হিরা কয়লা ছাই

canvas

জীবনে কখনো কঠোর হতে পারিনি। আজ মনে হয় একটু কঠোর হলে ভারতের এ সর্বনাশ হত না। ভারতের জন্য ওরা দুজন যেমন দায়ী – ঠিক তেমনি আমিও দোষ এড়াতে পারি না। আমার দুটো প্রিয় মানুষ ভারতকে এ অবস্থায় ফেলেছে। মোহনকে আমি বলেছিলাম অহিংসা চালিয়ে যেতে। স্বাধীনতা আরো পঞ্চাশ বছর পর হবে। কিন্তু শেষ দিকে ও কেমন ধৈর্য হারা হয়ে যায়। ডেকে এনে বুঝাই। ইংরেজরা আমাদের শত্রু না। ওদের তাড়ালে স্বাধীনতা আসবে না। শত্রু দেখতে চাইলে তোমার পাঁজর ভাঙ্গতে হবে। শত্রু তোমার মনে। তুমি কিছু মানুষ তৈরি কর। তারপর যখন চাইবে ইংরেজ তারাবে। এখন ভারতকে স্বাধীন করলে ভারতের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।

ওকে বলি পরাধীনতার শক্তির কথা। দেখাই গান্ধারীর দৃষ্টান্ত। গান্ধারী যখন স্বামীর ঘরে এল, দেখে ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ। তার পর ও সারাজীবন কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে রেখেছিল। দেখ তাতে তার চোখে কেমন শক্তি! সে দৃষ্টি কোথাও পরলে তা কেউ ধ্বংস করতে পারবে না। এটা থেকে শিক্ষা নিতে বলি। মোহন তুমি তো জান হীরা হল আসলে কয়লা। প্রচণ্ড চাপে ছিল বলে হীরা হয়ে গেছে। কিন্তু কয়লা যদি বাইরে এমনি রেখে দাও দেখবে ছাই হয়ে উড়ে গেছে। তুমি তোমার অহিংসা দিয়ে কিছু হীরা তৈরি কর। ঈশ্বরকে দেখ, জগদীশ কে দেখ। ভারতের এরকম আরো একশ হীরা চাই। তার পর ইংরেজ তারাও। ভারত তখন পৃথিবীর বুকে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আরেকদিন মোহন এল। ওকে দেখে ভালো লাগে। মুখটি সেদিন ছিল একেবারে প্রশান্ত। ওর ভিতরে আর কোন চাওয়া পাওয়ার অনুভূতি নেই। জীবনটা এমনি হওয়া চাই। কিন্তু কজন পারে। ও যে আমাকে সেদিন এমন কিছু বলতে পারে আজো ভাবতে পারি না। ও সেদিন এসে বলে ও শুধু একটি কৌপীন পরে থাকবে। আমার গলায় স্বর আসে না। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলি

– কেন?

– আমার কিছু লুকানোর নেই। তাই মনে করি ধূতি আমার জন্য বাহুল্য।

– তা বুঝলাম। আমি তোমাকে জানি। তোমার বাহুল্যে প্রয়োজন নেই। কিন্তু মোহন তুমি যে ভারতকে রিপ্রেজেন্ট করো! তোমার কাছে কত লোক দেশ বিদেশ থেকে আসবে। তাদের মাঝে অনেক মহিলাও থাকবে। ওদের সামনে কি ওভাবে যাওয়া ঠিক হবে?

– আমিতো ওদের জন্য করছি না। করছি আমার জন্য। আত্না শুদ্ধির জন্য। আত্না শুদ্ধির জন্য সব ছাড়তে হয়। বাহুল্যে আত্না দিকভ্রষ্ট হয়। সত্য দূরে সরে যায়।

– মোহন এগুলো আমি জানি। তারপরেও তোমাকে সাধারণের দিকটাও দেখতে হবে। তুমি না হয়ে অন্য কেউ হলে আমি কিছু বলতাম না। বৃন্দাবনে অনেকেই আছে যারা গায়ে কিছু রাখে না। ওদের চিন্তা শুধু ওদের আত্না। তোমাকে যে ভারতকে শুদ্ধ করতে হবে!

– তাহলে কি কিরব? বাহুল্য দিয়ে ভারত শুদ্ধি! সেটা কি হবে?

– মোহন! মনটাই সব। তুমি মন থেকে ঝেড়ে ফেল বাহুল্য। আর আমাকে কথা দাও- কখনো ধূতি হাঁটুর উপরে উঠাবে না। উপরে কিছু না রাখ আমি কিছু বলব না।

মোহন কথা রেখেছিল। ও কখনো কৌপীন পড়েনি। দেশ স্বাধীন হবার পর একবারই এসেছিল। এসে কি কান্না, একেবারে শিশুর মত কেঁদেছিল। ও এত মানুষ মারা যাবে ভাবতে পারেনি। এত মানুষের মৃত্যু ও চায়নি। ও হিন্দু বুঝে না, মুসলমান বুঝে না, খ্রিস্টান বুঝে না, …। বুঝত শুধু মানুষ। মানুষের এত কষ্ট দেখে ও বিভ্রান্ত। কষ্ট পায় আমার কথাটা শুনেনি বলে। আমি ওকে বুঝাই। দেশ যখনই স্বাধীন হোক না কেন তখন অনেক মানুষ মরবেই। তফাতটা কি যান? আধপোড়া মানুষ গুলো যারা আর কিছুদিন পরে হীরা হয়ে যেত তাদের এতদিনকার অপ্রাপ্তির আত্না এখন দিক্বিদিক ছুটবে। তারা পাবার নেশায় নিজের মা- ভারতের বুকে কামড় বসাবে। মোহনকে বুঝাই কষ্ট না পেতে। আমি জানতাম ও যাদের সাথে ছিল তাতে ওর পিছনে ফেরা সম্ভব ছিল না। আমি সাদামাটা ভাবে না করতে পছন্দ করিনা। আমার আশা ছিল ওরা নিজেরাই ঠিক করে নিবে। পারেনি, তাই বলে তো ওকে আমি ছেড়ে দিতে পারি না। ভারতকে পেছনে ফেলার আরেকটি বড় ভুল অনেক আগেই করা হয়ে গেছে। করেছে আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ- ঈশ্বর।
ঈশ্বরকে আমি শুধু পছন্দ করতাম না। ওর প্রতি ছিল আমার গভীর ভালোবাসা। একমাত্র ওর প্রতিই ছিল আমার শ্রদ্ধা। বয়সে এত ছোট কিন্তু ওর প্রতি আমার শ্রদ্ধায় সবসময়ই মাথাটা নুয়ে যেত। ওর ছিল একেবারে খাঁটি সোনা। ওর উজ্জ্বলতা ছিল কাঁচা সোনার মত সোনালী। চরিত্রে হীরার মত কঠিন, দৃঢ়। জীবনে শুধু একটি জিনিসই জানত। সত্য। ও কথায় সত্য ছিল। কাজে সত্য ছিল। চিন্তায় সত্য ছিল। কথায়, কাজে, এবং চিন্তায় কোথাও একবিন্দু ফাঁক ছিল না। আর ছিল ওর মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এখানে ওর মনটা ছিল দুধের মত। সত্য মিথ্যা দিয়ে কাউকে বিচার করতে যেত না। সবার প্রতিই সমান ভালোবাসা।

একটা জিনিস আমার মনে অনেক দিন ধরেই কষ্ট দিচ্ছিল। কিন্তু কাকে বলব। সবাই তো আর সমান বুঝে না। যখনই ভাবি কাকে বলব- মনের কোণে ভেসে উঠে সেই সাদা মানুষটির মুখ। কোনভাবেই আর কাউকে ভাবতে পারলাম না। তাই একদিন ওকে ডেকে পাঠাই। ও ডেকেছি শুনে আর দেরী করেনি। কলেজের ক্লাশ ফেলে ছুটে এসেছে। ওকে দেখে ভালো লাগে। ওকে একগ্লাস শরবত বানিয়ে দিলাম। বললাম-

