জুডিশিয়াল মার্ডার ভিকটিম রোজেনবার্গ দম্পতি

rosenbergs execution
ইথেল গৃনগ্লাসের জন্ম হয়েছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯১৫-তে নিউ ইয়র্ক সিটির একটি ইহুদি পরিবারে। অন্যান্য সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারের মতো তার পরিবারেও গান-বাজনা ও সাহিত্যের চর্চা ছিল। ছোটবেলায় তার আগ্রহ ছিল অভিনেত্রী ও গায়িকা হতে। কিন্তু যৌবনে পা দেয়ার পর তাকে বাস্তবের মুখোমুখি হতে হলো। একটি শিপিং কম্পানিতে সেক্রেটারির কাজে তিনি যোগ দিলেন। চাকরি করতে গিয়ে শ্রমিক-মালিকের স্বার্থের সংঘাত বিষয়ে ইথেল সচেতন হন। এই সময়ে শ্রমিকের পক্ষে কমিউনিস্টদের আদর্শে তিনি দীক্ষিত হন। ইথেল যোগ দেন ইয়াং কমিউনিস্ট লিগে। আর এখানে ১৯৩৬-এ তার পরিচয় হয় জুলিয়াস রোজেনবার্গ-এর সাথে। জুলিয়াসও ছিলেন ইহুদি। ইথেলের বয়স তখন একুশ। জুলিয়াসের বয়স আঠারো।

জুলিয়াসের জন্ম হয়েছিল ১২ মে ১৯১৮-তে। তিনি লেখাপড়ায় ভালো ছিলেন। হাই স্কুলে পড়া শেষ করে তিনি নিউ ইয়র্কের সিটি কলেজে ভর্তি হন। কলেজে পড়ার সময়ে তিনিও ইয়াং কমিউনিস্ট লিগে যোগ দেন।

ইথেল ও জুলিয়াসের প্রেম গভীর থেকে গভীরতর হয়। কিন্তু ছাত্রাবস্থায় জুলিয়াস বিয়ে করতে রাজি হন না। ১৯৩৯-এ তিনি সিটি কলেজ থেকে ইলেকটৃকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েট হন। সেই বছরেই জুলিয়াস আর ইথেলের বিয়ে হয়।

এর কিছুদিন পর ১৯৪০-এ জুলিয়াস রোজেনবার্গ ইঞ্জিনিয়ার-ইন্সপেকটর রূপে আমেরিকান আর্মিতে যোগ দেন। তার পোস্টিং হয় নিউ ইয়র্ক সিটির কাছে নিউ জার্সিতে ফোর্ট মনমাউথে অবস্থিত আর্মি সিগনাল কোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবরেটরিতে।

ইতিমধ্যে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯-এ ইওরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ক্রমেই এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে আফৃকা ও এশিয়াতে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয় দুই পর্যায়ে। সভিয়েট সৈন্যরা জার্মানিতে ঢুকে পড়লে এপৃল ১৯৪৫-এ জার্মানির চান্সেলর এডলফ হিটলার বার্লিনে আত্মহত্যা করেন। তারপর ৮ মে ১৯৪৫-এ জার্মানি নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে।

ইওরোপ ও আফৃকাতে যুদ্ধ থেমে গেলেও এশিয়াতে যুদ্ধ চালিয়ে যায় জাপান। ৬ আগস্ট ১৯৪৫-এ আমেরিকান বোমারু প্লেন থেকে জাপানের হিরোশিমা পোর্টে একটি এটম বোমা ফেলা হয়। বোমাটির নাম ছিল লিটল বয় (ছোট ছেলে)। এর ফলে অন্ততপক্ষে ৭৫,০০০ হিরোশিমা অধিবাসীর মৃত্যু হয়। এটাই ছিল যুদ্ধে এটম বোমার প্রথম প্রয়োগ। এর তিন দিন পরে ৯ আগস্ট ১৯৪৫-এ নাগাসাকি পোর্টে আমেরিকান বোমারু প্লেন থেকে দ্বিতীয় এটম বোমা ফেলা হয়। এই বোমাটির নাম ছিল ফ্যাট বয় (মোটা ছেলে)। এর ফলে প্রায় ৩৫,০০০ নাগাসাকি অধিবাসীর মৃত্যু হয়। এই দুই এটম বোমা বিস্ফোরণের পর ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫-এ জাপান আত্মসমর্পণ করে।

