সাইদীর ইমতিহান, ইন্সানিয়াতের খউফ এবং রিজ্জা প্রসঙ্গ

sayedee mehfil
আমি যখন তাকে প্রথম দেখি তখনো তার নামের সঙ্গে আল্লামা উপাধী সংযুক্ত হয়নি। সেটা ছিল ১৯৭৬ সালের কথা। আমি কেবল তার সুরেলা কন্ঠ এবং দাড়ী টুপির আকৃতির কথা মনে রাখতে পেরেছিলাম। এরপর তাকে দ্বিতীয়বার দেখি ১৯৯৪ সালে চট্রগ্রামের প্যারেড ময়দানে। ব্যবসা উপলক্ষে আমি তখন চট্রগ্রামে ছিলাম বেশ কয়েকদিনের জন্য। সারাদিন প্রচন্ড কাজ। কিন্তু সন্ধে হলেই অখন্ড অবসর। ঐ শহরে আমার পরিচিত জন ছিলো একেবারেই হাতে গোনা। ২/১ দিন বিকেলে গেলাম পতেঙ্গা সৈকতে- তাও আর ভালো লাগছিলো না। হোটেলে বসে থাকতে থাকতে যখন একেবারেই অধৈর্য হয়ে উঠলাম তখন দেখলাম অনেক গুলো লোক দলবেঁধে পাজামা-পাঞ্জাবী ও টুপি পরে মাহফিলে যাচ্ছে। আমিও তাদের সঙ্গী হলাম কোন কিছু জিজ্ঞাসা না করেই। প্রায় ঘন্টা খানেক হাটার পর মাহফিল স্থলে পৌছালাম এবং ওয়ায়েজীনের কন্ঠ শুনে বুঝলাম মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাইদী বক্তব্য দিচ্ছেন। আমি ওয়াজ শুনছিলাম এবং হেটে হেটে প্যারেড ময়দানের চারি পাশে ঘুরে ঘুরে লোকজনের সংখ্যা নিরুপনের চেষ্টা করছিলাম। কত হবে- কেউ বলে পাঁচ লাখ, কেউ বলে দশ লাখ- কেউ কেউ আরো বেশী। এতো বিশাল জন সমাবেশ আমি ইতিপূর্বে যেমন দেখিনি তেমনি আজ অবধিও দেখিনি কেবল তাবলীগ জামাতের মহা সমাবেশ ছাড়া।

ঐদিনের পর থেকে আমি জনাব সাইদীর একজন ভক্ত হয়ে গেলাম। চট্রগ্রামের মাহফিলে আমার দ্বিতীয়বার যাওয়ার সুযোগ হয়নি কিন্তু মতিঝিল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠের বাৎসরিক মাহফিল নিয়মিত শুনেছি। কিন্তু আমার সুযোগ হয়নি তার সামনে দাড়িয়ে বা নিকটে বসে দুদন্ড কথা বলার কিংবা একান্ত কাছ থেকে দেখবার।

শেষমেষ সেই সুযোগটি এলো ২০০৪ সালে। আমার এক বন্ধু ফোন করে জানালেন যে সাইদী সাহেব রাতে তার বাসায় দাওয়াত খাবেন। তিনি আর কাউকেই দাওয়াত দেননি কেবল আমাকে ছাড়া। আমি আগ্রহ ভরে সেরাতে বন্ধুর নিমন্ত্রন গ্রহন করেছিলাম। সাইদী সাহেব এলেন এবং আমরা পরিচিত হলাম। তিনি যখন জানলেন যে আমি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের একজন সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রার্থী তখন ভারী উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং আগ্রহ নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকালেন এবং মুচকী হেসে বললেন- আওয়ামীলীগে এতো ভদ্রলোক আছেন তা আপনাকে এবং ফারুক খানকে না দেখলে বোঝা যাবে না। আমি মূলত তার ওয়াজ মাহফিল নিয়েই কিছু কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আবেগের আতিসয্যে পারিনি। কেবল জিজ্ঞাস করেছিলাম- শেখ হাসিনা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? তিনি বলেছিলেন- আমরা তাকে শ্রদ্ধা করি বঙ্গবন্ধু কন্যা হিসেবে। তিনি যদি জানতেন-তার প্রতিদ্বন্দীরা তাকে কিভাবে শ্রদ্ধা করে-কেনো করে এবং কখন করে তাহলে তার রাজনৈতিক দর্শন আরো মর্যাদা পেতো।

এরপর আর আমার সঙ্গে সাইদী সাহেবের দেখাও হয়নি এবং কথাও হয়নি। উনি অবশ্য তার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেটাও হয়ে উঠেনি ব্যস্ততার কারনে। কিন্তু প্রতি মুহুর্তেই আমি তার সঙ্গে ছিলাম এবং এখনো আছি – হয়তো আল্লাহ চাইলে ভবিষ্যতেও থাকবো। তার সঙ্গে থাকার মূল ভিত্তিটি হলো ওয়ায়েজীন হিসাবে তার বক্তব্য, সুরেলা আওয়াজ, ক্ষুরধার যুক্তি, বর্নাঢ্য উপস্থাপনা, সাবলীল এবং সহজবোধ্য ভাষার প্রয়োগ এবং প্রচন্ড মোহময়তার সুতীব্র চৌম্বক শক্তিতে লক্ষ লক্ষ জনতাকে মাহফিলের মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে আকৃষ্ট করে রাখার প্রবল ক্ষমতা।

প্রথম জীবনে আমি দাদাকে নিয়ে তার মাহফিলে গিয়েছি। তারপর আব্বাকে নিয়ে-সবশেষে গিয়েছি নিজের পুত্র সন্তানকে নিয়ে। যখন প্রথম গিয়েছিলাম তখন ছিলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। যখন সর্বশেষ গিয়েছিলাম তখন যৌবন পেরিয়ে পৌঢ়ত্বে ঢোকার ভয় মনের মধ্যে প্রবেশ করেছিলো- এবং এখন আমার কথা-বক্তব্য শোনার জন্যও হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো- আমার প্রথম দর্শন এবং শেষ দর্শনের মধ্যকার প্রায় ৩০ টি বছরের ব্যবধানে একবারও জনাব সাইদীর বক্তব্য পুরোনো, অ-আকর্ষনীয়, বিরক্তিকর কিংবা একঘেয়ে বলে মনে হয়নি। যুগ যেমন টেপ রেকর্ডার থেকে সিডি-ভিসিডি ও ডিভিডিতে রুপান্তরিত হয়ে ওয়েব বেইজড হয়ে গিয়েছে তেমনি সাইদী সাহেবও জমিনের মালিক আল্লাহর বানী এবং তার হাবীবের বানীকে আধুনিক মানুষের মনের উপযোগী করে উপস্থাপন করেছেন। ফলে গত প্রায় ৪০টি বছর ধরে বাংলা ভাষাভাষী তাবৎ দুনিয়ার মুসলমান নরনারীর নিকট তিনি রুপান্তরিত হয়েছেন এক জীবন্ত কিংবদন্তীরুপে। মানুষের বুভূক্ষ আধ্যাত্মিকতার জগতে তিনি এক মুকুটহীন বাদশা এবং মনোজগতের আলোকিত স্বপ্ন পুরুষ।

আমার ক্ষেত্রে কিন্তু জনাব সাইদীর বিষয়টি এরুপ হবার কথা ছিলো না। কারন শৈশব থেকেই আমি ধর্মকর্ম করা একজন রক্ষনশীল মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠছিলাম। কলেজ জীবনে এসে সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতির একজন কট্ররপন্থী কর্মী হিসেবে ইসলাম পন্থী দলগুলো সম্পর্কে ভালো ধারনা পোষন করতাম না। এরপর আমি দেখা পাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতীদের। এদের দু’জন ইমাম-খাজা আবু তাহের এবং মাওলানা আব্দুল জলিলের পেছনে প্রায় দেড় যুগ ধরে জুমার নামাজ পড়েছি। এখানে উল্লেখ্য যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত গত নির্বাচনে আওয়ামীলীগকে সমর্থন দিয়েছে এবং তারা জামাত শিবিরকে খুবই ঘৃনা করে মনে হয় অমুসলিমদের চাইতেই বেশি। এমন একটি পরিবেশে থেকে সাইদীর গুনমুগ্ধ ভক্ত হওয়া খুবই জটিল এবং কঠিন একটি বিষয়। প্রথমে মনে হতো – আমি বোধ হয় একা। পরে দেখলাম আওয়ামীলীগ করে এমন লোকতো বটেই-অনেক হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টানরাও সাইদী সাহেবের জন্য পাগল। অনেক হিন্দুর বাড়ী-গাড়ীতে আমি জনাব সাহদীর ওয়াজের ক্যাসেট কিংবা সিডি দেখেছি।

এই মুহুর্তে জনাব সাইদী কারারুদ্ধ। তিনি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত। আপীল আদালত হয়তো খুব তাড়াতাড়ি এবং যেকোন সময় রায় দিয়ে দিতে পারে। কি রায় হয়েছে কিংবা কি রায় হবে তা নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই। তবে মনোবেদনাতো অবশ্যই আছে। মনে প্রশ্ন জাগে- এমনটি কেনো হলো। যে মানুষটি ৪০টি বছর ধরে সারা দুনিয়ার আনাচে কানাচে বাঙালীদের আস্তানায় গিয়ে কোরআন শুনিয়ে এলো। তার কন্ঠের মোহময় জাদুতে আকৃষ্ট হয়ে মানুষজন সুপথ পেলো কিংবা যার যৌক্তিক আহবানে লক্ষ লক্ষ মানুষ দ্বীনের পথে পাবন্দ হলো তিনি আজ কেনই বা এতোবড় মুছিবতে পড়লেন! আমরা তেমন কিছু জানিনা- আল্লাহ পাকই ভালো জানেন। তবে সাইদী বিরোধীরা যেসব কুৎসা রটনা করছে তা এদেশের সাধারন মানুষ বিশ্বাস করেনা। সাধারন মানুষের তো কোন ক্ষমতা নেই। তারা কেবল অন্তর থেকে কাউকে ঘৃনা করতে পারে এবং আল্লাহর দরবারে ঘৃনিত ব্যক্তির জন্য শাস্তি কামনা করতে পারে। অন্যদিকে ভালোবাসার মানুষটির জন্য দোয়া করতে পারে। সেই দিক বিবেচনায়-জনাব সাইদী এদেশের লক্ষ কোটি মানুষের মনের আকুতি মিশ্রিত দোয়া যে পাচ্ছেন তা আমি বলতে পারি নির্দ্বিধায়।

এবার আমি বলছি-ভিন্ন মতের, ভিন্ন ধারায় থেকেও কেনো আমি- সাইদীর অনুরক্ত হলাম। কারন একটাই-আমার আত্মার খোরাক মেলে তার ওয়াজের মাধ্যমে। আজও আমি সময় পেলে ইউটিউবে গিয়ে যেমন ক্বারী আব্দুল বাসিত, শেখ মোহাম্মদ জিবরীল, শেখ মোহাম্মদ খলিল আল হুসাইরি, আব্দুর রহমান সুদাইস, শেখ সুরীইয়াম, ক্বারী সাদাকাত, মোঃ রিফাত, আল আফাসী প্রমুখের সুললিত কন্ঠের কোরআন তেলাওয়াত শুনি তেমনি জনাব দেলোয়ার হোসাইন সাইদীর ওয়াজও শুনি। অবাক করা বিষয় হলো- সাইদী সাহেবের ওয়াজের একেকটি ভিডিও ১৪/১৫ লাখ লোক পর্যন্ত দেখেছে। কোন বাঙালী শিল্পী, কিংবা বক্তা কিংবা ওয়ায়েজীনের ভিডিও এতো মানুষ আজ অবধি দেখেনি। আমি এসব ভিডিও বা অডিও ক্লিপ শুনি এবং আত্মায় প্রশান্তি অনুভব করি। আমি লক্ষ করেছি আমাদের দেশের বেশির ভাগ সাইদী বিরোধী লোকজন না বুঝে এবং না জেনেই সাইদীর সমালোচনা করে। আবার উল্টোটাও আছে-কোন রকম ভালমন্দ বিচার বিবেচনা না করেই অন্ধভাবে সাইদী সাহেবকে সমর্থন করেন।

আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন রকম। আমি ব্যক্তি সাইদী সম্পর্কে তেমন কিছু জানিনা- বা জানার প্রয়োজনও মনে করিনি। কিন্তু পবিত্র আল কোরআনের তাফসির কারক অর্থাৎ মুফাচ্ছিরে কোরআন হযরত মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাইদী সম্পর্কে বেশ ভালো ভাবে জানি। তার বক্তব্যেও কোন যায়গায় কতটুকু সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং কোথায় কোথায় অনন্য সাধারন চমৎকারীত্ব রয়েছে তা যেমন লক্ষ করেছি তেমনি আরবী উচ্চারনের ভালো মন্দের দিকেও খেয়াল করেছি। আরবী ব্যাকরন-কিংবা হাদীসের ব্যাখ্যা অথবা তাসাউফের আলোচনায় কেউ কেউ জনাব সাইদীর পান্ডিত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন কিন্তু সামগ্রীকভাবে ইসলামের খেদমতে তার ধারের কাছে দাঁড়াতে পারেন এমন আলেম বাংলাদেশে একজনও নেই।

সাইদীর পাশে কোন আলেম দাঁড়াতে পারবেন না- এতোবড় কথা আমি কিভাবে বললাম? এ ব্যাপারে বিস্তারিত বললেই সম্মানীত পাঠক বিষয়টি স্পষ্ট বুঝতে পারবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে এও বুঝতে পারবেন-কেনো আমার মতো লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিন্ন ধারার রাজনীতির ধারক বাহক হবার পরও জনাব সাইদীকে পছন্দ করেন। পাক ভারত উপমহাদেশের ইসলাম ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা, ধ্যান ধারনা তাবৎ দুনিয়া থেকে আলাদা। বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানের মুসলমানগনের একটি বিরাট অংশ বিভিন্ন পীর, দরবেশ, আওলিয়া কিংবা মাজার কেন্দ্রীক ঐক্য গড়ে তুলে ধর্মকর্ম পালন করে থাকে। এসব পীর-ফকির-দরবেশ-দরগা এবং মাজারে ফি বছর ভক্ত বৃন্দ জমায়েত হয়ে নিজ নিজ রীতি অনুযায়ী নামাজ, কালাম, জিকির ফিকির, নাচগান এবং খানা পিনা করে থাকেন। কেউ এই জমায়েতকে বলেন- ইছালে ছওয়াব, কেউ বলেন ওরশ মোবারক আবার কেউ কেউ বলেন তাবলীগ বা বিশ্ব জাকের সমাবেশ। এ সব অনুষ্ঠান ২/৩ দিন ব্যাপি হয়। অনুষ্ঠান স্থলের আশে পাশে বিরাট মেলাও বসে যায়। ধর্মকর্মের পাশা পাশি মানুষ দুনিয়াদারীর কর্মকান্ডও করে থাকে। পীরেরা কিংবা দরগার খাদেমরা এ সময় ভক্তকুলের নিকট থেকে নজরানা গ্রহন করেন যা তাদের সারা বছরের জীবন জীবিকার একমাত্র সংস্থান বলে গন্য হয়। আমার গ্রামের বাড়ী ফরিদপুরের সদরপুরে ছোট বড় ১০/১২ জন দরবার ভিত্তিক পীর মোর্শেদ দেখে আসছি। এদের মধ্যে আকার আকৃতি এবং ভক্তকুলের সংখ্যাধিক্যে আটরশি এবং চন্দ্রপাড়ার পীর সাহেবদের নাম ডাক সারা দেশে থাকলেও স্থানীয় হিসেবে আমাদের অভিজ্ঞতা অতো ভালো না।

বড় হয়ে যখন পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম দেশে গেলাম তখন বাংলাদেশের মতো এরুপ কান্ড কারখানা কোথাও দেখলাম না। যাহোক- বহু পীরের কাছে গেলাম। মনে অনেক প্রশ্ন। অনেক কিছু জানতে চাই। কিন্তু পীরেরা কথা বলেন না। তাদের সামনে হাটু গেড়ে বসি- হাত জোড় করে থাকি এবং নজরানা দেই। পীর সাহেবরা জোরে জোরে ফুঁ দিয়ে দেন। পীর বাবার ফু মাথায় নিয়ে বাইরে আসি কিন্তু অন্তর ঠান্ডা হয় না। বরং নজরানার টাকা গুলোর জন্য এক ধরনের মায়া মায়া ভাবের জন্য মনটাই খারাপ হয়ে যেতো। এরপর আমি যেতাম বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে। বক্তা কান্নার ভান করে বিকট গলায় ভয়ঙ্কর আওয়াজ তুলে এমন সব মারেফতি কিচ্ছা কাহিনী শুরু করতো যা শুনলে রুচিবান লোকের বমি বমি চলে আসতো। চিন্তাশীল মানুষ হলে ইসলাম সম্পর্কেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতো। এই ঘটনার পর আমি ওসব পীর ফকিরের দরবার এবং গলাবাজ ওয়ায়েজীনদের মাহফিলে যাওয়া বন্ধ করে দেই। কোরআন- হাদিস পড়ার পাশা পাশি বিখ্যাত অলি আল্লাহগনের লিখিত বই পড়ার পর ধর্ম কর্মে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করতে থাকি। অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে ইসলামের তুলনা এবং আমাদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝার জন্য আরো কিছু বই পত্র পড়ে নিজের জ্ঞানও বিশ্বাসকে ঝালাই করে নিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো-ধর্মমতে সব কিছু করতে পারছিলাম না।

আমি প্রান পনে চাইতাম বাবা মাকে শ্রদ্ধা এবং আমার জীবনের সব ভালো জিনিসগুলো দিয়ে তাদেরকে সেবা করে আল্লাহ পাকের নৈকট্য হাসিল করার জন্য। আমি এও চাইতাম যে- আমার বহু কষ্টের উপার্জনের একটি অংশ ভাইবোন এবং দরিদ্র আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বিলি করে দেই। গোপনে অসহায় লোকজনকে দান খয়রাত করি এবং জমিনে মাথা নীচু করে বিনয় সহকারে চলা ফেরা করি। কিন্তু কিসের জন্যে জানিনা-কৃপনতা আমাকে ভর করে বসলো। বিনয়ের পরিবর্তে নিজের অর্থ, বিত্ত, জ্ঞান গরিমা, চেহারা সুরুত এবং বংশ মর্যাদার জন্য রীতিমতো গর্ব বা অহংকার করা শুরু করলাম। ফলে আমার আপনজনের অনেকের সঙ্গেই আমার দুরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেলো।

ঠিক এই সময়ে অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে আমি সাইদী সাহেবের মাহফিলে গেলাম। তিনি সেদিন সুরা ফাতিহার তাফসীর করছিলেন। তিনি বলছিলেন-রাহ্মান বা রহমান নামের মাহাত্ম সম্পর্কে। প্রথমে পুরো সুরাটি তেলাওয়াত করলেন। তারপর বর্ননা করলেন সুরাটির গুরুত্ব। এরপর চলে গেলেন শাব্দিক অর্থের ব্যাখ্যায়। আলহামদু লিল্লাহ, রব্বুল, আলামিন-এই তিনটি শব্দের মধ্যে রব শব্দের মর্মবানী এবং মর্মার্থ শুনে আমি পাগল হবার উপক্রম হলাম। এরপর তিনি যখন আর রহমান শব্দ নিয়ে তাফসীর শুরু করলেন তখন সাইদী সাহেবের গলার আওয়াজ ছাড়া আমি আর কিছু শুনতে কিংবা দেখতে পাচ্ছিলাম না। চোখ বন্ধ করে আমার মালিকের বিশালত্ব তার রব নামের ব্যপকতা এবং রহমান নামের স্বার্থকতার আলোকে নিজের জীবনের সীমাহীন ব্যর্থতা আর অপূর্নতার সন্ধান করছিলাম। মনের কালিমা দুর হয়ে সত্য ও শান্তির সুবাতাস কিসের যেনো এক সুবাস দিয়ে আমায় মোহিত করে তুলছিলো। আমার চোখের পানির অবারিত ঝর্নাধারা আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো আমার মালিকের দিকে। আমি সেদিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছিলাম-বাকীটা জীবন কল্যান, ন্যায় নিষ্ঠতা আর আল্লাহর প্রেমে মত্ত হয়ে কাটিয়ে দেবো। মাহফিল শেষে আমি হোটেলে ফিরে এলাম এবং কয়েকদিন পর ঢাকায় একটি ক্যাসেটের দোকানে গিয়ে কিনলাম-পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য, মেরাজের গুরুত্ব, স্বামী-স্ত্রীর মহব্বত, হুজুর (সঃ) এর জীবনী, সময়ের গুরুত্ব, ইত্যাদি বিষয়ে জনাব দেলোয়ার হোসাইন সাইদীর ওয়াজের ক্যাসেট।

প্রতিদিন ফজরের নামাজ অন্তে আমি ক্যাসেট গুলো শুনতাম এবং আমার স্ত্রী ও সন্তানকে শুনাতাম। আমার শিশু সন্তানটি তখন মাত্র স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। ছেলে আমার ক্ষনে ক্ষনে জায়নামাজ নিয়ে বসে পড়তো এবং নিজের ছোটখাটো চাহিদার কথা আল্লাহর নিকট বলতো। আর প্রার্থনা করতো- হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং আমার বাবাকে ওলি আল্লাহ বানিয়ে দাও। দুরে দাঁড়িয়ে আমি ছেলের মোনাজাত শুনতাম এবং চোখের পানিতে বুক ভাসাতাম। এর কিছুদিন পর আব্বা এলেন আমার বাসায় বেড়াতে। আমি আব্বাকে শোনানোর জন্য সাইদী সাহেবের পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য সংক্রান্ত ক্যাসেটটি ছেড়ে দিলাম। বাপবেটা এক সঙ্গে টেপ রেকর্ডারের সামনে দাঁড়িয়ে শুনলাম। দু’জনেই কাঁদছিলাম- হয়তো আমার আব্বা স্মরন করছিলেন তার পিতামাতাকে আর আমি স্মরন করছিলাম আমার জনক জননীকে। আমি আব্বার দিকে অশ্র“ভেজা চোখে তাকালাম-মনে হলো-আহা! এইতো আমার জন্মদাতা। কত কষ্ট করে আমাকে লালন করেছেন! বড় করেছেন! আমি অবশ্যই পিতামাতার অবাধ্য হবোনা। আমার মনে স্বাদ জাগলো- আব্বাকে সেবা করার জন্য। ইচ্ছে হলো- তাকে ভালোমন্দ কিছু খাওয়াই।
বাজারে গেলাম। আব্বার পছন্দের তরি তরকারী মাছ মাংস কিনলাম। স্ত্রীকে বললাম রান্না করো। আস্ত একটি মুরগী রোস্ট করো। আমার আব্বা সেটা খাবেন আর আমি বসে বসে দেখবো। আরেকদিন মনে হলো আস্ত একটি ইলিশ মাছ কোপ্তা বানিয়ে আব্বার প্লেটে দেই। আমার স্ত্রীর সহযোগীতায় যখন কাজ গুলো করলাম তখন আমার সঙ্গে আব্বার কেমন যেনো একটি রুহানী বা আত্মিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেলো। আর তখন থেকেই মনে হতে থাকলো- আমার ধন সম্পদ, শিক্ষা-দীক্ষা সব কিছুর মালিকই আমার পিতা। আমি এরপর থেকে কেবল আব্বার হুকুমের গোলাম হয়ে বেঁচে থাকার মধ্যেই স্বার্থকতা খুঁেজ পেলাম। এর কয়েক বছর পর আব্বা হঠাৎ স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে গেলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঐ রকমই ছিলেন। প্রায় ১২ বছর প্যারালাইজড পিতাকে সেবা করতে গিয়ে এক মুহুর্তের জন্যও বিরক্ত হইনি। অফিসে আসার সময় সালাম করে আসতাম। আবার বাসায় ফিরে আব্বার মুখ না দেখে অন্য কারো দিকে তাকাতাম না। অসুস্থ আব্বা প্রায়ই বলতেন- আমার ছেলে- আমার হাজার তারার এক চাঁদ। আজও আব্বার কথা মনে হলে নিজের অজান্তে যেমন চোখের পানি চলে আসে তেমনি মনের মধ্যে বাজতে থাকে

সাইদী সাহেবের ওয়াজের মর্মবানীগুলো
মহান আল্লাহ পাক সব কিছু দেখেন এবং সব কিছু জানেন বলেই-তার উপাধী সামিউন এবং বাছিরুন। নিশ্চয়ই তিনি বেখবর নন-২০১৪ সালের বাংলাদেশ সম্পর্কে। সাইদী ভক্তরা হয়তো কোন কিছুই জানেন না দুনিয়ার আদালত সম্পর্কে। কিন্তু আমার মতো লক্ষকোটি মানুষ যারা- সাইদী সাহেবের ওয়াজের মাধ্যমে আত্মার খোরাক পেয়ে জীবন ধারা বদলাতে পেরেছে এবং বিশ্বজাহানের রবের নিকট আত্মসমর্পন করতে শিখেছে তারা হয়তো ধরে নিয়েছে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাইদী সাহেবের হয়তো ইমতেহান অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হচ্ছে। কিন্তু ইমতেহানের সময় মানুষের জন্য বড় কর্তব্য হলো আল্লাহ পাকের ফায়সালার প্রতি খউফ ও রিজ্জা সহকারে সন্তুষ্ট থাকা।

আমি আজকের লেখার প্রান্ত সীমায় চলে এসেছি। সাইদী সাহেব সম্পর্কে বলতে গেলে শুধু এইটুকু বলেই শুরু করা যায়-তিনি মহান আল্লাহ পাকের অপূর্ব সৃষ্টি। ইসলামের ১৪শ’ বছরের ইতিহাসে আমি এমন কোন মুফাস্সির কিংবা মুহাদ্দিসের নাম শুনিনি যার বক্তব্য সোনার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ একটি মাহফিলে হাজির হয়ে অসাধারণ নীরবতা নিয়ে কয়েক ঘন্টা ধরে কোরআন এবং হাদিসের মর্মবানী শুনেছে। একবিংশ শতাব্দীর অস্থির সমাজে কোন একক ভাষা ভাষী জাতি গোষ্ঠীর এমন কোন ধর্মীয় নেতা নেই যার বক্তব্য জনাব সাইদী সাহেবের চেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষ শোনে এবং অনুসরন করে। পবিত্র কোরআনকে যারা আল্লাহর গ্রন্থ বলে মানেন এবং বিশ্বাস করেন-তারা জনাব সাইদীর গত চল্লিশ বছরের কোরআনী খেদমতকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন! আমার মনে হয় কোরআনের মালিকই উত্তম ফয়সালাকারী। বিশ্ব রবের ফয়সালাতো নতুন এবং অদ্ভূত নয় তার সকল সিদ্ধান্তই পূর্ব ঘোষিত। আমরা যারা আল্লাহকে রেখে অন্যকে মান্য করি বা ওসিলা করি তাদের সম্পর্কে কোরআন বলছে-”ইয়াবতাগুনা রব্বিহিমুল ওসিলা”- অর্থাৎ তোমরা যাদেরকে ওসিলা হিসেবে মান্য কর- তারাইতো বিশ্ব রবের ওসিলা করে থাকে। আজ যারা জমিনের বুকে উদ্ধত আচরন এবং অহংকার করে বেড়ায় এবং জমিনে অবিচার এবং অনাচার করে বেড়ায় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাকের সতর্ক বানী যিনি দরাজ গলায় বাংলার আনাচে কানাচে পৌছে দিয়েছেন সেই ব্যক্তিটি যদি মজলুম হয়ে পড়েন তবে তার মালিক তাকে কিভাবে সান্তনা দিবেন সে কথাও কোরআনে বলা আছে বহু যায়গায়-বহুবার। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের-আমরা জেনেও না জানার ভান করি কিংবা দেখেও না দেখার ভান করি। ফলে-সবশেষে-আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন ফয়সালা এসে পড়ে তখন না পালাবার কোন পথ খুঁজে পাই- না ভাগবার কোন রাস্তার সন্ধান লাভ করতে পারি!