ভিনমুলুকে খানা-খাজানা

bangla-food
এক ॥ ডাল-ভাত
খাওয়ার ব্যাপারে বদি ভাইয়ের ‘সুচিবাই’ আছে। ‘সুচিবাইগ্রস্থ’ মানুষ কোন কোন কিছুই সহজভাবে নেন না, সবকিছুতে থাকে খুতখুতে ভাব।
বদি ভাই। বিশিষ্ট সাংবাদিক বদিউল আলম। তিনদশকের সাংবাদিকতায় ভ্রমণ করেছেন বিশ্বময়। পাঁচতারকা, সাততারকা হোটেলে কাটিয়েছেন রাজকীয় যতœ-আত্তিতে। সাংবাদিকদের ভ্রমণভাগ্য ভাল বটে। মিডিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকদরে ভ্রমণপ্রিয় গোত্র মানুষের খাতির যতœ একটু বেশিই পান। বদি ভাই সে রকম ভাগ্যবান সাংবাদিক গোত্রভূক্ত। ভ্রমণের জন্যই যেন জন্ম তাঁর । বিদেশে তারকা হোটেলে থাকা মানে খানাপিনাতেও থাকে রাজকীয় ভাব। বিশ্বখ্যাত সেফদের হাতে বাছাই করা মেন্যু। উপাদান পরিচ্ছন্ন, মুল্যবান। তৈরি প্রণালি বিজ্ঞানসম্মত। পরিবেশন আধুনিকতার ছোঁয়ায় মনলোভা। স্বাদ, গন্ধ তুলনাহীন। তবে খানাপিনা একটা অভ্যাসের ব্যাপার। এর সঙ্গে মানুষের জাতিগত পরিচয়, সংস্কৃতি, ভৌগলিক ও আবহাওয়াগত ব্যাপারের মিশেল রয়েছে। একই জিনিস সব মানুষের কাছে সমান সুস্বাদু নাও হতে পারে।
বদি ভাইয়ের ব্যাপারটি একদম ভিন্ন। তিনি দামি রেস্তোরাঁর ব্যুফেতে সজ্জিত শত আইটেম থেকেও খাবার বাছাই করতে দ্বিধাগ্রস্থ হন। তাঁর আরাধ্য বাঙালি ঘরানার চারটে’ ডাল-ভাত, পাঁচ তারকা হোটেলের রেস্তোরাঁয় যা পাওয়া কঠিন। বিদেশে খাওয়ার সময় হলেই তিনি তাই হোঁচট খান। আমন্ত্রণকদের পীড়াপীড়িতে রেস্তোরাঁয় গিয়ে থরে থরে সাজানো পাত্রের ঢাকনা উঁচিয়ে ঝুঁকে পড়েন। গন্ধ শোঁকেন। বয় বেয়ারা এমনকি সেফদের সঙ্গে খাবারের উপাদান ও তৈরি প্রণালি নিয়ে আলাপ করেন। তারপর নিখরচায় পাওয়া মূল্যবান সব আইটেম ফেলে না খেয়েই বেরিয়ে যান। প্রিয় ডাল-ভাতের খোঁজে আতিপাঁতি করেন। বিদেশে লাঞ্চ-বা ডিনারে দাওয়াত হলে অন্যদের যেখানে খুশিতে আটখান হতে দেখেছি, সেখানে বদি ভাইয়ের বিরস বদন দেখতে হয়েছে। খাবারের সময় তাঁর এই রহস্যময় আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, ডালভাত তাঁর প্রিয়। তাছাড়া দামি রেস্তোরাঁর বহু আইটেম এমনকি সালাদেও ‘হ্যাম’ থাকে। ওই জিনিসটি কোন কোন খাবারে আছে সেটিই তিনি আগে যাচাই করে নিতে চান।
হ্যাম বা শুয়োরের মাংস হারাম। ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে ‘লাহমুল খিনজিরু হারামুন’। মুসলমানরা ধর্মপ্রাণ বলে ওটি খায় না, এমনকি এর নামও মুখে আনে না। ধর্মের নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও অভ্যেসও একটা বড় ব্যাপার। বদি ভাই সিজনড সাংবাদিক…. বহু অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। খাবারের বাচবিছারে তিনি একটু বেশিই সতর্ক।
