সাধারণ নির্বাচন: ভারতে ও বাংলাদেশে

Serajur Rahman
ইংরেজ প্রায় দুই শ’ বছর তার ভারতীয় সাম্রাজ্য শাসন করেছে। ভারতবর্ষ সম্বন্ধে প্রায় সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ কিছু ইংরেজ কর্মকর্তা বহু অনুগ্রহভোগী ভারতীয়ের সাহায্যে এই বিশাল দেশের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে। প্রথমে কলকাতায় এবং পরে দিল্লিতে বসে ব্রিটিশের একজন ভাইসরয় এই বিশাল প্রশাসক বাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছেন। দেশ শাসনের ব্যাপারে কথা বলার অধিকার ভারতীয়দের ছিল না।

ব্রিটিশের নিজের দেশে কিন্তু এই গোটা সময়জুড়ে গণতান্ত্রিক শাসন প্রচলিত ছিল। দেশের মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টে বসে আইন প্রণয়ন করেছেন, নীতিনির্ধারণ করেছেন। ইংরেজেরই কল্যাণে এবং তাদের সাম্রাজ্য প্রশাসনের প্রয়োজনে ভাগ্যবান কিছু ভারতবাসী উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে এসেছিলেন। গণতান্ত্রিক শাসন এবং উন্নত মানবাধিকারের সে চিত্র মনে ও মস্তিষ্কে ধারণ করে তারা স্বদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন থেকেই ভারতবাসীর চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল সংসদীয় গণতন্ত্র, পার্লামেন্ট ও নির্বাচন। কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আরো দীর্ঘকাল তাদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে।

সে ধৈর্যের বাঁধ মজবুত করার কৌশল হিসেবে ১৯৩৫ সালে প্রদেশে এবং তৃণমূলে নির্বাচন চালু করেছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। তাতে বরং উল্টো ফল ফলেছে। ভারতীয়দের গণতন্ত্রের পিপাসা তাদের স্বাধীনতার দাবির সাথে সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। যেটা সাধারণ বুদ্ধি এবং মানবধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক সেটা কিছুতেই চিরদিন টিকে থাকতে পারে না। ইংরেজ সাম্রাজ্যেরও অবসান হয়েছে। অপরিমেয় রক্তপাত এবং অসীম দুর্ভোগের মধ্যে বিভক্ত আকারে হলেও ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে। বিভক্ত উপমহাদেশের বৃহত্তর অংশ বর্তমান ভারত গণতন্ত্র আর নির্বাচিত সরকারের সে শুকতারার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়নি। স্বাধীনতার ৬৭ বছর পরেও মোটামুটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই শাসিত হয়ে আসছে ভারত। মোটামুটি বলছি এ কারণে যে মাঝে ১৯৭৫ থেকে দুই বছর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করে গণতন্ত্রকে বালির বাঁধ দিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ভারতবাসী সে জন্য তাকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছে। ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভারতের জনতা মিসেস গান্ধী ও তার কংগ্রেস দলকে বেধড়ক মার দিয়েছিল।

কিন্তু ইংরেজের কাছ থেকে ভারত গণতন্ত্রের সুফসলের সাথে সাথে উপনিবেশবাদের বিষবৃক্ষের বীজও লুফে নিয়েছিল। কাশ্মির ও জুনাগড়ের স্বাধীনতা ভারত তার স্বাধীন জন্মলগ্নের প্রায় সূচনা থেকেই ছিনিয়ে নিয়েছিল। আরো পরে হায়দরাবাদ, গোয়া ও সিকিমকেও গ্রাস করেছে ভারত। এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর ওপর তার লোলুপদৃষ্টি কিছুতেই চাপা থাকছে না। তাদের সম্পূর্ণ কুক্ষিগত করতে না পারলেও শোষণ দোহন ও পদদলিত করে রাখাই গান্ধী-নেহরুর সময় থেকেই স্বাধীন ভারতের প্রয়াস। কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তানের সাথে তার তিন তিনটি ঘোষিত যুদ্ধ হয়েছে। অঘোষিত যুদ্ধ তো বলতে গেলে লেগেই আছে। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মানুষ ভারতকে বন্ধু ভাবতে পারে না, ভাবে না। ভারতের দিক থেকে বিপদের আশঙ্কায় সদাই উৎকণ্ঠিত থাকে তারা।

