কথোপকথন-নীড়

ক্লান্ত পাখি উড়তে উড়তে গাছের ডালে বিশ্রামের জন্য বসলো । ধারেই পথিক পানি পান করছিল।

পাখি বলে পথিক আমায় একটু জল দেবে।

পথিক বলে, অবশ্যই দেবো। এই নাও।

পাখি পানি গ্রহণ করলো।

পথিক বললো, পাখি এ আকাশতো অনেক বড় । এখানে তুমি একা একা উড়ে বেড়াও। এ আকাশে আছে ঝড়, ঝাপ্টা, রোদ্র, খরতাপ আর আছে জীবন হারাবার ভয়। তোমায় একটা নীড় করে দেই পাখি?..

পাখি হেসে বলে, পথিক আমি হাজার ঝড়-ঝাপটা, রৌদ্র-খরতাপ পেরিয়ে জীবনে নামের তরীটা তীরে ভিড়িয়ে ফেলেছি। নীড় পাখিকে টানেনা পথিক-নীড় পাখিকে টানে না। এ তরী আজ তীরে ভিরে গেছে-এ পাখির আজ নীড়ের প্রয়োজন নেই।

পথিক অবাক হয়ে বলে, তীর থেকেইতো শুরু পাখি।জীবন নামের তরীর পথতো অনেক বড়। এতো তাড়াতাড়ি শেষ হয় কি করে?

পাখি একটু নি:শ্চুপ হয়ে জিজ্ঞাসা করে, জীবনের পথ কি এখনো বাকি আছে পথিক?

পথিক হেসে বলে, অব্যশই আছে। তুমি হাজার ঝড় ঝাপটা, রৌদ্র -খরতাপ পেরিয়ে জীবন নামের তরীটাকে তীরে মাত্র ভিড়িয়েছ। সুন্দর জীবনের পথ শুরু মাত্র শেষ নয়। জীবনের পথ শেষ হতো যদি মাঝ পথে তরী ডুবে যেতো। তরীতো ডোবেনি পাখি। তীরে সবে ভিড়ল। এসো শুরু করি-একটি নীড় দিয়ে।

পাখি নি:শ্চুপ হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে থাকে। পরক্ষনেই বলে-নীড় আমায় টানে না পথিক নীড় আমায় টানেনা।

পথিক বলে, না টানলে এসো না। আমি শুধু একটা নীড় করে দেই। ইচ্ছে হলে এসো বিশ্রাম করো ইচ্ছে না হলে এসো না। দেইনা পাখি একটা নীড় করে?
পাখি আবেগাপ্লুত অশ্রুসজল চোখে বলে, নীড় আমায় টানে না পথিক নীড় আমায় টানে না।

পথিক বলে, না টানলে এসো না। চলো একসাথে আকাশে উড়ে বেড়াই। আমি তোমার ডানায় আকাশে উড়ে বেড়াবো আর তুমি কাল্ন্ত হলে আমার কাধে মাথা রেখে পথে পথে ঘুরে বেড়াবে।

পাখি বলে, বন্ধন আমায় টানেনা পথিক-বন্ধন আমায় টানেনা . আমাকে বন্ধনে জড়াতে এসো না।

পথিক বলে, বন্ধনের কথা কি বলেছি পাখি। বলিনি। বলেছি -একটা নীড় করে দেই। যে নীড়ে তোমার জন্য পানি নিয়ে এ পথিক অপেক্ষা করবে। পিপাসা পেলে এসো -আমার আলিঙ্গনে বিশ্রাম নিও, জল পান করে যেও।

পাখি বলে, তোমরা সব এক। শুধু মিষ্টি কথা। আমি তোমাদের বিশ্বাস করি না। আজ বলবে নীড় করে দেই, কাল বলবে চিনিনা।

পথিক বলে বিশ্বাসের কথাতো বলিনি পাখি। বলেছি যে একটা নীড় করে দেই। বিশ্বাস না করলে এসো না। শুধু যেন রেখো তোমার একটা নীড় আছে যেখানে একজন সঙ্গী অপেক্ষা করে।

পাখি হেসে জিজ্ঞাসা করে, কি অপেক্ষা করে? সঙ্গী দিয়ে কি হয়? পাইনিতো কোনো সঙ্গী জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে।

পথিক বলে, পাওনি বলে কোনদিনও পাবে না তা ভাবছো কেন?

পাখি বলে, সঙ্গীর আমার প্রয়োজন নেই। সঙ্গী দিয়ে কি হয়?

পথিক বলে, সঙ্গী একসাথে আকাশে উড়ে বেড়ে আর ক্লান্ত হলে ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরে।

পাখি চিত্কার করে বলে, কি দিয়ে জড়িয়ে ধরে? ভালোবাসা?তোমারা ভালোবাসা বোঝো? পথে পথে ঘুরে বেড়াও আর সব পাখিকে ভালবাসার কথা বল।প্রতারণা করো আর কষ্ট দাও।

পথিক বলে, ঠিক আছে-ভালোবাসা দেবো না।শুধু একটা নীড় করে দেই। ক্লান্ত তুমি ডালে না বসে নীড়ে ফিরে এসো। আমায় বললে, আমি পথে পথে ঘুরে ভালবাসার কথা বলি, প্রতারণা করি আর কষ্ট দেই? তুমিও তো উড়ে বেড়াও- কই আমিতো বলিনি উড়ে বেড়াও, ডালে ডালে বসো আর আমার মতন অন্য অসহায় পথিককে কষ্ট দাও। কষ্ট কি শুধু তোমার পাখি? আমার নেই? অবিশ্বাস কি শুধু তোমার পাখি আমার নেই?

আমায় আবেগাপ্লুত করো না পথিক, আবেগাপ্লুত করো না।পাখি চিত্কার করে কেদে বলে, নীড় আমায় টানে না পথিক নীড় আমায় টানে না।

পথিক ভালবাসার জোর খাটিয়ে বলে, রইলো তোমার নীড়। দিলাম করে আমার বুকে তৈরী করে ছোট একটি নীড়। বৃদ্ধ হলে এসো এ পথিকের বুকে-রেখে দেব যতন করে তোমার ছোট নীড়।। হৃদয়ের দুয়ার রইলো খোলা আজীবন। দেখো উকি দিয়ে হৃদয়ের এ নীড়ে, তোমার জন্য ভালোবাসার ছোট একটি ঘর বেধেছি। যে নীড় শুধু তোমার পাখি শুধুই তোমার। অন্য কেউ কোনদিন প্রবেশ করতে পারবে না। পাখি আমার লক্ষী পাখি-এসো হাত বাড়াও। দেখো আমি হাত বাড়িয়েছি। আমার শরীর থরথর করে কাপছে। পারবে প্রত্যাখ্যান করতে কম্পিত ভালবাসার এ হাত?

পাখির চোখ অশ্রুসিক্ত।তার শরীরও কাপছে। ধীরে শুধু একবার পাখি বলে, তোমার হৃদয়ে শুধু আমার জন্য নীড়? কি করবে এ মুক্ত পাখি? মুক্ত পাখি আজ প্রশ্নবিদ্ধ, অশ্রুসিক্ত এবং দ্বিধাগ্রস্ত।