এখানে বলে রাখি, খাওয়ার এই অভ্যেস-অনভ্যেস নিয়ে অভিজ্ঞতা আমারও কম নয়। আমেরিকা ভ্রমণে গিয়ে ওয়াশিংটনে চীপস খেতে আমার আর সাংবাদিক মাসুমুর রহমান খলিলী’র তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ঘটনা ২০০০ সালের। আমরা বার সাংবাদিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণে গিয়েছি আমেরিকান সাহায্য সংস্থার (ইউএসএআইডি) আমন্ত্রণে। ওয়াশিংটনে জর্জ বুশ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর গাড়িতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওয়াশিংটন ডিসি’তে। সেখানে পাঁচতারা হোটেল ‘ক্রাউন প্লাজা’য় থাকার ব্যবস্থা। রাতে ওয়েলকাম ডিনারের আয়োজন থাকলেও দুদিনের বিমানযাত্রার ধকলের পর বিমানবন্দর থেকে শহর বেশ দূরত্বে হওয়ায় হোটেলে পৌঁছেই সকলের পেট চুঁ চুঁ করতে শুরু করেছে। পৌঁছেছি ছয়টার দিকে। আমেরিকায় তখনও সন্ধ্যা নামেনি। ডিনারে যাওয়ার আগে কিছু একটা খাওয়া দরকার। হোটেল বেয়ারাদের জিজ্ঞেস করতেই তাদের পরামর্শ ফার্মেসী’তে যান, সব পেয়ে যাবেন। আমাদের চোখ কপালে! ব্যাটারা বলে কি! আমরা খাবারের খোঁজে বেরুবো, ব্যাটা বলে ফার্মেসীর কথা।
ওয়াশিংটনের আমাদের দেশের মতো রাস্তার পাশে দোকানপাট নেই। জানা গেল, এখানে ভাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের নামে ফার্মেসী শব্দটা যুক্ত। আমাদের দেশে ফার্মেসী বলতে শুধু ওষুধের দোকান বোঝায়। যাই হোক, হোটেলের অদূরে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে পৌছালাম। নাম সিভিএস ফার্মেসী। কাঁচা তরিতরকারী থেকে শুরু করে বার্গার-স্যান্ডউইচ জাতীয় খাবার দাবার সবই সেখানে রয়েছে। তবে বেশিরভাগই আগে উল্লেখ করা ওই হারাম জিনিস দিয়ে তৈরি। মানে ‘লাহমুল খিনজির’। এ অবস্থায় চীপস, বিস্কুট, পানি ইত্যাদি কিনে নিলাম যার যার পছন্দমতো। খলিলী ভাই একটা বড় সাইজের চীপস কিনে হোটেলে ফিরে খাচ্ছিলেন। আমাকেও খাওয়ার অনুরোধ করলেন। খেয়ে দেখি বেশ মুখরোচক। চীপস যখন প্রায় শেষ, তখন কেউ একজন চীপস এর প্যাকেটটি ভাল করে পড়ে বললেন, এই চীপস শুয়োরের চর্বি দিয়ে ভাজা। আমাদের তখন চক্ষু চড়ক গাছ। নিজেকে প্রবোধ দিতে খলিলী ভাই’র মুখে অস্ফুট শব্দঃ যাহ্। বমি ভাব নিয়ে আমি বাথরুমে দৌড়…। এই ট্রিপেও বদি ভাই ছিলেন যথারীতি।
ওয়াশিংটনের চীপস পরিস্থিতির মতো এন্তার অভিজ্ঞতায় ঠাসা বলে বিদেশিদের লাঞ্চ-ডিনারের সম্ভাষণে কখনো তাঁকে খুব আমোদিত হতে দেখিনি। ডিনারের রাতটিতে কিভাবে ডাল-ভাতের যোগাড় করা যায়, তা নিয়েই গলদঘর্ম হতে দেখা গেছে তাঁকে। বদি ভাই’র সঙ্গে বহুবার ভ্রমণে ডালভাতের জন্য তাঁর হা পিত্যেস নিয়ে বহু মজার কান্ডও ঘটেছে। বদি ভাইয়ের এই ডালভাত কাহিনীর সূচনা করা যায়, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহর দিয়ে। সেখানে বিদেশিদের দাওয়াত ফেলে তাঁকে নিয়ে ছুটতে হয়েছিল সিডনি অপেরা হাউজের হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল ২৫ কিলোমিটার দূরে সিডনি বিমানবন্দরের সংলগ্ন মাস্কট এলাকায়, ডালভাতের খোজে।
