সংস্কৃত নামক একটি ভাষার অপমৃত্যু এবং একটি আশঙ্কাজনক পোস্টমর্টেম রিপোর্ট

sanskrit-large

ভুল, এক্কেবারে ভুল তত্ত্ব মিথ হয়ে আছে। সংস্কৃত ভাষা মানুষের মুখের ভাষা নয়, দেবতাদের মুখ-নিঃসৃত ভাষাও নয় – তাই এটি দেবভাষাও নয়, সংস্কৃত লিপিও দেবনাগরী নয়। সংস্কৃত ভাষা অখণ্ড ভারতবাসীর আদি ভাষা নয় । সংস্কৃত বহিরাগতদের সৃষ্ট একটি কৃত্রিম বা বানানো ভাষা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। সংস্কৃত ছিল এই প্রাকৃত যুগের সমসাময়িক সাহিত্যিক ভাষা মাত্র। পতঞ্জলির কথিত শিষ্ট বা ব্রাহ্মণ্য সমাজে এর প্রচলন থাকলেও জনসাধারণের মধ্যে যে এর কোনোই ব্যবহার ছিল না, তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। আর তাই আমরা দেখতে পাই যে, এটি মুখের ভাষা ছিল না বলেই গত আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এর বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। সংস্কৃত ভাষা কোনো জাতির মুখের ভাষা নয় – মায়ের মুখের ভাষা মানে মাতৃভাষা নয়। সংস্কৃত মানে সংস্কার । ভাষা প্রধানত দুই ধরনের – একটি কৃত্রিম তথা চাপানো, অন্যটি স্বাভাবিক বা মুখের ভাষা। কৃত্রিম ভাষাগুলি হল সংস্কৃত, লাতিন, হিব্রু, ব্রজবুলি, এস্পেরান্তো (কৃত্রিম ভাষা তৈরির কথা বলেছিলেন দার্শনিক রেনে দেকার্ত, ফ্রান্সিস বেকন, জন উইলকিন্স। উনিশ শতকে জোহান মার্টিন শ্লেইয়ার ‘ভোলাপুক’ নামে একটি কৃত্রিম ভাষা তৈরি করেন। সেই সূত্র ধরেই ১৮৮৭ সালে পোল্যান্ডের চক্ষুচিকিৎসক এল. এল. জামেনহফ একটি কৃত্রিম ভাষা তৈরি করেন। রুশ ভাষায় তিনি যে প্রস্তাবটি লেখেন সেখানে তিনি ব্যবহার করেন ছদ্মনাম Doktoro Esperanto, যার অর্থ Doctor Hopeful। এই নাম থেকেই তাঁর প্রস্তাবিত নতুন কৃত্রিম ভাষার নাম হয় ‘এসপেরান্তো’। বর্তমান পৃথিবীতে কুড়ি লক্ষ মানুষ এই ভাষায় কথা বলতে পারে, যার মধ্যে প্রায় ১০০০ মানুষের মাতৃভাষা ‘এসপেরান্তো’। একই সঙ্গে এটাও বলা দরকার, এসপেরান্তো ভাষাকে সংস্কার (সংস্কৃত) করতে চেয়ে আরও বেশ কয়েকটি কৃত্রিম ভাষার জন্ম হয়েছিল। যেমন – Ido, Occidental, Novial, Interglosa বা Glosa, Interlingua ইত্যাদি। বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ওটো ইয়েসপারসনের চিন্তার ফসল ছিল Novial কৃত্রিম ভাষা, যেটি আবার গড়ে উঠেছিল Esperanto, Ido ও Occidental-এর নানান বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণে। কিন্তু এই ভাষাগুলি কোনোটাই ছাপ ফেলতে পারেনি জনমানসে এবং দ্রুতই হারিয়ে যায় ।তেমনই কর্ণাটকের সিমোগা জেলায় মাত্তুরে, মধ্যপ্রদেশের নরসিংহপুর জেলায় মোহাদ, মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার পটিয়াতে, রাজস্থানের বুন্দি জেলার কাপেরনে, রাজস্থানের বাঁশওয়ারা জেলায় খাডা এবং গানোডায়, উত্তর প্রদেশের বাগপাট জেলায় বাওয়ালিতে,ওড়িশার কেন্দুঝড় জেলায় শ্যামসুন্দরপুর গ্রাম সহ আরও কিছু প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন গ্রামে প্রায় ১৪ হাজার ১৩৫ জন (ভারতের ২০০১ আদমশুমারি অনুযায়ী) মানুষদের মাতৃভাষা সংস্কৃত। যদিও ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের তার দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসাবে সংস্কৃত ভাষা নির্দিষ্ট হয়েছে। “Sudharma” নামে সংস্কৃতে একটি দৈনিক সংবাদপত্রও