১২ বছর ক্রীতদাস এবং আমরা

mina farah মিডিয়ার অধিকার হরণ
যারাই আমার মতো টিভির পর্দায় হীরে-জহরতে মোড়ানো বিস্ময়কর অস্কার রজনীটি উপভোগ করেছেন, নিশ্চয়ই একমত হবেন, বর্ণবাদের প-বিপ থাকলে, চেতনা নিয়ে কলঙ্কিত হওয়ার প্রশ্ন উঠলে, ফিল্ম-টিভি-বই নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির হুমকি থাকলে সবার আগে নিষিদ্ধ হতো ‘১২ বছর ক্রীতদাস’ নামের ছবিটি। তা না হয়ে বরং শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পেল, যা প্যালেস্টাইনকে ইসরাইলের স্বীকৃতি দেয়ার মতোই অবিশ্বাস্য। তাহলে স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর পক্ষ বিপক্ষ সৃষ্টি করে আমরা কেন রক্তারক্তিতে লিপ্ত, ১৬ কোটি মানুষের একজনেরও ব্যাখ্যা করার যোগ্যতা থাকলে এত দিনে জানতাম। ৯/১১ বনাম তালেবান, জায়ন বনাম মুসলমান, বিহারি বনাম বাংলাদেশী… প্রজন্মকে ১০০ ভাগ ইতিহাসের বদলে বাটিতে গুলিয়ে বেছে বেছে ইতিহাস খাওয়ালে জ্ঞানের ভাণ্ডার অর্ধেকই খালি থাকবে। ভালো না মন্দ, সত্য না মিথ্যা যাচাইয়ের অধিকার রাষ্ট্র নয়, বরং মানুষের। জোর করে কাউকে ইতিহাস থেকে দূরে রাখা আর হত্যার পরিকল্পনা নৈতিক অর্থে সমান অপরাধ।

তিনটি অস্কারসহ শ্রেষ্ঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘১২ বছর ক্রীতদাস’ নিয়ে দেশের প্রায় সব ক’টি পত্রিকাতেই খবর হলেও ছবিটির বিষয়বস্তু হয়তো অনেকেই জানেন না। ছবিটি আমি দু’বার দেখেছি। পশ্চিমা মিডিয়ার অভিমত হলো, কাহিনী অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ছবির বিষয়বস্তু হলোÑ ১৮৪১ সালে নায়ক সলোমন নামের গুম হয়ে যাওয়া এক বেহালাবাদকের ১২ বছরের ক্রীতদাস জীবন নিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের নির্মম নির্যাতনের একটি বাস্তব কাহিনী, যা মৃত্যুর আগে সলোমন নিজেই লিখে গেছেন। দাসপ্রথার নির্মম অত্যাচারের কিছুটা জানি। তবে ছবিতে পৈশাচিক নির্যাতন যেভাবে দেখানো হলো, শ্বেতাঙ্গদের জন্য চরম অপমান সত্ত্বেও ছবিগুলো এরাই তৈরি করে; কিন্তু বর্ণবাদী বনাম বর্ণবাদবিরোধী নামে পক্ষ বিপক্ষরে সুযোগ নেই। আফ্রিকা থেকে গুম ও ছিনতাই করে আনা দাস ব্যবসায়ীরা গরু-ছাগলের মতো খোলাবাজারে কেনাবেচা ছাড়াও ধর্ষণের জন্য কালো নারীদের আলাদা স্টকের নির্মম দৃশ্যগুলো বড়ই করুণ। কোনো রকম অনুকম্পা ছাড়াই সন্তান, বাবা-মাকে আলাদা বিক্রি করে দিত শ্বেতাঙ্গরা। বর্ণবিরোধী এমন কোনো নিষ্ঠুরতাই নেই ছবিতে যা দেখানো হয়নি। অবাক যেÑ বইপুস্তক, গবেষণা, ফিল্মে রেড ইন্ডিয়ান ও কালোদের ওপর নির্যাতনের তথ্যগুলো প্রচার করে কিন্তু শ্বেতাঙ্গরাই। এমনকি জাতির পিতা জর্জ ওয়াশিংটনের ক্রীতদাস রাখা নিয়েও নিন্দার ঝড়, শিা কারিকুলামেও এসব ইতিহাস অবিকৃত। জানি না ব্রাহ্মণদের মতো উচ্চ গোত্র হয়েও কৃষ্ণাঙ্গদের এই অপমান কী করে সহ্য করে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগুরুরা! ফেব্র“য়ারি সরকারিভাবে স্বীকৃত কালো ইতিহাসের মাস, দাসপ্রথা বিরোধী নানান কার্যক্রমে শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত মিডিয়াও পিছিয়ে নেই। যা বলতে চাইছি, এ দেশেও বাংলাদেশের মতো ‘চেতনা’ নামে কিছু থাকলে ছবিটি অবশ্যই নিষিদ্ধ হতো। তার মানে কি মার্কিন সরকারের উচিত ছিল ছবিটি নিষিদ্ধ করা? না, এতে স্বাধীনতার ইতিহাস যেমন কলঙ্কিত হয়নি, তেমনি জাতির পিতা জর্জ ওয়াশিংটনেরও সম্মান যায়নি; কিন্তু বিপে গেলেই বাংলাদেশীদের জাতির পিতা আর মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে সাথে সাথে শরীরে এক কড়াই গরম তেল পড়ার বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক। এদের দাপটে আকাশ কাঁপে। কথায় কথায় বই, ছবি, গবেষণা, মিডিয়া নিষিদ্ধ এখন ধর্মগ্রন্থের মতো নিয়মই হয়ে গেছে। মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে পাঁচ বছর রেকর্ড ভেঙেছে আগের ১৮ বছরের। কথায় কথায় নিষিদ্ধ, বহিষ্কার, কারাগার, ক্রসফায়ার। অথচ ‘১২ বছর ক্রীতদাস’, ‘বাটলার’, ‘রুটস’-এর মতো দাসপ্রথাবিরোধী উত্তপ্ত ছবিগুলো শ্বেতাঙ্গদেরই তৈরি, ওরাই অস্কার দেয়। তাহলে ‘মেহেরজান’ নিষিদ্ধ বা মিডিয়া বন্ধ কোন দাসপ্রথার আলামত! মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ বছর আগে সক্রেটিসকে প্রাণদণ্ড দেয়া হলেও ২১শ’ শতাব্দীতে আমাদের দেশে সেই বর্বরতা! আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই পর পর বন্ধ হয়ে চলেছে মুক্তচিন্তার মাধ্যম, প্রতিবাদীরা অন্তরীণ, শত শত মিডিয়াকর্মী মানবেতর জীবনের মুখোমুখি, খড়গহস্ত ও হুঁশিয়ারির রেকর্ড। জার্মান শাসকও দেশটাকে ইউরোপের সবচেয়ে উন্নত করার পদপে হিসেবে ইহুদিমুক্ত জার্মানি চেয়েছিল, যা ১৮ দলীয় জোট বিলুপ্ত করার সমান্তরালে। আমাদের মতো ফেসবুকে স্ট্যাটাস নয়, বরং বাস্তবেই তথ্যপ্রযুক্তিতে এত উন্নতি করেছিল, আমেরিকার আগেই অ্যাটম বোমা তৈরি করা শেষ; কিন্তু তারপরও মতায় চিরস্থায়ী হয়নি হিটলার। যা বলতে চাইছি, মুক্তিযুদ্ধে দু’টি পরিবার কোথায় ছিল বিষয়টি আজো পরিষ্কার না হওয়ায় একপীয় অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য। গণতন্ত্রের নিয়ম হলো শুধু গোয়েন্দারাই হাঁড়ির খবর জানবে না, বরং ভোটারদেরকেও রাজনীতিবিদদের হাঁড়ির খবর জানতে হবে। এমনকি ২০১২ সালে ওবামার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে জন্মসনদ প্রকাশে বাধ্য করল ওবামাবিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা। জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কুর্ট ওয়ার্ল্ডহেইম যে নাৎসি কর্মী ছিলেন, ফাঁস হওয়া মাত্র অপসারণ। মাইকেল মুর, অলিভার স্টোনের মতো অ্যাক্টিভিস্টরা ক্রমাগত সরকারের