সব যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

সেটাই মনে হয়েছিল তখন।

কিন্তু, না।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরপরই শুরু হয়ে যায় কোল্ড ওয়ার (Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ)। এই যুদ্ধের একদিকে ছিল আমেরিকা ও বৃটেনসহ পশ্চিম ইওরোপের অধিকাংশ অকমিউনিস্ট গণতান্ত্রিক দেশগুলো। অন্যদিকে ছিল সভিয়েট ইউনিয়ন এবং তার প্রভাবাধীন পূর্ব ইওরোপের কমিউনিস্ট একনায়কতান্ত্রিক দেশগুলো।

স্নায়ুযুদ্ধের আদর্শিক প্রশ্ন ছিল পশ্চিম ইওরোপ এবং আমেরিকায় কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে কিনা। আমেরিকান সাফল্যে মণ্ডিত পশ্চিমের ক্যাপিটালিজম জনগণের জন্য ভালো? নাকি, সভিয়েট ইউনিয়নের আদর্শের মোড়কে কমিউনিজমই জনগণের জন্য ভালো? গণতন্ত্র ভালো? নাকি একনায়কতন্ত্র ভালো?

উভয় পক্ষই চাইছিল দক্ষিণ আমেরিকা, আফৃকা ও এশিয়ার দেশগুলোকে তাদের পক্ষে টানতে। সেই প্রচেষ্টায় সফল হওয়ার জন্য উভয় পক্ষেরই প্রয়োজন ছিল তাদের শক্তি প্রমাণ করার ও দেখানোর।

তখন প্রশ্ন ওঠে, জাপানে তো দুটো এটম বোমা ফেলে ইউএসএ (USA) বা আমেরিকা দেখিয়ে দিয়েছে তাদের কাছে এটম বোমা আছে। কিন্তু ইউএসএসআর (USSR) বা সভিয়েট ইউনিয়নের কাছে কি এটম বোমা আছে?

উত্তরটা ছিল, গোপনে তখন দুই দেশই আণবিক থেকে আরো শক্তিশালী পারমাণবিক (নিউক্লিয়ার) বোমা বানানোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। দুই দেশই চাচ্ছিল অপর পক্ষ যেন জানতে না পারে সপক্ষের অগ্রগতির কথা।

ম্যাকার্থিজম জ্বরে আক্রান্ত আমেরিকা
ইতিমধ্যে ১৯৫০ থেকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ম্যাকার্থিজম (Mecarthyism)-এর জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল। ম্যাকার্থিজমের জনক ছিলেন রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থি (Joseph Mecarthy)। আমেরিকায় কমিউনিজমকে রুখে দাড়ানোর জন্য এবং বিদেশে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সভিয়েট ইউনিয়নকে মোকাবিলার জন্য সিনেটর ম্যাকার্থি সোচ্চার হয়েছিলেন।

১৯৫০-এ কোরিয়ান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। চায়না ছিল উত্তর কোরিয়ার পক্ষে। আমেরিকা ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে। সভিয়েট ইউনিয়ন এবং চায়নার কমিউনিস্ট আগ্রাসনে ইওরোপ এবং এশিয়া যদি পরাজিত হয়, তাহলে এক সময়ে আমেরিকাও কমিউনিস্ট হয়ে যাবে এমন ভীতি ম্যাকার্থি তার দেশে ছড়িয়ে দিতে সফল হন। তার এই তথাকথিত দেশপ্রেমের ক্যামপেইনে (যা আসলে ছিল কমিউনিস্ট বিরোধী ক্যামপেইন) সহায়ক হন এফবিআই, অর্থাৎ ফেডারাল বুরো অফ ইনভেসটিগেশনের ডিরেকটর জে. এডগার হুভার। এদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিল আমেরিকান কংগ্রেসে হাউস কমিটি অন আন-আমেরিকান অ্যাকটিভিটিস (House Committee on Un-American Activities)।

এই কমিটি এবং ম্যাকার্থি ও হুভার, সম্মিলিতভাবে সারা আমেরিকায় রাজনৈতিক সন্ত্রাস সৃষ্টি করেন। ফলে কমিউনিস্ট সন্দেহভাজন হলেই ওই ব্যক্তিকে হয়রানি, চাকরিচ্যুতি, রিমান্ডে নির্যাতন, করা হতো। জেলদণ্ড- এমনকি মৃত্যুদণ্ডও তখন দেয়া হয়েছিল। এসব হয়েছিল দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে অথবা কোনো উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই। আমেরিকায় অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের একটি ব্ল্যাক লিস্ট তৈরি হয়েছিল।

ম্যাকার্থিজমের শিকার হয়ে অভিনেতা ও মুভি ডিরেকটর চার্লস চ্যাপলিনকে স্বদেশ ছাড়তে হয়েছিল।

কমিউনিস্ট এবং কমিউনিস্টদের প্রতি সহানুভূতি পরায়ণ ব্যক্তি রূপে চিহ্নিত হওয়ায় বহু গুণীজন তখন অপদস্থ, অপমানিত, পদচ্যুত এবং অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ম্যাকার্থিজমের অনুসারীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছিলেন সমাজের বহু টপ নারী-পুরুষ। এসব নির্যাতিতদের মধ্যে ছিলেন নোবেল বিজয়ী সায়েন্টিস্ট এলবার্ট আইনস্টাইন ও লাইনাস পলিং, নোবেল বিজয়ী লেখক টমাস মান, ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্ট, নাট্যকার আর্থার মিলার ও বার্টল্ট ব্রেখট, অভিনেতা ড্যানি কে, অরসন ওয়েলস, গায়ক পল রবসন, পিট সিগার, কবি এলান গিন্সবার্গ, অভিনেত্রী জিন সিবার্গ, লেখক আরউইন শ প্রমুখ। মুভি ইনডাস্টৃতে ৩০০-র বেশি অভিনেতা, পরিচালক ও লেখক ভুক্তভোগী হয়েছিলেন।

কে যে কখন ম্যাকার্থিজমের শিকার হয়ে হাউস কমিটি অথবা এফবিআই অথবা আদালতের কাছে জবানবন্দি দিতে আদিষ্ট হবেন সেই ভয়ে আমেরিকার গুণী ও জ্ঞানী সমাজ তখন কাপছিলেন।

সেই সময়ে ম্যাকার্থিজমের শিকার হন জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গ দম্পতি এবং তারা হন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। উভয়েই তাদের অপরাধ অস্বীকার করেছিলেন। তারা বলেন, তারা কমিউনিস্ট বিরোধী রাজনীতির শিকার হয়েছেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে, যেসব মামলায় ম্যাকার্থিজমের শিকার যারা হয়েছিলেন, সেসব মামলার রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরে উল্টে যায় এবং বলা হয় যেসব আইন দেখিয়ে শাস্তি দেয়া হয়েছিল সেসব ছিল অসাংবিধানিক। ফলে দণ্ডিত ব্যক্তিরা মুক্তি পান।

কিন্তু সেই সুযোগ রোজেনবার্গ দম্পতির ছিল না। কারণ তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গিয়েছিল।

রোজেনবার্গ দম্পতির বিরুদ্ধে কি অভিযোগ ছিল?

নিউ জার্সিতে আর্মি সিগনাল কোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবরেটরিতে ১৯৪৫ পর্যন্ত জুলিয়াস রোজেনবার্গ ইঞ্জিনিয়ার-ইন্সপেকটর পদে কাজ করেন। এই ল্যাবরেটরিতে ইলেকট্রনিক্স, কমিউনিকেশন্স, রেডার এবং গাইডেড মিসাইল বিষয়ে রিসার্চ হতো। আমেরিকান আর্মি যখন জানতে পারে জুলিয়াস ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য তখনই তারা তাকে ডিসমিস করে।

জুলিয়াস সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যে আর্মি কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে আসেন যে সভিয়েট ইউনিয়নের পক্ষে স্পাইরূপে কাজ করার জন্য রোজেনবার্গকে রিক্রুট করা হয়েছিল ১৯৪২-এ। তখন থেকে তিনি বহু টপ সিক্রেট তথ্য পাচার করতে থাকেন সভিয়েট ইউনিয়নের কাছে। রোজেনবার্গ যে স্পাইং করছেন সে বিষয়ে কিছু তথ্য দেন তারই শ্যালক ডেভিড গৃনগ্লাস।

ডেভিড গৃনগ্লাস জানান, তার বোন ইথেল জানতেন তার স্বামী জুলিয়াস স্পাইং করছেন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সভিয়েটদের কাছে নিয়মিতভাবে পৌছে দিচ্ছেন। ডেভিড গৃনগ্লাস আরো জানান, তাকে এবং তার স্ত্রী রুথকেও স্পাইংয়ে রিক্রুট করতে চেয়েছিলেন জুলিয়াস। ডেভিড রাজি হননি। ম্যাকার্থিজমের যুগে, ডেভিড তার নিজের ও স্ত্রীর প্রাণ বাচানোর জন্য সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং আমেরিকার প্রতি নিজের আনুগত্য প্রমাণের জন্য নিজের বোন ইথেল ও দুলাভাই জুলিয়াসের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।

জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গকে ট্রায়ালে দেওয়া হবে কিনা সেটা বিবেচনা করতে আগস্ট ১৯৫০-এ ফেডারাল গ্র্যান্ড জুরি ডাকা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রধান দুই সাক্ষী ছিলেন ডেভিড ও তার স্ত্রী রুথ গৃনগ্লাস। তারা দৃঢ়ভাবে বলেন, এটম বোমা বানানো সম্পর্কিত তথ্য পাচার করেছিলেন জুলিয়াস।

১৭ আগস্ট ১৯৫০ ফেডারাল গ্র্যান্ড জুরি রায় দেন জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গের বিচার হতে হবে। সেই সঙ্গে ডেভিড ও রুথেরও বিচার হতে হবে।

৬ মার্চ ১৯৫১-তে রোজেনবার্গদের ট্রায়াল শুরু হয়। ডেভিড বলেন রোজেনবার্গদের ফ্ল্যাটে তার বোনকে একদিন দেখেছিলেন তিনি পারমাণবিক বোমা সংক্রান্ত নোট টাইপ করছেন। ডেভিড আরো বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রের একটা ডিজাইন একে জুলিয়াস তাকে দেখিয়েছিলেন। আদালতে ডেভিড তার স্মরণশক্তি থেকে ওই রকম একটা ডিজাইন একে বিচারককে দেখান।

কিন্তু ডেভিড যেসব তথ্য তার বোন সম্পর্কে দিয়েছিলেন সেসব ছিল ওজনবিহীন। তবু সরকার পক্ষ ইথেলের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যায় কারণ তারা ভেবেছিল এর ফলে জুলিয়াস তার স্ত্রীর প্রাণ বাচানোর জন্য স্বীকারোক্তি করবেন। আর তার ফলে এই স্পাইংয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যদের নাম জানা যাবে। কিন্তু দুজনই যে নিরপরাধ ছিলেন সেই দাবিতে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইথেল ও জুলিয়াস অটল থাকেন।

রাজনৈতিক কারসাজি
ট্রায়ালে ২৯ মার্চ ১৯৫১-তে তারা দোষী সাব্যস্ত হন। গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে ৫ এপৃল ১৯৫১-তে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

আদালতে জুলিয়াস রোজেনবার্গ দাবি করেন এই দ- একটি পলিটিকাল ফ্রেমআপ বা রাজনৈতিক কারসাজি। তিনি বলেন, ‘এই মৃত্যুদণ্ডে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এটাই হওয়ার কথা ছিল। রোজেনবার্গ কেইসকে একটা দৃষ্টান্তরূপে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন সরকারের ছিল। কারণ কোরিয়ান যুদ্ধ আমেরিকান জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আমেরিকায় একটা উন্মত্ততা চরমে ওঠানোর দরকার ছিল। যুদ্ধের বাজেট বাড়ানোর জন্য আমেরিকানদের মধ্যে ভীতি এবং উন্মত্ততা বজায় রাখতেই হবে। বামপন্থীদের মনে এমন একটা ছুরি বসাতে হবে যেন তারা ভয় করে, তাদের মতবাদের জন্য স্মিথ আইনে পাচ বছর জেল অথবা আদালত অবমাননার জন্য এক বছর জেল নয়, মতবাদের জন্য তাদের মরতে হবে।’

(This death sentence is not surprising. It had to be. There had to be a Rosenberg case, because there had to be an intensification of the hysteria in America to make the Korean War acceptable to the American people. There had to be hysteria and a fear sent through America in order to get increased war budgets. And there had to be a dagger thrust in the heart of the left to tell them that you are no longer gonna get five years for a Smith Act prosecution or one year for contempt of court, but we’re gonna kill ya)!

নিউ ইয়র্ক রাজ্যে সিং সিং জেলখানায় ১৯ জুন ১৯৫৩-তে ইলেকটৃক চেয়ারে জুলিয়াস ও ইথেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

দি এটমিক কাফে (১৯৮২) নামে একটি ডকুমুভিতে প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা দেন কিভাবে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। তারা বলেন, প্রথম ইলেকটৃক শকে জুলিয়াস রোজেনবার্গের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী মোট তিনটি শক ইথেল রোজেনবার্গকে দেয়া হলেও তার মৃত্যু হয় না। তখন তার হাত-পায়ের বাধনগুলো খোলা হয়। উপস্থিত ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখেন ইথেলের হার্ট বিট চলছে। এরপর ইথেলের হাত-পা আবার বেধে তাকে আরো দুটো ইলেকটৃক শক দেয়া হয়। তার মাথা থেকে ধোয়া বের হতে থাকে। এবার ইথেলের মৃত্যু হয়।

তারাই ছিলেন প্রথম আমেরিকান সিভিলিয়ান, যারা স্পাইংয়ের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।

বিশ্ব জুড়ে প্রতিবাদ
রোজেনবার্গ দম্পতি গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তাদের মুক্ত করার জন্য বিশ্ব জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠতে থাকে। কমিউনিস্ট দেশগুলো থেকে বলা হয়, যেহেতু জুলিয়াস ছিলেন আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সেহেতু তাকে ধরা হয়েছে – গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগটা অজুহাত মাত্র। ইহুদিরা বলেন, রোজেনবার্গ দম্পতিকে গ্রেফতার করাটা আমেরিকান সরকারের ইহুদি বিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। রোজেনবার্গ দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাচানোর জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ পর্যন্ত বহু সংগঠন গড়ে ওঠে। এসব সংগঠনের মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত ছিল ন্যাশনাল কমিটি টু সিকিওর জাস্টিস ইন রোজেনবার্গ কেইস (National Committee to Secure Justice in Rosenberg case) অর্থাৎ রোজেনবার্গ মামলায় সুবিচার আদায়ের লক্ষ্যে জাতীয় কমিটি।

তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুর পর মার্কসবাদী নোবেল প্রাইজ বিজয়ী ফ্রেঞ্চ দার্শনিক-লেখক জা পল সার্ত্র বলেন, ‘এটা হয়েছে বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড। গোটা আমেরিকান জাতির গায়ে রক্তের দাগ লেগেছে। রোজেনবার্গ দম্পতিকে খুন করে, তোমরা, আমেরিকানরা চেয়েছ বিজ্ঞানের অগ্রগতি রোধ করতে। মানুষকে তাড়িয়ে বেড়িয়ে, জেলজুলুম করে, বলি দিয়ে তোমাদের দেশকে তোমরা এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছ যে, তোমরা নিজেরাই ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছ … নিজেদের এটম বোমার কালো ছায়াতে তোমরাই ভয় পাচ্ছ।’

জা পল সার্ত্র ছিলেন কমিউনিস্ট। রোজেনবার্গ দম্পতিও কমিউনিস্ট হওয়ায় তার আবেগটা ছিল বেশি। কিন্তু যারা কমিউনিস্ট ছিলেন না, তাদেরও অনেকে প্রতিবাদ জানান। যেমন আমেরিকান সায়েন্টিস্ট এলবার্ট আইনস্টাইন, আর্টিস্ট পাবলো পিকাসো, ফ্রেঞ্চ চিন্তাবিদ জা ককতু, নাট্যকার বারটল্ট ব্রেখট, আর্টিস্ট ফৃডা কাহলো, মুভি ডিরেকটর ফৃটজ ল্যাং প্রমুখ।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পোপ দ্বাদশ পায়াস ব্যক্তিগতভাবে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার-কে আবেদন করেছিলেন যেন রোজেনবার্গ দম্পতিকে বাচিয়ে রাখা হয়।

কিন্তু বিশ্ব জুড়ে কোনো প্রতিবাদ-আবেদনে লাভ হয়নি।

আমেরিকান সরকার পরিচালিত মাস হিস্টেরিয়া (Mass hysteria) আমেরিকান জাতির উন্মত্ততাকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলেছিল। ম্যাকার্থিজমের তা-বে বহু নিরপরাধ আমেরিকান নিঃস্ব হচ্ছিলেন। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর জন্যও ম্যাকার্থিজম প্রয়োগ করা হচ্ছিল। যখন উচু পর্যায়ের আমেরিকান বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, মুভিস্টার, নাট্যকার, লেখক, টিভিস্টার ও পলিটিশিয়ানরা নিজেরাও ম্যাকার্থিজমের কবলে পড়তে থাকেন তখন তারা এই অভিশাপকে বিদায় দিতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হন। ম্যাকার্থিজমের জনক রিপাবলিকান সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির জীবন ও অতীত কর্মকা- বিষয়ে ইনভেসটিগেটিভ জার্নালিজম শুরু হয়। কে এই ম্যাকার্থি? তার অতীত কি ছিল? বর্তমানে লোকচোখের আড়ালে তিনি কি করেন? তিনি নিজে কতোটা সৎ?

অভিযোগ কোনো প্রমাণ নয়
সেই সময়ে আমেরিকার জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক-সাংবাদিক এডওয়ার্ড মারো কয়েকটি প্রোগ্রামে দেখিয়ে দেন ম্যাকার্থিজম আমেরিকার কি মারাত্মক ক্ষতি করছে। এ রিপোর্ট অন সিনেটর জোসেফ আর ম্যাকার্থি নামে একটি প্রোগ্রামে তিনি দেখিয়ে দেন, ম্যাকার্থি নিজেই ছিলেন অসৎ ও কা-জ্ঞানহীন এবং পরশ্রীকাতর। বিশেষত খ্যাতনামা আমেরিকানদের প্রতি বিদ্বেষ পরায়ণ। এই টিভি প্রোগ্রামের শেষাংশে এড মারো-র উক্তি ছিল :

‘আমাদের কখনোই উচিত হবে না, প্রতিবাদকে আনুগত্যহীনতা মনে করে গুলিয়ে ফেলা। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে অভিযোগ কোনো প্রমাণ নয় এবং কারো দণ্ড নির্ভর করে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনগত পদ্ধতির ওপর। পরস্পরের প্রতি ভীত হয়ে সমাজে চলাফেরা আমরা করব না। যুক্তিহীনতার যুগে উদ্বেগ আমাদের কাবু করতে পারবে না। আমরা যদি আমাদের ইতিহাস ও আদর্শ গভীরভাবে বিবেচনা করি তাহলে জানব আমরা কোনো ভীতুর বংশধর নই।’

(We must not confuse dissent with disloyalty. We must remember always that accusation is not proof and that conviction depends upon evidence and due process of law. We will not walk in fear, one of another. We will not be driven by fear into an age of unreason, if we dig deep in our history and our doctrine, and remember that we are not descended from fearful men.)
.
ম্যাকার্থিজম যুগ শেষ করার পেছনে এই প্রোগ্রাম ও এই উক্তির বিশেষ অবদান ছিল।

জুডিশিয়াল মার্ডার
পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে আমেরিকানরা বুঝতে পারে দলমত নির্বিশেষ তারা সবাই বিপন্ন। জনমত ঘুরে যেতে থাকে জোসেফ ম্যাকার্থির বিরুদ্ধে।

ম্যাকার্থি ছিলেন অতি উচ্চাশাপূর্ণ। সিনেটর থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ইচ্ছা তার ছিল। তিনি ভেবেছিলেন কমিউনিজমের জুজু ভয় দেখিয়ে আমেরিকানদের তিনি তার পেছনে দাড় করাতে পারবেন। সেটা না হওয়ায় হতাশ ম্যাকার্থি ক্রমেই মদ খেতে আসক্ত হয়ে পড়েন। তার লিভার নষ্ট হয়ে যায়। ২ মে ১৯৫৭-তে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ম্যাকার্থির মৃত্যু হয়।

আর তার পরপরই আমেরিকা থেকে চিরবিদায় নেয় ম্যাকার্থিজম।

কিন্তু ম্যাকার্থিজম পেছনে রেখে গেছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং জুডিশিয়াল মার্ডারের ভয়াবহ ও কুৎসিত দৃষ্টান্ত – ইলেকটৃক চেয়ারে রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যু।

রোজেনবার্গ দম্পতির বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হওয়ায় ডেভিড গৃনগ্লাস ও তার স্ত্রী রুথ মুক্তি পেয়েছিলেন। ২০০১-এ একটি ইন্টারভিউতে ডেভিড গৃনগ্লাস বলেন, ‘ওই সময়ে কে যে এটমিক বোমার বিষয়ে নোট টাইপ করেছিলেন সেটা এখন আর আমার মনে পড়ে না। কিছুই মনে পড়ে না। … আমি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে সরকার পক্ষ আমাকে উৎসাহিত করেছিল। আমি সেটা করেছিলাম আমার নিজের প্রাণ এবং আমার স্ত্রীর প্রাণ বাচানোর জন্য। আমার বউ আর ছেলেমেয়েকে বোনের জন্য বলি দিতে চাইনি। এ বিষয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।’

ডেভিড গৃনগ্লাস অনুতপ্ত না হলেও গ্লানি থেকে আমেরিকার বিচার বিভাগ মুক্ত হয়নি। সেখানে এখনো তর্ক চলছে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার (১৯৫৩-১৯৬১)-এর রিপাবলিকান সরকার কেন এবং কিভাবে মদ্যপানে আসক্ত, ঘোর এলকোহলিক রিপাবলিকান সিনেটর ম্যাকার্থি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল? কেন আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ এফবিআই ও বিচার বিভাগ পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছিল? কেন খুবই লঘু পাপে রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল?

এটা ঠিক যে সেই সময়ে সভিয়েট ইউনিয়নের এটমিক শক্তি সঞ্চয়, চায়নার উত্থান এবং কোরিয়ান যুদ্ধ, সঙ্গত কারণে আমেরিকানদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু সেটাকে পুজি করে রাজনৈতিক লাভ আদায়ের চেষ্টা করা রিপাবলিকান সরকার ও রিপাবলিকান দলের উচিত হয়নি। তাদের উচিত হয়নি অতি দুর্বল অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা সাজিয়ে মানুষকে বিপদের মুখে, এমনকি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। সেই সময়ে এই রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং হীন কৌশল সাধারণ আমেরিকানরা বুঝতে পারেনি।

ভাষা আন্দোলন করায় মৃত্যুদণ্ড?
১৯৫২-৫৩তে রোজেনবার্গ দম্পতিকে বাচানোর জন্য বিশ্ব জুড়ে আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত উভয়েরই ইলেকট্রক চেয়ারে মৃত্যুবরণ আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল কয়েকটি কারণে।

১৯৫২-র ফেব্রুয়ারিতে আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র রূপে আইএ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার পিতা সাইদুর রহমান ছিলেন ঢাকা কলেজেরই প্রফেসর এবং ঢাকা কলেজের তিনটি হস্টেলের (হাসিন বাগ, নূরপুর ভিলা ও মোস্তফা হাউজ) সুপারিনডেন্ট। ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন ছাত্রদের পক্ষে। এই অভিযোগে তাকে রাতারাতি ট্রান্সফার করা হয় সিলেটের মুরারিচাদ কলেজে। এর ফলে আমার মা রওশন আরা রহমান, বাংলাবাজার গার্লস স্কুলের টিচার, তার চার সন্তানকে নিয়ে মহাবিপদে পড়েন।

৩৭ নাম্বার বেচারাম দেউড়িতে সুপারিনটেনডেন্টের কোয়ার্টার্স ছেড়ে হঠাৎ ঢাকায় বাড়ি পাওয়া তখন দুঃসাধ্য ছিল। এই অকূল পাথার থেকে মা-কে উদ্ধার করেন তার এক আত্মীয় সৈয়দ মোহাম্মদ আলী (যিনি মুসলিম লিগের এমপি এবং অভিনেতা সৈয়দ আহসান আলী সিডনির পিতা ছিলেন) তার সহায়তায় বাদামতলিতে একটি বাড়িতে আমাদের স্থান হয়।

তবে এই বাড়িটি ছিল বাদামতলি পতিতালয়ের পাশে।

সেই প্রথম বারবনিতাদের চাক্ষুষ দেখলাম এবং বুঝলাম সরকারি রোষের শিকার হলে মানুষ ও পরিবারকে কতো প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হতে পারে।

জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গ দম্পতির অভিজ্ঞতা ছিল মর্মান্তিক। আমার পিতামাতার দুর্দশা তাদের সঙ্গে তুলনীয় না হলেও আমি বুঝতে পেরেছিলাম সরকারি প্রশাসন যন্ত্র কাউকে শান্তি দিতে বদ্ধপরিকর হলে সেটা তারা করতে পারে।

আগস্ট ১৯৪৭-এ পাকিস্তান জন্মের মাত্র সাড়ে চার বছর পরে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-তে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন মুসলিম লিগ সরকারের কাছে বিষের মতো মনে হয়েছিল। ঠিক আমেরিকায় রিপাবলিকান সরকারের কাছে যেমন কমিউনিজমকে ক্ষতিকর মনে হয়েছিল। কমিউনিজমের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য সাজানো বিচারে রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। আমার মনে প্রশ্ন এসেছিল তাহলে কি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত থাকার অপরাধে আমার পিতার মৃত্যুদণ্ড হবে? আমার পিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্যি ছিল। কিন্তু সেটা কি মৃত্যুদণ্ড ডেকে আমার মতো গুরুতর অপরাধ ছিল?

ছিল না।

কিন্তু তখন যদি মুসলিম লিগ সরকার তাই মনে করত তাহলে কি হতো? যদিও ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধে তখন মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল না, তবুও যদি পাকিস্তান সরকার আইন বদলে, নতুন আইনে ভাষা আন্দোলনকারীদের মৃত্যুদণ্ড দিত তাহলে আমরা কি করতে পারতাম?

