সংসদের ভাষা এবং স্পিকারের মেরুদণ্ড

Serajur Rahman ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর কর্মসূচি প্রতি বুধবার দুপুর ১২টা থেকে আধা ঘণ্টা। প্রধানমন্ত্রী কয়েক মিনিট বিরোধী দলের নেতার প্রশ্নের জবাব দেন। এরপর সাধারণ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে মূলত নিজ নিজ নির্বাচনকেন্দ্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি নিয়ে প্রশ্ন করেন। এ রীতি চলে আসছে সনাতনী কাল থেকে। ব্রিটিশ সংসদীয় গণতন্ত্রের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ইদানীং পিএমকিউ নামে পরিচিত এই গণতান্ত্রিক রীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। মূল কারণ, এ অনুষ্ঠানের বিতর্ক নিয়ে অতি মাত্রায় উত্তাপ সৃষ্টি। স্পিকার জন বেরকো প্রতি বুধবারই প্রথমে সদস্যদের কণ্ঠ নিচু ও মাথা ঠাণ্ডা রাখার অনুরোধ করছেন। ক্রমেই তাকে কণ্ঠস্বর উঁচু থেকে আরো উঁচু করে ‘অর্ডার! অর্ডার! বলে চিৎকার করতে হচ্ছে। সম্প্রতি দুয়েকজন সদস্যের নামও উচ্চারণ করেছেন তিনি। কোনো সদস্যের আচরণ সংসদীয় রীতিপদ্ধতির অথবা সৌজন্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে স্পিকার তার নাম উচ্চারণ করেন। ওই সদস্যকে তখন সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। পরে সংসদীয় শৃঙ্খলা কমিটি সে সদস্যকে কয়েকটি অধিবেশন থেকে বহিষ্কারও করতে পারে।

অথচ বুদ্ধিমানেরা বুঝতে পারেন এবং মিডিয়ায়ও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ সবই কৃত্রিম উত্তেজনা। এরা এটাকে বলে থাকেন ‘প্লেয়িং টু দ্য গ্যালারি’ অথবা লোকদেখানো। কারণটাও স্পষ্ট। যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচন হবে আসছে বছরের মে মাসে। স্মরণীয় কালের মধ্যেই এ নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ অবশ্যই এই যে, অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশের মতো ব্রিটেনও বিগত প্রায় এক দশক ধরে দারুণ অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভুগছিল। সরকারের কঠোর ব্যয়সঙ্কোচ নীতির ফলে লাখ লাখ লোক বেকার হয়েছে, মাইনে-মজুরি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের অর্থকষ্ট চরমে উঠেছিল। কিন্তু চলতি বছরে লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ব্রিটেন এখন সঙ্কটের তীব্রতা কাটিয়ে উঠেছে, অন্যান্য ধনী দেশের তুলনায় এর প্রবৃদ্ধি বেশি উৎসাহব্যঞ্জক। বড় দলগুলো আশা করছে, এ সময় গদি পেলে এরা নিজ নিজ কর্মসূচি সহজে বাস্তবায়ন করতে পারবে।

প্রধান দু’টি দল লেবার ও রক্ষণশীল (টোরি) বাদ দিয়ে তৃতীয় দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটেরা (লিবডেম) দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে ছিল। কিন্তু তাদের উদার ও প্রগতিশীল নীতি আদর্শবান জ্ঞানী-গুণীদের প্রশংসিত ছিল। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ব্যাপারে এরা সব সময়ই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু অনেককে হতাশ ও হতবাক করে দিয়ে ২০১০ সালের নির্বাচনের পর এরা একক বৃহত্তম দল টোরিদের সাথে কোয়ালিশন করে সরকার গঠন করে। শরিক দল টোরিদের সাথে লিবডেমদের প্রধান আদর্শিক গরমিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যাপারে। বহু টোরি পার্লামেন্ট সদস্য মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ব্রিটেনের সম্পর্ক হবে মূলত অভিন্ন বাণিজ্যের বাজার হিসেবে। ইইউ’র সামাজিক আইনগুলোর ব্যাপারে বহু টোরির প্রবল আপত্তি আছে। দলের ‘ব্যাক-বেঞ্চারদের’ সাথে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, আসছে বছরের নির্বাচনের পর সরকার গঠন করতে পারলে তিনি ইইউ সম্বন্ধে গণভোট করবেন।

এ দিকে ইউকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (ইউকিপ) নামে ক্ষুদ্র একটি দল (পার্লামেন্টে তাদের একটিও আসন নেই) ইইউ’র সদস্য থাকা-না-থাকা নিয়েই গণভোট করার আন্দোলন করছে। তা ছাড়া এরা বহিরাগমন বন্ধের জন্য আইন চায়। তাদের প্রভাবে টোরিদের ইইউ-বিরোধী অংশ সাধারণ নির্বাচনের আগেই গণভোটের দাবিতে মুখর হয়ে উঠেছে। এই ধরনের খুবই তরল পরিস্থিতিতে দলগুলো এবং সংসদ সদস্যরাও ভোটারদের মনে রেখাপাত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর আসরকে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছেন। পিএমকিউতে উত্তেজনার এটা হচ্ছে বড় কারণ। কয়েকজন সিনিয়র মহিলা সদস্য ইদানীং পিএমকিউ বর্জন করছেন। এরা বলছেন, হৈ-হট্টগোল আর চেঁচামেচিতে তাদের মাথা ধরে যায়, এরা বিরক্ত বোধ করেন। স্পিকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পিএমকিউতে হট্টগোল সম্বন্ধে তিনি আরোকঠোর হবেন।

ভাষার পবিত্রতা লঙ্ঘিত হচ্ছে না
লক্ষণীয়, এত চেঁচামেচি ও হট্টগোল সত্ত্বেও পার্লামেন্টে ভাষা ব্যবহারে সদস্যরা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন না। সাম্প্রতিক এক পিএমকিউতে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বোধ হয় একটু বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। প্রশ্নোত্তর পর্বের এক স্থানে তিনি বেফাঁসে ‘ইডিয়ট’ (ডাহা মূর্খ) শব্দটি ব্যবহার করে ফেলেছিলেন। কিন্তু কথাটা স্পিকারের কান এড়ায়নি। শব্দটি প্রত্যাহার করে নিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বাধ্য করেন।

রানী রাশমনির সাথে রইশ্যার নানীর তুলনা অবশ্যই হাস্যকর। কিন্তু রইশ্যার নানীকে কেউ যদি রানীর গদিতে বসাতে চায় তাহলে তুলনা করতেই হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে যারা গদিতে আছেন গণতন্ত্র-গণতন্ত্র বলে এরা মুখে ফেনা তোলেন, ভারতীয় অভিভাবকদের সমর্থনের জোরে এরা নিজেদের বৈধ সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার বলে জাহির করার চেষ্টা করেন। সুতরাং অন্তত সংসদে এদের কথাবার্তা ও আচরণ নিয়ে চুলচেরা বিচার করার অধিকার সবারই আছে। প্রবীণ মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ (সাবেক মুজিব বাহিনীর সদস্য এবং রক্ষীবাহিনীর অধিনায়ক, যে রক্ষীবাহিনীর ইতিহাস বহু রাজনৈতিক কর্মীর রক্তে রঞ্জিত) দিনকয় আগে বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক রহমানকে ‘আহাম্মক’ প্রভৃতি কয়েকটি অশালীন এবং অরুচিকর বিশেষণে ভূষিত করেছেন। লক্ষ করার বিষয়, আহাম্মক এবং ডাহা মূর্খ কথা দু’টি মোটামুটি সমার্থক এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্পিকারের রায় অনুযায়ী পার্লামেন্টে অগ্রহণযোগ্য।

তারেক রহমান সম্প্রতি দু’টি দাবি করে আওয়ামী লীগ নেতাদের লেজে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন বলা চলে। তার প্রথম বিতর্কিত দাবি হচ্ছে শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। দ্বিতীয় দাবিটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে রূপান্তরের কোনো আইনগত ভিত্তি ছিল না। এ দু’টি দাবির সপক্ষে তিনি বিশিষ্টজনদের উক্তি ও রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ লোক শহীদ হয়েছেন বলে দাবি করে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বেকায়দায় পড়েছিলেন। সে দাবির সমর্থনে কোনো প্রমাণ এরা দিতে পারেননি। তারেক রহমানের দাবি দু’টি সম্বন্ধে গদিতে আসীন ব্যক্তিদের অতিমাত্রিক স্পর্শকাতরতার এটাও একটা কারণ।

