বিশ্বকাপ ২০১৪: ব্রাজিলের পথে

brazil soccer 2014 world cup

দুনিয়াকাঁপানো ফুটবল আসরের প্রস্তুতিপর্ব। রাস্তায় তারকার ছবি যেমন আছে, আছে ক্ষুব্ধ মানুষের হতাশা উগরানো বিক্ষোভ। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তিন শহর ঘোরার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন তানিয়া হোসেন।

ব্রাজিলের ভিসার জন্য সবাই উতলা হয়ে গেল নাকি। জাপানিদের কখনো ভিসা নিতে বেগ পেতে হয়, তা আমি জানতাম না। কিন্তু এবার কাউন্টারে দেখছি ভিন্ন এক চিত্র। বেশ অবাক লাগছিল। না, আমি বিশ্বকাপ দেখতে যাচ্ছি না; তবে যাচ্ছি বিশ্বকাপের দেশে, আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পেপার পড়তে। বিশ্বকাপের আগে সেখানে যাচ্ছি এবং আসর শুরুর আগেই ফিরে আসছি; তবু বেশ ভালো লাগছে। মের প্রথম সপ্তাহে ছিল আমার সফর। বিশ্বকাপের আগের মাস, তাই ভেবেছিলাম শহর নিশ্চয়ই খুব সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে। সবকিছু দেখার জন্য আমি অস্থির। যা হোক, আমার ভিসা পেতে কোনো বেগ পেতে হয়নি। জীবনে প্রথম যাচ্ছি দক্ষিণ আমেরিকায়। তাও আবার এমন একটা দেশে প্রথমবার যাচ্ছি, যেখানে আমি ফিরে আসার পরপরই বিশ্বকাপ শুরু হবে। কোনো দিন বিশ্বকাপের মাঠ কাছ থেকে দেখিনি। এবার দেখার সুযোগ পাবো বলে বেশ একটা রোমাঞ্চ হচ্ছে।

ব্রাজিল অনেক দূর জাপান থেকে। বিমানে প্রথমে আমেরিকা, তারপর ব্রাজিল। শুধু আকাশেই উড়ে থাকি ২৪ ঘণ্টা এবং সঙ্গে আরও ২৪ ঘণ্টার ট্রানজিট। মোট ৪৮ ঘণ্টা। লম্বা ফ্লাইট এবং লম্বা ট্রানজিট শেষে প্লেন ল্যান্ড করে ব্রাজিলের সাও পাওলোতে। আমার এবার তিনটা শহরে যাবার কথা। সাও পাওলো, জাও পেসোয়া এবং ব্রাসিলিয়া, ব্রাজিলের রাজধানী। আমাকে নিতে আসবে হেনরিক। আমার বন্ধুর বন্ধু। এ শহর, এ মহাদেশ সবই আমার অচেনা, অজানা। একটু ভয়, একটু দ্বিধা নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের হই। উত্তেজনা আর দ্বিধা নিয়ে বেরিয়েই দেখি হেনরিক। আমার অপেক্ষায়। দেখেই অভিনন্দন জানায়। গাড়িতে করে নিয়ে চলে হোটেলের উদ্দেশে। ব্রাজিলের পথে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। কিছুই যেন নেই এ ছাড়া।

তিনটা শহরে ঘুরে আমার মনে হয়েছে, ব্রাজিল বিশ্বকাপের জন্য তৈরি নয়। কারণ, সে দেশে কেউ ইংরেজি জানে না। বিদেশিদের চলাচল অনেক বড় রকমের সমস্যার ব্যাপার। এ ছাড়া রয়েছে নিরাপত্তার সমস্যা। দেশটি পর্যটকদের একা চলাচলের জন্য নিরাপদ নয়। আমরা কিছুদূর যেতেই দেখি, বাংলাদেশের মতো বিক্ষোভ চলছে। আমার কৌতূহলে হেনরিক জানায়, ব্রাজিলের জনগণ বিশ্বকাপের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। ব্রাজিলে ধনী ও গরিবের মধ্যে অনেক ব্যবধান। সমস্যা অনেক সেখানে। অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত সমস্যা এর মধ্যে সর্বাগ্রে। বিশ্বকাপের জন্য এত অর্থ খরচ হোক, তা তারা চায় না। বিশ্বকাপের আয়োজন ব্রাজিলের মানুষ চায় নাÑ বেশ অবাক হই।

বিশ্ব-ফুটবলে ব্রাজিল বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। ১৯৫০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে তারা। এ জন্য অন্তত ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করছে এবং সে কারণেই এর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। তবে সরকার শহর সাজানোর সব পরিকল্পনা শেষ করে ফেলেছে এবং রাস্তাঘাট সাজানো শুরু করেছে।

পথে পথে রয়েছে খেলোয়াড়দের ছবি। আমি বেশ কয়েকবার ছবি তোলার চেষ্টা করেছি। কখনো পেরেছি, কখনো পারিনি। শহরগুলো আস্তে আস্তে যে সেজে উঠছে তা মনে হয়েছে। তবে আমার ধারণা, ব্রাজিলে বিশ্বকাপ হলে তা দেশটির কাজে লাগবে। কারণ, এতে জনগণ ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব বুঝবে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের নানান দেশের মানুষের নানান সংস্কৃতিও জানতে পারবে। পৃথিবীর অনেক দেশ থেকেই বেশ দূরে বলে অনেকেই ব্রাজিলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। অন্যদিকে, ব্রাজিলিয়ানরা অনেক দেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে না। এ বিশ্বকাপ সেই সুযোগ করে দেবে। অনেক নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে যেমন: হোটেল ব্যবসা, পর্যটন, অনুবাদকের কাজ, খাদ্য ইত্যাদি। বিশ্বকাপের কিছু খারাপ দিকও আছে। যেমন হেনরিক আমাকে জানায়, কিছু মেয়েকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে অতিথিদের প্রমোদসঙ্গী হবার জন্য। এ জন্য কিছু কোম্পানিও তৈরি হয়েছে। যা হোক, বিশ্বকাপ দেশটিকে সারা বিশ্বের কেন্দ্রে নিয়ে আসবে। এতে একরকম ব্র্যান্ডিংও হবে।