ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মবেশের চেয়ে প্রকাশ্য হিন্দুত্ববাদ ভালো

Narendra Modi
নরেন্দ্র মোদি ভারতের আগামি প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, এটা আকাশে-বাতাসে বহু দিন আগে থেকেই ধ্বনিত হচ্ছিল। নির্বাচন হয়েছে, বিজেপি জিতেছে। বলাবাহুল্য নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন শিগগিরিই। খুবই গরিবি অবস্থা থেকে নিজের গুণে উঠে এসেছেন মোদি। একেবারেই নিচু অর্থনৈতিক অবস্থান পেরিয়ে, চা বিক্রেতা থেকে উঠে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সহজ জয় নয়। মোদিকে দিয়ে দণি এশিয়ায় পরিবারতন্ত্রের ভাঙনের সুর আরো প্রবল হলো। রাজনৈতিক দল মানে, সমাজের বিভিন্ন স্বার্থ বা শ্রেণীর একেকটা মিলনস্থল; সেখানে কোনো এক পরিবারকে শিখণ্ডি খাড়া করে স্বার্থের বিবাদ মেটানোর পদ্ধতি অতি প্রাচীন। একে নানান দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়, আর চাইলেই তা কোনো সমাজ থেকে উবে যায় না। বিপদ আর রহস্যের জায়গা হচ্ছে কোনো এক পরিবারকে কেন্দ্র করে ভুতুড়ে মতা তৈরি হওয়া। সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসাবে পরিবারতন্ত্র নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা হয় নি বললেই চলে। তবে রাজতন্ত্র বা পরিবারতন্ত্রের বাইরে রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র মোতাবেক চলার রীতি রপ্ত করা বড় একটি কাজ। পরিবারের একচ্ছত্র মতার বাইরে দলীয় গঠনতন্ত্রকে সবার মান্য করা এবং দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বিরোধ বা সংঘাত নিয়মতান্ত্রিক বিধিবিধানের মধ্যে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা ও চর্চা অগ্রসর রাজনীতি সন্দেহ নাই। বিজেপি মতাদর্শিক ভাবে হিন্দুত্ববাদী, সন্দেহ নাই, কিন্তু তার সাংগঠনিক শক্তির দিকটা শুধু তার মতাদর্শে নিহিত ভাবা ভুল হবে। গঠনতান্ত্রিক দলীয় রাজনীতি, যেখানে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মীমাংসা কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, সেটা পরিবারতন্ত্রকে অস্বীকারের ধারা। সেই ক্ষমতা অন্তত বিজেপির আছে বলেই এ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিত বিজেপির এই সাংগঠনিক শক্তির জায়গাটা বোঝার দরকার আছে।

মোদি নীচু জাত আবার চা বিক্রেতা। এর একটা আবেদন আছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সেকুলার জামা গায়ে দেওয়া কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদের বিপরীতে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক বিজয়ের পেছনে এইসব নিম্নবর্গের চেতনাও কাজ করেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সবাই বলছেন, দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার দিক থেকে তিনি একটা ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন, ভারতের জনগণ যার মূল্যায়ন করেছে। হতে পারে। আমরা অস্বীকার করি না।

মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন এটা তাহলে খবর হিসাবে নতুন কিছু ছিল না। তবে মোদির মতো একজন দাঙ্গাবাজ লোক ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত কি না, নির্বাচনের আগে তা নিয়ে সেকুলার ঔচিত্যবোধের জায়গা থেকে জবরদস্ত নীতিবাগীশ তর্কও চলেছে। আসলেই গুজরাটের দাঙ্গা ও মুসলিমনিধন আমরা ভুলি কী করে? কিভাবে এই রকম এক দাঙ্গাবাজ লোক ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভারতের জনগণ মেনে নেবে? আর আমরা বাংলাদেশে স্বস্তিতে থাকব? এই প্রশ্ন যারা করেন তারা আগেই ধরে নেন ভারত একটি ‘অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপে’ দেশ। ভাবখানা এ রকম যে বুঝি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপে কংগ্রেস ও তাদের সহযোগী বামপন্থী দলের আমলে বা শাসনাধীন এলাকায় ভারতে কোনো দাঙ্গা হয় নি।

বাংলাদেশের নাগরিক বলে আমি মুসলমানদের উদাহরণ দেবো না। আচ্ছা যদি দাঙ্গাবাজকেই মেনে নেওয়া বা না-নেওয়া ইস্যু হয় তাহলে ১৯৮৪ সালে কংগ্রেস মতাসীন থাকার সময় যেভাবে শিখদের হত্যা করেছে সেটা কি দাঙ্গা ছিল না? দাঙ্গাবাজ কংগ্রেসকে মেনে নিল কিভাবে ভারতীয়রা? আর আমরাও। সেখানে শিখ কি গুজরাটের মুসলমানদের চেয়ে কম মারা গিয়েছিল? তাই বলা হয় কংগ্রেস ও ভারতের বামপন্থি দলগুলো সাম্প্রদায়িকতাকে ধর্মনিরপেতার আলখেল্লা দিয়ে যেভাবে ঢেকে রাখে, তার চেয়ে খোলামেলা হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি অনেক অনেক ভালো। কপট হিন্দুত্ববাদিতার চেয়ে অকপট ও স্বচ্ছ হিন্দুত্ববাদ মোকাবিলা করা সহজ।

পাশ্চাত্যের মিথ, নানাবিধ উৎকল্পনা এবং তার সঙ্গে কংগ্রেস ও বামপন্থিদের প্রচারের কারণে ভারতকে একটি বিশাল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপে দেশ হিসাবে হাজির করার গালগল্প তো বহু দিনের। কাশ্মির, পাঞ্জাব বা বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভারতের রাজ্যগুলোতে দমন, নিপীড়ন ও রাজনৈতিক বিদ্রোহীদের হত্যার নীতি বহু পুরানা। ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেতার আলখেল্লা গায়ে দিলে সেটা আড়াল করা যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। বিজেপির বিজয় ও নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আবির্ভাব হিন্দু ভারতের হিন্দুত্ববাদিতাকে আরো সরল ও স্পষ্ট করেছে। কংগ্রেস ও বামপন্থিদের লুকাছাপা কারবারের চেয়েও হিন্দুত্ববাদী ভারত তার নিজের স্বরূপে হাজির হচ্ছে। একে মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের কপটতার আশ্রয় নিতে হবে না। তাই আমরা একে স্বাগত জানাই। নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন।

নির্বাচনের পর পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে, বিমূর্ত নীতিবাগীশতা রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বিচার বা তার অভিমুখ নির্ণয় করবার জন্য অকেজো বা বেকার পদ্ধতি। এই সত্যটা ভারতের লোকসভার নির্বাচন থেকে আমাদের নতুন করে শেখার দরকার নাই। এটা এমন অজানা কিছু নয়। যাঁরা মার্কসের বরাতে ‘বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ’ কথাটির সঙ্গে পরিচিত, তারা জানেন, ভারতের বাস্তব অবস্থাটা বোঝাই আসল কাজ। নির্বাচনের আগে কিম্বা পরে। সেকুলারিজম হারল কি হিন্দুত্ববাদ জিতল সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু সেটা গৌণ তর্ক। দুধ থেকে ঘোষের মাখন আর ছানা তুলে নেবার পর খামাখা পড়ে থাকা পানি ঘোলা করা কেবল। বরং চুপচাপ খেয়ে ফেলুন কিম্বা, ফেলে দিন।

কথাগুলো অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া অমর্ত্য সেনকে বলতে পারলে ভালো লাগত। অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট নরেন্দ্র মোদি অ্যাজ মাই পিএম’। তিনি কিছুতেই চান না নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হোক। কারণ কী? “কারণ তার ‘সেকুলার ক্রেডেনশিয়াল’ নাই। মোদি ধর্মনিরপে না। সিধা কথা অমর্ত্যরে, ‘একজন ভারতীয় নাগরিক হিসাবে আমি চাই না মোদি আমার প্রধানমন্ত্রী হোক। … আমরা ভারতীয়রা এমন কোনো পরিস্থিতি চাই না যাতে সংখ্যালঘুরা নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করে এবং ন্যায্যতই মনে করে যে ২০০২ সালে তাদের বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত দাঙ্গা পরিচালিত হয়েছে। সে এক ভয়াবহ ইতিহাস। ভারতের নাগরিক হিসাবে আমি এমন প্রধানমন্ত্রী চাইতে পারি না যার এই দাঙ্গার রেকর্ড আছে।… ভারতের সংখ্যালঘু জনগণের মধ্যে নিরাপদ বোধ নিশ্চিত করবার জন্য মোদি যথেষ্ট প্রয়াস দেন নি। তিনি আরো সেকুলার হতে পারতেন।” গুজরাটে নরেন্দ্র মোদির আমলে সুশাসন ও পুঁজিবান্ধব বিনিয়োগের কেচ্ছাও অমর্ত্য সেন স্বীকার করেন নি। উন্নয়নের ‘গুজরাট মডেল’ সম্পর্কে তার বক্তব্য হচ্ছে স্বাস্থ্য আর শিা খাতে আরো অনেক কিছু করার ছিল, কিন্তু করা হয় নি। সামাজিক সমতার ক্ষেত্রেও মুশকিল আছে। সমতা আনয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ কাজ হয় নি। সারকথা, গুজরাটি উন্নয়ন মডেল অমর্ত্য সেন নাকচই করেছেন।

নির্বাচনের আগে তার এই বক্তব্য, বলাবাহুল্য, নরেন্দ্র মোদির বিরোধীরা নির্বাচনী প্রচার হিসাবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু তাদের পক্ষেও তো দাপুটে অর্থনীতিবিদ আছেন। তারা তার উত্তর দিয়েছেন। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মতাদর্শিক প্রভু ও ‘অবাধ বাজারব্যবস্থার ভগবান’ জগদীশ ভগবতী যেমন। তার সঙ্গে অমর্ত্য সেনের বিরোধ নতুন নয়। যাঁরা উন্নয়ন বিতর্ক কমবেশি অনুসরণ করেন, সেই সব তাদের জানা থাকার কথা। বাংলাদেশের উন্নয়ননীতিতে আগ্রহীদেরও এ তর্কগুলো পর্যালোচনার চোখ তীè রেখে অনুসরণ করা উচিত। মোদির বিজয়ের পর গুজরাট মডেল অবশ্যই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসতে বাধ্য। অর্থনৈতিক কারণ ছাড়া এখন তো রাজনৈতিক কারণেও এই তর্কগুলো চলবে। নির্বাচনের পর অমর্ত্য সেনসহ সেকুলারওয়ালা আর ব্র্যাক-মার্কা গরিবের উন্নয়ন কর্মসূচির সমর্থকদের অভিযোগের একটা উত্তর জগদীশ ভগবতী দিয়েছেন। স্থানাভাবে এই তর্কটা আমি এখন এখানে ব্যাখ্যা করব না। ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইল। ভগবতী কী চোখে নরেন্দ্র মোদিকে দেখছেন সেটা এখনকার জন্য তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ। মোদি ব্যবসায়ের বন্ধু, করপোরেশনের সিদ্ধপুরুষ। তাকে কোম্পানিগুলো চায়- এই সব আমরা জানি। কিন্তু জগদীশ ভগবতীর কাছ থেকে মোদির কথা শোনা আরো মজার।

জগদীশ ভগবতী বলছেন, ১৯৯১ সালে ভারতে উন্নয়ননীতির একটা ‘সংস্কার’ হয়েছে। সেটা ঘটেছিল প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সময়, আর করেছিলেন তখনকার অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং, যিনি এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। জগদীশের ভাষায় সেটা ছিল ‘প্রথম বিপ্লব’। আর এখন নরেন্দ্র মোদির মতায় আসাটা হচ্ছে মোদির নেতৃত্বে ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি’। সমালোচকরা অবশ্য ১৯৯১ সালের সংস্কারকে আইএমএফের চাপে নিউ লিবারেল বা নয়া উদারনীতিবাদী নীতি গ্রহণে ভারতকে বাধ্য করা বলে থাকেন। তাদের সমালোচনাটা না হয় মনে রাখলাম। কারণ কথাটা মিথ্যা নয়। সেটা মনে রেখেও নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে দ্বিপীয় ও বহুপীয় সংস্থা এবং বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর প্রত্যাশা ঠিক কী আর কোনো মাত্রার সেটা বোঝা দরকার। যদি এক কথায় বুঝতে চাই তাহলে জগদীশ ভগবতীর তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন আমাদের কাজে আসে। ভগবতী দাবি করছেন, মোদির নেতৃত্বে ভারতে নয়া উদারনীতিবাদী উন্নয়ননীতির ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ ঘটবার সম্ভাবনা। যদি ভারতের এই নির্বাচনের মর্ম আমরা বুঝতে চাই এবং বাংলাদেশের জন্য দিল্লির প্রতি সঠিক নীতি ও কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি মনে করি তাহলে ঠিক এই দিকটার ওপরই মনোযোগ দিতে হবে। হিন্দুত্ববাদের পরিণতি কী, কিম্বা মুসলমানদের কী হবে, কিম্বা মোদি বিএনপিকে মতায় বসাবে কি না সেই সব তর্ক এই মুহূর্তে নিরর্থক, পরিহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মোদির নেতৃত্বে উপমহাদেশে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের যে দ্রুত রূপান্তর ঘটতে চলেছে সেই দিকে নজর নিবদ্ধ রাখলে অন্যান্য গৌণ প্রশ্নের উত্তরও অচিরেই স্পষ্ট হবে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে নিউ লিবারেল অর্থনৈতিক উন্নয়নের ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এ নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন কী? সেটাই আসল প্রশ্ন। তার সফলতা কিম্বা ব্যর্থতাই আগামি দিনে ভারত শুধু নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে, বারাক ওবামার ভাষায় যার থিয়েটার বা নাট্যশালা এশিয়া। আমরা এর সঙ্গে নতুন কিছু কথা যোগ করতে পারি। বিশেষত এই সত্য যে এই নাট্যশালার সম্ভাব্য গ্রিন রুম বা কলাকুশলীদের অভিনয় প্রস্তুতির স্থান হবে দক্ষিণ এশিয়া। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের ভূমিকা বাড়বে, কমবে না।

ভগবতী স্বীকার করেন মোদির বিরুদ্ধে নীতিবাগিশদের সমালোচনা আছে। এটা তো অস্বীকার করবার কিছু নাই। দুই হাজার দুই সালে গুজরাটের দাঙ্গা হয়েছে আর সেই দাঙ্গায় মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে, এগুলো মোটেও মিথ্যা নয়। কিন্তু ভগবতীসহ হিন্দুত্ববাদী উত্থানের সমর্থকদের বক্তব্য হচ্ছে, এরপর তো আর দাঙ্গা হয় নি এবং মোদি সরাসরি এই দাঙ্গায় যুক্ত ছিল সেটাও সুনিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত হয় নি। এই বিষয়ে মোদির পক্ষে ভগবতীর যুক্তি মোটেও শক্তিশালী না, তবে ভগবতীর ভয় হচ্ছে দাঙ্গার কথা বলে মোদিকে তার প্রতিশ্রুতি পালন থেকে বিচ্যুত করবার লোকের অভাব নাই। ভীতি এই যে এর ফলে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ অসফল হয়ে যেতে পারে।

আসলে ভয়টা অন্যত্র। নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি রা করতে পারবেন কি? হয়তো পারবেন, কিন্তু তার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবেন কি? ভয়টা সেখানেই। এর পরিণতি হবে মারাত্মক। ভারতে দাঙ্গাহাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভারতের সামাজিক ব্যবস্থা নাজুক, অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি না ঘটলে, এবং এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো না গেলে হিন্দুত্ববাদ ভারতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতা ধরে রাখতে পারবে কি না সন্দেহ। হিন্দুত্ববাদের দরকার গতিশীল জাতীয় প্রবৃদ্ধি, কারণ তার আসল উৎপত্তি হিন্দু বা হিন্দু ধর্মের মধ্যে নয়। অর্থনীতির মধ্যে। তার জন্ম পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের কারখানায়। এই দিকটা মনে রাখা দরকার।

বিজেপি মতায় আসবার পেছনে জনগণকে দেওয়া দলটির প্রধান প্রধান প্রতিশ্রুতিকে আমরা তিন ভাবে ভাগ করতে পারি। প্রথমে হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত শাসন। বহুজাতিক করপোরেশন, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থা এবং এনজিওর ভাষায় যার নাম ‘সুশাসন’। দুর্নীতির উচ্ছেদ ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রবাহে স্বচ্ছতা। আমজনতা পার্টি নামে কেজরিওয়াল সুশাসনের আবেগকে ধারণ করে হাতে ঝাড়ু নিয়ে রাজনীতি করতে নেমেছেন। দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরোধিতা নিউ লিবারেল রাজনীতি ও উন্নয়ননীতি থেকে ভিন্ন কিছু নয়। এই রাজনীতি বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কোনো গুণগত রূপান্তর বা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক কোনো সংস্কারের প্রস্তাব করে না। বরং নয়া উদারনীতিবাদী অর্থনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করবারই পক্ষে দাঁড়ায়।

বিনিয়োগকারীরা যে অর্থ বিনিয়োগ করে, সেখান থেকে একটা অংশ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় jক্ষমতাচর্চার ত্রেগুলোতে দুর্নীতির ফলে উধাও হয়ে গিয়ে অল্প কিছু ব্যক্তি বা পরিবারের পকেটে চলে যায় বলেই তাদের আপত্তি। অতএব ঝাড়ু নিয়ে নামো, প্রশাসন ও রাজনীতিকে দুর্নীতিমুক্ত করো। এই স্লোগান শুনতে খুব মধুর লাগে এবং সাময়িক জনপ্রিয়তাও লাভ করে। কিন্তু ভেতরটা ফাঁপা।

বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে বলি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপত্তি যেমন ইউনিলিভার, গ্রামীণ ব্যাংক, বাংলালিংক বা ট্রান্সকম-প্রথম আলোর, ঠিক তেমনি শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও বটে। ঘুষ দিয়ে বা বিনিয়োগের বড় একটা অংশ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের হাতে গচ্চা দিয়ে ব্যবসাকে স্থিতিশীল বিনিয়োগ মনে করে এমন কোনো কোম্পানি খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। পুঁজি একটা বিধিবিধানের মধ্যে বিনিয়োগ ও মুনাফা চায়। অন্য দিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি মনে করে, পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন ও বিদেশি পুঁজির বিনিয়োগের ফলে উন্নয়নের সুফল ঘটছে কিন্তু রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বৃত্তপনার জন্য তারা তার ভাগ পাচ্ছে না। দুর্নীতিবাজদের কারণে তাদের লাভের ভাগে টান পড়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে যারা গরিবের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং শ্রেণিবৈষম্যকে নৈতিক কারণে বিরোধিতা করেন, তারাও উন্নয়নের সুফল অল্প কিছু উচ্চবিত্তের হাতে পুঞ্জীভূত হওয়াকে ভালো চোখে দেখেন না। গরিবের প্রতি দরদে নিজের মহত্ত্ববোধের যে আনন্দ তার মোহে এই অংশের বামপন্থা বা বামপন্থার প্রতি ঝোঁক নৈতিক আস্ফালন ছাড়া বিশেষ কিছু পয়দা করে না। অথচ দরকার পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন ও দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর কাজের ধরন বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য কার্যকর নীতি ও কৌশল প্রণয়ন।

এটা তো পরিষ্কার যে নিউ লিবারেল উন্নয়ন মডেলে বেশির ভাগ মানুষের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটে নি, এর বিরুদ্ধে একটা সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভও রয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ ও অবাধ বাণিজ্যের সুফল পাবার কারণ পুঁজির স্বভাবের মধ্যে না দেখে কিম্বা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে না দেখে একে দুর্নীতির ঝাড়ুদার ও সুশাসনওয়ালারা দেখে দুর্নীতির সমস্যা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক অবক্ষয়ের ফল হিসাবে। এ কারণে দুর্নীতি বিরোধিতার রাজনীতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বৃহৎ একটি অংশের কাছে আদরণীয় হয়ে ওঠে। ভারতে আন্না হাজেরের আন্দোলন ও কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির রাজনৈতিক উত্থানের অর্থনৈতিক মর্মও এখানে। নিউ লিবারেল অর্থনৈতিক মার্গে দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতি ঝাড়ু দিয়ে সাফ করার অধিক কোনো রাজনৈতিক মর্ম ধারণ করে না। বাংলাদেশে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ও নানান কিসিমের সাহায্য সংস্থার দুর্নীতিবিরোধী নীতিবাগীশ তৎপরতা ও সুশাসন কায়েমের ভালোমানুষী চরিত্রও আমরা এভাবেই বিচার করতে পারি। বিশেষ কোনো ফারাক নাই।