প্রকাশিত হয় শুনেছি, কে পড়ে ?), নিউট্রাল, নোবিতল ইত্যাদি — এর সবকটিই ক্ষয়িঞ্চু বা মৃত ভাষা। স্বাভাবিক ভাষাগুলি হল বাংলা, ওড়িয়া, অহমিয়া, মারাঠি, গুজরাটি, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, হিন্দি, শবর, করফু, খড়িয়া, মুণ্ডারি, সাঁওতালি, ভোজপুরি, মৈথিলি ইত্যাদি — এই সবকটি ভাষাই চলমান বা জীবন্ত ভাষা। এই ভাষাগুলি নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে উন্নত হয়েছে এবং হচ্ছে। ভাষার কোনো ফাদার-মাদার নেই। ছেলেপুলেও নেই। থাকতে পারে না। পণ্ডিতগণ বললেন – বাংলা-হিন্দি-ওড়িয়া ইত্যাদি ভাষাগুলি নাকি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-বংশের নব্য ভাষা। নব্য ভাষা ? বাংলা, ওড়িয়া, অহমিয়া, মারাঠি, গুজরাটি ইত্যাদি ভাষাগুলি নব্য ভাষা ? মোটেই নব্য নয়, ভারতে সংস্কৃত এবং উর্দু ছাড়া সবই প্রাচীন ভাষা। অপরদিকে সংস্কৃত এবং পরে উর্দু ভাষাই নব্য ভাষা। এই ভাষাগুলি তৈরি করা হয়েছে, কৃত্রিমভাবে। স্বাভাবিক ভাষাগুলি থেকে বেছে বেছে শব্দ চয়ন করে এই ভাষাগুলিকে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। “ধৃতরাষ্ট্র” নামটা শব্দ হিসাবে মারাঠি হলেও ওড়িয়া ভাষাভাষীদের মধ্যে ব্যক্তিনাম হিসাবে খুবই প্রচলন আছে। প্রচলন আছে নাম হিসাবে, শব্দ হিসাবে নয়। শব্দটির বিশিষ্টার্থ হচ্ছে — জন্মের পর থেকে যে অন্ধ বা জন্মান্ধ। অন্য কোনো অর্থ শব্দটির নেই। শব্দটি এক্কেবারেই সংস্কৃত নয়, মারাঠি। নির্ভেজাল মারাঠি শব্দ শকুনি, শূর্পনখা, হিড়িম্বা সংস্কৃত বেমালুম গিলে খেয়েছে।“প্রজাপতি” শব্দটি বাংলা ভাষায় প্রচলন আছে। বাচ্যার্থে নয়, প্রচলন আছে বিশিষ্টার্থে। “প্রজাপতি” শব্দটি গুজরাটি ভাষাতেও প্রচলন আছে।প্রচলন আছে রাজস্থানের বাগড়ি ভাষাতেও।“রামায়ণ”, “মহাভারত” শব্দ-দুটি মূলত মারাঠি হলেও অর্থবহ শব্দ হিসাবে মারাঠি ও গুজরাটি ভাষায় প্রচলন আছে, তবে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে। মারাঠি ভাষায় “মহাভারত” শব্দের অর্থ “খুব ধুমধাম”। মারাঠি “রামায়ণ”-এর অর্থ “বিরক্তিকর গল্প”(Tedious Yarn)। আসলে মারাঠি ও গুজরাটি ছাড়া আর অন্য কোনো ভাষায় নাম দুটোর কোনো ব্যঞ্জনা নেই, তাৎপর্যও নেই। খাঁটি বাংলা শব্দ যেমন সংস্কৃত ভাষাটিতে প্রবেশ করানো হয়েছে, তেমনই খুব সুচারুভাবে খাঁটি ওড়িয়া, খাঁটি মারাঠি, খাঁটি গুজরাটি, খাঁটি হিন্দিও। বাকি নেই ইংরেজি সহ অন্যান্য বিদেশি ভাষা। জার্মান, পোর্তুগিজ, বুলগেরীয়, লাতিন, গ্রিক, আরবি, ফারসি ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষার শব্দও সংস্কৃত ভাষায় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পণ্ডিতি কৌশলে কোথাও শব্দগুলির অর্থ পালটে, কোথাও-বা একই অর্থ বহাল রাখা হয়েছে। হাজার হাজার কিসিমের ভাষার শব্দ গুঁজে গুঁজে দেবভাষার কলেবর ঋগবেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ – এগুলি মারাঠি শব্দ। অথর্ববেদ-এর ‘অথর্ব’ অংশটির যে ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নিরুক্ত নামক শব্দব্যুৎপত্তি তত্ত্বের বইয়ে দেওয়া আছে, তা থেকে বোঝা যায় ‘অথর্ব’ অংশটি খাঁটি বাংলা ভাষা। মারাঠি সামবেদ শব্দটির অর্থ ‘একটি মারাঠি উপভাষা’। পর্জন্য, উপনিষদ শব্দটিও খাঁটি মারাঠি।সংস্কৃত ভাষায়, বিশেষ করে বেদগুলিতে এত মারাঠি শব্দের ছড়াছড়ি কেন!

