বাতাসের শব্দ

james campbell

হারু আর প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতার মুখোমুখি বসে থাকে, কেউ কোনো কথা বলে না। প্রিন্সেস বলে কথা! নির্জনতা ভেঙে আগ বাড়িয়ে কথা বললে যেন তার হার হয়, তাই প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতারের কথা বলার কোনো উৎসাহ নাই। হারু হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে মিস বিউটি আকতারের উপর এবং বিউটি আকতার কিছু বুঝে উঠার আগেই কাবু করে ফেলতে চায়। প্রিন্সেস বলে কথা! সহজেই বিউটি আকতারকে কাবু করার মতো এত শক্তি কই হারুর মনসে এবং গতরে? বিউটি আকতার নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় এবং থাপ্পড় লাগায় হারুর গালে। হারু ভীষণ অপমানিত হয় এবং এই থাপ্পড়ের কোনো মানে বুঝতে পারে না। অবাক হয় হারু, আর সেই সাথে সাম্প্রতিক অপমান মিলে মিশে ক্লান্ত করে তাকে, বসে থাকে বিছানার কোনায়। মিস বিউটি আক্তার হারুকে ছোটলোক এবং লুইচ্চা বলে গালি দিলে হারু আরও কুঁকড়ে যায়, তেইশ শ’ টাকা আর মালা খালার জন্য দুই বোতল দেশি মদ সাপ্লাইয়ের পরেই প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতারের বিছানায় প্রবেশ-অনুমতি পেয়েছে হারু, আর সেই প্রিন্সেস কি না থাপ্পড় মারলো হারুর গালে? প্রিন্সেস মিস বিউটি হারুর মুখে থু মেরে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ে। হারু বিছানায় একা বসে থাকে আর বসে বসে ভাবে প্রিন্সেস কেন তাকে থাপ্পড় মারলো? প্রিন্সেস তো আর সে একদিনে হয় নাই, মালা খালা গত সাত বছরে এই মেয়েকে নানা রকম আসন এবং বিশেষ বিশেষ ঢং শিখিয়ে মোছাম্মদ বিউটিকে করে তুলেছে প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতার; তাহলে কিসের এত দেমাগ এই
প্রিন্সেসের? বিউটি-তো জানতোই যে আজ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে এক মর্দ মালা খালাকে টাকা সমেত দুই বোতল দেশি মদ উপহার দিয়েছে! কিছুতেই হারুর হিসাব মেলে না। মনোবাসনা অসম্পূর্ণ রেখে হারু মাথা নত করে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাঁটা দেয়।

বিশেষ এই মানসিক অবস্থায় হারু হাঁটতে থাকে। এবং হেটে হেটে শরীরের রাগ দূর করে; হাঁটার কষ্টে, দুঃখ কাটাকাটি হয়ে যায়; দুঃখ বেশি হলে বেশি পথ হাঁটতে হয় যেন দুঃখ থেকে কষ্টের পরিমাণ বেশি হয় তাতে করে তাৎক্ষণিক দুঃখ ভুলে থাকা যায় এবং রাস্তায় হাঁটতে থাকলে আগের ভুলগুলো শুধরে নেবার একটা সুযোগও পাওয়া যায়। এবং নানাবিধ চিন্তা চেতনার প্রসার ঘটে, স্মৃতি ভিড় জমায়, জায়গা করে নেয় মস্তিষ্কে।

সেই সকল চিন্তার মধ্যে যোগ দেয় আরেকটি আদি চিন্তা; স্মৃতি জাগে কল্পনায়। দেখা হয় মর্জিনার সাথে, মর্জিনা আর হারু বিছানায় বসে থাকে মুখোমুখি। কেউ কোনো কথা বলে না। মর্জিনার চুল থেকে পানি গড়ায়। বিছানার পেছনের জানালা দিয়ে আলো এসে পিঠে পড়ে হারুর, আর চুলের পানি ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে ভিজিয়ে দেয় মর্জিনার পিঠ; পাতলা কামিজ ভিজিয়ে দৃশ্যমান করে তোলে মর্জিনার বক্ষবাস। হারু তখনো কোনো কথা বলে না; নির্জনতা ভেঙে আগ বাড়িয়ে কথা বললে মান নষ্ট হয় এই ভেবে মর্জিনাও নীরব থাকে। কারো মধ্যে কোনো কথা হয় না, শুধু মর্জিনা তার ভিজে মাথা হারুর বুকে রাখতে চায় এবং মর্জিনার ভেজা-চুল সমেত মাথা হারুর ঘাড়ে রাখে, তাতে হারু কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও এইটুকু বুঝতে পারে যে, এই মুহূর্তে মর্জিনাকে উপেক্ষা করার কোনো উপায় নাই। হারু কোনো কথা না বলে মর্জিনার ভেজা মাথাটাকে নিজের ঘাড়ে ঠাঁই দিলে তার পাঞ্জাবিও ভিজে যায়। মর্জিনা হারুর হাত চেপে ধরে, হারুও মর্জিনার হাত চেপে ধরে, মর্জিনাকে অভয় দেয়, আশ্বাস দেয় আর মাথায় চুমু খায়। মর্জিনা আবেশে চোখ বন্ধ করে, হারুর আরো কাছাকাছি, একদম মুখের কাছাকাছি এমনকি ঠোঁটের কাছাকাছি আসলে হারু মর্জিনার কপালে চুমু খায়। মর্জিনা আরো একবার হারুর কাছাকাছি, একদম মুখের কাছাকাছি এমনকি ঠোঁটের কাছাকাছি আসে এবং হারু আবারও মর্জিনার কপালে চুমু খায়। এবার মর্জিনা শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হারুকে কাবু করতে চায় এবং হারুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হারু নিজেকে ছাড়িয়ে নিলে মর্জিনা হারুকে থাপ্পড় মারে, কাপুরুষ বলে এবং হারুর মুখে থু দিয়ে রুম ছেড়ে বারান্দায় যায়। কিন্তু মর্জিনা কেন থাপ্পড় মারলো তাকে সেটা তখনো অজানা। মর্জিনা তো জানে আগে মন শেষে দেহ; মনের প্রেম না বুঝলে দেহতে কী যায় আসে! হারু কিছু বুঝে ওঠার আগেই অপমান বোধ করে এবং সাম্প্রতিক অপমান নিয়ে মনোবাসনা অসম্পূর্ণ রেখে, মাথা নত করে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাঁটা দেয়। রাস্তায় নামে; কষ্ট দিয়ে দুঃখ ভুলতে দূরের পথে হাঁটা দেয়।

হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়ে একটা রেস্টুরেন্টে, যার এক-কোণে জায়গা করে নেয় হারু। সেই সাথে এই রেস্টুরেন্টের অবয়ব পাল্টে যায় এবং ভীষণ চায়ের তৃষ্ণা হয়। চা চাইতেই চোখ যায় সামনের টেবিলে বসে থাকা মেয়েটির দিকে। মেয়েটি তখনো হারুকে দেখে নাই, হারু অবিলম্বে মেয়েটিকে চিনতে পারে; মেয়েটির নাম সোফিয়া। আরো মনে পরে যায় এই রেস্টুরেন্টের কথা, মেয়েটি ঠিক যেই টেবিলে বসে আছে সেই টেবিলের কথা। টেবিল নাম্বার নয়, এই টেবিলেই মেয়েটির সাথে শেষ দেখা হয় হারুর। পরিচয়ের চার মাস পর কোনো এক দুপুরে মেয়েটিকে হারু এই রেস্টুরেন্টে নিয়ে আসে বিশেষ একটা জিনিস দিবে বলে, মেয়েটিও প্রবল আগ্রহে হারুর সাথে এই চায়ের টেবিলে এসে বসে। কেউ কোনো কথা বলে না, শুধু দুজনের হাত দুজনে ধরে থাকে। নীরব হয়ে থাকে পুরো রেস্টুরেন্ট। নৈঃশব্দ্যের পরে যখন হারু তার পকেট থেকে একটি চিঠি বের করে দেয় তখনই ঘটে যায় স্মরণীয় একটি ঘটনা, যেখানে মেয়েটি ভাবতেও পারে নাই হারু তাকে চিঠি লিখবে; আনন্দে মেয়েটির চেখে পানি এসে গেল এই ভেবে যে বহুদিন পর কেউ তাকে চিঠি লিখেছে! চিঠির উচ্ছ্বাস কাটিয়ে উঠেই হঠাৎ সোফিয়াও থাপ্পড় মারে হারুর গালে এবং বন্ধু সেজে, অভিনয় করে প্রেমপত্র দেবার অভিযোগে হারুকে ছোটলোক বলে। অতঃপর হারুর মুখে থু বলে সোফিয়া স্থান ত্যাগ করে। সেই দিন হারু বুঝতে পারেনি কেন সোফিয়া হারুকে থাপ্পড় মারলো, প্রেমের জন্য বন্ধুত্ব অপরিহার্য। বন্ধুত্ব আর করা হয় না সোফিয়ার সাথে। তবে সেদিনের পর থেকেই কি সোফিয়া প্রতিদিন এই রেস্টুরেন্টে এসে সেই একই টেবিলে বসে চা খায় কি না এটাই এই মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন!

কষ্ট দিয়ে দুঃখ ভুলতে দূরের পথে হাঁটা দেয়। হাঁটতে হাঁটতে আবার ফিরে আসে সেই কান্দুপট্টির প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতারের কাছে। মিস বিউটি হারুর কাছাকাছি আসে, হারুর মুখোমুখি হয়। হারু কিছুক্ষণ আগের সেই অপমান এখনো ভুলতে না পেরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে প্রিন্সেসের সামনে। প্রিন্সেস হারুর হাত ধরে, হারু অপমানে মাথা নিচু করে থাকে। প্রিন্সেস হারুকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে সদরের মিষ্টিপট্টি পার হয়ে যায়, বাজারের হাজার হাজার মানুষের মধ্যদিয়ে হারুর হাত ধরে টেনে টেনে সামনের দিকে নিয়ে যায়। সদরের রাস্তা পেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠে; হারু মাথা নিচু করে বিউটি আকতারের পিছু পিছু হেঁটে যায়, এই মুহূর্তে অনেকটা পথ হেঁটে হেঁটেও মাথায় আর কোনো চিন্তা আসে না হারুর, শুধু বিউটির পিছু পিছু হাঁটে। হারু যেন এত মানুষের ভিড়ে হারিয়ে না যায় সে জন্যই বিউটি কিছুতেই হাত ছাড়ে না তার, পুরা রাস্তা জুড়ে হারুকে পথ চিনিয়ে নিয়ে যায় সামনের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে সকাল থেকে দুপুর এবং বিকেল থেকে সন্ধ্যা হয়ে যায়। হারুর খিদে পায় কিন্তু প্রিন্সেসকে লজ্জায় খাবারের কথা বলতে পারে না। প্রিন্সেস মিস বিউটির হাঁটা শেষ হয় কাজিপুর হাওরে এসে। সে এক দেখার মতো দৃশ্য, বিশাল বড় একটা হাওর। সবেমাত্র চাঁদ উঠতে শুরু করেছে হাওরের পানিতে আর তখনই হাওরের-পাড়ে এসে প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতার হারুকে নিয়ে বসে পড়ে চারশ’ বছরের বুড়ো এক বটবৃক্ষের মূলে।

প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতার ও হারু মুখোমুখি বসে থাকে, কেউ কোনো কথা বলে না। প্রিন্সেস বলে কথা! নির্জনতা ভেঙে আগ বাড়িয়ে কথা বললে যেন তার হার হয়, তাই হয়তো প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতারের কথা বলার কোনো উৎসাহ নাই। কিন্তু হেরে যাবার আশঙ্কা ভুলে গিয়ে প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতার হারুকে বলে, কোনো কথা বলবে না, আজ এখানে তোমাকে নিয়ে আসছি বাতাসের শব্দ শোনাবো বলে, প্লিজ কোনো কথা বলবে না। চন্দ্রের ঝিলিক পানিতে পড়লে, দূরে অনেক দূরে কোথাও একটা পাল তোলা নৌকা দেখা যায়। হারু আর প্রিন্সেস মিস বিউটি আকতার হয়তো সেই নৌকার আশায় চারশ’ বছরের পুরানো, প্রবীণ এক বটমূলে অপেক্ষায় থাকে। হারু আর প্রিন্সেস মুখোমুখি বসে থাকে, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলে না, কারণ কথা বললেই বাতাসের শব্দ আর পাওয়া যাবে না।