২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে একটি বিশ্ব সম্মেলন। জ্বালানির ওপর। বদি ভাইসহ কয়েকজন গেছেন আমেরিকান সংস্থার আমন্ত্রণে। জ্বালানি ব্যবসায়িদের কেউ কেউ পৌঁছেছেন আযোজক কমিটির সদস্য হিসাবে নিজ খরচায়। তাঁরা উঠেছেন সিডনি হারবারের বিভিন্ন ফাইভ স্টার হোটেল। এর মধ্যে এক ব্যবসায়ীসহ কয়েকজন উঠেছেন হাইডপার্ক সংলগ্ন শেরাটন হোটেলে। বদি ভাইদের হোটেল সবচেয়ে সিডনী অপেরা হাউসের কাছে, ইন্টারকন্টিনেন্টালসিডনী। আমরা কয়েকজন মিডিয়া হাউসের খরচায় পৌছেছি সেখানে। তবে খরচে না কুলানোয় আমাদের ভরসা বেড এ্যান্ড ব্রেকফাস্ট মার্কা হোটেল। কয়েকদিন সেখানে কাটিয়ে আমি আর আরেকজন চলে গেছি বাঙালি বন্ধুর বাসায়। গার্লফ্রেন্ড সিডনীতে থাকায় বন্ধুটি বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তার বাসায় তুলতে পারেনি। তবে গার্লফ্রেন্ড চাকরির কাজে কান্ট্রিসাইডে চলে যাওয়ায় সে আমাদের নিয়ে তুলেছে সিডনীর লাকেম্বা এলাকায় তার বাসায়।
তবে আমাদের নিত্যকার আড্ডাই ছিল, সিডনি হারবার, পার্ক বা অপেরা হাউসে অবস্থিত তারকা হোটেলগুলোর বাঙালি ভাইদের কক্ষে। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি সিডনি হারবারের কনভেনশন সেন্টারে সম্মেলনের বিভিন্ন সেশনে অংশ নেয়া, আয়োজক ও বিভিন্ন কোম্পানির দেয়া লাঞ্চ-ডিনারে যোগদান, ঢাকায় রিপোর্ট পাঠানো আর গল্প আড্ডা, পানাহারই আমাদের কাজ। কয়েকদিনের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম, বদি ভাই শুকিয়ে কাঠ হয়ে হচ্ছেন। কয়েকদিনের ভাল ভাল লাঞ্চ আর ডিনারের পানাহারে যেখানে চেকনাই বাড়ার কথা, সেখানে তার কাষ্ঠমুখ দেখে অবাকই হলাম। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, কয়েকদিন অনেকটা না খেয়েই কাটাচ্ছেন। সম্মেলন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বিমানের সিডিউল ভিন্নতায় আমার আর বদি ভাই’র আরও দুয়েক বেলা থেকে যাওয়ার কথা। বদি ভাই অনুরোধ করলেন, সন্ধ্যায় হোটেলে চলে এসো, ডালভাত এর খোজে বেরুবো, তা না পেলে তো আর বাঁচি না।
সন্ধ্যায় হোটেলে পৌছে বদি ভাই’র সঙ্গে বের হলাম। তিনি তার এক আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। এ সময় দেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন মোস্তফা কামাল। তার মেয়ে ও জামাই থাকেন সিডনি হারবার থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে, বিমানবন্দরের কাছে মাস্কট এলাকায়। তার বলে দেয়া রুট অনুসারে আমরা ক্যাব নিলাম। খোজাখুজি করে বের করলাম তার বাসা। গিয়ে দেখি, ডালভাতের বদলে মোরগ পোলাওসহ নানা উন্নত খাবারের আয়োজন। আত্মীয় বলে কথা। বদি ভাই’র সৌজন্যে তাদের যতœ-আত্তির সীমা নেই। কিন্তু তাঁর তখন দরকার নিরেট ডালভাত। আয়োজনের ঘটা দেখে বদি ভাই বললেন, পোলাও, কোর্মা চলবে না। সাধারণ কিছু খেতে চাই। পরে সাধারণ ডালভাতের ব্যবস্থা হওয়ায় তিনি খুশি হলেন। মনে হলো জন্ম-জন্মান্তর অভ্যুক্ত থাকার পর তিনি এই প্রথম তাঁর প্রিয় খাবার সামনে পেয়েছেন।
রাতে যখন হোটেল পর্যন্ত বদি ভাইকে পৌছে দিলাম, দেখা গেল যাতায়াতে ট্যাক্সিক্যাবে যে খরচ হয়েছে আমাদের, তাতে ওয়েস্টার্ণ স্টাইলে খোদ সিডনীতেই অন্তত দশজনের ডিনার সারা যেতো। হলে কি হবে, খাদ্যাভ্যাস বলে কথা, ডালভাত বলে কথা।

দুই ॥ মার্সিডিজি রহস্য
বাংলা খাবার চারটে’ ডালভাত না পেয়ে একই দশা হয়েছিল এটিএন বাংলা চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমানের। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে, সুইজাল্যান্ডের জেনেভায় ।
বিশ্ব ইনফরমেশন সোসাইটি সামিট (ডব্লিউএসআইএস) কভার করার আমন্ত্রণ পেয়ে আমরা তিন সাংবাদিক গিয়েছি একদলে। জেনেভার প্যালেক্সপো কনভেনশন সেন্টারের ভেন্যুতে মাহফুজ ভাই যেখানে মিলিয়নার হয়েও হলুদ ট্যাক্সিক্যাবে এসে নামছেন, আমরা সেখানে উপস্থিত হচ্ছি কালো রঙের চকচকে মার্সিডিজ বেঞ্জে। শীর্ষ সম্মেলন ভেন্যুতে মার্সিডিজ থেকে নামতে দেখে তার ব্যকুল প্রশ্ন
: আপনাদের রহস্য কী?
: জাতিসংঘ আমাদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছে। তাদের সৌজন্যেই ঘুরছি মার্সিডিজে।’- তাকে ঘাবড়ে দেয়ার জন্য আমরা মজা করে বলি।
মাহফুজ ভাই’র চোখে অন্তহীন বিস্ময়। ঢাকায় আমরা ছাপোষা প্রফেশনাল, মাহফুজ ভাই শিল্পপতি। এটিএন বাংলা ছাড়াও গার্মেন্টস শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। ঢাকায় এন্তার বাড়ি, গাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন তাঁর। বলে রাখা ভাল, প্রিন্ট সাংবাদিকতার সমান্তরালে মাহফুজ ভাইয়ের আগ্রহে চুক্তিভিত্তিতে এটিএন বাংলায় ইলেকট্রনিক সাংবাদিকতা শুরু করি ১৯৯৭ সালে, এটিএন এর যাত্রা শুরুর সময় থেকেই। রিপোর্টিং – সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠানাদি ও টকশো’’র প্রথম সূচনাকারী ও পরিচালক হিসাবে সফলতা দেখানোয় তাঁর ঘনিষ্ঠ জুনিয়র বন্ধুত্ব লাভ করি। ফলে তার সঙ্গে মজার করার বিষয়টা খুব বেখাপ্পা নয়। তিনি ধরে বসলেন,
: আপনাদের মার্সিডিজ রহস্য আসলে কী !
চ্যানেল মালিকের জেনেভা ট্রিপের রহস্যটা আগে বলি। তখন এতো চ্যানেলের চল হয়নি। বিটিভি ছাড়া এটিএন বাংলা আর চ্যানেল আইই ভরসা। এটিএন বছরখানেক আগে থেকে নিয়মিত সংবাদ প্রচার শুরু করায় বিশ্ব সম্মেলনের কথা শুনলেই কভার করার ব্যবস্থা করে। এটিএন চেয়ারম্যান এমনিতে ভ্রমনপ্রিয় মানুষ। বড় অনুষ্ঠানাদির ছুতোয় রিপোর্টার, ক্যামেরাম্যান, ক্রুদের সঙ্গে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিতে তার আগ্রহ-উৎসাহের কমতি নেই। সদ্য বিবাহিত স্ত্রী ইভা রহমানকে নিয়ে বাইরের একটা ট্রিপও মন্দ না। ঘন ঘন বিদেশ যাওয়ার সিডিউলে েিজনেভা সামিটকে অন্তর্ভূক্ত করে নিয়েছেন। তল্পিতল্পা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন জেনেভায়। আলাপে জানা গেল, সম্মেলন কভার করতে গিয়ে হাজার হাজার ডলার খরচ করলেও খাবার নিয়ে পড়েছেন বেকায়দায়। জেনেভার পাঁচতারা হোটেলের খাবার খেতে খেতে অরুচি ধরে গেছে। সেফদের বুঝিয়ে দিয়ে বাঙালি কায়দায় ভাত, মুরগির ঝোল রান্নার চেষ্টা করেছিলেন।স্পাইসি খাবার রান্নার কথা বলে দেয়ার পরও তারা এমন এক খিচুড়ি মার্কা জিনিস সামনে দিয়েছে, তা আর নবদম্পতির মুখে রোচেনি। সে কথা অকপটে বলে দেশি খাবারের জন্য হা পিত্যিস করছিলেন।
বললাম, ‘রাতে আসুন জেনেভা রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে, মার্সিডিজ রহস্য জানতে পারবেন। বাঙালি খাবারও জুটবে।’ তিনি সানন্দে রাজি হলেন।
মার্সিডিজি কাহিনীর রহস্যভেদ, দেশি খাবারের গল্পে আমাদের যেতে হবে আরও একটু পেছনে।
আমি, রুহুল আমিন রুশদ আর ডাবলু চৌধুরী এ যাত্রায় একসঙ্গে। জেনেভা শহরে হোটেল ভাড়া বেশি আর সম্মেলনের সময় বেশিরভাগ স্টার হোটেলে রুম না থাকায় আমরা একদিনের জন্য বুকিং দিয়েছিলাম ইয়ুথ হোস্টেলে। পরিকল্পনা ছিল, জেনেভায় পৌঁছে পরে হোটেল ঠিকঠাক করে নেবো। জেনেভা পৌঁছে প্রথমেই বিমানবন্দরে সময়মতো ল্যাগেজ পেলাম না। প্রেসার কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল, কারণ ল্যাগেজের মধ্যে কাপড় চোপড় ছাড়াও ডলার ছিল। ‘লস্ট এ্যান্ড ফাউন্ড’ এর কাঁচঘেরা রুমে দায়িত্বরত প্রৌঢ়া বললেন, “ডন্ট ওরি, এ্যাড্রেস দিয়ে যাও, ঠিকানায় লাগেজ পৌছে যাবে।” ঠিকানা দিয়ে হোস্টেলে চেক ইন করে রাত কাটালাম। সকাল দশটায় সম্মেলনের রেজিস্ট্রেশন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য অধিবেশন কভার করে একবারে ভরসন্ধ্যায় ফিরলাম। এসে দেখি বিমানবন্দর থেকে লাগেজ এসেছে তবে তা রুমে নেয়ার আর সুযোগ হলো না। আমাদের বুকিং ছিল একদিনের, দুপুর বারোটাতেই চেক আউট করে দেয়া হয়েছে আমাদের। ওই কক্ষ অন্য ক্লায়েন্টের দখলে। নতুন রুম বরাদ্দ চেয়ে বিফল হলাম। এশিয়ান কায়দায় লজিক উপস্থাপনের চেষ্টাও সফল হলো না। আফ্রিকান ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মী সাফ জানিয়ে দিল “জেন্টেলম্যান, দিস ইজ নট বাংলাদেশ অর ইন্ডিয়া, এখানে সবকিছু আগে ঠিকঠাক করতে হয়।’ খাঁটি কথা। ভরসন্ধ্যায় লাগেজ নিয়ে বের হয়ে এলাম।
অদূরে রু দে লুজান। রু মানে রাস্তা বা সড়ক। লুজান সড়কের ফুটপাত দিয়ে লাগেজ টেনে হাঁটছি। কাছেই জেনেভাস্থ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন। মিশনের দোরগোড়ায় পৌছালাম। বহুতল ভবনের তিনতলায় মিশন, নিচে ছোটখাটো দরজা পেরিয়ে সিঁড়ি। দেশের প্রধানমন্ত্রী সামিটে যোগ দিতে জেনেভা সফর করছেন। মিশনের কর্মকর্তারা ব্যস্তসমস্ত। সেই সন্ধ্যায় কেউই অফিসে নেই। নিচের দরজায় বাংলায় ডাক-চিৎকার শুনে একজন নি¤œপদের বাঙালি কর্মচারী তিনতলার জানালা খুলে নিচে উঁকি দিলেন। বাঙালি চেহারা দখলে নিচে এসে দরজা খুলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওপরে নিয়ে বসতে দিলেন। বাংলাদেশ সমিতি-সংগঠন করেন এমন কয়েকজনের নম্বর চাইলাম। ওই মিশন কর্মী দিলেন। কথায় বসতে দিলে শুতে দিতে হয়। আমরা পড়েছি বিপদে। মিশনের ফোন থেকে ফোন করতেও বাধা দিলেন না। কয়েকবার ফোনের পর একজনেরউত্তর এল সাগ্রহে। বৃত্তান্ত শুনে অপরপ্রান্তের প্রশ্ন
: আপনারা এখন কোথায়?
: বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে।
: নিচের রাস্তায় এসে লাগেজ নিয়ে দাঁড়ান, দশমিনিটের মধ্যে একটা কােেলা রঙের চকচকে মার্সিডিজ যাচ্ছে, তাতে উঠে পড়–ন।
আমাদের ঘোর কাটতে না কাটতেই নিচে নামলাম। আনন্দে আত্মহারা হলাম। যে কথা সেই কাজ। কিছুক্ষণের মধ্যে কালো রঙের একটি মার্সিডিজ এসে আমাদের সামনে পাশে দাঁড়াল। কাঁচ নামিয়ে আমাদের নাম জিজ্ঞেস করলেন চালক। তারপর পিছনে ল্যাগেজ ভরে গাড়িতে উঠতে ইঙ্গিত করলেন। আমরা যন্ত্রচালিতের ল্যাগেজ তুলে আরাম করে ভিতরে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আবাসিক এলাকার একটা বহুতল এ্যাপার্টমেন্টের সামনে থামলো গাড়ি। গাড়ি থেকে নামতেই শান্ত, সৌম্য চেহারার এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আমার নাম নজরুল জমাদার।”
নজরুল জমাদার বাংলাদেশ সমিতি জেনেভার সভাপতি। নিজের বাসা ছাড়াও একটি বড়সড়ো এ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে তার মালিকানায়। চারতলার একটা ছিমছাম নিরিবিলি ফ্ল্যাটে আমাদের বেশ আরামেই থাকার ব্যবস্থা হলো। জমাদারের ভাগিনার তত্ত্বাবধানে জেনেভায় আসা আরও কয়েক বাঙালির সঙ্গে দেশি খাবার দাবার খেয়ে কাটালাম সে রাত। পরদিন থেকে মার্সিডিজে ঘোরাঘুরি শুরু হলো। জমাদার মরক্কান স্ত্রী আর ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকেন অন্য বাসায়। সেখান থেকে আসা বাঙালি-মরক্কান ফিউশান ফুডেও আমাদের রসনা পুরণ হতে লাগল। এই অকৃত্রিম যতœ-আত্তি, আর কয়েকদিনের নীবিড় বন্ধুত্বের সাহসেই জমাদারকে না বলে এটিএন চেয়ারম্যান মাহফুজ ভাইকে দাওয়াত দিয়েছি। নজরুল জমাদার তা শুনে খুশিই হলেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ সমিতির অন্যদের ফোন জরে বাঙালিদের বড়সড়ো একটি দল নিয়ে আমাদের সঙ্গে জেনেভা রেলস্টেশনে হাজির হলেন। কথামতো, মাহফুজ ভাই আর ইভা রহমান এলেন। তাদের সঙ্গে এটিএন এর রিপোর্টার মনিউর রহমান, ক্যামেরাম্যান পল্লব, ভিডিও এডিটর আদর। মাহফুজ ভাইকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নজরুল জমাদারের বাসায় আনা হলো।
বাঙালি স্টাইলের ভাত, ডাল, ভর্তা, মাছের পাশাপাশি ছিল মরক্কান স্টাইলের নানা পদ। বেশ কয়েকদিন পর বাংলা খাবারের আস্বাদ পেয়ে মাহফুজ ভাই যার পর নাই খুশি। নজরুল জমাদারের একটি ছোট্ট ইন্টারভিউ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাহফুজ ভাই’র নির্দেশে পুরো পরিবারের ওপর আধঘন্টার ইন্টারভিউ নেয়ার ব্যবস্থা হলো।
খাবার দাবার শেষে এক ফাঁকে মাহফুজুর রহমান আমাকে ফিসফিসিয়ে বললেন-
: এই তাহলে আপনাদের মার্সিডিজ রহস্য!
: হুমম…
মানবসভ্যতায় নিমন্ত্রণ খাওয়া এমনিতেই মজার একটি বিষয়। কয়েকদিন দেশি খাবার থেকে দূরে থাকার পর সে নিমন্ত্রণ যদি হয় দেশি খাবার দিয়ে, তার মজা বোধ করি একটু বেশি। জেনেভার এই মেজবান নজরুল জমাদার ওই ডিনারে সকলের তৃপ্তি দেখেই তা বুঝেছিলেন সেদিন।

তিন ॥ মিস্টার বিন ও তাজা ঝিনুক
বিশ্বখ্যাত হাসির টিভি সিরিজ মিস্টার বিন এর একটা এপিসোডের নাম ’মিস্টার বিন ইন রুম নাম্বার ফোর হানড্রেড টুয়েন্টি সিক্স’। এ পর্বে মিস্টার বিন উইকেন্ডে একটি হোটেলে কাটাতে যান এবং হোটেলটির ব্যুফে ডিনারের দৃশ্য প্রিয় পাঠকের স্মরণে থাকার কথা। মিস্টার বিন এক আবাসিক হোটেলের ব্যুফেতে ণৈশভোজ করতে গিয়ে পাশের কক্ষের অতিথির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মেতে ্ওঠেন। খাবারের সঙ্গে ওয়েস্টার বা তাজা ঝিনুক নিলেন প্লেটে। অতিথির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে গোগ্রাসের গিলছিলেন এসব খাবার। অন্য অতিথি ধীরে ধীরে ডিনার সারছিলেন। ওয়েস্টার খেতে গিয়ে গন্ধ শুঁকে পরখ করে দেখলেন, তা দূর্গন্ধময় ও খাবাার অযোগ্য। তিনি হোটেলের ওয়েটারদের বিষয়টি অবহিত করলে সেফরা বাঁকি ঝিনুকগুলো সরিয়ে ফেললেন। ততোক্ষণে সবগুলো ঝিনুকই সাবাড় করে ফেলেছেন মিস্টার বিন। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি ওয়াক ওয়াক করতে করতে গিয়ে বেরিয়ে গেলেন। পরে তা পীটের পীড়া হয়ে যায় এবং রাতে গ্রোগ্রাসে ওয়েস্টার খাওয়ার দু:স্বপ্ন দেখেন।
কানাডার ক্যালগেরিতে বাস্তব জীবনে আমাদের এই অবস্থা হয়েছিল। ২০০০ সালে বারো সাংবাদিক মার্কিন ট্যূরের অংশ হিসাবেই পৌঁছেছি কানাডার ক্যালগেরি শহরে। এক বহুজাতিক কোম্পানির সৌজনে দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ কাউবয় সিটিখ্যাত ক্যালগেরির সবচে’ দামি রেস্তোরাঁয়। আমাদের বারোজনকে ভাগ করে বিদেশি অন্য আমন্ত্রিতদের সঙ্গে বসানো হয়েছে। একেক টেবিলে জনা চারেক। বয়-বেয়ারার রেস্তোরাঁর নামাঙ্কিত বিশেষ এ্যাপ্রোন পরে সাদরে সম্ভাষণ করে বসিয়েছে আমাদের। দামি রেস্তোরা বলে আগে ভাগে মেন্যু ঠিক করে অর্ডার দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী খাবার সার্ভ করা শুরু হয়েছে। পাশে বসা বিদেশিদের সঙ্গে টুকটাক আলাপ হচ্ছে। প্রথমে বান আর চিজ। পানীয় দেয়া হয়েছে যার যার পছন্দমতো। এরপরই দেখি, সাদা প্লেটে একটা করে শ্যাওলা জমা সাদা ঝিনুক দেয়া হচ্ছে। বরফগুঁড়োর ওপর তরতাজা ঝিনুক আর পাশে এক টুকরো লেবু বিশেষ কায়দায় কেটে বসিয়ে দেয়া। কানাডার এই রেস্টুরেন্টে নাকি সমুদ্র থেকে ধরা তরতাজা ঝিনুক সরবরাহ সরবরাহ করা হয় অভিজাত ভোজনরসিকদের রসনাবলিাসে। আমাদে পাতে দেয়া ঝিনুক কিছুক্ষণ আগেই পানির তল থেকে তুলে আনা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সঙ্গে সসের বাটি। এটা সার্ভ হওয়ায় আমার টেবিলসঙ্গী বিদেশি বন্ধুরা মহাখুশি। আলাপ হচ্ছে, এই তরতাজা জিনিসটার জন্যই এই রেস্টুরেন্ট এ শহরের মানুষের এতো প্রিয়।
আমার মাথায় হাত। বনরুটিতে চীজ লাগিয়ে চেটে যাচ্ছি। ভেতরে যাচ্ছে না। মূহুর্তে কোথায় যেন হারিয়ে গেছি। এ ধরনের দাওয়াতাদিতে ওঠবস খুব বেশিদিন হয়নি আমার। সেদ্ধ-আধসেদ্ধ খাবারের কথা শুনলেও সরাসরি সাগর থেকে প্লেটে কোন খাবার আসতে পারে সে ধারণা নেই। আশপাশে দেখি, শামুক-ঝিনুক ভেঙে ভেতরে লেবুর রস চিপে সামান্য সস দিয়ে বেশ চেটে পুটে খাচ্ছে অন্যরা। আমাকে বসে থাকতে দেখে অন্যরা পীড়াপীড়ি করলো স্ট্যাটারটা খেয়ে নেয়ার জন্য। এটাতে অভ্যস্ত নই বলতে দ্বিধা করলাম না। পাশের একজন আমার প্লেট থেকে নিয়ে ঝিনুকটা সাবাড় করে ফেললেন। এরপর যেসব খাবার এলো, তাতে বেশ বাছবিচার করেই খেতে হলো।
বলার অপেক্ষা রাখে না, খানাপিনার ডেলিক্যাসি জিনিসটা সর্বজনবিদিত। বহু জিনিস দুর্লভ বলে এর দাম অনেক বেশি। মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ায় সুইফলেট পাখির লালায় তৈরি পাখির বাসার স্যূপ চীনে সবচেয়ে দামি ও জনপ্রিয় । সামুদ্রিক ফুগু মাছ জাপানের খাদ্যতালিকার দামি ও সংবেদনশীল খাবার। এই ডেলিক্যাসি খাবারের তালিকাভূক্ত হচ্ছে, সামুদ্রিক ঝিনুক। দামি রেস্তোরাঁ বলেই ক্যালগেরিতে আমাদের প্লেটে তুলে দেয়া হয়েছিল ওয়েষ্টার। কিন্তু যতো দামিই হোক, অভ্যেস বলে কথা। আমাদের অভ্যেস না থাকায় ওই দুর্লভ ও দামিটা বাদ দিয়েই অন্য খাবার খেয়েছি।
এ দিন রাতে কোন দাওয়াত না থাকায় ক্যালগেরির এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে খাওয়ার পরিকল্পনা হলো। অন্তত সপ্তাহ দুয়েক আমরা দেশছাড়া। দেশি খাবার ছাড়া। কেএফসি, ম্যাগনোডালস আর শামুক-ঝিনুকে হাঁফিয়ে উঠেছি। ক্যালগেরিতে এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের খোঁজ পেয়ে হোটেল রামাদা থেকে সবাই ট্যাক্সি নিয়ে হাজির হলাম। রেস্তোরার মালিক ও বয় বেয়ারারা বাদামি চেহারা দেখে যার পর নাই খুশি। আমাদের সামনে হোটেলের নিয়মিত মেন্যু দেয়া হলো। মেন্যুর কোন আইটেমই কারও সেটা পছন্দ নয়। দলের সিনিয়র সদস্য আকরাম হোসেন খান, কাশেম হুমায়ুন, বদিউল আলম বললেন, আলু ভর্তা আর পাতলা ডাল চাই। রেস্তোরার সেফরাও দ্বিতীয় প্রজন্মের কানাডিয়ান। আলু ভর্তা, পাতলা ডাল তারা করতে পারবে বলে মনে হলো না। তাও বুঝিয়ে দেয়া হলো আমাদের পক্ষ থেকেই। শেষমেষ সাদা ভাত, আলু ভর্তা আর ডাল খাওয়ার মনে হলো সবাই আজই পৃথিবীতে কোন উপাদেয় খাবার খেয়েছে। তবে কিছুক্ষণের জন্য আমাদের সে তৃপ্তির ঢেকুর উধাও। যে বিল এলো..তা দেখে সবার চক্ষু চড়কগাছ। মেন্যুর খাবারের যে দাম ছিল..তার তিনগুণ করে বিল করা হয়েছে। বিলের অর্থ গুণতে গিয়ে মুখ কালাকালি হলো। তবে দেশি খাবারের স্বাদের অপূর্ব আমেজ কুচবরণ মুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকল না।