অন্যদিকে বাংলা, ওড়িয়া, অহমিয়া, মারাঠি, গুজরাটি ভাষাগুলি সমৃদ্ধ হয়েছে আদানপ্রদানের মাধ্যমে। লক্ষ্য করুন বাংলা, ওড়িয়া, অহমিয়া ভাষাগুলির মধ্যে উচ্চারণগত, অর্থগত এমনকি বর্ণগত বিরাট সাদৃশ্য। বৃহৎ বঙ্গের সময়কালে এই তিনটি রাজ্যের নৈকট্যই এহেন সাদৃশ্যের কারণ। একইরকমভাবে তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম – এই দক্ষিণী ভাষাগুলি সমৃদ্ধ হচ্ছে। এদের ভাষাতেও উচ্চারণগত-অর্থগত-বর্ণগত একে-অপরের প্রচুর মিল। একইরকমভাবে মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি ভাষাগুলির মধ্যে উচ্চারণগত-অর্থগত-বর্ণগত একে-অপরের প্রচুর সাদৃশ্য। সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক আদানপ্রদান-সংমিশ্রণের ফলেই এই সাদৃশ্য। এগুলি সন্দেহাতীতভাবে জীবন্ত ভাষা, তাই এখনও সেই প্রক্রিয়া সমানে চলছে। ভাষাগুলি তিল তিল করে প্রতিদিনই সমৃদ্ধ হচ্ছে। অন্যদিকে সংস্কৃত “ভাষা-নির্মাণ-চক্র” অনেকদিন হল নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। যাঁরা সংস্কৃত ভাষাটি তৈরি করেছিলেন তাঁরা এখন আর জীবিত নেই। কারখানার মালিক নেই, কারখানার শ্রমিক নেই, উৎপাদন নেই, উৎপাদনের উন্নয়নও নেই। সেই কারণে ভাষাটিও রুদ্ধ হয়ে গেছে। নতুন করে আর কোনো সংযোজন হয় না। স্থবির হয়ে শুধু মন্ত্র-শাস্ত্রেই বেঁচে থাকা ভট্ট-কোরামিনের দৌলতে। বহিরাগতরা বহিরাগতদের প্রয়োজনে এবং সংস্কারের প্রয়োজনেই সংস্কৃত ভাষা সৃষ্টি করেছিল, ধর্মতত্ত্ব এবং শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেও। তাই আমরা সংস্কৃত যুগ বলে একটি পৃথক যুগ কল্পনা করতে পারি না। প্রাকৃতের পূর্বে ছিল প্রাচীন প্রাকৃত। যা ছিল মূলত অনার্য প্রভাবজাত। প্রাচীন ভারত বলতে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ-সংবলিত একটি সুবৃহৎ ভূখণ্ড (প্রাচীনকালের মানুষ এই অখণ্ড ভারত ভূখণ্ডকেই তো সমগ্র পৃথিবীরূপে কল্পনা করতেন)। শতশত স্বতন্ত্র দেশের শতশত স্বতন্ত্র শাসক ছিল, কোনো কেন্দ্রীয় শাসক বা নিয়ন্ত্রক ছিল না। বহিরাগতদের একটি গোষ্ঠী যাঁরা ব্রাহ্মণ পরিচয়ে পরিচিত, তাঁরা তাঁদের এবং শাসক তথা ক্ষত্রিয়দের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে সংস্কৃত ভাষাকে দেবতাদের মুখের ভাষা প্রচার করতে শুরু করেছিল। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণগণ এবং রাজাগণ ঈশ্বরেরই নামান্তর সেটাও প্রচার চলল।ওঁরা তো “মনুসংহিতা”-টা এমনি-এমনি লেখেননি ! পড়ে দেখুন – (১) “উত্তমাঙ্গোদ্ভবাজ্জ্যৈষ্ঠ্যাদব্রহ্মণশ্চৈব ধারণাৎ।/সর্বস্যৈবাস্য সর্গস্য ধর্মতো ব্রাহ্মণঃ প্রভুঃ”।।(১/৯৩) অর্থাৎ, “(ব্রহ্মার) উত্তমাঙ্গ বা মুখ থেকে উৎপন্ন বলে (বর্ণচতুষ্টয়ের মধ্যে) জ্যেষ্ঠ বলে বেদ ধারণ হেতু ধর্মত ব্রাহ্মণ এই সমগ্র সৃষ্টির প্রভু”।(২) “উৎপত্তিরেব বিপ্রস্য মূর্তিধর্মস্য শাশ্বতী।/স হি ধর্মার্থমুৎপন্নো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে”।।(১/৯৮) অর্থাৎ, “ব্রাহ্মণের দেহই ধর্মের সনাতন মূর্তি। তিনি ধর্মের জন্য জাত এবং মোক্ষলাভের যোগ্য পাত্র”। (৩) “স্বমেব ব্রাহ্মণো ভুঙক্তে স্বং বস্তে স্বং দদাতি চ।/আনৃশংস্যাদব্রাহ্মণস্য ভুঞ্জতে হীতরে জনাঃ”।।(১/১০১) অর্থাৎ, “ব্রাহ্মণ নিজের অন্নই ভক্ষণ করেন, নিজের বস্ত্র পরিধান করেন এবং নিজের দ্রব্য দান করেন। অন্য লোকেরা যা ভোগ করে, তা ব্রাহ্মণের দয়া হেতু করে”।এবার দেখি রাজাদের স্থান কোথায়? (১) “অরাজকে হি লোকেঽস্মিন সর্বতো বিদ্রুতে ভয়াৎ।/রক্ষার্থমস্য সর্বস্য রাজানমসৃজৎ প্রভুঃ।।/ইন্দ্রানিলযমাকার্ণামগ্নেশ্চ বরুণস্য চ।/চন্দ্রবিত্তেশয়োশ্চৈব মাত্রা নির্হৃত্য শাশ্বতীঃ”।।(৭/৩-৪) অর্থাৎ, “রাজশূন্য এই জগতে চারদিকে ভয়ে (সকলে) প্রচলিত হলে এই সমগ্র (চরাচর জগতের) রক্ষার জন্য ঈশ্বর ইন্দ্র, বায়ু, সূর্য, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র ও কুবেরের শাশ্বত অংশ গ্রহণ করে রাজাকে সৃষ্টি করেছিলেন”। অর্থাৎ রাজাও যা, ঈশ্বরও তাই।রাজা মানুষ নয়, মানুষের উর্ধ্বে।
এহেন ব্রাহ্মণগণ ও রাজাগণ যে কীভাবে অবশিষ্ট বর্ণদের সম্মোহন করে ফেলেছিল, তা বোধহয় আর বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। অতএব, “এক দেশ, এক ভাষা” কৌশল অবলম্বন করতে চাইল। সবাই যাতে ঈশ্বরের ভাষাকে ধ্রুপদ ভাষা ভেবে সমীহ করে সেজন্য এক শ্রেণির ভাষাতত্ত্ববিদ আসরে নেমে পড়লেন। বললেন — সংস্কৃত হল একটি ঐতিহাসিক ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা এবং হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের পবিত্র দেবভাষা। বর্তমানে সংস্কৃত ভারতের ২২টি সরকারি ভাষার অন্যতম এবং উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অন্যতম সরকারি ভাষা।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে রচিত পাণিনির ব্যাকরণে সংস্কত ভাষার প্রামাণ্যরূপটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপে লাতিন বা প্রাচীন গ্রিক ভাষার যে স্থান, বৃহত্তর ভারতের সংস্কৃতিতে সংস্কৃত ভাষার সেই স্থান। ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষত ভারত ও নেপালের অধিকাংশ আধুনিক ভাষাই এই ভাষার দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে করেন পণ্ডিতগণ।

সংস্কৃতের প্রাক-ধ্রুপদি রূপটি বৈদিক সংস্কৃত নামে পরিচিত। এই ভাষা ঋগ্বেদের ভাষা এবং সংস্কৃতের প্রাচীনতম রূপ। এর সর্বাপেক্ষা প্রাচীন নিদর্শনটি খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ নাগাদ রচিত। এই কারণে ঋগ্বৈদিক সংস্কৃত হল প্রাচীনতম ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগুলির অন্যতম এবং ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের (ইংরেজি ও অধিকাংশ ইউরোপীয় ভাষা যে পরিবারের সদস্য) আদিতম সদস্য ভাষাগুলির অন্যতম।

ভাষাটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পণ্ডিতগণ আরও বলেন — সংস্কৃত ক্রিয়া বিশেষণ ‘সংস্কৃত’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ “সংযুক্ত করা”, “উন্নত ও সম্পূর্ণ আকারপ্রাপ্ত”, “পরিমার্জিত” বা “সুপ্রসারিত”। শব্দটি ‘সংস্কার’ ধাতু থেকে উৎসারিত; যার অর্থ “সংযুক্ত করা, রচনা করা, ব্যবস্থাপনা করা ও প্রস্তুত করা”। ‘সং’ শব্দের অর্থ “সমরূপ” এবং “(স্)কার” শব্দের অর্থ “প্রস্তুত করা”। এই ভাষাটিকে সংস্কৃত বা পরিমার্জিত ভাষা মনে করা হয়। এই কারণে এই ভাষা একটি “পবিত্র” ও “অভিজাত” ভাষা। প্রাচীন ভারতে ধর্মীয় ও শিক্ষাদান সংক্রান্ত উদ্দেশ্যে লোকপ্রচলিত প্রাকৃত (প্রাকৃতিক, শিল্পগুণবর্জিত, স্বাভাবিক ও সাধারণ) ভাষার পরিবর্তে এই ভাষা ব্যবহৃত হত। এই ভাষাকে “দেবভাষা” বলা হত; কারণ প্রচলিত প্রচার অনুযায়ী এই ভাষা ছিল “দেবগণ ও উপদেবতাগণের ভাষা”।

তাহলে এই সংস্কৃত ভাষাটার ইতিহাস কী ? ইতিহাস তো একটা থাকা উচিত, তাই না? আছে বইকি। পড়ুন, পণ্ডিতগণ কী বলছেন — সংস্কৃত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের ইন্দো-ইরানীয় উপপরিবারের সদস্য। এই ভাষার নিকটতম প্রাচীন আত্মীয় হল ইরানীয় আদি পারসিক ও আবেস্তান ভাষাদুটি। বৃহত্তর ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারে সংস্কৃত ভাষার ধ্বনিপরিবর্তন বৈশিষ্ট্যগুলি সাতেম ভাষাসমূহ (বিশেষত স্লাভিক ও বাল্টিক ভাষা) এবং গ্রিক ভাষার অনুরূপ।

সংস্কৃত ও অন্যান্য ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করতে গিয়ে গবেষকগণ একটি অনুপ্রবেশ তত্ত্বের অবতারণা করেছেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বর্তমানে যে ভাষাটি সংস্কৃত ভাষায় পরিণত হয়েছে, তার আদি ভাষাভাষীগণ খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথম ভাগে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পথে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। এই তত্ত্বের প্রমাণস্বরূপ বাল্টিক ও স্লাভিক ভাষার সঙ্গে ইন্দো-ইরানীয় ভাষার ঘনিষ্ট সম্পর্ক, অ-ইন্দো-ইউরোপীয় ফিনো-আগরিক ভাষাসমূহের সঙ্গে শব্দভাণ্ডার আদানপ্রদান, এবং উদ্ভিদ ও জীবজগতের নামসংক্রান্ত ইন্দো-ইউরোপীয় প্রামাণ্য শব্দগুলিকে তুলে ধরা হয়।

সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীনতম প্রামাণ্য (?) রচনা হল হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদ (যদিও শুরুতে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ হিসাবে গ্রন্থটি রচিত হয়নি, কারণ তখন পর্যন্ত “হিন্দু” শব্দটিরই সৃষ্টি হয়নি, কারণ “হিন্দু” কোনো ধর্মের নাম ছিল না, ছিল একটি জাতির পরিচয় হিসাবে।)। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মধ্য থেকে শেষভাগের মধ্যবর্তী সময়ে এই গ্রন্থ রচিত হয়। এই সময়কার কোনো লিখিত নথি পাওয়া যায় না। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গ্রন্থের মৌখিক প্রচলনটি বিশ্বাসযোগ্য। কারণ, এই জাতীয় গ্রন্থগুলির সঠিক উচ্চারণকে ধর্মীয় কারণেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হত।
ঋগ্বেদ থেকে পাণিনি (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী) পর্যন্ত সংস্কৃত ভাষার বিকাশ লক্ষিত হয় সামবেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদ গ্রন্থগুলিতে। এই সময় থেকে এই ভাষার মর্যাদা, ধর্মীয় ক্ষেত্রে এর ব্যবহার, এবং এর সঠিক উচ্চারণ সংক্রান্ত বিধিনিষেধগুলি এই ভাষার বিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সঠিক উচ্চারণ কি সম্ভব ? নমুনা দেখুন –

“তত্র বীরভটপটলোত্তরঙ্গতুরঙ্গকুঞ্জরমকরভীষণসকলরিপুগণকটকজলনিধিমথনমন্দরায়মাণসমু-দ্দণ্ডভুজদণ্ডঃ, পুরংদরপুরাংগণবনবিহরণপরায়ণগীর্বাণতরুণগণিকাগণজেগীয়মানয়াতিমানয়া
শরদিন্দুকুন্দঘনসারনীহারহারমৃণালমরালসুরগজনীরক্ষীরগিরিশাট্টহাসকৈলাশকাশমূর্ত্যা- রচিতদিগন্তরালপূর্ত্যাকীর্ত্যাভীতঃ,সরভিতঃ…………..” (দশকুমারচরিতম্/দণ্ডী/পর্বপীঠিকা/প্রথমোচ্ছ্বাস)।

শুধু দাঁত নয়, হাড়গোড় ভেঙে যাওয়ার জোগার ! কোনো ভাষা সাবলীল না-হলে প্রাঞ্জল না-হলে সে ভাষার মৃত্যু অনিবার্য। শুধুমাত্র পণ্ডিতদের প্রয়োজনের জন্যই কোনো ভাষা বেঁচে থাকতে পারে না। ভাষা হতে হবে সাধারণ মানুষের মনের ভাষা, মননের ভাষা, চিন্তার ভাষা, আনন্দের ভাষা।

পাণিনির “অষ্টাধ্যায়ী” প্রাচীনতম (?) সংস্কৃত ব্যাকরণ, যা আজও অন্য ভাষার ব্যাকরণ হিসাবে বর্তমান রয়েছে। এটি মূলত একটি প্রামাণ্য ব্যাকরণ। এটি বর্ণনামূলক নয়, নির্দেশমূলক প্রামাণ্য গ্রন্থ। যদিও পাণিনির সময় বেদের কয়েকটি অপ্রচলিত হয়ে পড়া কয়েকটি বাক্যবন্ধের বর্ণনাও এখানে রয়েছে।

সেযুগে “সংস্কৃত” শব্দটির দ্বারা অন্যান্য ভাষা থেকে পৃথক একটি ভাষাকে বোঝাত না, বরং বোঝাত একটি পরিমার্জিত রীতিকে। প্রাচীন ভারতে সংস্কৃত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত উচ্চসমাজে স্থান পাওয়া যেত। সাধারণত উচ্চবর্ণের মধ্যেই পাণিনির ব্যাকরণ তথা সংস্কৃত ভাষার চর্চা প্রচলিত ছিল। প্রাচীন ভারতে সংস্কৃত ছিল বিদ্যাচর্চার ভাষা। লোকসাধারণে প্রচলিত প্রাকৃত ভাষার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতও সমাজে প্রচলিত ছিল। উল্লেখ্য, কথ্য প্রাকৃত ভাষা থেকেই পরবর্তীকালের আধুনিক ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলির উৎপত্তি হয় বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন।

এত কিছুর পরেও শশ্মানযাত্রা ! কথ্য সংস্কৃত সংক্রান্ত একাধিক সমাজভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা যায়, কথ্য (যতটা-না কথ্য, তার চেয়ে বেশি লেখ্য, তাই না ?) সংস্কৃত সীমাবদ্ধ এবং এর বিবর্তন ঘটে না। ২০০১ সালে সমাজভাষাবৈজ্ঞানিক পোলক এক জার্নালে লিখেছেন: “Both died slowly, and earliest as a vehicle of literary expression, while much longer retaining significance for learned discourse with its universalist claims. Both were subject to periodic renewals or forced rebirths, sometimes in connection with a politics of translocal aspiration… At the same time… both came to be ever more exclusively associated with narrow forms of religion and priestcraft, despite centuries of a secular aesthetic.”

বেদের বেদি বানিয়ে চার ভাগে ভাগ করা হল ভারতবাসীদের । ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র – এই চারটি ভাগে বিভক্ত করে বলা হল কর্মের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণদের অবশ্য-কর্তব্য হল অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা । এই অধিকার থেকে বাকিদের বঞ্চিত করা হল । কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হল শাস্ত্রপাঠ, যা সংস্কৃতে রচিত । সফট টার্গেট করা হল অশিক্ষিত, কুৎসিত-দর্শন তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ শূদ্রদের । পরবর্তীতে সময়ের ব্যবধানে পুরাণ রচনা করিয়ে এই এদেরকেই চিহ্নিত করে দেওয়া হল অসুর, দৈত্য, রাক্ষস ইত্যাদি পরিচয়ে, অতএব এরা নিধনযোগ্য । অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনা যেহেতু একমাত্র ব্রাহ্মণদের অধিকার, সেই কারণে সংস্কৃত শিক্ষা, সংস্কৃত চর্চা মায় সংস্কৃত অভিসম্পাতের অধিকার ব্রাহ্মণদের মধ্যেই কুক্ষিগত হয়ে থাকল । কথায় কথায় ক্রোধ, কথায় কথায় অভিশাপ – তাঁদের খুশি করতে পারলে আশীর্বাদও মিলত, আর তা দেওয়া হত সংস্কৃত ভাষাতেই। ফলে সংস্কৃত ভাষা বহিরাগত বা আর্যদের তৈরি করা ভাষা থেকে পরিবর্তিত হয়ে ব্রাহ্মণদের সম্পত্তিতে পর্যবসিত হল । সংস্কৃত ভাষাকে মহিমান্বিত করতে প্রথমে “ব্যাস” গোষ্ঠী এবং তারও অনেক পরে অন্যরাও আসরে নেমে পড়লেন। রামায়ণ-মহাভারত-মনুসংহিতা যেমন লেখা হয়েছে, তেমনই লেখা হল ১৮টি মহাপুরাণ এবং ১৮টি উপপুরাণও । এর পিছন পিছন সংস্কৃত ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে এলেন কৌটিল্য-চাণক্য, কালিদাস, অভিনন্দ, রত্নাকর, পাণিনি, ভারবি, শ্রীহর্ষ, ভবভূতি, ভোজ, ভরদ্বাজ, হলায়ুধ, জীমূতবাহন, অনিরুদ্ধভট্ট, রুদ্রধর, পশুপতি, বাৎস্যায়ন, কোক্কাচার্য, জ্যোতির্মল্ল, চরক, সুশ্রুত প্রমুখ অসংখ্য সংস্কৃত-পালক। এরা প্রত্যেকেই ব্রাহ্মণ এবং কোনো-না-কোনো রাজার তত্ত্বাবধানে ও পৃষ্ঠপোষকতায় রাজাকে খুশি করতে এই দুর্বোধ্য সংস্কৃত-ভাষাচর্চা। সংস্কৃত তাই শুধু ব্রাহ্মণদেরই ভাষা, সাধারণের ভাষা নয়। শুধুমাত্র ব্রাহ্মণদের মধ্যেই এই ভাষা কঠোরতার সঙ্গে চর্চা চলত। চর্চা বলতে ভারতের কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষা এবং সারা পৃথিবীর বাছা বাছা ভাষা থেকে শব্দ আত্মসাৎ করে সংস্কৃত ভাষাকে সৃষ্টি, পরিপূর্ণতা দেওয়া এবং সমৃদ্ধ করা। সেই কারণেই সংস্কৃত ভাষার ভিতর পৃথিবীর সব ভাষারই উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ভাষাটির শব্দরূপের কিছুটা লাতিন, কিছুটা মারাঠি, কিছুটা গুজরাটি, কিছুটা লিথুয়ানীয়। সেই “আত্মসাৎ” ব্যাপারটাকে আড়াল করতেই পণ্ডিতগণ বলতে থাকেন সংস্কৃত ভাষা ভারতের সব ভাষার জননী, কেউ কেউ আবার এককাঠি উপরে উঠে বলেন সংস্কৃত পৃথিবীর সব ভাষার জননী। একেই বলে চোরের মায়ের বড়ো গলা !

দেবী দুর্গা বা কাত্যায়নীর যা কিছু শক্তি বা যা কিছু বাগাড়ম্বর-লম্ফঝম্ফ সবই ধার করা, সামান্যতমও নিজস্ব নয়। তা সত্ত্বেও দেবী দুর্গা ভক্তি সহকারে পূজিত হন, তেমনিভাবে সংস্কৃত ভাষা সকলের জননী সেজে পূজিত হয়। এ ব্যাপারে পরে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব সম্ভব হলে। একদা যে অধ্যবসায় নিয়ে ব্রাহ্মণদের মধ্যে সংস্কৃত ভাষাচর্চা চলত, তা পরবর্তীতে সেই অধ্যবসায়ের অভাবে হারিয়ে ভোঁ ! সংস্কৃত এখন শুধুমাত্র বিয়ে, শ্রাদ্ধ, পুজো-পার্বণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বেদ, উপনিষদ, মনুসংহিতা এবং অন্যান্য সংস্কৃত সাহিত্যগুলি যদি ব্রাহ্মণগণ রচনা করতে প্রয়াসী না হত তাহলে সংস্কৃত ভাষাটির কথা কেউ জানতেই পারতেন না। সংস্কৃত ভাষা কোনোদিন সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি। সংস্কৃত ভাষাকে সম্বল করে দাপটের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদ কায়েম হল ভারতের মাটিতে । উপরন্তু সংস্কৃত ভাষাটিকে আঁকড়ে ধরে টিকে আছে হিন্দুধর্ম, ওই সংস্কৃত ভাষা ও মাহাত্ম্যের মধ্যেই হিন্দুধর্মের প্রাণভোমরার জিয়নকাঠি-মরণকাঠি। একসময় যা কায়েম হল কালের বিবর্তনে তা রক্ষা করা সম্ভব হল না । শাসক ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদ মুখ থুবড়ে পড়ল বিদেশি শাসক মুসলিম (সুলতান, মোগল, পাঠান ইত্যাদি), মোঙ্গল, শক, হুন, ফরাসি, ব্রিটিশদের সামনে । অবশ্য পরে এই ব্রিটিশরাই ব্রাহ্মণদের উদ্ধারকার্যে নেমেছিলেন নানাভাবে, নানা কৌশলে।

যা বলছিলাম, কিছুদিনের মধ্যে সংস্কৃতের সেই সম্মোহনী জাদু চলে গেল। অর্ধমৃত হল ব্রাহ্মণ্যনীতি এবং ব্রাহ্মণ্যবাদ, আর চিরকালের মতো কোমাচ্ছন্ন হল সংস্কৃত ভাষা । এখন আমরা যেই ব্রাহ্মণদের আমাদের চারপাশে দেখি যাঁরা পৈতে ঝুলিয়ে এ-বাড়ি ও-বাড়ি দৌড়ে বেড়ায় তাঁদের বেশিরভাগই সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ নয়, এরা এক-একটা হাঁসজারু বা বকচ্ছপ । এরা না-জানে সংস্কৃত, না-জানে সংস্কৃতি।

এই হল আমাদের শিকড়, শিকড়ের সংস্কৃত, শিকড়ের সংস্কৃতি।