খুশবন্ত সিংয়ের তৈরি চরিত্র

খুশবন্ত সিং (ফেব্রুয়ারি ২, ১৯১৫ - মার্চ ২০, ২০১৪)

খুশবন্ত সিং (ফেব্রুয়ারি ২, ১৯১৫ – মার্চ ২০, ২০১৪)

পরিপূর্ণ লেখকরা চলে গেলে পাঠকের শূন্যতা হয়। সেই শূন্যতায় থাকে নতুন লেখা না পাওয়ার আক্ষেপ এবং ব্যক্তি লেখকের জন্য মায়া। বিদায় মানেই এক কঠিন স্তব্ধতা। খুশবন্ত সিংয়ের চলে যাওয়ার খবরে এই স্তব্ধতা শুধু কি তার প্রিয় পাঠকের? তার সমালোচকদের ভেতর তৈরি হয়েছে আরও বেশি। খুশবন্ত সিং তেমনই লেখক, যার বই নিন্দুকরাও হাতে পেলে পৃষ্ঠা না উল্টে সরিয়ে রাখতে পারেন না। তার প্রথম সফলতা সব শ্রেণীর মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। রসবোধ আর ব্যাঙ্গাত্মক সূক্ষ্ম মেধার যথাযথ ব্যবহার সমালোচকদের অস্থির করে তোলে সহজে। তবে অতটা সহজেই প্রতি উত্তর খুঁজে পান না তারা। এ কথা খুশবন্ত সিং নিজেও জানতেন বলেই শেষ উপন্যাস দি সানসেট ক্লাব-এ তিনটি চরিত্রের ভেতর বুটা সিংয়ের সঙ্গে পাঠক লেখকের মিল খুঁজে পায়। যেখানে বুটা সিং বন্ধু প্রীতম শর্মার সঙ্গে কথোপকথনে বারবার মহাত্মা গান্ধীর বিভিন্ন মতাদর্শসহ সমালোচনা করেছে ভারতবর্ষের আচার-বিশ্বাস, নিয়ম-কানুন নিয়ে। যার জুতসই প্রতি উত্তর প্রীতম শর্মা কখনও দিতে পারেননি। সাধারণ পাঠকের চেয়েও খুশবন্ত সিং অধিক সমালোচিত হয়েছেন ভারতের রাজনীতিবিদদের কাছে। জননন্দিত ও নিন্দিত এই লেখক যতটা সাফল্যের সঙ্গে নিজের সমালোচনা উপভোগ করেছেন, তাও এক বিস্ময়ের ব্যাপার। সমালোচনা উপভোগ করে শত্রুর মুখে ছাই উড়িয়ে দিয়েছেন এক একটি লেখায়। তার বিখ্যাত বই দিলি্লর একটি অংশে সমালোচক রাজনীতিবিদদের আয়েশ করে এক হাত নিয়েছেন, ভারতের ভবিষ্যৎ শাসন কর্তাদের কথা অনেক আগেই নির্ধারিত হয়েছিল উদাহরণ দিয়ে একটি পৌরাণিক ঘটনার সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত একটি গল্প তৈরি করেছেন তিনি, যা শুধু খুশবন্ত সিং-ই পারেন। পৌরাণিক গল্পের ছলে তুলে ধরেছেন, ভারতের শাসনকর্তাদের ব্যক্তিত্ব। গল্পটি এমন, ‘রাম বনবাস থেকে ফিরে এসে দেখেন এক যুগেরও বেশি সময় আগে তিনি যেখান থেকে বিদায় নিয়েছিলেন সেখানে কিছু অপরিচিত মানুষ তারই জন্য অপেক্ষা করছে। রাম পরিচয় জানতে চেয়ে তাদের দাঁড়িয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করল। অপেক্ষারত মানুষ উত্তরে জানাল, আপনি বনবাসে যাওয়ার দিন এখানে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে বলেছিলেন, ভ্রাতা ও ভাতৃরা ফিরে যাও। আমরা এর কোনোটার মধ্যেই পরি না বলে আজও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। তাদের বছরের পর বছর ধরে একই জায়গায় অপেক্ষা দেখে রাম অত্যন্ত খুশি হয়ে বর দিতে চাইলেন। বললেন, যে কোনো একটি প্রার্থনা কর। অপেক্ষারত উভয় লিঙ্গের সেই অনুগতরা বলেছিল, ভারতকে স্বাধীন রাষ্ট্র করে দিন। রাম বলেছিল, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হবে এবং তোমরা তার দায়িত্ব গ্রহণ করবে।’ এই হলেন খুশবন্ত সিং, যিনি জানতেন শত্রু বধের জন্য তার কলমই যথেষ্ট। খুশবন্ত সিং এমন একজন লেখক যার লেখার প্রশংসা ও কঠোর সমালোচনা দুটোই সমান তালে হয়েছে কিন্তু অবজ্ঞা করে বাদ দিতে পারেনি কোনো পাঠকই। এর বড় কারণ তার বাক্য মানুষের অনুভূতিতে প্রতিধক্ষনি করে। পড়লাম এবং বই শেষ হলে অন্য কাজে মনোসংযোগ করলাম এতটা সহজ নয় তার তৈরি চরিত্ররা। সে চরিত্র হোক কোনো ডাকাতের, একজন বৃদ্ধ যে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ে চিন্তিত তার, কোনো যৌন আবেদনময়ী ঝাড়ুদারণী মহিলার চরিত্র অথবা তার দাদিমা যিনি একজন সাধারণ ভারতীয় মহিলা মাত্র তার। প্রতিটি চরিত্র স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যময়।

