ছিলেন ডায়ালগ ইন্সটিটিউট নামে একটি সংগঠনের সদস্য। ইরান সরকার এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষিত করেছিল। ২০১২-তে আহবাজ (Ahvaz ইসলামি বিপ্লবী আদালত শাবানি ও রাশেদিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল, তারা ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ করছিলেন। অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে ছিল, তিনি দুর্নীতির বীজ বিশ্বে বপন করছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচার করছেন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজ করছেন।

গ্রেফতারের পরে ইরান সরকার নিয়ন্ত্রিত টিভিতে শাবানিকে দেখান হয়েছিল। তিনি যে সন্ত্রাসী ছিলেন সেটা তিনি তখন ‘স্বীকার’ করেন। কিন্তু বিভিন্ন রিপোর্টে জানা যায়, বহু মাস বন্দি থাকার সময়ে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং তিনি ওই ‘স্বীকারোক্তি’ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
২০১৩-তে আহওয়াজ (Ahwaz) নিউজ এজেন্সি শাবানির লেখা একটি চিঠি প্রকাশ করে। এতে তিনি লেখেন, ‘আমার লক্ষ্য যা-ই থাকুক না কেন, আমি কখনোই কোনো সশস্ত্র কাজে অংশ নিইনি… যে নিষ্ঠুরতন্ত্র মানুষের মনকে বন্দি করার চেষ্টা করছে আমি তার বিরুদ্ধে আমার কলম নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম… আমি মনে করি এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষেরই পূর্ণ নাগরিক অধিকারসহ মুক্তভাবে বেচে থাকার অধিকার আছে। মানুষের এই বৈধ অধিকার রক্ষার জন্য আমি কাজ করেছি আমার কলম দিয়ে… ভয়াবহ নৃশংসতার বিরুদ্ধে আমার এই লড়াইয়ে আমার কলমই ছিল একমাত্র অস্ত্র।’

শাবানি হাই স্কুলে আরবি সাহিত্য পড়াতেন এবং ‘শান্তি উৎসব’ (Peace Festival)-এর আয়োজন করতেন। সরকার এই উৎসবও নিষিদ্ধ করেছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ শাবানি ছিলেন এক সন্তানের পিতা। আবু আলা আল-অফোগি (Abo Ala Al-Ofoghi) ছদ্মনামে অনলাইনে তিনি লিখতেন।

ইরান হিউম্যান রাইসট ডকুমেন্টেশন সেন্টার প্রকাশিত সংখ্যাতত্ত্বের মতে, আগস্ট ২০১৩-তে মাহমুদ আহমেদিনেজাদের পরে বর্তমান রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি ক্ষমতাসীন হবার সময়ে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল একজন মধ্যপন্থী মডারেট রূপে। কিন্তু আগস্ট ২০১৩-তে রুহানি রাষ্ট্রপতি হবার পর অন্ততপক্ষে ৩০০ মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ইরানে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ড্রাগস চোরাচালানের অভিযোগে। এর পরই রয়েছে ধর্ষণ, খুন এবং অ্যাপস্ট্যাসি (Apostasy) বা স্বধর্ম ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শাবানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে।
সন্তানের খুনিকে ফাসির বদলে চড়

সম্প্রতি একজন ইরানি মা তার সন্তানের হত্যাকারীকে ফাসির মঞ্চে মৃত্যু কার্যকর করার কয়েক সেকেন্ড আগে ক্ষমা করে দিয়ে বিশ্ব মিডিয়ার আলোচনার শিরোনাম হন। মৃত্যুদণ্ডের বদলে একটি চড় মেরে তিনি নিজের রাগ মিটিয়েছেন! ইরানের প্রায় সবগুলো দৈনিকে খবরটি ছবিসহ প্রকাশিত হয় ১৭ এপৃল ২০১৪-তে।

২০০৭ সালে ১৯ বছর বয়সী বেলাল রাস্তায় কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ছুরি মেরে তারই সমবয়সী তরুণ আব্দুল্লাহ হোসেইন যাদেহকে হত্যা করেছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সম্প্রতি ইরানের সুপৃম কোর্ট বেলালকে ফাসিতে ঝুলিয়ে হত্যার চূড়ান্ত নির্দেশ দেন। ইরানে কিছু অপরাধের রায় জনম্মুখে কার্যকর করা হয়, যাতে তা দেখে অন্যরা এসব অপরাধ করতে সাহস না পায়। ফাসির রায় সাধারণভাবে ভোরে সূর্যোদয়ের আগ মুহূর্তে কার্যকর করা হয়। ফাসি কার্যকরের ঘোষণা আগেই দিয়ে দেয়া হয়, যাতে দর্শকরা সেখানে সময় মতো এসে পৌছাতে পারেন।
রেডিও তেহরানের খবরে বলা হয়, ১৫ এপৃল ২০১৪ মঙ্গলবার ভোরে ইরানের উত্তরাঞ্চলের শহর নোশাহরে বেলালকে জনসম্মুখে স্থাপিত একটি ফাসির মঞ্চে নিয়ে আসা হয়। এ সময় ফাসির দৃশ্য দেখতে সেখানে সমবেত হয় শত শত মানুষ। সমবেত জনতার মধ্যে ছিল বেলালের মা-বাবাসহ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন। কালো কাপড়ে বেলালের চোখ বেধে তার গলায় ফাসির রশি পরানো হয়। এ অবস্থায় নিহত আব্দুল্লাহর মা সামেরেহ আলীনেজাদ ফাসি মঞ্চের একেবারে কাছাকাছি চলে যান। দুই ছেলের ও এক মেয়ের মা সামেরেহ ২০১০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তার দ্বিতীয় ছেলেকেও হারিয়েছেন। তিনি সমবেত জনতার কাছে জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কি জানেন, সন্তানবিহীন খালি ঘরে বসবাস করা কতটা কঠিন?
এরপর তিনি নিরাপত্তা কর্মীদের বলেন, আমার সন্তানের ঘাতকের সঙ্গে আমার কথা আছে। আমাকে তার কাছে যেতে দিন। সামেরেহ নিজ সন্তানের ঘাতকের সামনে গিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে তাকে একটি থাপ্পড় মারেন। তারপর বলেন, তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। এরপর নিজ হাতে তার গলা থেকে ফাসির দড়ি খুলে দেন।

এ কাজে তাকে সাহায্য করেন তার স্বামী আব্দুল গনি হোসেইন যাদেহ ও নিরাপত্তা কর্মীরা। আবদুল গনি একজন অবসরপ্রাপ্ত পেশাদার ফুটবলার। তিনি সোমবার রাতেই তার সন্তানের ঘাতককে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী সামেরেহ ক্ষমা করতে সময় নেন ফাসির দণ্ড কার্যকর করার মুহূর্ত পর্যন্ত। ইরানের আইনে নিহত ব্যক্তির অভিভাবক ঘাতককে ক্ষমা করে দিলে, রাষ্ট্র তার দণ্ড মওকুফ করে দেয়। আর অভিভাবক ক্ষমা না করলে রাষ্ট্রের পক্ষে দণ্ড মওকুফ করা সম্ভব নয়।

নিহত আব্দুল্লাহর মা সামেরেহ আলীনেজাদ বলেন, আমি আল্লাহতে বিশ্বাসী। আমি স্বপ্নে দেখেছি আমার সন্তান আমাকে বলছে, সে শান্তিতে আছে। এ ছাড়া আমার সব আত্মীয়স্বজন এমনকি আমার মা-ও ঘাতককে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি আরো বলেন, ঘাতক কান্নাকাটি করে আমার কাছে ক্ষমা চায়। আমি তার গালে চড় মারি। ওই থাপ্পড় আমার রাগ কমিয়ে দেয়। তাকে ক্ষমা করার পর আমি শান্তি বোধ করছি।

নতুন জীবন পাওয়া ঘাতক বেলাল পরে জানিয়েছে, প্রতিশোধ এবং ক্ষমার মাঝামাঝি অবস্থায় সে আব্দুল্লাহর মায়ের থাপ্পড় খেয়েছে। সে তার বন্ধুদের অনুরোধ করেছে, কেউ যেন চাকু হাতে ঘরের বাইরে বের না হয়।

