মনে হয় নির্বাচন একটা হয়ে যাওয়াই ভালো

Ibn-Golam-Samad একটা দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাম্য নয়। নির্বাচন তাই একটা হয়ে যাওয়াই ভালো। নির্বাচনই দিতে পারে একটা দেশে একটা দলের হাত থেকে আরেকটা দলের হাতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে মতা হস্তান্তরের নিশ্চয়তা। ঠিক সময়ে নির্বাচন না হলে সৃষ্টি হয় ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। আর এই ষড়যন্ত্রে সুযোগ নিতে পারে বাইরের শক্তিও। বাংলাদেশের েেত্র যেটা হওয়ার সুযোগ অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি। অতীতে এটা ঘটতে পেরেছে। আর তাই ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। যদি আমরা করি অতীত ভুলের পুনরাবৃত্তি।

আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে একটা সুন্দর নির্বাচন হয়ে গেল। এবারের ভারতীয় নির্বাচনে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোথাও মারদাঙ্গা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গেও যে এর পরিমাণ খুব বেশি হয়েছে, তা নয়। ভারতের রাজনীতি অনেক ভদ্র হয়েই উঠছে। এক সময় বলা হতো ভারতের লোক অশিতি। তাই ভারতে গণতন্ত্র টিকবে না। কিন্তু ভারতে গণতন্ত্র টিকেই গেল। পাকিস্তানেও একটা নির্বাচন হলো। নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হলেন। এই নির্বাচন নিয়েও ওঠেনি কোনো সংশয়। কিন্তু বাংলাদেশে প্রকৃত কোনো নির্বাচন হতে পারছে না। এক সময় আমরা বলতাম, পাকিস্তান রাজনৈতিক দিক থেকে পশ্চাৎপদ দেশ। কিন্তু এখন পাকিস্তানকেই এগিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। আর আমরাই যেন যাচ্ছি পিছিয়ে পড়তে। গণতন্ত্র যে একটা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয়, সেটা আর এখন বিতর্কের প্রশ্ন নয়। এক সময় বলা হতো, বুর্জুয়া গণতন্ত্র চাই না। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর এই আওয়াজ এখন আর জোরালো হতে পারছে না। খোদ রাশিয়ায় মানুষ এখন চাচ্ছে বহুদলীয় গণতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার অনেক কারণ আছে। জাতিসত্তার সঙ্ঘাত সেখানে প্রবল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু জাতিসত্তার সমস্যা ভারতে থাকলেও গণতন্ত্র থাকার জন্য তা কিছুটা প্রশমিত হতে পারছে। আমাদের দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো বিরাজ করছে অগণতান্ত্রিক বাম শক্তি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে না পারার একটি কারণ হলো রাজনীতিতে এখনো এই বাম শক্তির বেশ কিছু প্রভাব-পতিপত্তি। কিন্তু তারা আজ আগের মতো অতটা শক্তিমান নয়। যদিও আওয়ামী লীগে তাদের প্রভাব এখনো যথেষ্ট সক্রিয়। ক’দিন আগে একজন বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতাকে বলতে শোনা গেল, শেখ হাসিনাকে নাকি খুন করার চক্রান্ত চলেছে। তাই আওয়ামী লীগের সদস্যদের থাকতে হবে হুঁশিয়ার। এ রকম বক্তব্য প্রদান কতটা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক তা আমরা জানি না। এতে হাসিনার নিরাপত্তা কতটা বাড়বে তা আমরা বলতে পারি না। জনগণই মতার শেষ উৎস। জনসমর্থন না থাকলে সাধারণভাবে কেবল দলনেতাদেরই নয়, দলকর্মীদের নিরাপত্তাও হয়ে ওঠে খুব অনিশ্চিত। আওয়ামী লীগ একটা পেশাদার বিপ্লবীদের দল নয়। এর নেই কোনো নিজস্ব বাহিনী। তাই দলকর্মীরা দলটিকে কতটা নিরাপত্তা দিতে পারবে, সেটা নিয়ে থাকছে প্রশ্ন। শেখ হাসিনাকে খুন করার চক্রান্ত চলেছে বলে প্রচার করলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ হতে পারে তিগ্রস্ত। কারণ, দলকর্মীদের একাংশ হারাতে পারে মনোবল। রাজনীতিতে খুনখারাবি গণতান্ত্রিক দেশেও হতে পারে। চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘাতকের হাতে মারা গিয়েছেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ রকম মৃত্যুর পরিমাণ হয় কম। আমেরিকার সাথে লাগোয়া দেশ কানাডার কোনো প্রধানমন্ত্রী ঘাতকের হাতে মারা গিয়েছেন কি না আমরা তা জানি না। বিলাতের কোনো প্রধানমন্ত্রী ঘাতকের হাতে মারা যাননি। ফ্রান্স ও জার্মানিতে এখন গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। তাই হতে পারছে না আগের মতো শেখানে কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হলে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, থাকতে হবে জনমত গঠনের স্বাধীনতা ও অবাধ নিরপে নির্বাচনের ব্যবস্থা। জনমত গঠনের স্বাধীনতা, আরেক কথায় রাজনৈতিক দল গড়ার স্বাধীনতা ও অবাধ নিরপে নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটা দেশে সম্ভব হয় না। এসবের অভাবে গণতন্ত্র বর্তমান এ দেশে হোঁচট খেয়ে চলছে। এটা থাকতে হবে আমাদের উপলব্ধিতে।

আমরা যেন আমাদের অতীত নিয়ে বড় বেশি মাথা ঘামাচ্ছি। কথা তুলছি অতীতে কারা মুক্তিযুদ্ধের পে ছিল আর কারা ছিল না, সে প্রসঙ্গে। এ রকম করে চললে আমরা অতীতের হাতে বন্দী হয়ে পড়ব; বর্তমানকে নিয়ে রাজনীতি করতে সম হবো না। অতীতকে বদলানো যায় না। যা ঘটে গিয়েছে তা ঘটে গিয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলা যায়। আমাদের করতে হবে ভবিষ্যৎ গড়ার রাজনীতি; যদি এই বিপদসঙ্কুল বিশ্বে জাতি হিসেবে আমাদের পৃথক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে চাই।

শেখ মুজিব হত্যা সম্পর্কে এ যাবৎ যতগুলো বই বেরিয়েছে, তার মধ্যে অধ্যাপক আবু সাইয়িদের লেখা ‘ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড’ বইটি বহুল পঠিত। এতে বলা হয়েছে, যদি রীবাহিনীকে ঠিক সময় ডাকা হতো, তবে এড়ানো যেত শেখ মুজিবের মৃত্যু। আওয়ামী লীগের প থেকে এখন বলা হচ্ছে, শেখ মুজিবের মৃত্যুতে জিয়ার হাত ছিল। কিন্তু রীবাহিনীর কোনো নিয়ন্ত্রণ জিয়ার হাতে ছিল না। রীবাহিনী ডাকার েেত্র তিনি কোনো বাধা দিয়েছিলেন বলে কেউ বলছে না। শেখ হাসিনা বলছেন, জিয়া বেঁচে থাকলে তিনি তারও বিচার করতেন। কিন্তু কেন? অন্য দিক থেকে বলা যায়, জিয়া বেঁচে থাকলে দেশের ইতিহাসের ধারা ভিন্ন প্রকার হতো। শেখ হাসিনা পেতেন না তাকে বিচার করার কোনো সুযোগ। জিয়া আজ বেঁচে নেই। কিন্তু তাকে বহু লোক ভালোবাসে। তাদের মনে কোনো ক্রোধ উৎপাদক উক্তি না করাই ভালো। দেশে বিএনপি একমাত্র রাজনৈতিক দল নয়। দেশে আরো অনেক রাজনৈতিক দল আছে; যাদের কার্যকলাপ হয়ে উঠতে পারে আওয়ামী লীগের জন্য মারাত্মক তির কারণ। বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। তারা গুম-খুনের রাজনীতি করতে চায় না। আর দলগতভাবেই তারা সেটা করতে সমও নয়।

অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ নেই। অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে এমন অনেক কথা উঠে আসতে পারে যে, আওয়ামী লীগও দল হিসেবে হতে পারে তিগ্রস্ত। সম্প্রতি তাজউদ্দীনকন্যা শারমিন আহমেদ, ‘তাজউদ্দীন আহমেদ : নেতা ও পিতা’ নামে একটি বই লিখেছেন; যাতে তিনি বলেছেন, তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবকে ২৫ মার্চ অনুরোধ করেন স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে। কিন্তু শেখ মুজিব তাতে রাজি হন না। বলেন, এটা করলে পাকিস্তান কর্তৃপ তাকে দেশদ্রোহী হিসেবে বিচার করতে যুক্তি পেয়ে যাবে। তাজউদ্দীনকন্যা যা বলেছেন হয়তো তা ঘটনা নয়। কিন্তু বইটি ইতোমধ্যেই নানা জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে। নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে শেখ মুজিব আসলে কী চেয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গে।

অধ্যাপক আবু সাইয়িদ তার বইতে বলেছেন, শেখ মুজিব হত্যার কলকাঠি নেড়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেগে উঠেছে বিরোধ। আওয়ামী লীগের উচিত হবে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের রাজনীতিতে এখনো হয়ে আছে একটা ফ্যাক্টর।

ভারতের মনমোহন সরকার যতটা হাসিনা-বান্ধব ছিল, বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঠিক তা থাকবেন কি না আন্দাজ করা যাচ্ছে না। যদিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ শেখ হাসিনাকে উপহার দেয়ার জন্য দিল্লিতে কিনছেন পছন্দের শাড়ি। ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনকেও বিশেষভাবেই বিবেচনায় নেয়া উচিত আওয়ামী লীগের। আমরা শান্তিপ্রিয় নাগরিক। আমরা শান্তির স্বার্থে গণতান্ত্রিক রাজনীতিকেই পছন্দ করি বেশি। তাই চাই রাজনীতি হোক ভোট-নির্ভর। তাই চাচ্ছি, একটি শান্তিপূর্ণ নতুন জাতীয় নির্বাচন। আমরা সাধারণভাবেই গণতন্ত্রকে পছন্দ করি। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষ ভোগ করতে পারে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিস্বাধীনতা।

প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট