একজন নব্য টাইপিস্ট

typing

আমি একটি গল্প লিখেছি। গল্পটি আসলে লিখিনি, টাইপ করেছি। এই হিসেবে আমি একজন লেখক না। আমি একজন টাইপিস্ট। একজন নব্য টাইপিস্ট। এখনকার লেখকরা আর লিখেন না। তাঁরা (লেখকেরা সম্মানিত বলে “তারা” শব্দটির উপর চন্দ্রবিন্দু দেয়া হল) এখন সবাই টাইপ করেন। কিন্তু কেন জানি তাঁদেরকে এখনো লেখক বলে। হয়ত শুরুতে ওঁরা লিখেছে- এখন টাইপ করে। আমি শুরু থেকেই টাইপ করেছি। তাই আমি কোনভাবেই লেখকের দলে পড়তে পারি না। সেজন্যেই আমি একজন ফরমালিন মুক্ত নির্ভেজাল টাইপিস্ট। আমি যে গল্পটি লিখেছি ওর নাম দিয়েছি “ছিরু মিয়াঁর অট্টহাসি”। নামটি খুব সুন্দর হয়েছে এবং আমার বিশ্বাস কোন পাঠকের হাতে গেলেই নামটির জন্যই পড়তে শুরু করবে। ছিরু মিয়াঁ নামটি শুনলেই মনে ভেসে উঠে শাশ্বত বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের মুখ। হাটে, মাঠে, ঘাটে, রাস্তায়- ঘাম ঝরানো মানুষের প্রতিনিধি যেন ছিরু মিয়াঁ। কিন্তু ছিরু মিয়াঁরা অট্টহাসি দেয় না। তাহলে ছিরু মিয়াঁর অট্টহাসির কারণ কি? এ প্রশ্নের উত্তর বের করার জন্যই পাঠকেরা পড়তে থাকবে। পাঠকেরা প্রশ্ন শুনলেই উত্তর জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে যায়। পড়তে থাকে পাতার পর পাতা। পাঠকের আগ্রহ বাড়ানোর জন্যই আমি বুদ্ধি করে নামটি ওভাবে রেখেছি।

গল্পটি পড়ে আমি নিজেই অভিভূত। গল্পটিতে উঠে এসেছে মানব জীবনের জটিল দর্শন। খুব সংক্ষেপে কিন্তু পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে জীবনের প্রয়োজনীয়তা। সাদাকালো ভাবে উত্তর খোঁজা হয়েছে মানব ইতিহাসের বহু পুরাতন একটি প্রশ্নের- মানুষ কেন বাঁচে? এরকম একটি ছোট গল্পে সুন্দর করে এত গুলো জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করা দুরহ কাজ। রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের পক্ষেও এত সুন্দর করে অল্প পরিসরে বিষয় গুলো ফুটিয়ে তুলা সম্ভব হত না (আমি রবীন্দ্রনাথের কিছু পড়িনি আর জীবনানন্দের একটি কবিতাই পড়েছি- যে কবিতায় সুরঞ্জনাকে পর পুরুষের সাথে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে)। গল্পটি যত পড়ি ততই মনে হয় এটা একটা অনবদ্য সৃষ্টি। এটা এইচএসসির পাঠ্য হয়া উচিৎ। ছোট ছেলেমেয়েরা গল্পটি পড়ে বুঝতে পারবে জীবনের প্রয়োজনীয়তা। সেভাবে গড়ে তুলতে পারবে নিজেদের সুন্দর জীবন।

গল্পটি টাইপ করেই পাঠিয়ে দিয়েছি কিছু বন্ধুদের ইমেইল-এ। তারা কোন এক সময় সাহিত্য পড়ত। সাহিত্য পড়াকে তারা এখন সময়ের অপচয় মনে করে। তার পরেও আশা ছিল বন্ধু বলে হয়ত আমার লিখাটা পড়বে। কেউই রিপ্লাই করে না। আমি কয়েক জনকে ফোন করেছি। তারা বলেছে ব্যস্ত আছে পরে জানাবে। শুধু আরিফই রিপ্লাই করেছে। ও আমার লিখাটা অনেক সময় ধরে পড়েছে। জানিয়েছে ভাষা আরেকটু সহজ হলে ভালো হত। আর শেষের দিকে নাকি যে মাত্রায় আবেগ ঢেলে দেয়া হয়েছে সেভাবে ইমোশনটা ফুটে উঠেনি। দুজন আবার ইমেইলটা পেয়ে গল্প না পড়েই বাসায় চলে এসেছে। আমার উয়াইফের কাছে জানতে চেয়েছে আমার চাকরি চলে গেছে কিনা।

আমার খুব ইচ্ছা গল্পটা কোন দৈনিকে ছাপা হোক। আমার জন্য না- নতুন প্রজন্মের জন্য। জীবন গড়তে আমার লেখাটা একেবারেই অপরিহার্য বলে মনে হয়। পেপার অফিসে আমার পরিচিত কেউ নেই। আর না চিনলে ওরা ইমেইল না পড়েই ডিলিট করে দেয়। আমেরিকান এম্বেসিও তাই করে। কাউকে ভিসা না দিতে চাইলে আগে রিজেকক্সন সিলটা মারে তারপর বলে- অ্যাই এম নট কনভিন্সড। পেপার অফিসে পরিচিত কাউকে খুঁজে পেলে ভালো হত। খুঁজতে থাকি কেউ আছে কিনা। একদিন একজনের খোঁজ পেয়ে যাই। সে আমার দূর সম্পর্কের খালাত বোনের ছেলে। সে একটা দৈনিকের সাহিত্য উপ-সম্পাদক। ওর সাথে ফোনে কথা বলি। নিজের পরিচয় দেই- তারপর বলি ওর সাথে একদিন একটা জরুরি ব্যাপারে দেখা করতে চাই। পরের সপ্তাহে আমাকে ওর বাসায় যেতে বলে। ওর বাসায় যাবার আগেরদিন গল্পটা প্রিন্ট করি। প্রিন্টেড গল্পটা দেখে একটা অবশ করা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে আমার সারা গায়ে। একটি সুন্দর পরিস্কার কাগজে আমার ছাপানো নামটি দেখে। আমি সত্যিই একজন টাইপিস্ট। কোন দৈনিক বা বই-এ ছাপা না হোক- প্রিন্ট করা কাগজ গুলোও তো আসলে ছাপা। কি সুন্দর ফন্টে প্রথম পাতার উপরের দিকের মাঝখানে লেখা “ছিরু মিয়াঁর অট্টহাসি”। ঠিক তার নিচেই ডানদিকে লেখা আমার নাম। আমি আমার নাম দেখে যেমন খুশি, আমার নামটিও যেন আমাকে দেখে তেমন উৎফুল্ল।

ছাপানো গল্পটি নিয়ে আমার ভাগ্নের বাসায় হাজির হই। এর আগে আর কখনো ওর বাসায় আসিনি। ও বাসাতেই ছিল- ফোন করে এসেছি। ভাগ্নেকে দেখে মনে হল- ও অনেক বড় মাপের মানুষ (আমার চেয়ে অন্তত আড়াই গুণ) [এ লাইনটি আমার বড় বোনের বড় মেয়ে নাজলার জন্য উৎসর্গ করা হল। এখানে বড় শব্দটি যে কোন ভাবেই প্রযোজ্য]। আমাকে নিয়ে ঘরে বসাল। ঘরটির চারদিকে পেপার আর বইয়ের স্তূপ। একটি ছেলেকে ডেকে চা দিতে বলল। এই ফাঁকে ওর হাতে আমার লেখাটা দিলাম। লেখাটা হাতে নিল, কিন্তু চেয়ে দেখল না। জিজ্ঞেস করল

– কবে থেকে লেখেন।
– গত তিন সপ্তাহ ধরে। তাতেই আমি এই পুরো গল্পটি লেখেছি।
– এটা আপনার প্রথম লেখা?
– হ্যাঁ। এটা ছাপা হলে আরো লেখবো।
– তারমানে জীবনে আপনি একটাই গল্প লেখেছেন!
– হ্যাঁ।

তারপর ও একটানা দেড় ঘণ্টা বলে গেল- মানুষ কিভাবে লেখক হয়। আমি বলার চেষ্টা করলাম এখন আর কেউ লেখক নেই- সবাই টাইপিস্ট। কথাটা শুনলেও কানে তুলল না। বলে গেল লেখক সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণা। সাধারণ মানুষ নাকি মনে করে- লেখক জন্মায়। কিন্তু এটা একটা অত্যন্ত ভ্রান্ত ধারণা। লেখক হতে হয়। লেখক হবার জন্য প্রথম শর্ত পড়া- অনেক পড়তে হবে। তারপর আস্তে আস্তে লেখা। লেখা নাকি খুবই কঠিন। অধিকাংশ লেখকেরই প্রথম লেখা ছাপা হয়- ওঁরা বিখ্যাত হয়ে মরে যাবার পর। আরো কিছু ধারণার কথা বলে গেল- আমি আর কোথাও শুনেছি বলে মনে হল না। এক পর্যায়ে থেমে আমাকে ধরিয়ে দিল ওর প্রকাশিত কিছু গল্প। আর অনেক বেশী অপ্রকাশিত গল্প। এগুলো পড়ে দেখতে বলল- কিভাবে ভাব প্রকাশ করতে হয়। পরের সপ্তাহে আমাকে আবার যেতে বলল- ওর লেখাগুলোর উপর আলোচনা হবে। আমার ছাপানো গল্পটা একবারও দেখল না।

ভাগ্নের বাসা থেকে বের হলাম। একঝাক পুরানো ময়লা কাগজ নিয়ে রিক্সায় করে ফিরছি। বুঝে গেছি ওকে দিয়ে আমার গল্প ছাপানো হবে না। আমি আর লেখা ছাপাতে আগ্রহ বোধ করছি না। প্রিন্ট করতে পেরেছি তাতেই আমি খুশি। আর কারো কাছে যাব না। কিন্তু একটা ব্যাপার ভাববার মতো- আমার কখনো লেখক বা টাইপিস্ট হবার ইচ্ছে ছিল না। কেন তাহলে আমি লেখতে গেলাম? প্রশ্নটি স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে মনে। উত্তর পাইনা। এটাকেই কি দৈব বলে! এটা কি সৃষ্টিকর্তার বিশাল পরিকল্পনার একটি অংশ? খেয়াল করে দেখি আমি লেখতে শুরু করেছি ঠিক হুমায়ূন আহমেদের মারা যাবার পর পরই। এটাও কি দৈব? আমি ভেতরে ভেতরে অস্থির অনুভব করি। একসময় আমি যেন খুঁজে পাই আমার লেখার কারণ। বাংলার আকাশে যেন নন্দিত লেখক আর সৃষ্টিশীল টাইপিস্ট একসাথে থাকতে পারে না। আমার টাইপিস্ট হয়াটাই যেন সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। বাসায় ফিরেই অনলাইনে বসে পরি। যতগুলো দৈনিকের ইমেইল অ্যাড্রেস ছিল সব গুলোতে আমার গল্পটা পাঠিয়ে দেই। পাঠিয়ে দিয়েই একটু পর পর ইমেইল চেক করি। কখন একটি রিপ্লাই আসবে- আপনার লেখাটা একেবারে ভিন্নধর্মী, তাই পরের সপ্তাহেই ছাপা হবে। কিন্ত আমার ইমেইল গুলোর কোন রিপ্লাই আসে না। আজ ছয় মাস হয়ে গেল। মাঝে মাঝে মনে একটু খোঁচা লাগে। আমার লেখাটা ছাপা হয়নি সে জন্যে না। কষ্ট লাগে সৃষ্টিকর্তার এত বড় একটা ইচ্ছার কথা কোন পত্রিকা অফিস রাখে না।