গরু মেরে জুতা দান
আর বাংলাদেশ? আমাদের বর্তমান সরকার যেন দিল্লির পালিত সন্তান। ভারতের দয়ায় গদিতে আছেন এবং ভারতের সেবা ও ইচ্ছা পূরণের জন্যে তারা সব সময় উন্মুখ। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন আর চেষ্টা করেও ভারতকে বন্ধু ভাবতে পারছে না। অঢেল ইয়াবা আর ফেনসিডিল বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে ভারত। তার বেশি আর কী দিয়েছে গত সোয়া পাঁচ বছরে? আর যা নিয়েছে তার তালিকা সুদীর্ঘ। বাংলাদেশকে দিল্লি সরকার বাড়ির পেছনের বাগানের মতোই দেখছে এখন। যখন যা প্রয়োজন বেগুন, কাঁচা লঙ্কা ইত্যাদি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যে (সাত বোন) অবাধে পণ্য সৈন্য ও যুদ্ধাস্ত্র পাঠানোর অধিকার আদায় করে নিয়েছে ভারত। সে জন্য বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও নদীগুলো ভারতের অবাধ ব্যবহারের জন্য খুলে দিয়েছে সরকার। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ভারতকে অবাধ ব্যবহারের অধিকার দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা ঝুঁকিগ্রস্ত করে দিয়েছে।

এখন আবার (শোষণ করে) সাত বোন থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে যাওয়া হবে মূল ভারতে। বিশাল বিশাল পাইলনগুলো তৈরিতে বাংলাদেশের হাজার হাজার একর উর্বর কৃষিজমি বিরাণ হয়ে যাবে। অথচ বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতি দেশ। জমির স্বল্পতা এ দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটা। বাংলাদেশকে টোপ দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ পরিবহনের এই মহাসড়ক তৈরি হলে তাকে এক শ’ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দেয়া হবে। কিন্তু যে কথাটা বলা হচ্ছে না সেটা এই যে সাত বোনে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে অভিন্ন নদীগুলোতে আরো বহু বাঁধ তৈরি করে, যেসব নদীর পানির ন্যায্য অংশ বাংলাদেশের পাওনা। ভারতের প্রস্তাবিত বাঁধগুলো এবং মধ্য ভারতে নদীর পানি নিয়ে যাওয়ার সংযোগ খালটি তৈরি হয়ে গেলে বাংলাদেশের সবগুলো নদীরই তিস্তার মতো করুণ দুর্দশা হবে। গরু মেরে জুতা দানের এর চেয়ে মোক্ষম দৃষ্টান্ত আর কোথাও পাওয়া যাবে না।

কিন্তু আসলেও কী প্রতিশ্রুত পরিমাণ বিদ্যুৎ পাবে বাংলাদেশ? ভরসা করবেন কী করে? ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী কি ছিটমহল বিনিময় চুক্তি করেননি শেখ মুজিবের সাথে? মুজিব তো প্রায় সাথে সাথে সংবিধান সংশোধন করেছিলেন, বেরুবাড়ী ছিটমহলটি তুলে দিয়েছিলেন ভারতের হাতে। সেটা ৪০ বছর আগের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ কি আজো পেয়েছে তিনবিঘা ছিটমহলটি? প্রায় তিন বছর আগে ভারত বলেছিল তিস্তা নদীর পানি বাটোয়ারার চুক্তি করবে বাংলাদেশের সাথে। সে চুক্তিতে সই করবেন বলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকঢোল পিটিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন।

চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের করুণ ইতিহাস
কিন্তু এখন কী বলছে ভারত? দৃশ্যমান ভবিষ্যতে তিস্তা চুক্তি ও ছিটমহল হস্তান্তরের কোনো সম্ভাবনা নেই। এতগুলো যে বাঁধ তৈরি হচ্ছে এবং সংযোগ খাল কেটে যে পানি মধ্য ভারতের মরুভূমিতে নিয়ে যাওয়া হবে, তার পর আর বাটোয়ারা করার মতো পানি তিস্তায় আসবে কোত্থেকে? শেখ হাসিনা স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সাথে চুক্তি করেছিলেন ১৯৯৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর ফারাক্কায় গঙ্গার পানি বণ্টন সম্বন্ধে, সে চুক্তি অনুযায়ী পানি কি বাংলাদেশ এক বছরও পেয়েছে? তাহলে কী করে আমরা ধরে নেবো যে আমাদের হাজার হাজার একর উর্বর চাষের জমি নষ্ট করে ভারতের পাইলন তৈরি হওয়ার পর প্রতিশ্রুত পরিমাণ বিদ্যুৎ বাংলাদেশ পাবে? তাকে বিশ্বাস করার মতো কোনো নজির কি ভারত সৃষ্টি করেছে কখনো?

ভারতে এখন সাধারণ নির্বাচন চলছে। বাংলাদেশে কেউ কেউ প্রত্যাশা নিয়ে এ নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে। ভারতের মানুষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ নিচ্ছে। ৮০ কোটির বেশি মানুষ ভোটার তালিকাভুক্ত। এ যাবৎ যা দেখা যাচ্ছে খুবই উঁচু হারে ভোট পড়ছে। এবং একটা উৎসবের পরিবেশ বিরাজ করছে গোটা ভারতজুড়ে। ভারতের নির্বাচন কমিশন সাধারণত দক্ষ ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে। এবারো এ যাবৎ তার কোনো ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতিকদের বেসামাল বক্তৃতা-বিবৃতি সম্বন্ধে কঠোর মনোভাব নিয়েছে কমিশন। ভারতে অনেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে পশ্চিমবঙ্গের ভিন্ন মানুষ বলে বর্ণনা করে থাকে। মমতা নির্বাচন নিয়ে কিছু ঘাড়-ত্যাড়ামি দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কমিশনের দৃঢ়তার কাছে তাকে হার মানতে হয়েছে।

প্রায় সব ভারতীয় জনমত সমীক্ষাই বলছে যে কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির বিরাট জয় হবে এ নির্বাচনে এবং আরো কট্টর নরেন্দ্র মোদি নেহরু গান্ধী পরিবারের বংশধর রাহুল গান্ধীকে হারিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। বাংলাদেশের মতো ভারতের সংবিধানেরও একটা স্তম্ভ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু বর্তমান নির্বাচনে বিজেপির এবং নরেন্দ্র মোদির দাপট প্রমাণ করছে যে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে সেকুলারিজম সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে শিবসেনা ও সঙ্ঘপরিবার প্রভৃতি বিজেপির কোনো কোনো অঙ্গ দল গোটা ভারতকে শুধু হিন্দুদের বাসভূমি বলে ঘোষণা করেছে। ১৯৯২ সালে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙায় বিজেপির শীর্ষ নেতারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বর্তমান নির্বাচনেও জয়ী হলে বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর রাম মন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বিজেপি নেতারা। ভারতের সব মানুষকে তারা হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করতে চায়। মুসলমানদের তারা ভারতের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। এই একবিংশ শতকেও বিজেপি বহু খ্রিষ্টানকে হত্যা করেছে।

নরম পন্থা নির্বাচনী কৌশল হতে পারে
নরেন্দ্র মোদি ২০০১ সালে পশ্চিম ভারতের গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন। পরের বছর হিন্দু তীর্থযাত্রী বোঝাই ট্রেনের একটি বগিতে আগুন লেগে ৫৯ জন যাত্রী মারা যান। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মুসলমানেরাই ট্রেনে আগুন লাগিয়েছিল। সেই যে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা শুরু হয় সে দাঙ্গা কয়েক দিন ধরে চলেছিল। মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার দাঙ্গা দমনের পরিবর্তে সে দাঙ্গায় উৎসাহ দিয়েছিলেন বলে বহু অভিযোগ আছে। শত শত মুসলিম ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। দুই হাজারেরও বেশি মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল সে দাঙ্গায়। পরে অবশ্যি প্রমাণিত হয়েছে যে তীর্থযাত্রীরা শীত থেকে পরিত্রাণের জন্য ট্রেনের বগিতে আগুন জ্বালিয়েছিল, আর সে আগুনই গোটা বগিকে গ্রাস করে ফেলে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি কিংবা বিজেপি সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করেননি, জানমালের ক্ষতির জন্য মুসলমানদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মোদির বিরুদ্ধে মামলা করেন। কিন্তু প্রমাণাভাবে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি। আইন সম্বন্ধে যাদের সামান্যতম ধারণাও আছে তারা অবশ্যই জানে প্রমাণের অভাব মোটেও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দোষ প্রমাণিত করে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কয়েক বছর ধরে মোদিকে অবাঞ্ছিত করে রেখেছিল। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা মোদির সাথে যোগাযোগের পথ খুলে দিয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন এখনো তাকে ভিসা না দেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেনি। নির্বাচনকে সামনে রেখে মোদিকে নতুন ইমেজ দেয়ার অভিযান শুরু হয়েছে। তাকে উদার মনোভাবাপন্ন হিসেবে দেখানোর প্রচুর চেষ্টা চলছে। সাংবাদিক এম জে আকবর ও বলিউডের কোনো কোনো উচ্চাভিলাষী মুসলিম অভিনেতার মতো কিছু লোক বিজেপিকে সমর্থন দিচ্ছে। মোদি নিজেও কিছু কিছু নরম ও মধ্যপন্থী কথাবার্তা বলছেন। কিন্তু ‘পুনর্মূষিক ভবঃ’ কাহিনীটা ভুলে গেলে চলবে না।

