সম্রাটের অভিনব নতুন পোশাক এবং বাংলাদেশ

Serajur Rahman

গল্পটি লিখেছিলেন ড্যানিশ গল্পকার হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন। অবশ্য গল্পটির অনুপ্রেরণা তিনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন, সে সম্বন্ধে একাধিক কাহিনী আছে। গল্পের সম্রাটের দারুণ লোভ নিত্যনতুন জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকের। দুই ধূর্ত তাঁতি ঠিক করল সম্রাটের দুর্বলতার সুযোগ নেবে এরা। একদিন সম্রাটের দরবারে হাজির হয়ে এরা দাবি করল, অভিনব নতুন বস্ত্র তৈরির কৌশল এরা আবিষ্কার করেছে, যে বস্ত্র বোকারা দেখতে পাবে না।

কাহিনীর সম্রাট নিজেকে সর্বজ্ঞানী বুদ্ধিমান বলে গর্ব করতেন। গর্দান যাওয়ার ভয়ে কেউ বলতে সাহস পেত না যে আসলে সম্রাট ছিলেন গণ্ডমূর্খ। সম্রাট স্থির করলেন, এই অভিনব বস্ত্রে তৈরী নতুন পোশাক তার চাই। সম্রাট খাজাঞ্চিকে নির্দেশ দিলেন, তাঁতিদের চাহিদানুযায়ী অর্থ স্বর্ণ মণিমুক্তা যেন তাদের দেয়া হয়। তাঁতিরা মাঝে মাঝেই এসে আরো মণিমুক্তা নিয়ে যায়। ওদিকে সম্রাট তার নতুন পোশাকের জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। প্রায়ই তিনি তাঁতিদের তাগিদ পাঠাচ্ছিলেন।

অবশেষে তাঁতিরা একদিন প্রাসাদে এলো এমন অঙ্গভঙ্গি করতে করতে যেন এরা ভারী কিছু পোশাক বহন করছে। সম্রাট পারিষদদের তলব করলেন তার নতুন পোশাক দেখতে। তাঁতিরা সযতেœ সম্রাটকে পোশাক পরানোর ভঙ্গি করল। তারপর তারা এমন ভাবে তাকিয়ে দেখতে থাকল, যেন নিজেদের তৈরী পোশাক দেখে নিজেরাই মুুগ্ধ হয়েছে। সম্রাটকে খুশি করার জন্য পারিষদরাও প্রশংসার ছলে হাততালি দিয়ে উঠলেন। সম্রাট নিজেকে বোকা বলে স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না। তিনিও হাততালি দিলেন। আর প্রজাদের বাহবা পাওয়ার আশায় সে পোশাক ও মুকুট পরে তিনি তখনই রাজধানীর সড়কে মিছিল করে বেরোলেন।

সম্রাটের রোষের ভয়ে জনতাও মিছিলের দুই পাশে সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। শাস্তির ভয়ে এরাও হাততালি দিচ্ছিল। সম্রাট যে বিবস্ত্র সে কথা বলে কেউ প্রাণ হারাতে রাজি ছিল না। মিছিল প্রায় শেষ হয়, এমন সময় একটা শিশু খিল খিল করে হেসে এবং হাততালি দিয়ে উঠল। বলল, ‘রাজার পরণে পোশাক নেই’। জনতা ভয়ে আঁতকে উঠল। পারিষদদের একজন এগিয়ে এসে বললেনÑ মহামান্য সম্রাট, ও শিশু বোকা আর নির্বোধ, কিছু বোঝে না। সে কী করে এই অপূর্ব সুন্দর পোশাক দেখতে পাবে? কিন্তু ততক্ষণে জনতারও ভয় কেটে গেছে। তারা সমস্বরে বলতে শুরু করলÑ ‘রাজার পরনে পোশাক নেই, রাজার পরনে পোশাক নেই’। কিন্তু সম্রাটের গর্ব আছে, গোঁয়ার্তুমি আছে। তিনি তো আর মিছিল বন্ধ করতে পারেন না! গট গট করে হেঁটে চললেন।

মস্তিষ্কের পোকামাকড় আর গর্দানের ভয়
হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের জন্ম ১৮০৫ সালের ২ এপ্রিল। তার মৃত্যু ১৮৭৫ সালের ৪ আগস্ট। সুতরাং ধরে নেয়া যায়, প্রায় তিন শ’ বছর আগের কোনো এক সময় এ গল্প তিনি লিখেছিলেন। বর্তমান সময়ে লেখা কোনো গল্প হলে ভুল হতে পারত যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যঙ্গ করেই কেউ এ কাহিনী লিখেছেন। আজকে যারা এ দেশ শাসন করছেন, এরাও কাহিনীর সম্রাটের মতো জাঁকজমক আর আড়ম্বরের ফিকিরে আছেন সব সময়। আর গোঁয়ার্তুমি। যে দল আর যে গোষ্ঠী একাত্তরে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, এরা এখন দেশের ঘাড়ের ওপর চেপে বসে আছে। আর যারা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন; তাদের লেকচার শোনাচ্ছে। দেশের যারা সর্বস্ব ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। তাদের ছোট করার সব রকমের চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু বিদেশীদের ডেকে এনে ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘স্বর্ণপদক’ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তঞ্চকতার বদ অভ্যাস তো আর ধুলে যায় না! এখন ধরা পড়ে গেছে যে স্বর্ণপদকের নামে বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে রদ্দি মাল। চুরির দায় কে কার ঘাড়ে চাপাবে, সে নিয়ে এখন রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে।

গর্দান যাওয়ার ভয়ে কেউ বলতে সাহস পায় না যে আবর্জনা আর পোকামাকড় ছাড়া শাসকদের মস্তিষ্কে আর কিছু নেই। অথচ নিজেদের এরা সর্বজ্ঞ পণ্ডিত বিবেচনা করেন, মনে করেন যে বাকি বিশ্বকে জ্ঞানদানের অধিকার তাদের আছে। অন্যের কথা এরা শুনবেন না, কারো সাথে আলোচনা করবেন না। তাতে এদের আত্মাভিমানে ঘা লাগে। নিজেদের ক্ষুদ্রত্ব তাতে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে এরা আতঙ্কিত। আলোচনা (সংলাপ) না করার অজুহাত সন্ধানের চিন্তা তাদের মাথায় ওভারটাইম কাজ করে। দৃষ্টান্ত? তারেক রহমান মাত্র সেদিন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে রিমান্ডে নিলে স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার রহস্য উদঘাটিত হবে। ব্যস, যায় কোথায়? যারা এসব কথা বলতে পারে তাদের সাথে সংলাপ হবে না। খোদ প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন সে কথা।

এই সংলাপের দাবি চলছে বলতে গেলে পাঁচ বছর ধরে, যখন থেকে এরা নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব করে দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে। বিদেশীরাও সমঝোতা আর সংলাপের পরামর্শ দিচ্ছে দুই বছরের বেশি হলো। তখনো তারেক রহমান কাউকে রিমান্ডে নেয়ার কথা বলেননি। এ সময়ের মধ্যে সংলাপ না করার নিত্যনতুন অজুহাত আবিষ্কার করা হয়েছে। আকাশ নীল হলে এরা সংলাপ করবেন না, অন্য দিকে শ্রাবণের মেঘে ঢাকা আকাশকেও তারা সংলাপের প্রতিবন্ধক মনে করেন। কতকগুলো অজুহাত এরা এ পর্যন্ত দিয়েছেন, সে হিসাব বোধ হয় নিজেরাও হারিয়ে ফেলেছেন।

কে কাকে পাগল বলে
শেখ হাসিনার ‘আন্দোলনের ফসল’ বর্ণচোরা সামরিক সরকার তারেক রহমানকে জেলে পুরে রেখেছিল, রিমান্ডের নামে নির্যাতন করে তার কোমরও ভেঙে দেয়া হয়েছিল। এই কয় বছর তিনি বিদেশে চিকিৎসা করিয়েছেন, যতটুকু পেরেছেন বাংলাদেশের ইতিহাস পড়াশোনা করেছেন, গবেষণা করেছেন সে সম্বন্ধে। মাত্র সম্প্রতি তিনি মুখ খুলেছেন। কোথায় কোথায় ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে এবং হচ্ছে তুলে ধরছেন। সে গবেষণাতেই তিনি প্রমাণ পেয়েছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, ঘোষণা দিয়েছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, আর সে ঘোষণায় তিনি নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিলেন এবং দেশে ফিরে শেখ মুজিবের রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রীতে রূপান্তরে সংসদের অনুমোদন নেয়া হয়নি। এই প্রমাণগুলো সরকারের পায়ের তলা থেকে মাটি খসে যাওয়ার শামিল। সে জন্যই ক্রোধে এরা মাত্রাজ্ঞান ও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। মন্ত্রীদের মুখে দিবারাত্রি উচ্চারিত হচ্ছে তারেকের নাম। আগেও পরামর্শ দিয়েছি, তার বদলে আল্লাহ-রাসূলের নাম জপ করুন, তাতে পারত্রিক কল্যাণ হবে। কিন্তু কার কথা কে শোনে? অবিরাম গালাগাল চলছে তারেকের বিরুদ্ধে।
তারেক নাকি অর্বাচীন, বেয়াদব, উন্মাদ। তাকে (আগের মতো) আবারো জেলে দেয়া উচিত ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও এখন তারেক রহমান বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। বাংলাদেশে প্রবাদ আছেÑ ‘পাগলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায়।’ বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকারের পাগল থেকে দূরে থাকে, তাকে ঘাঁটাতে কেউ চায় না। এমন পাগলদের কথা জানি, যারা হাটের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে এর-তার দিকে আঙুল তুলে বলেÑ তুই পাগল, তুই পাগল। কেউ সেটা গায়ে মাখে না। তারেককে নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা থেকে দেশের মানুষ এই সিদ্ধান্তই নেবে যে, আসলে খাঁটি কথাই বলছেন তারেক রহমান। সেজন্যই সরকারের আঁতে ঘা লেগেছে, মন্ত্রীদের আহার-নিদ্রা বন্ধ হয়ে গেছে।

অর্থ মন্ত্রী চরিত্র
এক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ। সকাল-সন্ধ্যা সতেরো রকম আজেবাজে কথা বলেন। সরকারের লোকেরা খুনখারাবি করে, পুলিশও গ্রেফতার করছে তাদের; কিন্তু হাছান মাহমুদ বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত করো। আকাশে সূর্য উঠলে বলেন, খালেদা জিয়াকে রিমান্ডে নাও। আবার সূর্য ডুবলেও বলেন একই কথা। এবারে তিনি মিডিয়াকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, এরা যেন তারেকের বক্তব্য প্রচার না করে। আরেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম ২০০৯ সালে মন্ত্রী হয়েই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাত হাজার মামলা তুলে নিয়েছিলেন। অনেক খুনের মামলাসহ। পাপবোধের চাপে আর অসংখ্য মানুষের অভিশাপে তার মস্তিষ্কে অনেক দিন আগেই পচন ধরেছে। তারেকের বক্তব্য প্রচারের কারণে দুটো টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করেছেন তিনি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র আর সংবাদের স্বাধীনতা দাবির মণিমুক্তাখচিত অভিনব পোশাক এখন পুরোপুরি খসে পড়ল মন্ত্রীদের কাজে আর কথায়। কিন্তু হ্যান্স অ্যান্ডারসনের গল্পের সম্রাটের মতো এরাও নির্বোধ। তাদের সুমতি হওয়ার কোনো আশা নেই। লোকলজ্জার ভয়ও নেই তাদের।

গদি পাওয়ার পর থেকে নিজেদের ভাঙা ঢাক পেটাচ্ছে এই সরকার। দেশে তারা গণতন্ত্র আর সংবাদের স্বাধীনতার বন্যা আর ‘সুনামি’ বইয়ে দিয়েছে। লন্ডনের টাইমস পত্রিকায় এক লাখ পাউন্ড ব্যয়ের বিজ্ঞাপন দিয়ে সে কথা এরা জাহির করেছে। বিদেশে এই সরকারের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। বিদেশীদের জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনও নেই। স্বদেশে চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত আর ইসলামিক টেলিভিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী আর অজস্র দর্শককে জিজ্ঞেস করে দেখুন, রুনি আর সাগরের পুত্র মেঘ ও পরিবার-পরিজনকে দেখে আসুন, আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিক ও লাখ লাখ পাঠককে জিজ্ঞেস করুন, আর জিজ্ঞেস করুন বিনাবিচারে কারাবন্দী সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। এরা আপনাকে বলে দেবেন সংবাদের স্বাধীনতার সন্ধান করতে হলে অন্য কোন দেশে যেতে হবে। ‘হেথা নয়, হেথা নয়; অন্য কোথা, অন্য কোন খানে।’

মাথাকাটা গরুর দুধ দোহন
দুই মন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিলাম একটু আগেই। গণতন্ত্র আর সংবাদের স্বাধীনতার প্রতি সরকারের ভয়ভীতি আর ঘৃণা মূর্ত হয়ে উঠেছে তার মধ্যে। অথচ শাসকেরা প্রচারের মূল্য বোঝে। গোয়েবলসের টেকনিক এরা ঘষে-মেজে আরো বেশি ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। দেশে সরকারের পোষ্য আর দালাল মিডিয়াই বেশি। মন্ত্রীরা আজেবাজে যাই বলুন, সেটাকে নিয়ে ঢাক পেটাতে হবে। আর সরকারের সামান্যতম সমালোচনাও ছাপা কিংবা প্রচারের সাহস তাদের নেই। স্তাবকতার রৌদ্রোজ্জ্বল পথের এ দিক-ও দিক করলে এসব মিডিয়ার ভাত জুটবে না। নিষিদ্ধ হওয়ার ভয়ে অন্যরাও দিবারাত্রি আতঙ্কে থাকে।

আর গণতন্ত্র? প্রথমেই প্রশ্ন ওঠেÑ কিসের গণতন্ত্র? এই দল, এই প্রধানমন্ত্রী সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। তারা বরাবরের জন্য গদি চান, ‘সংসদীয়’ গণতন্ত্র চান, কিন্তু এমন সংসদ এরা সহ্য করতে পারেন না যে সংসদ তাদের সমালোচনা করবে, বিরোধিতা করবে। গদি চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়কপদ্ধতি বাতিল করে নতজানু সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাতেও সরকার নিশ্চিত হতে, নিরাপদ বোধ করতে পারছে না। অতএব বিনা ভোটে গরিষ্ঠতা অর্জনের এবং ভোটারবিহীন নির্বাচনের ব্যবস্থা হলো। সুস্থ এরশাদকে হাসপাতালে বন্দী রেখে তার দলকে হাইজ্যাক করা হলো, গরুর মাথা কেটে দুধ দোহনের জন্য গৃহপালিত বিরোধী দল গঠন করা হলো।
বাংলাদেশে এ সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের মন বসে না। সুযোগ পেলেই তিনি বিদেশে উড়াল দেন। ইদানীং আবার ওড়াউড়ি শুরু হয়েছে। বিদেশী ভিআইপিদের ঢালাও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। এই আশায় যে তারাও হয়তো আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে নিমন্ত্রণ পাঠাবেন। সেই সাথে সরকার মোটা সুদে ঋণ আনছে, এ প্রকল্প সে প্রকল্পের নামে। সে প্রকল্পগুলো আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না, সেটা শুধু ভবিষ্যৎই বলতে পারে। আর বিদেশী ঋণের কত ভাগ স্বদেশী ভিআইপিদের পকেটে যাবে, সে চিন্তাও আছে দেশের মানুষের। কিন্তু এরা সুনিশ্চিত জানে, এই ঋণের বোঝা ডেমোকিসের খাড়ার মতো ঝুলতে থাকবে তাদের মাথার ওপর। অর্থমন্ত্রী কয়েক দিন আগে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১২ হাজার ৭০০ টাকা। এ অঙ্ক যে শিগগিরই বেড়ে যাবে সন্দেহ নেই। এ ঋণ একদিন-না-একদিন শোধ করতে হবে বাংলাদেশের মানুষকে। সেটা তারা ভুলে যায়নি। আর পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির মহাভারতও ভুলতে এ দেশের মানুষের অনন্তকাল প্রয়োজন হবে।

দুই নৌকার কূটনীতি
এখন আবার পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির কথা উঠছে। এ নীতির কথা প্রথমে উঠেছিল খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে। কাজের কাজও কিছু হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার গাঁটছড়া দিল্লির সাথেই বাঁধা ছিল বলে অগ্রগতি হতে পারেনি। দিল্লিতে এখন নতুন সরকার এসেছে। এরা সারা বিশ্বকে অগ্রাহ্য করে তার অনির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রী সরকারকে বহাল রাখতে রাজি হবে কি না শেখ হাসিনা নিশ্চিত হতে পারছেন না। জাপানের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আর চীনের সাথে কিছু কিছু প্রকল্প সম্বন্ধে সমঝোতাপত্রে সই করে তিনি দিল্লির প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে চাইছেন। এক শনিবার বেইজিংয়ে বাংলাদেশী পক্ষ ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করেছিল যে, চীনের সাথে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সমঝোতাপত্রে সই হবে সোমবার। সোমবারে কিন্তু বলা হলো, চীনের সাথে সে চুক্তি করলে দিল্লির সরকার কী মনে করবে বাংলাদেশের সরকার বুঝে উঠতে পারছে না বলে সে সমঝোতা এখন করা হবে না। কিন্তু একপ্রস্থ গোপন চুক্তি করে ভারতকে সড়ক, রেল ও নদীপথে ট্রানজিট এবং চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দর ব্যবহারের চুক্তি করার সময় চীনের রণকৌশলগত আশঙ্কা বিবেচনা করার কথা সরকারের একবারও মনে হয়নি।

তা সত্ত্বেও সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা এমন ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, দিগি¦জয় করে তিনি বেইজিং থেকে ফিরেছেন। এসব প্রগলভ উক্তি যে কূটনীতিতে সহায়ক হয় না তার প্রমাণও প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া গেছে।

ভারতের দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য মিডিয়া খবর দিচ্ছে, ‘চীনের সাথে হাসিনার অংশীদারিত্বের’ দাম্ভিক কথাবার্তা নয়াদিল্লির নতুন সরকার ভালো চোখে দেখছে না। সেদিকে তীক্ষè নজর রাখছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। ভাঙা নৌকায় চড়ে রাজনীতি করার অনেক বিপদ। নৌকাডুবির আশঙ্কা তো আছেই; অন্য দিকে দুই নৌকায় চড়তে গেলেও বিপদ কম নয়।

লেখক: বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান