নৃশংসতা, ক্ষমা ও স্বাধীনতার কোলাজের চলচ্চিত্র “কিনিয়ারওয়ান্ডা”

kinyarwanda_kid
“হোটেল রুয়ান্ডা” যদি হলিউডি ঘারাণার চলচ্চিত্র হয়ে থাকে, “কিনিয়ারওয়ান্ডা” (Kinyarwanda) আফ্রিকার যাদু বাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়ালিজামের স্বদেশীয় আলপনায় আঁকা এক অনবদ্য চলচ্চিত্র। ‘হোটেল রুয়ান্ডা’ য় গৃহযুদ্ধে আক্রান্ত ভীত-সন্ত্রস্ত নাগরিক বিশেষত তুতসি গোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল যদি হয়ে থাকে একটি হোটেল ‘কিনিয়ারওয়ান্ডা’র আশ্রয়স্থল হলো মসজিদ। যে পবিত্র মসজিদের শান্ত-শীতল ছায়ায় অসহায় মুসলমান, খ্রিস্টান, হুতু, তুতসি বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষের একমাত্র আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯৪ সালে সংঘঠিত নৃসংশ গৃহযুদ্ধের যে দায় গিয়ে পড়ে রুয়ান্ডার দুই উপজাতি গোষ্ঠী, হুতু এবং তুতসীর ওপর কিন্তু যে গৃহযুদ্ধ সৃষ্টির পশ্চাতে থাকে অন্য এক ভিন্ন কারণ। যে কারণ, যে ইতিহাস থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। অথচ রুয়ান্ডার প্রাগৈতিহাসিক আবহমান ইতিহাস কিন্তু সে কথা বলেনা। রুয়ান্ডার আছে দীর্ঘ এক ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস। যে ইতিহাস গড়ে উঠেছে বরফ যুগের শেষের প্রায় দশ হাজার বছর আগে নিওলিথিক সময়ের শুরু থেকে। অর্থাৎ খ্রীস্টপূর্ব ৩০০০ বছর থেকে রুয়ান্ডায় জনবসতি গড়ে উঠতে থাকে। যদিও এখানকার আদিম জনগোষ্ঠী ‘তাওয়া’ গোষ্ঠীর এক অংশ পরবর্তীতে বানতু নামের অভিবাসীর সঙ্গে মিলে গিয়ে আদিম তাওয়া গোষ্ঠীকে সংখ্যালঘুতে পরিণত কোরে কৃষিকাজ শুরু করে, যে মিশ্র গোষ্ঠী বর্তমান হুতু গোষ্ঠী নামে পরিচিত। পরবর্তীতে আরো একদল অভিবাসী যারা তুতসী নামে পরিচিত তারা এখানে মেষপালনের মাধ্যমে জীবিকা ও বসতি স্থাপন শুরু করে। পনর শতাব্দীর মধ্যে হুতু-তুতসি একত্রে বৃহত্তর রুয়ান্ডা ভূমি গড়ে তোলে। তারা শুধু রুয়ান্ডার ভূমিই গড়ে তোলেনি, এই হুতু-তুতসি উভয় জাতিগোষ্ঠীর ভেতর বিবাহ, পরিবার, সমাজ একত্রে মিলেমিশে গড়ে ওঠে। যে গড়ে ওঠার পেছনে কখনোই কোনো জাতিগত বিদ্বেষ দেখা দেয়নি। ১৮৯৪ সালের দিকে জার্মানরা প্রথম এখানে পদার্পন করে, কিন্তু জার্মান উপনিবেশিক পরোক্ষ শাসন এই দুই গোষ্ঠীর ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। ঘটাতে পারেনি কোনো ধরণের বিচ্ছেদ। কিন্তু ঠিক একশ বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র রুয়ান্ডায় কী এমন ঘটলো যে সে বছরের মে থেকে জুলাই Ñ এই তিন মাসে দশ লক্ষ রুয়ান্ডাবাসীকে গণহত্যার শিকার হতে হলো ? এবং যে খবর বিশ্বের দরবারে পৌঁছাতে আরো দেরি হলো?

উত্তর-উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর একটা অনিবার্য (?) অথচ বাস্তব সত্য এই যে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই শুরু হয় বিভাজন, বিদ্বেষ এবং শেষ পর্যায়ে নৃশংসতার রাজনীতির খেলা। অথচ যা অনিবার্য হবার কথা তা হলো বিদারণ নয় একত্রিকারণ, বিদ্বেষমূলক বা শত্রতামূলক নয় বন্ধুসুলভ এবং নৃশংসতা নয় মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন আচরণ। দলগত, গোষ্ঠীগত বা জাতিগত বিদ্বেষের এসব অনৈতিক আচরণ নিহিত থাকে সমাজের সমাজবাস্তবতার প্রতীকী আকারে। আপাতদৃষ্টিতে এসব বিদ্বেষ, বিভাজনকে বিভাজিত দল বা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রেষারেষি, ক্ষমতার প্রতি সীমাহীন লোভ-লালসা, দুর্নীতিপ্রবনতা ইত্যাদি বলেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু এসব কোন্দলের ভিত্তিভূমি দাঁড়িয়ে থাকে সেসব দেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক উপনিবেশবাদ, উত্তর-উপনিবেশবাদ বা সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অন্তড়ালে। যে উপনিবেশবাদ তাদের সৃষ্ট উপনিবেশ ত্যাগ করে গেলেও সাম্রাজ্যবাদের বিষদাঁত গেঁথে রেখে যায় সেসব দেশে। ‘কিনিয়ারওয়ান্ডা’ ছবির জাতিগত বিদ্বেষ তাই প্রতীকী আকারে দেখা দেয়, প্রকৃত ইতিহাসের অন্তরালে থাকে রুয়ান্ডার ওপর বেলজিয়ামের দীর্ঘ দিনের উপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও জাতিগত বিভক্তির বীজ বপনের মধ্যে। কেনিয়ার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ও লেখক নগুগি ওয়া থিওঙ্গো তাই তার ‘ডিকলোনাইজিং অফ মাইন্ড’ বইটিতে লেখেন Ñ “ উপনিবেশিক শক্তির আধিপত্যবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছিলো যারা উপনিবেশবাদের শিকার তাদের ‘মানসিক জগত’। তারা কিভাবে, কোন্ দৃষ্টিতে নিজেদেরকে এবং পৃথিবীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে দেখে ÑÑ সংস্কৃতির মাধ্যমে সে দৃষ্টিভঙ্গির নিয়ন্ত্রণ নেয়াটাও ছিলো উপনিবেশিক শক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য। মানসিক নিয়ন্ত্রণকে উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কখনোই ফলপ্রসূ হয়না।” এসব মানসিক নিয়ন্ত্রণ উপনিবেশিত রাষ্ট্রের জনগণের মানসিক জগতকে এতোটাই গভীর অথচ দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করতে থাকে যে উপনিবেশিত জনগণ বোধগম্যই করতে পারেনা কবে কিভাবে তারা বিভাজিত হয়ে পড়েছে। আর ঠিক এখানেই উপনিবেশবাদের শক্তি নিহিত যা পরবর্তীতে সাম্রাবাদের আকারে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। রুয়ান্ডার ইতিহাসে তাই দেখা যায় ১৯২৩ সালে লিগ অফ নেশান্সের ম্যানডেট নিয়ে সমগ্র রুয়ান্ডা-উরুন্ডি এবং কঙ্গো পর্যন্ত এলাকা বেলজিয়াম তার উপনিবেশ স্থাপন করে। যে উপনিবেশ ১৯৬১’র ২৫ সেপ্টেম্বর রুয়ান্ডার স্বাধীনতা পর্যন্ত বলবৎ থাকে। আর ঠিক এই সময়ের মধ্যেই রুয়ান্ডার জনগণের মাঝে থিওঙ্গো কথিত ‘মানসিক জগত’ নির্মিত হয়ে যায়, যা ছবির একটি মাত্র দৃশ্যে পরিচালক অ্যালরিক ব্রাউন অত্যন্ত চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তোলেন। সেই দৃশ্যে যাবার আগে দেখা যাক ছবিটি কিভাবে পরিচালক অ্যালরিক ব্রাউন তার যাদুবাস্তবতার আলোকে তুলে ধরেছেন।

“কিনিয়ারওয়ান্ডা” শব্দটি রুয়ান্ডার অফিসিয়াল ভাষা। যে ভাষার আরেক নাম ‘বানতু’ যে ভাষায় হুতু-তুতসি এবং অপর ক্ষুদ্র গোষ্ঠী তাওয়া এরা সবাই কথা বলে। ছবিতে বানতু এবং ইংরেজি দুই ভাষাই ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৯৪ সালের গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া মানুষদের সত্য কাহিনী অবলম্বনে ছবিটি নির্মিত। রুয়ান্ডার একটি এলাকার মুসলিম জনগোষ্ঠী দৃঢ়ভাবে স্থির করে এই নৃসংশ গণহত্যায় তারা অংশগ্রহণ করবেনা। কিগালির বড় মসজিদ এবং নিয়ানজার মাদ্রাসা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে স্থাপিত হয়, যেখানে মুসলিম, খ্রিস্টান, হুতু, তুতসি, তাওয়া জনগোষ্ঠীকে এই নৃশংসতা থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়। মোট ছয়টি খন্ডে বা অধ্যায়ে ভাগ কোরে, খন্ড খন্ড কাহিনীকে একত্রিত কোরে একটি পূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। এসব খন্ড কাহিনীগুলোর মধ্যে গণহত্যার লোমহর্ষক ঘটনা যেমন এসেছে তেমনি এসেছে গণহত্যায় অংশ নেয়া সেনাদের অপরাধ সংঘঠনের স্বীকারোক্তি এবং ভুল শুধরে নেয়ার আকুতি, এসেছে ক্ষমাশীলতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। ছবির শুরুতে কালো পর্দার ওপর অফভায়েজে ছবির নায়িকা তুতসী গোষ্ঠীভুক্ত জেন তার আত্মজীবনী বলে যায়। জেন ভালোবাসে হুতু গোষ্ঠীর প্যাট্রিককে। যুদ্ধ শেষের রি-এডুকেশন ক্যাম্পে, সেনারা জানায়, গৃহযুদ্ধের সময় বিশ্বাসঘাতক বলে তাদের কাছে যাদের পরিচিতি দেয়া হতো, বিশ্বাস করানো হতো তারা হলো Ñ যেসব হুতু-তুতসি বা তুতসি-হুতু বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।। অর্থাৎ কোনো হুতু কোনো তুতসিকে কোনোভাবেই বিয়ে করতে পারবেনা। যদি তারা করে থাকে তাহলে তারা বিশ্বাসঘাতক নামে চিহ্নিত হবে এবং অবশ্যই তাদের মেরে ফেলা হবে। এভাবে তারা অসংখ্য পরিবার নিঃশ্বেষ করেছে বলে জানায়। যুদ্ধের সময় সেনাদের শেখানো হয় Ñ তোমাদের একমাত্র শত্র“ কে ? উত্তর Ñ তুতসি, তোমাদের শত্র“ কে ? উত্তর Ñ তুতসি। ছবিতে বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র, বল্লম হাতে বারংবার হুতু সেনাদের এসব উল্লাস করে বলতে দেখা যায়। ছবির একটি অধ্যায়ের নামই রাখা হয় Ñ নারীটি তুতসি, পুরুষটি হুতু। এই অধ্যায়ে আমরা দেখি দেশের সামগ্রিক বিভেদ, বিদ্বেষ কীভাবে একটি পরিবারের তুতসি স্ত্রী আর হুতু স্বামীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। ছবির সব থেকে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো Ñ গানস ( বন্দুক ) অ্যান্ড ককরোচেস ( তেলাপোকা ) । ছোট্ট ছেলে ইসমাইলের সিগারেট কেনাকে কেন্দ্র করে পরিচালক কী অসাধারণ দক্ষতায় বন্দুক আর তেলাপোকার অর্থকে ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে যান। ছবিটি যারা দেখেছেন তাদের পক্ষে এই দৃশ্যটির কথা কখনোই বিস্মৃত হওয়া সম্ভব নয়। গৃহযুদ্ধ তখন পুরোদমে চলছে, গ্রামে গ্রামে হুতু সেনারা নিয়োজিত। ইসমাইলকে তার বাবা সিগারেট আনতে পাঠায়। দোকান থেকে সে সিগারেট আর একটা ক্যানডি কেনে। সেই ক্যানডি চুশতে চুশতে সে দলানো-পাকানো একটা কাগজের টুকরো কোরে ফুটবলের মতো খেলতে খেলতে হুতু সেনাদের সামনে এসে পড়ে। সেনারা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। হুতুরা তুতসিদের তেলাপোকা নামে অভিহিত করতো। একজন সেনা বলে Ñ ‘তুমি অবশ্যই কখনো কোনো তেলাপোকাকে ( তুতসি নারী ) চুমু খাবে না। ওদের সরাসরি ধর্ষণ করবে।’ এভাবে ওদের কথার মাঝে বার বার তেলাপোকা আর বন্দুকের প্রসঙ্গ আসে। ইসমাইল মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শোনে। এইসময় হঠাৎ গুলির শব্দ ভেসে আসে। তারা মনে করে নিশ্চয়ই এটা সেই তেলাপোকা অর্থাৎ তুতসিদের কাজ। তেলাপোকার খোঁজে তারা তটস্থ হয়ে পড়ে। ইসমাইল জানায় সে জানে কোথায় বন্দুক আর তেলাপোকা আছে। সেনাদের সে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। ইসমাইল তার বাড়ি দেখিয়ে বলে ওখানে বন্দুক আর তেলাপোকা আছে। সেনারা সদলবলে বাড়িতে ঢোকে আর ইসমাইলের বাবাকে কঠোর ভাষায় জিজ্ঞেস করতে থাকে কোথায় বন্দুক রাখা আছে। নিরীহ ইসমাইলের বাবা ও তার পরিবার হতভম্ব হয়ে যায়। ইসমাইল তখন একটা ভিডিও ক্যাসেট টেলিভিশানের সঙ্গে সংযোগ করে এবং সেখানে যুদ্ধের ভিডিও দেখিয়ে বলে Ñ ‘ঐ দেখো ওখানে বন্দুক।’ তারপর কাঠের আলমারি ঝাঁকায়, বেশ কয়েকটা তেলাপোকা বের হয়ে আসে, ইসমাইল বলে Ñ ‘আর এই দেখো তেলাপোকা।’ ছোট্ট শিশুমনের এই বন্দুক আর তেলাপোকার ধারণা দিয়ে পরিচালক আমাদের বন্দুক আর তেলাপোকার অর্থাৎ যুদ্ধ ও গোষ্ঠীবিদ্বেষের স্থুলতা, ক্ষুদ্রতা, নীচুতা আর হীনতা এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। একই সময়ে তখন এসব বিদ্বেষের শৃঙ্খল থেকে তুতসি-হুতু-তাওয়াদের রক্ষা করার উপায় বের করার জন্যে কিগালির বড় মসজিদে সভা বসে। এই সময়েই এসব বিদ্বেষ, বিভেদের থিয়োঙ্গো কথিত ‘ মানসিক জগত’ এর ঐতিহাসিক পটভূমি চমৎকার ভাবে ওমর নামের একটি চরিত্রের সংলাপের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। ওমর বলেন Ñ “ —আমাদের শত্র“তার বীজ বপন করে দিয়ে গেছে সেই উপনিবেশিক শাসক বেলজিয়ামের কর্তা ব্যক্তিরা। তারা এখানে এসেই আমাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ বিশেষত কান এবং পাঁজড়ের পরিমাপ করে। তারা জানায় যেহেতু তুতসিদের পাঁজড় আমাদের থেকে যথেষ্ট বড় কাজেই তারা অফিস-আদালতে কাজ করবে আর হুতুদের তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র বলে তারা কৃষিকাজ করবে। আর তাওয়ারা থাকবে বনে-জঙ্গলে। এবং আশ্চর্যজনক সত্য হলো সেই থেকে আজও আমরা এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে চলেছি।” উপনিবেশিক শক্তি উপনিবেশিত দেশের মানুষের মনোজগত গঠন করার প্রক্রিয়া এবং এই শক্তির গঠিত মনোজগতের বিশ্বাস কতটা গভীরে রাখতে জানে তা এই একটি মাত্র সংলাপে আমরা বুঝে যাই। এই শক্তির বলেই উপনিবেশিক শাসন যুগ যুগ ধরে উপনিবেশিত দেশে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চলিয়ে যেতে পেরেছে।

কিন্তু বিদেশি কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই স্থায়িভাবে টিকে থাকতে পারেনা। একটা সময়ে তার ধবংস অনিবার্য হয়ে পড়ে। ধ্বংসের এই অনিবার্যতাকে তুলে ধরার কারণেই ‘ কিনিয়ারওয়ান্ডা’ ছবিটি এক ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। আমরা দেখি একই মসজিদে একদিকে যেমন মসজিদের ঈমাম মুসলিম হুতু-তুতসিদের নামাজের ঈমামতি করছেন, পাশের ঘরে আরেকজন প্রিস্ট খ্রিস্টান হুতু-তুতসিদের বাইবেল থেকে বাণী পড়ে শোনাচ্ছেন। স্লো মোশানে কাট টু কাট শট বা দৃশ্যাংশে ধর্মনিরপেক্ষতার, মানবিক মূল্যবোধের ভিন্ন মাত্রার এরকম অনবদ্য চিত্র খুব কম ছবিতে দেখা যায়। অপরাধ-স্বীকার এবং ক্ষমাই যে একমাত্র স্বাধীনতা ও শান্তির চাবিকাঠি ছবির শেষে পরিচালক আমাদের আরো স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেন। ইমানুয়েল নামের ছেলেটি যে জেনের বাবা-মা সহ অসংখ্য তুতসি নিধন করেছিলো সে জেন সহ সবার সামনে বলে Ñ “ আজ থেকে আমি ভুলে যেতে চাই আমি একজন হুতু ছিলাম। ভুলে যেতে চাই কারা তুতসি। — আমি কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চাই জেনের কাছে। সবার কাছে —- আজ থেকে আমি কেবলই একজন রুয়ান্ডান।” হুতু বা তুতসি হিসেবে নয় একজন রুয়ান্ডান হিসেবে বেঁচে থাকার মধ্যেই আছে স্বাধীনতার মূল চাবিকাঠি। যে চাবিকাঠি কেউ ছিনিয়ে নিতে পারেনা। যে চাবিকাঠির অভাবেই উপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিয়ন্ত্রণ চালায় অন্য দেশের ওপর। নিজের দেশকে কখনোই নিজের আপন দেশ বলে ভাবতে দিতে চায়না এসব শক্তি। নিজের দেশকে নিজের ভূমি, নিজের মাটি হিসেবে ভাবতে শেখানোর মধ্যে দিয়্ইে শেষ হয় ছবি। বর্তমান রুয়ান্ডা তাই অতীতের সেই গণহত্যার কাহিনী নিজেদের জীবন থেকে মুছে ফেলার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। সফলও হচ্ছে। আমরা আমাদের বর্তমানের বিদ্যমান রাজনৈতিক বিদ্বেষ, বিভেদের প্রেক্ষাপটে ‘ কিনিয়ারওয়ান্ডা’ ছবি থেকে কিছুই কি শিক্ষা নিতে পারিনা?