খুশবন্ত সিংয়ের প্রথম উপন্যাস ট্রেন টু পাকিস্তান প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। প্রায় ৬০ বছর আগে প্রকাশিত ১৮১ পৃষ্ঠার এই বইটি এখন পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান ভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে লেখা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। বইটি ঐতিহাসিক এক দলিল বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। তবে আমার মতে, দলিলের চেয়েও এ বইয়ের সার্থকতা- ট্রেন টু পাকিস্তান পড়ার পর দেশভাগ নিয়ে আরও দুটো বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করে দেয় পাঠককে। বইয়ের মূল চরিত্র জুগগাত সিং, অন্য একটি চরিত্র মানো মাজরার জেলার হুকুম চাঁদ। একটি পার্শ্বচরিত্র কেমন করে উপন্যাসের মূল ঘটনার ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করতে পারে, তা দেখিয়েছেন খুশবন্ত। ডাকাতির অভিযোগে প্রায়ই কারাগারে আটক থাকত জুগগা সিং। চারপাশে দাঙ্গা শুরুর পর ম্যাজিস্ট্রেট হুকুম চাঁদ মানো মাজরায় এসে বুঝতে পারেন যে, কোনো সময় সেখানকার মুসলমানরা হামলার মুখে পড়বে, তাই সিদ্ধান্ত নিলেন সবাইকে শরণার্থী শিবিরে পাঠিয়ে দেয়ার। এর আগেই পাকিস্তান থেকে এক ভুতুড়ে ট্রেন আসে। সে ট্রেন জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য কাঠ জোগাড় করতে হয় আর মানো মাজরা গ্রামের মানুষ দূর থেকে দেখে আকাশ ভর্তি ধোঁয়া। সেই ট্রেনভর্তি ছিল হিন্দু ও শিখদের লাশ। এ ঘটনার পর আশঙ্কা শুরু হয় এই শরণার্থী মুসলমানদের নিয়ে যে ট্রেন পাকিস্তান যাবে তাতে প্রতিহিংসাবশত হামলা হবে। সে হামলা প্রতিরোধের কোনো উপায় প্রশাসনের ছিল না বলে অসহায় হয়ে পড়লেন হুকুম চাঁদ। ঠিক তখনই তার মাথায় এলো অন্য ভাবনা। তিনি ছেড়ে দিলেন জুগগাত সিংকে। হুকুম চাঁদ ধারণা করেছেন, অন্য কোনো উপায় না হলেও জুগগাত নিশ্চয়ই ওই ট্রেন নিরাপদে পেঁৗছানোর ব্যবস্থা করবে কেননা সেই ট্রেনেই রয়েছে তার মুসলমান প্রেমিকা নুরান। হুকুম চাঁদের ধারণাই ঠিক হয়েছিল। মুসলমান প্রেমিকার জন্য জুগগাত সিং বাঁচিয়ে দিয়েছিল সেদিনের ট্রেন। ভালোবাসার কাছে পরাজিত হয়েছিল সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসা। আর নুরানের চরিত্রটা খুশবন্ত কেমন বর্ণনা করেছিলেন? প্রথম দিকে কামতাড়িত এক উঠতি বয়সি নারী যে কিনা বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে জুগগার সঙ্গে রাতের অন্ধকারে মিলিত হয়। সেই নারী পাকিস্তান চলে যাওয়ার নির্দেশে বলেছিল, কে আমাদের বের করে দেবে গ্রাম থেকে? এ গ্রাম আমাদের সবার। মুসলমান মেয়ে হয়েও উচ্চারণ করেছিল ‘সতশ্রী আকাল’। খুশবন্ত সিংয়ের চরিত্র নির্মাণের আরেক উদাহরণ তার ‘দ্য কোম্পানি অফ ওম্যান’ এর মূল চরিত্র মোহন কুমার। যে যথেচ্ছ যৌনাচারে অভ্যস্ত তবুও পাঠকের সমবেদনা তার স্ত্রীর প্রতি নয়, মোহনের জন্য। উপন্যাসের শেষে লেখক এমন জীবনের পরিণতিও তুলে ধরেছেন পাঠকের জন্য কিন্তু এত সত্যি এমন মোহন কুমার সমাজের অংশ এবং বাস্তব একটি চরিত্র। বহুগামী মোহন কুমারই ঝারুদারণী ধান্নো যার সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হতেন। হাতেনাতে ধান্নোর চুরি ধরা পরার পরও পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন মোহন। এ সময়ের যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন তাতে মোহন কুমারের ভেতর আরেক মানুষের উপস্থিতি স্পষ্ট, যাকে পাঠক চেনে না। দিলি্ল বইতে বাহাদুর শাহ জাফরের যে জীবন তিনি বর্ণনা করেছেন এমন নিখুঁত বর্ণনা কোনো ইতিহাসবিদও জানিয়ে যাননি। এবার তার অন্য একটি চরিত্রের কথা বলি। আনফরগেটেবল ওম্যান বইয়ের প্রথম লেখাটি ‘একজন মহিলার প্রতিকৃতি’। এ লেখার শেষ লাইনটি উল্লেখ করছি ‘আমরা দাদিমার মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাওয়ার পর পাখিগুলো নীরবে উড়ে গেল। পরদিন সকালে ঝাড়ুদার রুটির টুকরোগুলো ঝাড় দিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল।’ লেখক তার দাদিমার কথা বলেছেন, যিনি খুব সাধারণ একজন ভারতীয় নারী তবুও তার মৃত্যুতে পাখি এসেছিল সেই পাখিরা নীরবে শোক জানিয়েই ফিরে গেছে। অর্থাৎ খুব সাধারণ এই নারীর ভেতরও রয়েছে চমকে দেয়ার মতো কোনো এক প্রাকৃতিক বোঝাপড়া। চরিত্র তৈরির ক্ষেত্রে দিলি্ল বইয়ের ভাগমতীর কথা উল্লেখ করতেই হয়। যাকে বর্ণনাকারী অপছন্দ করলেও এড়াতে পারত না। তিহার জেল থেকে মুক্তি পাওয়া সেই ভাগমতী না পুরুষ না নারী। কিন্তু সে এমনই প্রভাবিত করতে জানে যে অনেক নারীর সংস্পর্শে যাওয়ার পরও বইয়ের মূল চরিত্রের ভাগমতী ছাড়া তৃপ্তি আসেনি। দিলি্ল বইটি সম্পূর্ণ পড়ার পর বোঝা যায়, দিলি্ল শহরকেই তিনি আসলে ভাগমতীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। যে শহরে যানজট, লোডশেডিং, দুর্নীতি, মিথ্যে হাসি আর আলোর নিচে প্রতারিত জীবন দেখেও সে শহরের বাসিন্দারা দিলি্ল ছাড়া অন্য শহরে শান্তি পায় না। এই যে মানুষের ভেতর এমন স্ববিরোধিতা সেই বিরোধিতা ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। দি সানসেট ক্লাব উপন্যাসের শুরু ২০০৯ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৫৯তম বার্ষিকী দিয়ে। ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস হলেও এ দিনটিতে দেশকে নতুন সংবিধান উপহার দিয়ে প্রজাতন্ত্র দিবস তৈরি করা হয় ভারতে। এ দিনের প্যারেড বিষয়ে আলোচনা দিয়ে শুরু হয়েছে উপন্যাসের প্রথম অংশ। ‘কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, ভারত শান্তি ও অহিংসার দূত গান্ধীর ভূমিকা বলে অহঙ্কার করে থাকে, সে দেশ মারণাস্ত্র ও সামরিক শক্তির এমন মহড়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় দিবস উদযাপন করে। আসল সত্য হচ্ছে, আমরা ভারতীয়রা স্ববিরোধিতায় পরিপূর্ণ। আমরা বিশ্বের কাছে শান্তির বাণী প্রচার করি আর নিজেরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেই। আমরা মনের পবিত্রতা, সতীত্ব ও যৌন সংযমের কথা বলি, আর যৌনতার মাঝে নিজেদের আচ্ছন্ন রাখি।’ রাষ্ট্রের এমন স্ববিরোধিতার প্রতি ইঙ্গিত ও কটাক্ষ খুশবন্ত সিংয়ের লেখার মানকে অন্য স্তরে পৌঁছে দেয়। তার চরিত্র নির্মাণ, ব্যাঙ্গাত্মক বর্ণনা, অগোপনীয় আচরণের সাহস আর ইতিহাস থেকে শুরু করে সমসাময়িক ঘটনা সবকিছুতে গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে তৈরি হওয়া শত শত বাক্যে তিনি স্বতন্ত্র। খুশবন্ত সিংয়ের মৃত্যুতে সেই পরিপূর্ণ জীবনে স্তব্ধতা এলো। এই পূর্ণতা প্রায় একটি শতক কাটিয়ে দেয়ার জন্য নয়, পরিপূর্ণতা তার সৃষ্টিতে।