বিরুদ্ধে ছবি করছে, বই লিখছে, যার অন্যতম ‘ফারেনহাইট ৯/১১’, ‘ওবামা জাম্বি’, ‘শয়তান বুশ’ ইত্যাদি; কিন্তু ফারেনহাইট ৯/১১-এর মতো বুশবিরোধী ছবির জন্য মাইকেল মুরকে কি আমেরিকা থেকে বের করে দিয়া হয়েছিল? ছবি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল? বরং বুশের আমলেই অস্কার পায় ‘ফারেনহাইট ৯/১১’। যা বলতে চাইছি, গ্লোবাল ভিলেজে বাস করেও প্রাগৈতিহাসিক সরকারের শিকার আমরা। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে না এলে তথ্যহীনতায় অন্ধ হবে মানুষ। মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক অ্যানরেন্ড বলেছেন, ‘মনকে সব সময় ভালো চিন্তা দিয়ে ব্যস্ত রাখবে, এমনকি যখন দাঁত ব্রাশ করবে, মাথা আঁচড়াবে কিংবা বাসে বসে থাকবে।’ আমাদের রাজনীতিবিদেরা তাদের অন্ধ-অম চিন্তা দিয়ে দখলে রেখেছেন ১৬ কোটি মানুষের মন, ব্যস্ত রেখেছেন প-বিপরে মারণাস্ত্র দিয়ে। সুলতান, মোগল, ব্রিটিশ, কংগ্রেস ও পাকিস্তানিদের পর ’৭১ থেকে বুদ্ধিবৃত্তির ওপর যে খড়গহস্ত, তাতে করে বুদ্ধিবৃত্তির ধ্বংসযজ্ঞ চলতে পারে আগামী ১০০ বছর ধরে হিরোশিমার পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়ার মতো ধীরে কিন্তু নিশ্চিত।

মুক্তিযুদ্ধে দুটো পরিবার
’৭১ নিয়ে কারো কথাই আর বিশ্বাসযোগ্য নয়। দুই পই নিজেদের মতো করে ’৭১-এর গল্প ফাঁদে। পাঠ্যপুস্তকে কেউ ভাসানীকে অন্তর্ভুক্ত করে, কেউ কেটে ফেলে। কেউ ওসমানীকে হিরো বলে, কেউ নামটি উচ্চারণে বাধা দেয়। সংবিধান সংশোধন করে নিজেদের মতো করে জমিদারি সাজায়। এদের হাতে রক্তমাংস হারানো ’৭১-এর কঙ্কালে এখন চেতনা বা গণতন্ত্র কোনোটাই নেই। লেখাটি পড়ে বিএনপিপন্থীরা খুশি হবেন যে, এবার পেয়েছি! খালেদা ক্যান্টনমেন্টে থাকলে, তোমরা কোথায় ছিলে! আমি খালেদা-হাসিনা কারো কথাই বিশ্বাস করি না, বরং নিজস্ব গবেষণা এবং তথ্যপ্রমাণ আছে। প্রাথমিক স্কুলের শিক মোমিনুল স্যার শিখিয়েছেন, ‘চিলে কান নিলো কি না আগে হাত দিয়া কান পরীা করো, পাগলের পিছনে দৌড়াইলে পথ হারাইয়া নিজেই পাগল হইয়া যাইবে এবং মানুষ তখন তোমাকেই পাগল ভাবিয়া হাততালি দিবে।’ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা যেন ঠিক তাই। এ কথা বোঝার জন্য ‘রকেট সায়েন্টিস্ট’ হতে হবে না যে, ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও ৯ মাসে দু’টি পরিবারের কারো গায়েই কাঁটার আঁচড়টি লাগেনি, বরং ঢাকাতেই ছিলেন। আমরা জানি, ২৬ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইটে’ ঢাকায় কী পরিমাণ রক্তপাত হয়েছিল। দেশজুড়ে ধ্বংসের মহোৎসবের পরও এই ব্যতিক্রমের গভীরে না গিয়ে বরং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ টকশো অ্যাক্টিভিস্টরা। মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের (বিশেষ করে হিন্দুরা) জন্য এসব প্রশ্ন তোলা এখন ধর্মগ্রন্থের মতো মহান। এডওয়ার্ড স্লোডেন আর জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জদের যুগে চাইলেও এখন আর স্বৈরাচারের মল ঢেকে রাখা যাচ্ছে না, বরং যেসব দুর্গন্ধ ভুরভুর করে বেরিয়ে আসছে, চেতনাবাদীদের সজাগ হওয়ার যথেষ্ট কারণ। রাজনীতিবিদেরা ধরাকে সরাজ্ঞান করলেও নিউটনের কথা, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া সমান।

ভাস্কর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইটির মুজিববাদী লেখক কী বলছেন! ’৭১-এ এই পরিবারও নাকি ঢাকাতেই কুশলে ছিলেন। তার মানে, অন্যদের খুন করেও দুই বেগমের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে পাকিস্তানিরাই। তৃতীয় বেগমের পরিবার তখন পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। অত্যন্ত দুঃখজনক, এত দিন হাসিনার গালিগালাজে শুধু ক্যান্টনমেন্টের খালেদার কথাই জেনেছি, এবার মুজিবপন্থী লেখকের বই থেকে জানলাম মুক্তিযুদ্ধে এই পরিবারের অজানা কথা।

সত্য হলো যে যাই বলুক, ’৭১-এর সবচেয়ে বড় ভিকটিম সংখ্যালঘুরা। সবচেয়ে বড় কৃতিত্বের দাবিদারও। এদের দুর্ভাগ্যই পশ্চিমের মিডিয়াগুলোকে ধাক্কা দিয়েছে। এরাই পাকিস্তানিদের টার্গেট হয়ে বারবার কুকুরের মতো মরেছে। ২৪ বছরে দুটো কাশ্মির যুদ্ধের পর ’৭১-এর যুদ্ধ যেহেতু পাকিস্তান ভাঙার পক্ষ-বিপক্ষ তাই হিন্দুস্তানের দুর্গন্ধ গায়ে হিন্দুরাই ওদের প্রধান টার্গেট ছিল। যেহেতু পরিসংখ্যান নেই তারপরও বলা যায়, ’৭১-এর শহীদ, অত্যাচারিত ও ধর্ষিতা মূলত সংখ্যালঘুরাই। এক কোটি শরণার্থীর ৯৯.৯৯ ভাগই সংখ্যালঘু। ‘জাত’ চিহ্নিত করার জন্য পাকসেনার হাতে লুঙ্গি খোলা রিকশাওয়ালার বিখ্যাত ছবিটি একাই একটি মিউজিয়াম। দেশ বিভাগের সময় থেকে দফায় দফায় রায়ট আর যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত এরাই বাড়িয়েছে অর্পিত সম্পত্তির পরিমাণ এবং জন্ম দিয়েছে লাখ লাখ কোটিপতির। অল্প সময়ের ব্যবধানে সংখ্যালঘুদের ওপর এমন বীভৎস নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। ’৪৭, ’৪৮, ’৫০, ’৬৪, ’৬৫, ’৭১, ’৯২, ২০১৪… বারবার দাঙ্গা-যুদ্ধের আগে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি ৬৭ বছরেও কেউ আমলে নেয়নি, বরং বলির পাঁঠার গলায় দড়ি দিয়ে দুই পই খুনোখুনিতে লিপ্ত হওয়ায় একই মানবেতর পরিস্থিতির শিকার সংখ্যালঘুরা। সংখ্যায় কমতে কমতে ৬৭ বছর পর ৪২ থেকে এখন ৯ ভাগ। পার্থক্য হলো, ’৪৮ এবং ’৬৫-এর কাশ্মির দখল যুদ্ধে দেশ ছাড়ার হিড়িক আর ’৭১-এ পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধে খুনের হিড়িক।’ ড. মিজানুর রহমান যথার্থই বললেন, ‘থাকলে ভোট, না থাকলে জমি।’ আমি বলব, ভোটের আগে আগুন লাগাও, পরেও আগুন। সংখ্যালঘুদের ভোট পায় আওয়ামী লীগই বেশি; কিন্তু ভোটপরবর্তী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে মন্দির ভাঙচুরের জন্য প্যারাসিটামল মাখানো ‘চেক’ বিতরণের রাজনীতিতে একেবারেই উলঙ্গ এরা যা-তা। ভূরি ভূরি প্রমাণ সত্ত্বেও শুধু হিন্দু নেতৃত্বের অভাবে হেইটক্রাইমগুলো বারবারই বদলে দিয়ে আওয়ামী কর্মীরা দোষ চাপায় জজ মিয়াদের ওপর। সাম্প্রতিককালে বৌদ্ধবিহারের জঘন্য ঘটনায় আবারো প্রমাণ হলো ১২ বছরের ক্রীতদাস ‘সলোমনের’ মতো সংখ্যালঘুদেরও কত সস্তায় কেনা যায়, আবার বেচাও যায়। যা বলতে চাইছি, ইংরেজদের বিলুপ্ত ক্রীতদাস প্রথা এখন বাংলাদেশে, টার্গেট বিশেষ করে হিন্দুরাই। যারাই বিশ্বজিৎ হত্যাকে এখনো ক্রীতদাস সলোমনের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখছে না, তাদের অস্তিত্ব অবশ্যই বিলুপ্ত হবে।

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইটি সিরাজউদ্দিন আহমেদের লেখা, যিনি স্বাধীনতার পর বরগুনার প্রশাসক। আমার বিতর্কের উৎপত্তি এই বই থেকেই। ঘোর আওয়ামীপন্থী, ’৭৫-এর ১৫ আগস্টে বরগুনায় তার নির্দেশে রবিাহিনী রাস্তায় নামে এবং নিজে অস্ত্র হাতে হত্যার প্রতিবাদ জানান। তার বই থেকেই তথ্য “…শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, ড. ওয়াজেদ ধানমন্ডির ১৮ নম্বরে চলে যান, গোলাগুলির মধ্যে শেখ কামাল দেয়াল টপকে পালিয়ে যান। …একদিন ড. ওয়াজেদ আসন্ন প্রসবা শেখ হাসিনাকে নিয়ে বেগম মুজিবের বাসায় চলে আসেন। ড. ওয়াজেদ নিয়মিত অফিসে যাচ্ছেন। বেগম মুজিবের নির্দেশে মোমিনুল হক, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বাসায় যান। বেগম মানিক মিয়া ধানমন্ডির বাসায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে নিয়ে থাকতেন। আর্মি একদিন আনোয়ার হোসেনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তিনি ফিরে এসেছেন। তিনি জানালেন যে, সেনাবাহিনী শেখ পরিবারকে খুঁজছে। আনোয়ার হোসেন ও তার মা বেগম মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন এবং মোমিনুল হককে আর্মির সাথে দেখা করতে বলেন। একদিন আনোয়ার হোসেন তাকে বাসায় সংবাদ দেন। মোমিনুল হক তার বাসায় পৌঁছে দেখেন জেনারেল ওমর বসে আছেন। ওমর বেগম মুজিবকে সরাসরি পশ্চিম পাকিস্তানে বা সেনানিবাসে থাকার প্রস্তাব দেন। শেখ পরিবারকে সেনাবাহিনীর প্রহরায় থাকতে হবে; কিন্তু বেগম মুজিব বাংলা ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যাবেন না। জেনারেল ওমর ও মোমিনুল হক ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কে একটি বাড়ি ঠিক করে দেন এবং সে বাড়িতে বেগম মুজিব ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকবেন। বেগম মুজিব যখন দেখলেন আর্মি তাদের সন্ধান পেয়েছে, তখন পালিয়ে বাঁচা যাবে না। বেগম মুজিব মানিক মিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। তাদের বাসায় গিয়ে দেখেন জেনারেল ওমর বসে আছেন। তিনি বেগম মুজিবকে সম্মান দেখালেন। বেগম মুজিব তার ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে গেলেন, এক কাপড়ে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন। ওমর ওই দিনই ইসলামাবাদে চলে যান… জেনারেল ওমরকে চেকবই দিলেন এবং শেখ মুজিবের লেটার অব অথরিটি নিয়ে আসার জন্য বললেন। এমনি সময় দুটো জিপভর্তি পাকসেনা বাসার চার পাশে পজিশন নেয়। তারা বাসার সকলকে ডাকে। মেজর জানায় এভাবে তাদের অরতি থাকা ঠিক নয়, তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে। বেগম মুজিবসহ সকলকে ধানমন্ডি ১৮ নম্বর সড়কে নিয়ে যায় এবং পাহারার ব্যবস্থা করে। অন্তরীণ অবস্থায় আর্মির হুকুম ব্যতীত কোথাও যাওয়া যায় না। বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়া পাকসেনারা পুড়িয়ে ফেলেছে। ঘরে আগুন দেয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতাকে বাইরে নিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধুর বাবা-মা আগুনের তাপে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডা: নূরুল ইসলামের সাহায্যে শেখ লুৎফর রহমানের মাতা সায়েরা খাতুনকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেখ হাসিনার শরীর খারাপ হয়ে পড়ে, তাকেও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বেগম মুজিব তার কন্যার সন্তান প্রসবের সময় হাসপাতালে থাকতে চাইলেন; কিন্তু মেজর রাজি হয়নি। একজন আয়াকে থাকার অনুমতি দেয়। বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন লিলি আয়া সেজে হাসিনার কাছে থাকেন। ২৯ জুলাই শেখ হাসিনা পুত্রসন্তান লাভ করেন। কয়েক দিন পর তিনি ১৮ নম্বর ধানমন্ডি চলে আসেন। একদিন কৌশলে বেগম মুজিব পিজি হাসপাতালে শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখতে যান। শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছে তার সংবাদ মুজিবের নিকট পৌঁছে যায়। শেখ জামাল মনস্থির করলেন তিনিও মুক্তিযুদ্ধে যাবেন। সেনাবাহিনী জামালের পলায়নের বিষয়টি নিয়ে ভীষণ হৈচৈ শুরু করে। ইঞ্জিনিয়ার মইনুল ইসলাম শুনে মইনুল হককে বলেন যে, শেখ পরিবারের উপর নির্যাতন শুরু হবে। এবং তিনি বেগম মুজিবকে রাও ফরমান আলীর সাথে দেখা করতে বলেন। এক অবাঙালির সহায়তায় সাাতের অনুমতি পাওয়া যায়। ড. ওয়াজেদ তার শাশুড়িকে নিয়ে রাও ফরমান আলীর সাথে দেখা করার পর তাদের উপর চাপ কমে যায়…।”

তথ্য বিশ্লেষণ
“তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে। …বেগম মুজিবসহ সকলকে ১৮ নম্বর সড়কে নিয়ে যায় এবং পাহারার ব্যবস্থা করে। …ঘরে আগুন দেয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতাকে বাইরে নিয়ে আসে। …শেখ হাসিনার শরীর খারাপ হয়ে যায়, তাকেও ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। …বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন লিলি আয়া সেজে হাসিনার সঙ্গে থাকেন। …২৯ জুলাই শেখ হাসিনা পুত্রসন্তান লাভ করেন। …ড. ওয়াজেদ তার শাশুড়িকে নিয়ে রাও ফরমান আলীর সাথে দেখা করার পর তাদের উপর চাপ কমে যায়…, একদিন কৌশলে বেগম মুজিব হাসপাতালে শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখতে যান।” এ বিষয়ে ব্যক্তিগত মতামত গোপন হলেও বৃহত্তর স্বার্থে কথাগুলো বিশ্বাস করব কি না! রাও ফরমান আলীর সাথে দেখা করার পর যদি তাদের ওপর সত্যিই চাপ কমে গিয়ে থাকে কিংবা হাসিনার শরীর খারাপ হলে অপারেশন সার্চলাইটের মতো পৈশাচিক ঘটনা ঘটা ঢাকা নগরীতেই যদি তাকে হাসপাতালে নিয়ে প্রসবের ব্যবস্থা করে থাকে পাকসেনারা, বেগম মুজিব সদ্যপ্রসূত নাতিকে দেখতে যাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে এই ব্যতিক্রম থেকে ‘অ্যাক্টিভিস্টদের’ কী শিণীয়! অন্য অর্থে, ঢাকার পরিস্থিতি কি তখন অন্যদের জন্য সমান নিরাপদ ছিল! দু’টি পরিবারের প্রতি তাদের মহানুভবতার পাশাপাশি মূলত সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ আর এক কোটি শরণার্থী মোটেও মুক্তিযুদ্ধের শেষ কথা নয়, বরং যতই দিন যাচ্ছে ’৭১-এর অন্ধকার যেন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

যা বলতে চাইছি, এসব প্রশ্ন সংখ্যালঘুরাই তুলবে, কারণ ’৭১-এর ১ নম্বর ক্ষতিগ্রস্ত তারাই। ঘরে আগুন দেয়ার আগে মুজিবের বাবা-মাকে বের হতে দেয়ার মতো মহানুভবতার প্রশংসা করি, একই সাথে সংখ্যালঘুদের ওপর ন্যূনতম করুণা না দেখিয়ে বরং এই পর্যায়ের হত্যাযজ্ঞের জন্য সন্দেহ, সে দিন কবে আসবে যে দিন জানতে পারব মুক্তিযুদ্ধের আসল রহস্য। রাও ফরমান আলীর সাথে মুজিব পরিবারের যোগাযোগের বিষয়টি সুখবর নয়, বরং উইকিলিক্স আর স্নোডেনের যুগে তথ্য অধিকার সবার। তাদের ফাঁস করা তথ্যের ওপর সামাজিক মাধ্যমে ঝড় উঠলে উল্টো তৃতীয়পরে ওপর এভাবে খড়গ অপারেশন যেকোনো নিরপে সুপ্রিম কোর্টই প্রত্যাখ্যান করবে। এ ছাড়া এটা সক্রেটিসের রোম নয় যে, যা খুশি করে পার পেতে থাকবে স্বৈরশাসকেরা। আর ক্যান্টনমেন্টের নামে খালেদাকে একতরফা দোষারোপ করতে থাকলে স্নোডেনদের মতো অ্যাক্টিভিস্টদের কারণে মুক্তিযুদ্ধে একটি বিশেষ পরিবারের অজানা তথ্য আরো দুর্গন্ধ ছড়াবে।

সার্ক স্বৈরাচার ও দাসপ্রথার প্রত্যাবর্তন
অস্কারপ্রাপ্ত ‘১২ বছর ক্রীতদাস’ ছবিটি থেকে এটাই শিণীয়, শাসকশ্রেণীর সাদাকে কালো, কালোকে সাদা বলার প্রবণতা দুঃখজনক এবং অবিলম্বে মৌলিক অধিকার নিশ্চিতসহ বন্ধ করতে হবে সব ক্রসফায়ার ও মিডিয়া নির্যাতন। ১৮১১ সালে লুইজিয়ানার কুখ্যাত ‘ক্রীতদাস বিদ্রোহ’ একটি অভাবনীয় ঘটনা হওয়ায় বর্ণবাদী যুদ্ধের রেফারেন্সটি বহু ব্যবহৃত। একে কেন্দ্র করে আব্রাহাম লিংকন যদিও ১৮৬৫ সালে দাসপ্রথা বন্ধের আইন করেছিলেন; কিন্তু শ্বেতাঙ্গদের মনোভাবের পরিবর্তন না হওয়ার কারণেই ১৯৫৩ সালে অ্যালাবামা অঙ্গরাজ্যে রোজাপার্কের বাস বর্জনের ঘটনা থেকে সিভিল রাইটস অ্যাক্টের সূত্রপাত। তবে ড. কিংয়ের আন্দোলনের কারণে ১৯৬৪ সালে পাস হওয়া সিভিল রাইটস আইনের সুফল কৃষ্ণাঙ্গ নয়, বরং অধিক ভোগ করছে সার্কভুক্ত স্বৈরাচারী দেশগুলোর প্রবাসীরাই। বলতে চাইছি, ভৌগোলিকতার সুযোগে একত্র হয়ে নিজেদের জন্য মতার সর্বোচ্চ পাহাড় বানানো সার্কভুক্ত অত্যাচারী স্বৈরশাসকেরা গণতন্ত্রের নামে নব্য দাসপ্রথার জন্ম দিয়েছে। হিটলারবাদীরা যার যার দেশের পরিস্থিতি এমন দুর্বিষহ করেছে যে, এখনো বেশির ভাগ মানুষের ইতর জীবন, দেশে কোনো কাজ নেই, জমিজমা নেই, জীবনের নিশ্চয়তা নেই। ফলে বিদেশে ভাগ্য খুঁজে নিয়ে এরাই কোটি কোটি প্রবাসী শ্রমিক, এলিয়েন, আনডকুমেন্টেড ওয়ার্কার। ভাগ্যবানদের অনেকেই পশ্চিমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে বিত্তশালী হচ্ছে। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মূলত শিপজাম্পার মুসলমানেরা রণশীল আমেরিকায় এলেও ধরা পড়ার ভয়ে বরং মেক্সিকান বা কালোদেরকে বিয়ে করে ভাগ্য বদলের সুযোগ করে নিত। সে অন্য ইতিহাস। যা বলতে চাইছি, ২৫০ বছরের সংগ্রাম শেষে মূলত কালোদের জন্য পাস হওয়া সিভিল রাইটস অ্যাক্টের সর্বাধিক সুফলভোগী বাংলাদেশীরা আজ যে পর্যায়ের ভাগ্যবান হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তুলনামূলকভাবে স্বদেশে মৌলিক অধিকার হারিয়ে তারাই এখন ক্রীতদাস জীবনের সম্মুখীন। তবু সব জেনে-শুনেও প্রতিবাদহীন এরা। ফলে অতীতের শ্বেতাঙ্গদের মতো দারুণ অত্যাচারী হয়ে উঠেছে সার্ক শাসকগোষ্ঠী। কেউই হয়তো ল করেনি, ক্রীতদাস সলোমনের কাহিনী পশ্চিমে শেষ হলেও সঙ্ঘবদ্ধ মাফিয়াদের মতো একাত্ম এরা সার্ক ভূখণ্ডে নব্য দাসপ্রথার জন্ম দিয়েছে। নীতিনৈতিকতাহীন এরাই সৃষ্টি করেছে পক্ষ বিপক্ষ নামের দু’টি মারমুখী গোষ্ঠী, যেন ওদের কলহের সুযোগে এরা আজন্ম মতায় থাকতে পারে। মাফিয়ারা যখন সঙ্ঘবদ্ধ হয়, এফবিআই পর্যন্ত নাস্তানাবুদ। অর্থাৎ সার্কের একাধিক শাসকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার মামলা হলেও এদের দাপটে ওয়াশিংটন পর্যন্ত নখদন্তহীন বাঘের মতো গর্জন পর্যন্ত শেষ। স্বৈরাচারীরা মিলে এমন দুর্গ সৃষ্টি করেছে, যেখানে জাঁদরেল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পর্যন্ত সার্কদের কাছে দুর্বল। এসব অত্যাচারীর ক্রমিক নম্বর পর পর আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল ও ভুটান। অর্থাৎ ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস সনদ হত্যা করে মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে এরা। অ্যাক্টিভিস্টরা এখনই সক্রিয় না হলে এই ভূখণ্ডে দাসপ্রথা দীর্ঘস্থায়ী হবে।

farahmina@gmail.com