হিন্দু পুরাকাহিনীতে আছে, ইঁদুর ফরিয়াদ নিয়ে মুণির কাছে গিয়েছিল : বেড়ালের ভয়ে সে সদাই আতঙ্কিত। মুণির দয়া হলো। ইঁদুরকে তিনি বেড়াল করে দিলেন। নতুন ফরিয়াদ : এখন তাকে উত্ত্যক্ত করছে কুকুর। মুণির কৃপায় বেড়াল কুকুর হয়ে গেল। আরো পরে সে কুকুরকে বাঘ করে দিলেন মুণি। এবারে বাঘ মুণিকেই খেতে উদ্যত হলো। মুণি তখন বললেন, যাও, আবার তুমি ইঁদুর হয়ে যাও। গদির লোভে বাংলাদেশ সরকার গণতন্ত্র এবং আদর্শের বুলি কপচান। কিন্তু কাজের বেলায় সেসব সব সময়ই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, এ সরকার গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। গদি পেলে নরেন্দ্র মোদি যে আবারো উগ্রচণ্ডী মূর্তিতে ফিরে যাবেন না, কে বলতে পারে?

অদৃষ্টের পরিহাসের অট্টহাসি
জনমতের সমীক্ষা যে সব সময় সত্যি হবে এমন কোনো কথা নেই। সত্যি যদি হয় তাহলে বলতেই হবে যে বাংলাদেশের অভিশাপ লেগেছে ভারতের বর্তমান শাসকদের ওপর। এক শ’-দেড় শ’ বছর আগের ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের মতো নিজ দেশে তারা গণতন্ত্রের চর্চা করেছে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যাতে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে না পারে, যাতে তারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সরকার পেতে না পারে, সে জন্য সব রকমের চেষ্টাই করেছে দিল্লির বর্তমান সরকার। অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে তারা বাংলাদেশের সব অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছে। বিশেষ করে নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ সরকারকে গদিতে বহাল রাখার জন্যে এক হাজার কোটি রুপি ব্যয় করেছে ভারত সরকার। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই এ সরকারের অধীনে নির্বাচনের সক্রিয় বিরোধিতা করেছে। তারা নির্বাচন বর্জন করেছে।

কিন্তু ষড়যন্ত্র করে এবং দেশের ভোটদাতাদের গরিষ্ঠ অংশকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে নির্বাচনের আগেই গরিষ্ঠসংখ্যক আসনে শাসক দলকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। অবশিষ্ট আসনগুলোর জন্য যেখানে আদৌ ভোট পড়েনি বলা চলে সেখানেও সরকারের নির্দেশমতো ৩৯ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ছয় পর্বের উপজেলা নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বের পরেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছুটি নিয়ে আমেরিকায় যান। নির্বাচনে অজস্র দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ হয়েছে কিন্তু কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিএনপি এবং ১৯ দলের নেত্রীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বিবৃতি দিয়ে কমিশনের নতজানু ভূমিকার প্রমাণ দিয়ে দিলেন। এই নির্বাচনকে বৈধ বলে জাহির করার জন্য ভারত সরকারের কূটনেতিক তৎপরতা রীতিমতো ন্যক্কারজনক না বলে উপায় নেই।
কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি দল যদি সত্যি সত্যি জয়ী হয় এবং নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হন তাহলে অদৃষ্টের পরিহাসের অট্টহাসিতে আকাশ-পাতাল প্রকম্পিত হবে। কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের ইসলাম ও ধর্মীয় রাজনীতি বিরোধী ক্রুসেডের পেছনে দিল্লিতে তাদের প্রভুদের তাগিদ একটা বড় কারণ ছিল। মনমোহন সিং নিজেই প্রকারান্তরে বলেছেন সে কথা। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মানুষকে ভারতের প্রতি বৈরী করে তুলছে।

