লেডি ম্যাকবেথের ট্র্যাজেডি ও বাংলাদেশে সমাধি ডাকাতি

Serajur Rahman

অমর কবি-নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ট্র্যাজিক নাটক ‘ম্যাকবেথ’ একটি ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে রচিত। ম্যাকবেথ স্কটল্যান্ডের একজন অভিজাত জমিদার। তিন ডাইনি তার স্ত্রীকে বলেছিল যে তিনি রানী হবেন। তাকে রানী হতে হলে তার স্বামীকে অবশ্যই রাজা হতে হয়। কিন্তু ম্যাকবেথ উচ্চাভিলাষী ছিলেন না। স্ত্রী ক্রমাগত তাকে তাড়না ও প্ররোচনা দিতে থাকেন। অবশেষে ম্যাকবেথ রাজাকে হত্যা করতে রাজি হন। স্কটল্যান্ডের রাজা ডানকান ম্যাকবেথের ক্যাসলে (দুর্গ প্রাসাদ) বেড়াতে এলে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাকে হত্যা করা হয়। লেডি ম্যাকবেথ রানী হয়েছিলেন সত্যি, কিন্তু রানীর মর্যাদা বেশি দিন ভোগ করার সৌভাগ্য তাদের হয়নি। অপরাধবোধ তাদের মনস্তত্ত্বকে ভয়ানক প্রভাবিত করে। রাজা-রানী উভয়েই অশুভ দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকেন। রানীর সব সময় মনে হতো যে, ডানকানের রক্তে তার হাত লাল হয়ে আছে। যখন তখন তিনি সাবান ঘষে হাত ধৌত করেন, কিন্তু রক্তের দাগ কিছুতেই যায় না। কোনো কিছুতেই তার আর মন বসে না। নাটকের পঞ্চম অঙ্কে এসে রানী (যবনিকার অন্তরালে) আত্মহত্যা করেন।

বাংলাদেশে অনেকে নিশ্চয়ই ভাবেন অপরাধবোধ আর অনুশোচনা কি উচ্চাভিলাষীদের ওপর কোনো দিন প্রভাব ফেলবে? আমাদের ধর্মে আর আমাদের সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয় পাপ-পুণ্যের চূড়ান্ত বিচার হবে শেষ বিচারের দিনে, কিন্তু নরকযন্ত্রণা পৃথিবীতেই ভোগ করতে হয় অনেককে। দুর্ভাগ্যবশত বিচারের জন্য তত দিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার সুযোগ অনেকের হয় না।

রাজনৈতিক পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলা অতি সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ‘সংস্কৃতি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৃষ্টান্ত দিতে বেশি দূর যেতে হবে না। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও রাজনৈতিক কারণে নিহতদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে আবার সেই যে গুম হয়ে যান তাদের খোঁজ আর কখনো পাওয়া যায় না। ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম আর মুজিবুর রহমান তাদের কয়েকজন মাত্র। তাদের কবরে দুটো দোয়া পড়ার সুযোগ পান না আত্মীয়স্বজন। যেন তাদের কবরও চুরি হয়ে গেছে। ইদানীং এই হত্যাগুলোর বেশির ভাগই হচ্ছে শাসক দলের ভেতরে, ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির লোভে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা, ফুলগাজীতে উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যাÑ এগুলো জাজ্বল্যমানভাবে শাসক দলের গৃহযুদ্ধের বিষফল।

সাড়ে পাঁচ বছর ধরে সম্পত্তির লোভে অনেক হত্যা হচ্ছে। দুঃখের বিষয়, ব্যাপারগুলো যেন সাধারণ মানুষের গা-সওয়া হয়ে গেছে। কালশীর বিহারি ক্যাম্পে এতগুলো অমানুষিক খুন হলো, কিন্তু জাতি কি তাতে মর্মাহত হয়েছে? এ অবস্থা হঠাৎ করে হয়নি; ‘কচুগাছ কাটতে কাটতে ডাকাত হয়’। মানুষের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা, মৃতদের প্রতি কর্তব্যে অবহেলা এবং মৃতব্যক্তির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে ব্যর্থতা ইত্যাদি থেকেই বর্তমান পাশবিক তাণ্ডবের সূচনা। একটু খতিয়ে দেখলেই দেখা যাবে, এই প্রবণতা শুরু হয়েছে শীর্ষ মহল থেকে। ঊর্ধ্বতন মহলের সহিংসতা ধীরে ধীরে নি¤œতর পর্যায়কেও পথ দেখিয়েছে। ওপরওয়ালারা যা করতে পারেন, সেটা করতে নিচেরওয়ালাদের বিবেকে একটুও আটকায় না।

কতকগুলো ধর্মীয় কর্তব্য এককালে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারো মৃত্যু হলে সে সংবাদ পাড়া-প্রতিবেশীকে জানান দিতে হবে, জানাজায় অংশ নিয়ে মৃতব্যক্তির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং তার পারত্রিক কল্যাণ কামনা করতে হবে, এমনকি কারো কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনা করে যেতে হবে। জীবিতাবস্থায় সে ব্যক্তির সাথে বিরোধ থাকলেও এই কর্তব্যগুলো থেকে অব্যাহতি নেই বলে বিশ্বাস করা হতো।

মৃত আত্মার প্রতি চরম অশ্রদ্ধা
বাংলাদেশের ইতিহাস সুদীর্ঘকালের ইতিহাস নয়। আমাদের অনেকেই এই ইতিহাসের জন্ম এবং অধঃপতন চোখের সামনে দেখছি। দেখেছি আর আমাদের হৃদয় দলিত-মথিত হয়েছে। রাষ্ট্রের জনক হিসেবে যার আসন চিরকাল সমুন্নত থাকার কথা, তিনি অত্যন্ত হিংস্র নজির সৃষ্টি করেছিলেন এবং সেজন্য তাকে চরম মূল্যও দিতে হয়েছে। ১৯৭২-৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সেনাদল রক্ষীবাহিনী অন্যূন ৪০ হাজার রাজনৈতিক বিরোধীকে হত্যা করেছিল। তারপর নিজের হাতে যখন তিনি গণতন্ত্রকেই হত্যা করলেন, সেনাবাহিনীর মধ্যম স্তরের কয়েকজন অফিসার তখন বিদ্রোহ করে মুজিবকে হত্যা করেন।

সেনাবাহিনীর ভেতরের সমস্যা ও টানাপড়েনগুলো নিয়ে কোনো তদন্ত হয়নি, অন্তত জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে। বিদ্রোহী অফিসাররা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার সময়কার কর্মকর্তা (যুগ্মসাংগঠনিক সম্পাদক, অপরজন শেখ মুজিবুর রহমান) খন্দকার মোশতাক আহমদকে রাষ্ট্রপতির আসনে স্থাপন করে। মোশতাক মুজিবের মন্ত্রিসভার আটজন আওয়ামী লীগ মন্ত্রীকে নিয়ে একটি আওয়ামী লীগ দলীয় সরকার গঠন করেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে যখন তার মৃত্যু হয় আওয়ামী লীগ দল তার জানাজায় বাধা দেয়। শুধু মুসলমান বলেই নয়, মানুষ হিসেবেও নীতিনৈতিকতা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি চূড়ান্ত অবমাননা দেখানো হলো।

কারণ কী? কারণ এই যে আওয়ামী লীগ দলের নেত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার পিতামাতা ও পরিবারের হত্যার সময় দেশে ছিলেন না, ছিলেন তখনকার পশ্চিম জার্মানিতে। তার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া পারমাণবিক বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বৃত্তি নিয়ে সে দেশে গিয়েছিলেন। জার্মানি থেকে তিনি ও তার বোন ভারত সরকারের রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে দিল্লিতে ছিলেন প্রায় ছয় বছর।

বাংলাদেশের ইতিহাসের এই ট্র্যাজিক অধ্যায় সম্বন্ধে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছিল না। দিল্লিতে তাদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছিল বিদেশ মন্ত্রকের রিসার্চ উইংয়ের ওপর। মনে রাখতে হবে, ইতিহাসের সেই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ সম্বন্ধে দিল্লি ও ঢাকার মনোভাব ছিল প্রায়ই বিপরীতমুখী, সাংঘর্ষিক। ভারত যে দৃষ্টিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতির মূল্যায়ন করেছে, বাংলাদেশের মানুষ মূল্যায়ন করেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিতে। সম্ভবত সে কারণেই শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে ঢাকায় এসেছিলেন এ বিশ্বাস নিয়ে যে, তার পিতার হত্যার পর বাংলাদেশে যারা ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আসনে বসেছেন, সেই ঘনঘটাপূর্ণ সময়ে যারা রাষ্ট্রের টলটলায়মান তরণী দৃঢ় হাতে চেপে ধরেছিলেন, তারা সবাই তার পিতার খুনি, কেননা তার পিতার মৃত্যু থেকে তারা লাভবান হয়েছেন। কিন্তু তিনি ভুলে যান যে পিতার হত্যা থেকে তিনিও লাভবান হয়েছেন। কেননা সে সময় মুজিব নিহত না হলে তার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।

ইতিহাস যা বলে
শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে ভারতের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত করতে রাজি ছিলেন না। অন্তত গোড়ার সময়ে তার জনপ্রিয়তা এতই আকাশচুম্বী ছিল যে তার সাথে কোনো বিবাদ-বিসম্বাদ করতে ভারত সাহস পায়নি। একাত্তরে নির্বাসিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের সাথে ভারত সরকার যে সাত দফা চুক্তি করেছিল, সে চুক্তিতে কথা ছিল যে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব থাকবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর। কিন্তু মুজিব সে চুক্তি মানতে রাজি হননি। স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঢাকায় এসেও মুজিবের মনোভাব পরিবর্তন করাতে পারেননি। শেখ মুজিবুর রহমান ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন।

মুজিবের হত্যার পর ভারত সেই সাত দফা চুক্তিকে আবারো বলবৎ করার চেষ্টা করেছিল। খন্দকার মোশতাক তাতে রাজি হননি। সেজন্যই অপেক্ষাকৃত ভারতমুখী জেনারেল খালেদ মোশাররফকে দিয়ে আরেকটা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছিল। মোশাররফ ও তার অভ্যুত্থান সাধারণভাবেই সেনাবাহিনীর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। সেজন্য তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। খালেদ মোশাররফ তার অভ্যুত্থানের শুরুতেই সেনাপ্রধান কাছে পদে সদ্য উন্নীত জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দী করেছিলেন। সাধারণ সৈনিকেরা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ফটক ভেঙে বন্দিদশা থেকে জিয়াকে মুক্ত করেন এবং তাকে সেনা সদর দফতরে প্রতিষ্ঠিত করেন। জিয়া প্রকৃতই ভারতের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। বস্তুত সে লক্ষ্যেই তিনি দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সমিতি (সার্ক) গঠনে উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের প্রত্যাশা তাতে মেটেনি। ভারত সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রূপে একাত্তরের সাত দফা চুক্তির বাস্তবায়ন চেয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি ভারতের রোষের সেটাই ছিল কারণ।

বাংলাদেশের ইতিহাসের এ অধ্যায়টিতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। সুতরাং ইতিহাসের কোন ভাষ্য ও কোন বিশ্লেষণ তার রয়েছে তা সহজেই বোধগম্য। শেখ মুজিবুর রহমান তার বাকশাল কায়েমের সময় আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে আওয়ামী লীগসহ সব দলকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ড. কামাল হোসেন ও আবদুর রাজ্জাককে দিল্লিতে পাঠিয়ে শেখ হাসিনা ও রেহানাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। তার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন।

রাতের আঁধারে জিয়ার লাশ লুকিয়ে ফেলা
ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় থেকে জিয়ার নামগন্ধ মুছে ফেলতে চেয়েছিল। সেজন্যই সঙ্গোপনে এবং বিনা জানাজায় তার লাশ পুঁতে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষের সতর্কতায় সে লাশের অস্তিত্ব জানাজানি হয়ে যায়। সসম্মানে সে লাশ তুলে এনে রাজধানীতে সমাহিত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যায় বাংলাদেশে মিষ্টান্ন বিতরণ করা হয়েছিল।

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রথমেই তিনি রাতের আঁধারে জিয়ার মাজারে যাওয়ার সেতুটি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। জনতার মিছিল অবিরাম স্রোতে সে সেতু পেরিয়ে জিয়ার মাজার জিয়ারতে যাচ্ছে, সে দৃশ্য সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এখনো প্রায় সময়ই দলে দলে মানুষ সে মাজারে দোয়া পড়তে যায়। মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীনেরা সেটাও সহ্য করতে পারছেন না। এখন আবার সমাধি ডাকাতির আয়োজন হচ্ছে বলেই মনে হয়। কোনো কোনো মন্ত্রী আজেবাজে অজুহাতে শহীদ জিয়ার মাজার অন্য কোথাও নির্বাসিত করার কথা বলাবলি করছেন। শেক্সপিয়ারের লেডি ম্যাকবেথের মতো অপরাধবোধ তাদের তাড়া করে ফিরছে কি না কে জানে?

লেখক: বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান