মেক্সিকান ক্যাথলিকরা ঈশ্বর খুঁজে পেয়েছেন

mexico

১৯৯৪ সালে মেক্সিকো সিটিতে মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮০ জন। তবে এখন অবস্থা বদলে যাচ্ছে। পিউ রিসার্চের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১০ সালে মেক্সিকোতে মুসলামানদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১১ হাজার। ডেনভার পোস্টে প্রকাশিত Some Mexican Catholics now find God in Islam অবলম্বনে বিস্তারিত ফাতিমা ফেরদৌসী।

১৯৯৪ সালে মরক্কো থেকে মেক্সিকো সিটিতে এসেছিলেন সৈয়দ লুয়াহাবি। তখন এই শহরে মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮০ জন। এদের বেশিরভাগই ছিল কূটনীতিক ও ব্যবসায়িক।স্মৃতি রোমন্থন করে লুয়াহাবি বলেন, ‘মুসলিম সম্প্রদায় ছিল খুবই ছোট। এদের বেশিরভাগই ছিল বিদেশি। মেক্সিকানরা ইসলাম সম্পর্কে তেমন কিছুই জানত না।’

তখন একটি মসজিদ খুঁজে পেতে তাকে হয়রান হতে হয়েছিল। লুয়াহাবি বলেন, ‘অনেক সময় ২-৩ মাসেও একজন মুসলমানের দেখা মিলত না।’ তবে এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ এই মেক্সিকোতে মুসলমানদের জন্য তৈরি হয়েছে একটি ভিন্নতর পরিবেশ। মেক্সিকোতে মুসলমানের সংখ্যা অনেক। তাদের বেশিরভাগই মেক্সিকান।এখন প্রতি শুক্রবারই ইসলাম গ্রহণ করছেন মেক্সিকানরা। কোনো কোনো শুক্রবার ৫জনও ইসলাম গ্রহণ করেন। লুয়াহাবি জানান, নবদীক্ষিতদের বেশিরভাগই নারী।

‘হোয়াই ইসলাম’ নামের একটি সংগঠনের ২০১২ সালের জরিপে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে মেক্সিকোতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ৩০০০ লোক। এদের ১৯ শতাংশ ছিলেন ল্যাটিনো এবং অর্ধেকেরও বেশি নারী।২০১১ সালের ৫২৪টি মসজিদের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, ২০০০ সাল থেকে নারীদের ইসলাম গ্রহণের হার ৮ শতাংশ বেড়েছে। দুই দশক আগে মেক্সিকোতে একটি মসজিদ খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। তখন পাকিস্তানী দূতাবাসের মসজিদে অনেকে নামায পড়তেন। তবে এখন অবস্থা বদলে যাচ্ছে।

পিউ রিসার্চের গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালে মেক্সিকোতে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৯৬.৭ শতাংশ। ২০১০ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮২.৭ শতাংশে। এখানে ক্যাথলিকদের একটি অংশ ইসলাম গ্রহণ করছেন।পিউ রিসার্চের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১০ সালে মেক্সিকোতে মুসলামানদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১১ হাজার। তবে ২০৩০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ২৬ হাজারে। প্রশ্ন উঠছে, মেক্সিকোন খ্রিষ্টানরা কেন ইসলাম গ্রহণ করছেন? কেউ কেউ বলছেন, ক্যাথলিকদের ঈশ্বরের তিন রূপ মতবাদ, যাকে বলা হয় ‘দা ট্রিনিটি ডকট্রিন’ (পিতা, সন্তান ও পবিত্র সত্ত্বা)-এর বিপরীতে ইসলামে এক আল্লাহতে বিশ্বাস অনেককে আকৃষ্ট করেছে।

এছাড়া খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারীর সীমাহীন অভিযোগেও অনেক খ্রিষ্টান বিরক্ত। তারা ইসলামে এর সমাধান পাচ্ছেন। এদেরই একজন মার্থা আলামিলা, বয়স ২৩। তিনি একটি ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তিনি সব সময় উচ্চতর শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু গির্জায় এ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তার সন্তোষজনক জবাব পাননি। শুক্রবার জুমার নামাযের পর মসজিদে বসেই আলামিলা বলেন, ‘আমার মনে কোনো সংশয় ছিল না যে ঈশ্বর আছেন। কিন্তু আমার ধর্মের কাছে অনেক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে আমি অর্থপূর্ণ জবাব পাইনি। আমাকে বলা হতো- ঈশ্বর এভাবে বলেছেন তাই, ঈশ্বর এরকম… ইত্যাদি ইত্যাদি।’

এভাবে চলার পর ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রিধারী আলামিলা এক সময় উন্নত জবাব খোঁজার চেষ্টা করেন। আলামিলা বলেন, ইসলাম সম্পর্কে তার প্রাথমিক ধারণা ছিল যে, এটি সন্ত্রাসবাদ ও নিপীড়নের ধর্ম। কিন্তু পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করার পর এবং মুসলমানদের সঙ্গে বৈঠকের পর তার ধারণা পাল্টে যায়। তিনি যেসব প্রশ্নের জবাব খুঁজছিলেন তাও পেয়ে যান।তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম যে, এটা একটা সুন্দর ধর্ম। এখানে প্রত্যেকটা জিনিসের অর্থ আছে। কুরআন ও হাদীসে প্রতিটি প্রশ্নের জবাব আছে।’

প্রায় ছয় মাস ইসলামের ওপর অধ্যয়ন শেষে ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)’ পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন আলামিলা। তিনি আরো বলেন, ইসলাম সম্পর্কে তার সবচেয়ে সাধারণ যে ভুল ধারণাটি ছিল তা হলো এই ধর্ম নারীদের অধিকার হরণ করে, তাদের মত প্রকাশের সুযোগ দেয়া হয় না এবং নারীদের হিজাব পরতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু ইসলামের ওপর অধ্যয়ন শেষে তার এই ভুল ধারণা ভেঙে যায়।আলামিলা বলেন, ‘আমি যেসব মুসলমানদের সঙ্গে মিশেছি তাদের প্রত্যেকেই অসাধারণ মানুষ। এটা এই কারণে নয় যে, তারা এভাবেই জন্মগ্রহণ করেছে বরং ধর্ম তাদের এভাবে বদলে দিয়েছে।’আলামিলা জানান, তিনি এখনো তার পরিবারের কাছে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেননি। তার পরিবারের লোকজন জানেন যে, তিনি ইসলামের ওপর অধ্যয়ন করছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে তাদের কাছে প্রমাণ করতে চাই যে, আমি বদলে গেছি। যখন আমি তাদের বলব যে, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি তখন তারা যেন দেখতে পায় যে, আমি আগের ব্যক্তিই আছি কিন্তু আরো ভালো হয়েছি।’

কথা বলার সময় আলামিলার পাশেই ছিলেন লেসলি কামরিলো। তার কাহিনীও প্রায় আলামিলার মতই। ক্যাথলিক খ্রিষ্টান থেকে তিন বছর আগে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। লেসলি বলেন, ‘শিশুকালে আমি যখন গির্জায় যেতাম তখনই তাদের ভণ্ডামি আমার চোখে পড়ে। প্রতিবার আগুন আর ধোঁয়া দেখে ঈশ্বর সম্পর্কে আমার মধ্যে ভীতি তৈরি হয়।’

‘ত্রি-তত্ত্ববাদের (ট্রিনিটি) কথা অনুসারে ঈশ্বর মানবরূপে জন্মগ্রহণ করে এবং মৃত্যুবরণ করে। সেই তিনিই আমার কীভাবে স্বর্গে অমরত্ব লাভ করবেন?’ প্রশ্ন করেন লেসলি। ‘আমার সব সময়ই বিশ্বাস ছিল যে, ঈশ্বর আছেন। আমি সব সময়ই ভাবতাম যে সবকিছু সৃষ্টির পেছনে একজন কারিগর বা ঈশ্বর আছেন।’কিন্তু তিনি কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছিলেন না। এরপর মুক্ত মন নিয়ে তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ নানা ধর্ম সম্পর্কে অধ্যয়ন শুরু করেন। তিনি নিয়ত করেন যে ধর্মে তিনি সব প্রশ্নের জবাব পাবেন তাকেই আলিঙ্গন করবেন। অবশেষে ইসলামেই তিনি সব প্রশ্নের জবাব পান এবং শান্তির এই ধর্মকে আলিঙ্গন করেন।