দেশে দেশে মাতৃত্ব আর সন্তান জন্মের আচার-সংস্কার

আবহমানকাল ধরে বিশ্বের নানান দেশে নানান সংস্কৃতিতে মা হওয়া আর সন্তান জন্মদানকে ঘিরে পালিত হয়ে আসছে নানা ব্রত, নানা আচার-অনুষ্ঠান, নতুন মাকে উপহার দেওয়ার বিচিত্র রীতি-নীতি। বিশ্বায়নের এই যুগে এসে আমরা বৈচিত্র্যময় নানান সংস্কৃতি থেকে মানব জন্মের এই চিরায়ত সুন্দরের কথা জানতে পারি, শিখতে পারি। একই সঙ্গে আমরা জেনে নিতে পারি এ বিষয়ে নানা সংস্কার ও কুসংস্কার সম্পর্কেও। গত মাসে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে ঘিরে প্রকাশিত এক বইয়ে লেখক ব্রিজিত ম্যাককনভিলে দেখিয়েছেন কীভাবে মাতৃত্ব ও সন্তান জন্মদানের বিষয়ে বৈশ্বিক প্রজ্ঞা নতুন মা ও শিশুর জীবনকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে আর। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে এসবের নানান টুকিটাকি।

Finnish Baby Box

Finnish Baby Box


শিশুদের জন্য সেরা দেশ ফিনল্যান্ড
নতুন মায়েদের উপহার হিসেবে যুক্তরাজ্যে দেওয়া হয় সাবান-শ্যাম্পুসহ ধোয়া-পাকলানোর পাতলা কাপড়ের রুমাল-টুমালের বাজারি প্যাকেট। ফিনল্যান্ডে একজন নতুন মা উপহার পান শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় নানান জিনিসপত্রে ঠাসা একটা আস্ত কার্ডবোর্ডের বাক্স। এই বাক্সটিই ব্যবহার হতে পারে শিশুর প্রথম খাটের মতো। আর এতে শিশুর জন্য থাকে পাতলা তোশক-বিছানাপত্র, গোসলের থার্মোমিটার, গোসলের কাপড়, টুপিওয়ালা তোয়ালে, নখ কাটুনি, দাঁত ও চুলের ব্রাশ, নেংটি, টুপি, কাপড়ের জুতা, মোজা, লোল-ঝরানি, দাঁত-কামড়ানি থেকে শুরু করে শিশুদের ছবির বই পর্যন্ত অনেক কিছুই।

বাংলায় সাত মাসে মায়ের ‘সাধ’
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই গর্ভাবস্থার শেষ সময়ে হবু মায়েদের উপহার সামগ্রী দেওয়ার রীতি প্রচলিত। বাংলাদেশসহ পশ্চিম বাংলায় সাত মাসের গর্ভাবস্থায় হবু মায়েরা শাড়ি-গহনাসহ নানা উপহার পান। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে এটা অত্যাবশ্যক আচার হলেও যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই রীতি এখন হিন্দু-মুসলিম সবাই কম-বেশি পালন করে থাকে। উত্তর ভারতের হিন্দু নারীর জন্য এই সময়ে আয়োজন করা হয় বিশেষ অনুষ্ঠানের। হবু মায়ের কোল-ভর্তি করে উপহার সামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে ঘিরে হয় গান-বাজনা-নাচ। আমেরিকার নাভাজো আদিবাসীরা হবু মা ও অনাগত শিশুকে আশীর্বাদের জন্য আয়োজন করেন রাতব্যাপী প্রার্থনা ও পানাহারের অনুষ্ঠানের।


তুমি যা খাও তোমার সন্তান তা-ই
উগান্ডায় গর্ভবতী নারীদের ঘাসফড়িং খেতে মানা। সেখানে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই খাবার একই বাড়িতে বসে পুরুষেরা হরহামেশা খেলেও গর্ভাবস্থায় নারীরা তা খান না। কারণ হিসেবে মনে করা হয়, এ সময় ঘাসফড়িং খেলে হবু শিশুটির মুখও ওই রকম হয়ে যেতে পারে। মলদোভায় প্রায় একই রকম ভীতি থেকে গর্ভবতী নারীরা মাছের মাথা খান না। কুকুরের মাংস খেলে পেটের শিশুটি জন্মের পর মায়ের দুধ পান করার সময় কামড়ানোর স্বভাব পেতে পারে মনে করে চীনের গর্ভবতী নারীরা কুকুরের মাংস খান না। আর মালাওয়ির হবু মায়েরা নাকি এই ভেবে ডিম খান না যে, ডিম খেলে হবু শিশু ডিমের মতো মাথা নিয়ে জন্মাতে পারে।

সত্য এক প্রাচীন প্রজ্ঞা
উত্তর আমেরিকা ও কানাডার মোহাক ও ডেনে নৃগোষ্ঠীতে ঐতিহ্যগতভাবেই গর্ভাবস্থায় নারীকে সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে উত্সাহিত করা হয়। জ্বালানির কাঠ চেরাই করা, প্রচুর সময় হাঁটাচলা করা এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে বলা হয় গর্ভবতী হবু মায়েদের। তবে সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, এত বেশি খাওয়া যাবে না যাতে সন্তান বেরোনোর পথ না পায়। মোহাক ও ডেনে নৃগোষ্ঠীর মতো আরও অনেক আদিবাসীর মধ্যেই কাছাকাছি চর্চা দেখা যায়। আর এই উপদেশগুলোকে আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে আমরা দেখতে পাব, সন্তান জন্মদানের জন্য শক্তসমর্থ থাকা এবং হবু সন্তান ও মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য এগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এমনকি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, মুটিয়ে যাওয়া ও ‘ম্যাক্রোসোমিয়া’ বা ‘বিশাল বপু শিশু’র মতো সংকট থেকে বাঁচতে আধুনিক চিকিত্সকেরা এসব পরামর্শই দিচ্ছেন।


নাড়ির টানেই দুনিয়া ভরা
আধুনিক চিকিত্সাবিজ্ঞানে দীক্ষিত হাসপাতালগুলো ‘হাসপাতাল বর্জ্য’ হিসেবে ‘প্লাসেন্টা’ বা গর্ভফুল/গর্ভপত্র/নাড়ি ইত্যাদি ফেলে দেয় ময়লা-আবর্জনার সঙ্গেই। কিন্তু অনেক সংস্কৃতিতেই শ্রদ্ধার সঙ্গে এসব কবর দেওয়া হয় বা মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। দক্ষিণ আমেরিকার হোসা নাড়ি পুঁতে রাখার জায়গাটা চিহ্নিত করে রাখে, যাতে সন্তান পরবর্তী সময় তাঁর বংশের খোঁজ করতে পারে। উগান্ডার মাওরিরা মায়ের এসব একটা কলাগাছের নিচে পুঁতে রাখে। কম্বোডিয়ায় পোঁতা হয় কাঁটাযুক্ত কোনো গাছের নিচে (যাতে জন্তু জানোয়ার তা ধ্বংস করতে না পারে)। তুরস্কে এসব মসজিদের উঠানে পোঁতা হয় যাতে সন্তান

আধ্যাত্মিকতায় দীক্ষিত হয়ে ওঠে। ইউক্রেনে এমন কোনো স্থানে, যা কেউ ডিঙোতে না পারে আর পারস্যে এটা মাটিতে পুঁতে এমনভাবে চারকোল দিয়ে চারদিকে দাগ টেনে দেওয়া হয়, যাতে প্রাণীরা তা খুঁড়ে বের করতে না পারে।

প্রসববেদনায় চিত্কার মুক্তির
সন্তান প্রসবের সময় প্রচণ্ড ব্যথায় চিত্কার করে ওঠাটাই নাকি স্বাস্থ্যসম্মত। এটা ভেতরের বুনো প্রাণটাকে মুক্ত করে দেয়। দাভিনা ম্যাককলের তিনটি সন্তানই হয়েছে নিজের বাড়িতে। তিনি জানিয়েছেন, সবচেয়ে ছোটো ছেলেটার জন্মের সময় প্রসবের পরপরই তিনি ছেলেটাকে দুহাতে ওপরে তুলে নিয়ে সিংহীর মতো গর্জন করে উঠতে চেয়েছিলেন। আধুনিক সময়ে এসে নানান স্বাস্থ্য-শঙ্কায় বাড়িঘরে সন্তান জন্মদানের রীতিকে নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। আর একই সময়ে বেড়েছে ‘সিজারিয়ান বেবি’র সংখ্যাও। তবে এখনো এটাই সর্বজনস্বীকৃত যে, স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবই সর্বোত্কৃষ্ট।

ওজন কমানোটা ‘সেলিব্রেটিদের নয়’
সন্তান জন্মদানের পর ওজন কমাতে মরিয়া হয়ে ‘ডায়েটিং’ করা হাল আমলের সেলেব্রেটিদের চালু করা কোনো রীতি নয়। ভারতের কর্ণাটকে নব মাতা ও নবজাতকের যত্নে নিয়োজিত ‘দাইমায়েরা’ বরাবরই এই পরামর্শ দিয়ে আসছেন। নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা সংগঠন ‘বেলাকু ট্রাস্ট’-এর ডা. সরস্বতী গণপাথি জানান, স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ দাইমায়েরা নতুন মা হওয়া নারীদের উপদেশ দেন, ‘তুমি মন্তানার পাতার মতোই হালকা, চিকন তরতাজা আর স্নিগ্ধ হও’।


সুমো কুস্তিগির ও শিশুর কান্না
জাপানি একটা প্রবাদে বলা হয়, ‘কাঁদুনে শিশুরা দ্রুত বাড়ে’। আর এই প্রবাদ থেকেই হয়তো হিরোশিমায় একটা বার্ষিক প্রতিযোগিতা হয় শিশুর কান্না নিয়ে। এই উত্সবে সুমো কুস্তিগিরদের কোলে অল্পবয়সী শিশুদের ছেড়ে দেওয়া হয়। যে শিশু যত আগে এবং যত জোরে কেঁদে উঠবে, সে-ই এই প্রতিযোগিতার বিজয়ী হবে।

প্রসূতির যত্নে সেঁক দেওয়া
সন্তান প্রসবের পর মায়ের স্বাস্থ্যের যত্নে পেটে ‘তাপ’ বা ‘সেঁক’ দেওয়াটা অনেক সংস্কৃতিতেই বহু আগে থেকেই প্রচলিত। এর মধ্য দিয়ে দেহের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে অপ্রয়োজনীয় বা দূষিত রক্ত টেনে ত্বকে নিয়ে আসা যায়। চীনে একটা পাথর আগুনে পুড়িয়ে তা তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে শুয়ে থাকা সদ্য মায়েদের পেটে সেঁক দেওয়া হয়। এটা প্রতিদিন প্রায় এক মাস ধরে চলে। এ সময় বুকের দুধ খাওয়ানো ছাড়া বাকি সময়টা এই মায়েরা প্রায় তেমন কোনো নড়াচড়াই করেন না। কম্বোডিয়ায় প্রসূতির বিছানার নিচে গরম কয়লা রেখে দেওয়া হয় আর ম্যানথল দিয়ে মুছে তাঁর পুরো শরীর মালিশ করে দেওয়া হয়। সঙ্গে তাঁকে খাবার হিসেবে দেওয়া হয় এক চুমুক রাম, একটু আদার রস ও ঝাঁজালো ঝালের হালকা খাবার।