উন্মত্ত শাহবাগী
এই প্রশ্নটি আমার আবার মনে এসেছিল ৬১ বছর পরে আরেক ফেব্রুয়ারিতে। ২০১৩ তে শাহবাগে তথাকথিত গণজাগরণের সময়ে।

জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে ফাসি দেওয়ার লক্ষ্যে আইন বদলে, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার জন্য শাহবাগীদের আন্দোলনে দুই মাস দেশের দুটি প্রধান হসপিটাল, পিজি ও বারডেমে, রোগিদের সেবাÑশুশ্রুষা ব্যাহত হয়েছিল। তাতে হয়তো কিছু পেশেন্টের তরান্বিত মৃত্যুর কারণ হয়েছিল এই আন্দোলন। তাদেরও (শাহবাগীদের) কি তাহলে পরবর্তী সরকারের সময়ে আইন বদলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা উচিত হবে?

কোনো আইনের রেট্রোসপেকটিভ এফেক্ট (Retrospetive Effect) দিয়ে ন্যায়ের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার বিষয়ে তথাকথিত সুশীল সমাজ তখন নীরব ছিল।

শাহবাগীদের আন্দোলনের সময়ে আমার বারবার মনে পড়ছিল প্রায় একই ধরনের সরকার পৃষ্ঠপোষিত এবং সাজানো পাবলিক উন্মত্ততা বা মাস হিস্টেরিয়ার পরিণতিতে ছয় দশক আগে হতভাগ্য রোজেনবার্গ দম্পতির ইলেকটৃক চেয়ারে জুডিশিয়াল মার্ডারের কথা। বাংলাদেশে মাস হিস্টেরিয়ার সময়ে সুশীলদের বিবেক হারিয়ে গিয়েছিল বুড়িগংগায়, লজ্জা ডুবে গিয়েছিল শীতলক্ষ্যায়, মানবতাবোধ বিলীন হয়ে গিয়েছিল মেঘনায়।

অন্যায় ও পাপ
ছয় দশক আগে রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুর পরে আমি বুঝতে পারি মৃত্যুর ফাইনালিটির বিষয়টি। ব্যক্তির মৃত্যু একটি ফাইনাল ফাইনাল ঘটনা। মৃত্যুর পরে ব্যক্তিকে জীবিত করা যায় না। রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুর পরে আমেরিকায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বেচে গেলেও রোজেনবার্গ দম্পতি পুর্নজীবিত হতে পারেন নি। এই চরম দুঃখজনক রূঢ় বাস্তবতা বুঝে আমেরিকায় তখন থেকে মৃত্যুদণ্ড বিরোধী আন্দোলন শুরু হয় এবং সেই আন্দোলন এখনো চলছে। আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ১৫টি-তে মৃত্যুদণ্ড রহিত হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড: দেশে বিদেশে যুগে যুগে শীর্ষক লেখাগুলোর প্রথম পর্বে (টেন রিলিংটন প্লেস) আমি দেখিয়েছি নিরপরাধ টিমথি এভান্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার পর বৃটেনে মৃত্যুদণ্ড বিরোধী আন্দোলনের সুত্রপাতের বিষয়টি। দ্বিতীয় পর্বে (এ সিক্স মার্ডার মিসটেকেন আইডেনটিটি) আমি দেখিয়েছি ভুল পরিচয়ে জেমস হ্যানরাটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার পর বৃটেনে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি। উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশ ও বিচার বিভাগের ব্যর্থতা বৃটেনের মানুষকে সচেতন করে তোলে। আজ তৃতীয় পর্বে (জুডিশিয়াল মার্ডার ভিকটিম রোজেনবার্গ দম্পতি) আমি দেখিয়েছি আমেরিকাতে কা-জ্ঞানহীন পলিটিশিয়ান ও তাদের সহযোগী রাজনৈতিক দোষে দুষ্ট গোয়েন্দা পুলিশ বিভাগ এবং পক্ষপাতদুষ্ট বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনমত গঠিত হবার বিষয়টি।

আইনের হাত মুচড়িয়ে, আইনকে বদলিয়ে এবং বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রিত করে রেট্রোসপেকটিভ এফেক্টে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় সেটা যে কতো বড় অন্যায় ও পাপ সেটা আশা করি বাংলাদেশের মানুষ বুঝবে।