– তুমি এভাবে ছুটে না আসলেও পারতে।

– আপনি ডেকেছেন শুনে আর দাঁড়াতে পারিনি।

– এখন শরবতটা শেষ কর। এর পর কোন ছুটির দিনে চলে আস। কিছু কথা তোমাকে বলতে চাই। একটা কাজ দিব। মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। কাউকে বলতে না পারলে খুব কষ্ট পাব।

ও তখনি বলেছিল ওকে বলতে। বুঝিয়ে বলেছি আরেক দিন আসতে। অনেক সময় লাগবে। সাথে ধৈর্য আর ভালোবাসা। পরের দুটা সবার চেয়ে তোমার বেশী। তোমার সময়টা থাকলে খুব ভালো হত। ও কথা দিল যে করেই হোক ও সময়টা বের করবে। এটা আর বলতে হবে না। আমি জানি ও খাটতে পারে অসুরের মত। পরের সপ্তাহে একদিন সকালে এল। সাথে করে এনেছে ওর গাছের কিছু পাকা আম। আম আমার সবচেয়ে প্রিয়। ওকে বসতে দিলাম। বললাম-

– আমি কিছু কথা বলব তোমাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।

– সেজন্যেই আমি সকাল সকাল চলে এসেছি। আপনি শুধু আমাকে বলেন কি করতে হবে।

– তুমিতো দেখ এদেশে বিধবাদের কি অবস্থা। রামমোহনকে বলেছিলাম ওদেরকে চিতার আগুন থেকে বাঁচাতে। ওর কাজটি ও ঠিকই করেছে। এখন দেখি বিধবারা সারাটা জীবন চিতার আগুনে পুড়ছে।

– কি করব ওরা যে বিধবা!

– এটা বললে তো চলবে না। কিছু একটা করতে হবে। একটি ছোট মেয়ের যখন একটু বুদ্ধি হল তোমরা ওকে বুঝালে ও বিধবা। ও জানেনা বিধবা কি। ওর যখন বিয়ে হয়েছিল ও ছিল শিশু। বিয়ে ও বুঝত না। স্বামীটি মরে গেল। চিতার আগুন দেখে হেসে বলেছিল- কত বড় চুলা! ওকে এখন তোমরা বিধবা বানিয়ে সারা জীবন চিতায় আগুনে পুড়াতে চাও!

– কি করবো, অনেক দিনের বিধি। সমাজ না আসলে যে হবে না।

– তোমাকে একটি কাজ করতে হবে। সেটি হল বিয়ে। সমাজকে পথ দেখাতে হবে তোমাকে। পারবে না।
খুব লজ্জা পেয়ে যায়। বলে

– আজ্ঞে বাড়িতে আমার পরিবার আছে।

– আরে না না। তোমাকে বিয়ে করতে বলিনি। তুমিই বা ক জনকে বিয়ে করবে!

ও লজ্জা ঝেড়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠে।

– আপনি ঠিক বলেছেন। ওদের আবার বিয়ে দিতে হবে। আমি সবাইকে বুঝাব। এটা নিয়ে আর আপনি চিন্তা করবেন না।
আনন্দ লাগে। ঠিক মানুষটি খুঁজে বের করেছি। ওকে বুকে জড়িয়ে ধরি। আমার ভাবনা সেদিনই শেষ। এ নিয়ে আর কাওকে ভাবতে হবে না। ও অনেক সময় ধরে সবার কাছে গেছে। সবাইকে বুঝিয়েছে। সমাজ এসেছিল বাঁধা দিতে। পারেনি। এটা আর কেউ নয়। হিমালয়কে সরানো গেলেও ওকে টলানো যাবে না। নিজের ছেলের সাথে বিধবার বিয়ে দিয়েছে। এইনা হলে মহা মানুষ! এজন্যেই ওর প্রতি আমার শ্রদ্ধা।

অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম ওকে ডেকে এনে ধন্যবাদ দিব। কিন্তু এত বড় কাজে ধন্যবাদ দেয়াটা ছেলেমানুষি মনে হয়। তাই আর ডাকি নি। নিজেই কেন জানি একদিন এল। আমি ওকে সেদিন অনেকক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম। ওর সেই প্রফুল্য মুখখানি! প্রান একেবারে জুড়িয়ে যায়! ও আমাকে বলে একটি কাজ করবে।

– খুব ভালো কথা। তুমি যেই কাজই করোনা কেন আমাকে তোমার পাশে পাবে।

– আমি ভেবেছি মেয়েদের লেখাপড়া করার ব্যাবস্থা করব। ওদেরকে স্কুলে দেবার চেষ্টা করে যাব। ওরা শিক্ষা পেলে ওদের অনেক কষ্ট কমে যাবে।

আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারি না। ও এটা কি বলছে। ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু বুঝতে পারছে না আমার ভিতরে কি হচ্ছে।

– না। তুমি এটা করতে যেয়ো না। ভারতের অনেক সর্বনাশ হয়ে যাবে।

– এটা আপনি কি বলছেন। শিক্ষা জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

– তুমি লেখাপড়া আর শিক্ষাকে এক করে ফেলেছ। দুটা এক না।

– লেখাপড়ার মাঝেই শিক্ষা আসবে।

– সেটা হবার নয়। ভারতের মেয়েদের শিক্ষা দেবার প্রয়োজন নেই। ওরা পৃথিবীতে সবচেয়ে শিক্ষিত। ওদের যে মাতৃত্ব বোধ- তাতে করে জীবনের প্রতি তাদের স্নেহ, মায়া, ভালোবাসা পৃথিবীর আর কোথাও পাবে না। ওরা মানুষ গড়ে। জীবন দাড় করায়। তুমি ওদের ভূমিকাটা আবার ভালো করে খেয়াল করে দেখ।

– ওরা যদি বাইরে আসে- পৃথিবীকে দেখতে পায় তাহলে ওদের শিক্ষা আরো ভালো হবে।

– না ঈশ্বর। তুমি মনে হয় ভারতের মেয়েদের মেম সাহেব বানাতে চাও। বানাও!

এর পর আমি কথা না বলে ওর সামনে একটি ডিম ভাঙ্গি। জিজ্ঞেস করে এই ভাঙ্গা ডিম থেকে একটি সুন্দর ফুটফুটে মুরগীর বাচ্চা বের করতে পারবে কিনা। না বলে। ওকে বুঝাই- ডিমের খোলসটিই ওর শিক্ষা। যখনই এটা ভাঙ্গবে- ওর শিক্ষা শেষ। ঠিক যখনই তুমি বাড়ির মেয়েদের বাইরে আনবে- যত কুশিক্ষা আছে ঘরে ঢুকবে। ভারত ছেয়ে যাবে অনাসৃষ্টিতে। তার পরেও ওকে বুঝাতে পারিনি। বড় একগুঁয়ে ছিল। একবার যা করতে চাইত- তা থেকে সরাবার নয়।
শুনতে পাই মেয়েরা এখন লেখাপড়া করে। বাইরে যায়, চাকরি করে। স্বামীর সাথে ঝগড়া করে। সমাজে নানান অশান্তি। মনে হয় ঈশ্বরকে সেদিন কড়া ভাবে না করলেই পারতাম। খুব কষ্ট হয়, যখন দেখি মেয়েরাও আজকাল গালি দেয়। বাজে বাজে কথা বলে। নিজেকে অন্যকে কাউকে বাদ দেয় না (বিশ্বাস না হলে সংসদ ভবনে যেয়ে একবার বসে দেখ)। খুব কষ্ট!