প্রমাণ যাচ্ছে কার বিরুদ্ধে?
প্রকৃত পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করে দেখা যাক। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা শুরু হতেই আওয়ামী লীগ নেতারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারত সরকারের অতিথি হন। শেখ মুজিব নিজেই তাদের ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৭ এপ্রিল কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা মেহেরপুরের এক আমবাগানে দাঁড়িয়ে একটা ‘নির্বাসিত বাংলাদেশ সরকারের’ ঘোষণা দেন। সে ঘোষণায় শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী (ভারপ্রাপ্ত) রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী বলে উল্লেখ করা হয়। সে আমবাগানটি এখনো ‘মুজিবনগর’ নামে খ্যাত। লক্ষণীয়, সাড়ে তিন বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান পদে আসীন থাকলেও মুজিব কখনো মুজিবনগরে পদধূলি দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।

মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন ২৬ মার্চ তারিখে। সে ঘোষণা মুজিব ২৫ মার্চ মাঝরাতের আগেই গ্রেফতার হওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছিলেন বলে কোনো প্রমাণ নেই। বতর্মানে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা কর্নেল অলি আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, জিয়ার ওই ঘোষণার সময় তিনি সেখানে উপস্থি’ত ছিলেন। অন্তত নীতিগতভাবে হলেও রাষ্ট্রের একজন রাষ্ট্রপতি থাকা প্রয়োজন। তারেক রহমান কিছু প্রমাণ উপস্থিত করেছেন যে, মেজর জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণার সময় নিজেকে রাষ্ট্রপতি বলে উল্লেখ করেছিলেন। জিয়ার একজন সহসেনা কর্মকর্তা ছিলেন মোহাম্মদ সফিউল্লাহ। ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। বিদ্রোহী অফিসারেরা তার বাড়ি আক্রমণ করলে শেখ মুজিব তার কাছেই সাহায্য চেয়েছিলেন। সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহ তখন মুজিবকে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কী আশ্চর্য! সফিউল্লাহ এখনো সরকার ও আওয়ামী লীগের প্রিয় ব্যক্তি। তিনিও বিগত ক’দিনে বলেছেন যে, মেজর জিয়াউর রহমান প্রকৃতই নিজেকে রাষ্ট্রপতি বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।
মুজিবনগরের ঘোষণা অনুযায়ী শেখ মুজিব ছিলেন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করার আগে মন্ত্রিসভা কিংবা সংসদের অনুমোদন তিনি নিয়েছিলেন বলে কোনো প্রমাণ নেই। বরং প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে শারমিন আহমেদ তার সর্বসাম্প্রতিক বইতে বলেছেন, তার মুজিব কাকু তার পিতাকে কানে কানে বলেছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চান। তার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে গেলেন। মুজিবের জনপ্রিয়তা তখন এতই তুঙ্গে ছিল যে, তার উক্তি কিংবা কাজ সম্বন্ধে প্রশ্ন করার সাহস কারোই ছিল না। কিন্তু তাই বলে বলা যাবে না যে, তার পদবি পরিবর্তন বৈধ ছিল।

মুজিবের ইমেজ এবং শেখ হাসিনা
অনেকেই যথার্থ বলেছেন এবং লিখেছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ফেরেশতা ছিলেন না। আর আর মানুষের মতো তারও কিছু ভুলত্রুটি থাকা স্বাভাবিক ছিল। স্বাধীনতার আন্দোলনে তার নেতৃত্বের কথা বিবেচনা করে এতকাল সেসব ভুলত্রুটি নিয়ে কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাননি। কিন্তু চুলকিয়ে ক্ষত সৃষ্টি করা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিশেষ প্রতিভা। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনীতির একমাত্র মূলধন তার বাবার নাম। বাবার কথা ও কাজকে অমোঘ সত্য এবং ত্রুটিহীন প্রমাণ করার জন্য তিনি এমন আপসবিহীনভাবে উঠেপড়ে লেগে যান যে, প্রায় ভুলে যাওয়া অতীত ইতিহাসের কিছু ঘটনা উল্লেখ না করে উপায় থাকে না। আমি প্রায়ই ভেবেছি এবং বন্ধুবান্ধবদেরও বলেছি যে, শেখ মুজিবুর রহমানের ইমেজের প্রধান শত্রু তার মেয়ে শেখ হাসিনা।

তারেক রহমানকে বরাবরই আওয়ামী লীগের ভীষণ ভয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে তার সাংগঠনিক প্রতিভার প্রমাণ জুজুর মতো সব সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের তাড়া করে বেড়ায়। বিগত কিছু দিনে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, হাছান মাহমুদ, হাসানুল হক ইনু, কামরুল ইসলাম প্রমুখ মন্ত্রী তারেক সম্বন্ধে যেসব অশোভন উক্তি করেছেন দেশ-বিদেশে বিবেকবান মানুষ তাতে ছি ছি করছেন। ছোটবেলা থেকে জ্ঞানী-গুণীদের মুখে শুনে এসেছি মেরুদণ্ডহীন মানুষ যখন যুক্তিতর্কে হেরে যায় তখনই তারা অশোভন গালিগালাজ শুরু করে দেয়। উপরোল্লিখিত মন্ত্রীদের সম্বন্ধে মানুষ কী ভাবছে আপনারাই বুঝে নিন।

বাংলাদেশের সংবিধান ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টের আদলে প্রণীত। যেসব দেশে এ পদ্ধতি চালু আছে (ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ক্যানাডা প্রভৃতি) এরা ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টের আইনকানুন ও নজির মেনে চলে। সংসদের পবিত্রতা রক্ষায় এসব দেশে স্পিকারেরা সযত্নে অসংসদীয় ভাষা পরিহারের চেষ্টা করেন। কিন্তু বিগত সোয়া পাঁচ বছরে বাংলাদেশ সংসদে যেসব অসংসদীয় ও অশোভন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে সংসদের আসবাব এবং দেয়ালও পুঁতিগন্ধময় হয়ে রয়েছে বলে আমার মনে হয়।

দু’জন স্পিকার এ সময়ে সংসদের নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রক ছিলেন। এরা হচ্ছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও শারমিন চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় সংসদে বহু অমার্জিত ও অশালীন গালিগালাজ করেছেন। কোনো স্পিকার কি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্পিকার জন বেরকোর মতো তাকে কোনো উক্তি প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেছেন? প্রধানমন্ত্রী কেন, কোনো মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্যকে তারা তিরস্কার করেছেন অশালীন উক্তি করার জন্য? মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ যে তারেক রহমানকে ‘আহাম্মক’ বলে গালি দিলেন, স্পিকার কি তাকে সেটা প্রত্যাহার করতে বলেছেন? নিশ্চয়ই বলেননি।

কারণটাও কারো অজানা নয়। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, স্পিকার এরা কেউই জনসাধারণের ভোটে কিংবা নিজ গুণে এসব পদে বহাল হননি। এসব পদ এরা পেয়েছেন শেখ হাসিনার অনুগ্রহে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করার জন্যই মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা প্রতিযোগিতা করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অশালীন গালিগালাজ করেন। মেরুদণ্ডে জোর নেই বলেই স্পিকার প্রতিকার করতে সাহস পান না। নিজের শক্তিতে নয়, পরের অনুগ্রহে যারা উচ্চ পদ পান তাদের মেরুদণ্ড সব সময়ই দুর্বল হয়। প্রভুর কথা কিংবা কাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস তাদের থাকে না। প্রধানমন্ত্রীর নিজের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। দেশের মানুষের ভোটের জোরে নয়, দিল্লির প্রভুদের অনুগ্রহে তিনি গদি দখল করে আছেন। দিল্লির সরকার ১৯৭৪ সালের সীমান্ত সহজীকরণ চুক্তি কার্যকর করছে না, তিন বিঘা করিডোরটি বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করছে না। নদীর পানির ন্যায্য অংশ তারা বাংলাদেশকে দিচ্ছে না। কথা দিয়েও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে তারা সই করছে না। তাদের এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার সাহস এ সরকারের নেই। বরং বাংলাদেশের মানুষ যখন পানির দাবিতে লংমার্চ করে, মন্ত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হন। তাদের হুমকি দেন। ভারত বিশ্বের চোখে বিব্রত হতে পারে সে ভয়েই এরা কাতর। সাময়িকভাবে হলেও তিস্তায় কিছু পানি পেতে হলে বিএনপিকে লংমার্চ করতে হয়।