দুর্নীতি ও প্রশাসনে স্বচ্ছতার দিক থেকে নরেন্দ্র মোদি পরীক্ষিত। তিনি একটি রাজ্য সরকার ১২ বছর ধরে চালিয়েছেন। আম আদমি পার্টি রাজনীতিতে এসে হইচই ফেলে দিয়েছিল। বাংলাদেশেও অনেকে আম আদমি পার্টি গড়া দরকার দাবি করছেন এখন। এর আগে এরা খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার হাত থেকে নিস্তারের জন্য সেনাসমর্থিত মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীন মার্কা সরকার দিয়ে কোশেশ কম করে নি। এখন দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করার জন্য পুরানা কৌশলের বদলে আন্না হাজারে স্টাইলে কিভাবে দুইজনকে মাইনাস করা যায় সেই রকম জনপ্রিয় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের স্বপ্ন দেখেন। ভারতে আম আদমির আকস্মিৎ উত্থান, কিন্তু লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির তুলনায় চরম পরাজয় এটাই প্রমাণ করে যে দুর্নীতির বিরোধিতা ও প্রশাসনে স্বচ্ছতাই যদি রাজনীতির ইস্যু হয়, তাহলে নরেন্দ্র মোদিকেই ভোটাররা পছন্দ করেছে। তাকেই কেন্দ্রে পাঠানো ঠিক মনে করেছে তারা। তিনিই নিউ লিবারেল ইন্ডিয়ার মসনদের যোগ্য রাজপুরুষ।

মোদি অভিজ্ঞ এবং তার পেছনে আরএসএস ও ভারতীয় জনতা পার্টির মতো সুসংগঠিত দল রয়েছে। সর্বোপরি রয়েছে হিন্দুত্ববাদী আদর্শ যা হিন্দু ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করতে সম। দুর্নীতিই যদি রাজনীতির ইস্যু হয় তাহলে কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির চেয়েও ভারতীয় জনতা পার্টিকে ভারতের জনগণ অধিক উপযুক্ত মনে করার মধ্যে ভুল নাই। বাংলাদেশের জনগণের জন্য এখানে শিক্ষণীয় অনেক কিছুই আছে।

দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি হচ্ছে চাকরি ও অর্থনৈতিক উন্নতি। ভারতীয় তরুণদের বিশাল একটি অংশের কাছে চাকরি পাওয়া ও সচ্ছল জীবনযাপনের আকাক্সা ন্যায়সঙ্গত আকাঙ্খা। নরেন্দ্র মোদি তাদের এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন কি না, ভয়টা এখানেও।

তিন নম্বর প্রতিশ্রুতি প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো। এটা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। যে প্রবৃদ্ধি ১৯৯১ সালের প্রথম বৈপ্লবিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটেছিল, কিন্তু পরে আর ধরে রাখা যায় নি সেই প্রবৃদ্ধির হার নরেন্দ্র মোদি ফিরিয়ে আনতে পারবেন কি? কঠিন কাজ। এ ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলার সময় আসে নি।

পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই যুগে নব্য হিন্দুত্ববাদী ভারতকে বুঝতে হলে ভারতের বাস্তব অবস্থাটাই বোঝা জরুরি। ভারত নতুন করে হিন্দু হচ্ছে না। সব সময়ই হিন্দু ছিল। কিন্তু হিন্দু আর হিন্দুত্ববাদ সমার্থক নয়। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন হিন্দুকে কিভাবে হিন্দুত্বে পরিণত করেছে ও আরো করবে সেই প্রক্রিয়াটা বোঝাই বরং বেশি জরুরি।

হিন্দুত্ববাদ নয়া উদারনৈতিক অর্থব্যবস্থা বা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয়। মোদি ভারতের শুধু নন, নয়া উদারনৈতিক অর্থব্যবস্থার নব্য অবতার তিনি। তাকে সেভাবে বোঝাটাই বেশি জরুরি।

তাকে ‘পূজা’ করা আমাদের সবার কর্তব্য- জগদীশ ভগবতীর লেখা থেকে এই ইঙ্গিত পেয়ে তার কাছে আমাদের কৃতার্থ থাকা উচিত। কারণ মোদি বিপ্লব করতে এসেছেন। অমর্ত্য সেন গোসস্যা করলেও আমাদের কিছুই করার নাই। বরং তাকে জানিয়ে দেওয়া মন্দ নয় যে দিল্লি থেকে কংগ্রেসের অপসারণ বাংলাদেশে আমাদের সাময়িক স্বস্তির কারণ হয়েছে। আর, বামপন্থিদের ভরাডুবিতে আমরা কাতর নই, এটা তাদের প্রাপ্য ছিল।

আমরা ইতিহাসের অধীন, তার অধীনে থেকেই বাংলাদেশের জনগণের সুরার কথা আমাদের বাস্তবসম্মত ভাবে ভাবতে হবে।