জাপানের কনডেমড সেলে ৪৬ বছর থাকার পরে পুনর্বিচারের আদেশ
মৃত্যুদণ্ড বিরোধীদের জন্য ২০১৪-র সবচেয়ে বড় সুসংবাদ ছিল জাপানে কনডেমড সেলে ৪৬ বছর থাকার পর একটি আদালত আইওয়াও হাকামাদার পুনর্বিচারের আদেশ দিয়েছে। ১৯৬৮-তে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং এখন তার বয়স ৭৮। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, হাকামাদা-ই হচ্ছেন কনডেমড সেল বা ডেথ রো (Death Row)ি-তে দীর্ঘতম সময় কাটানো ব্যক্তি।

আইওয়াও হাকামাদা ছিলেন একজন প্রফেশনাল বক্সার বা মুষ্টিযোদ্ধা। শিজুফা-তে একটি সয়াবিন প্রসেসিং ফ্যাক্টরিতে তিনি কাজ করতেন। ওই ফ্যাক্টরিতে হঠাৎ একদিন আগুন লেগে যায়। এরপরে ফ্যাক্টরির মালিক, তার স্ত্রী ও তাদের দুই সন্তানের যে লাশ পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় তারা ছুরিকাহত হয়েছিলেন অগ্নিকাণ্ডের আগেই।

হাকামাদা অভিযুক্ত হন ওই পরিবারকে হত্যার দায়ে। ২০ দিন তাকে হাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার কাছ থেকে একটা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। কিন্তু আদালতে বিচারের এক পর্যায়ে হাকামাদা বলেন, টর্চার করে সেই স্বীকারোক্তি দেওয়া হয়েছিল।

জাপানের পুলিশ সাধারণত স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মামলা দায়ের করে। তবে সমালোচকরা বলেন, এসব স্বীকারোক্তি প্রায়ই জোর করে আদায় করা হয়। এই হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণস্বরূপ আদালতে হাকামাদার রক্তমাখা পোশাক পেশ করা হয়। হাকামাদাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে হাকামাদার বড় বোন হিদেকো, যার বয়স এখন ৮১, তিনি আইনি যুদ্ধ চালিয়ে যান।

সাম্প্রতিক সময়ে সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য ডিএনএ টেস্টের রীতি চালু হবার পরে হিদেকো আশার আলো খুজে পান। তার পক্ষের উকিলরা নতুন একটি শুনানিতে দাবি করেন, হাকামাদার পোশাকে যে রক্ত পাওয়া গিয়েছিল তার সঙ্গে হাকামাদার ডিএনএ ম্যাচ করে না।

এই শুনানিতে বিচারক হিরোসাকি মুরায়ামা বলেন, ওই পোশাকই হাকামাদার ছিল না। তার মুক্তির আদেশ দিয়ে বিচারক বলেন, ‘যতই হাকামাদার নির্দোষ প্রমাণের ভিত্তি দৃঢ়তর হচ্ছে ততই তাকে জেলবন্দি রাখাটা অন্যায় হচ্ছে।’

৪৬ বছর আগে হাকামাদারকে মৃত্যুদণ্ড দানকারী যে তিনজন বিচারক ছিলেন, তাদের মধ্যে একজন এখন প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছেন যে, তিনি মনে করেন হাকামাদা নির্দোষ ছিলেন। জাপানে এই ধরনের কোনো বিবৃতি কোনো বিচারক দেন না। কিন্তু বিবেকের দংশনের ফলে তিনি এখন তার মত পালটাতে বাধ্য হয়েছেন। হাকামাদার সৌভাগ্য যে বিচারক এখনো বেচে আছেন।

হাকামাদার বোন হিদেকো বলেছেন, যারা আমাদের সাহায্য করেছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি খুব খুশি।

জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের ভিভিত্তে মৃত্যুদণ্ডের পরপরই যদি ৪৬ বছর আগে নির্দোষ হাকামাদার ফাসি হয়ে যেত তাহলে সত্যটা প্রতিষ্ঠিত হবার কোনো সুযোগ থাকত না। আর সে জন্যই কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত নয়।