ইসলামি সন্ত্রাস দলনের নামে সরকার বাংলাদেশের জাতীয় জীবনকে খণ্ডিত-বিখণ্ডিত ও রক্তাক্ত করে দিয়েছেন। বাংলাদেশে ভারতের দালালরা জামায়াত এবং সাধারণভাবেই ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগের তাতে অনীহা নেই। আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে রাজনীতিকেই নিষিদ্ধ করেছিলো, আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়েছিল সে সময়। বর্তমান নির্বাচনে যদি হিন্দু দল বিজেপির কাছে মনমোহন সিং ও তার সরকারের পরাজয় হয় তাহলে সেটা বাংলাদেশের ইসলাম-বিরোধীদের গালে প্রচণ্ড এক চপেটাঘাতের মতোই হবে।

বাংলাদেশ নীতি পরিবর্তিত হবে কি?
নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারতের বাংলাদেশ নীতি পরিবর্তিত হবে বলে যারা আশা করে বসে আছেন তাদের হতাশ হতেই হবে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া প্রমুখ বড় দেশের বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে থাকে। কিন্তু সেসব নীতিনির্ধারণ করে থাকেন গোয়েন্দাদের রাজনৈতিক প্রভুরা। এ ব্যাপারে ভারত বিরাট একটা ব্যতিক্রম। দক্ষিণ এশিয়ায় তার পররাষ্ট্রনীতি রাজনীতিক ও কূটনীতিকেরা প্রণয়ন করেন না, সে নীতিনির্ধারণ করে ভারতের বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যা-অ্যানালিসিস উইং (র)। সে কারণেই ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরন বলেছেন যে, নির্বাচনী ফলাফল যাই হোক দিল্লির বাংলাদেশ নীতি পরিবর্তিত হবে না। সরকার পরিবর্তন হলেই যে র-এর নীতি পরিবর্তন হবে, এমন কোনো কথা নেই। তবে নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক শক্তির উৎস গুজরাট। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বর্তমানে প্রবাসী গুজরাটিরা খুবই প্রভাবশালী। ভারতের গুজরাটি ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের স্বার্থের খাতিরে ইউরোপ-আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক মোদিকে স্থাপন করতে হবে।

বিগত তিন-চার বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্কে গুরুতর অবনতি হয়েছে। বহু কারণের মধ্যে একটা হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন সম্বন্ধে মনোভাব। সম্ভবত রাশিয়া ছাড়া আর কোনো শিল্পোন্নত দেশ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে না। সে নির্বাচনে এবং পরবর্তীকালে দিল্লির ভূমিকায় তারা বিরক্ত। এসব দেশ এখন চায় যে সংলাপের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের উপায় উদ্ভাবন করে বাংলাদেশে নিকট ভবিষ্যতেই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। ওয়াশিংটনকে খুশি করার জন্য সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি এই প্রস্তাবে রাজি হন তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিরাট একটা কল্যাণ হবে। মি. মোদি কিংবা অন্য যে কেউ নির্বাচনোত্তর প্রধানমন্ত্রী হন তিনি জেনে রাখলে ভালো করবেন যে গণবিরোধী আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ভারত যেসব গোপন চুক্তি করেছে বাংলাদেশের মানুষ কোনো দিন সেসব চুক্তি সহ্য করবে না। সুযোগ পেলে এসব চুক্তি বাস্তবায়নে তারা বাধা দেবেই। ইতোমধ্যে এসব চুক্তির কারণে বাংলাদেশের মানুষ ক্রোধে ফুঁসছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে কতগুলো অসম চুক্তি ও অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতের হস্তক্ষেপের কারণে। ধর্মীয় রাজনীতি মোটেই সে জন্য দায়ী নয়। ভারত যদি আদৌ বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক চায় তাহলে সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিদের সাথে তাকে সমঝোতায় আসতেই হবে।

লন্ডন, ১৬.০৪.১৪

লেখক: বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান