বিসিবির সেলিব্রেশন কনসার্ট এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীগণ

world-cup-t20-2014-opening-ceremony-in-bangladesh

আমাদের দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস.এম.সুলতান তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন “আমাকে শিল্পকলা একাডেমি একটা মুক্তিযুদ্ধের ছবি আঁকতে বলেছিলো। আমি সেখানে রাইফেল-বন্দুক আঁকিনি, লাঠি, সড়কি, বল্লম এসব এঁকেছি। এ সবই এখনো আমাদের অস্ত্র। স্টেগান, রাইফেল আমি তৈরি করিনি, আমার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি যা অর্জন করিনি, তা আমার না। ধার করা জিনিস নিয়ে আধুনিক হওয়া যায় না”।

ধার করা জিনিস নিয়ে শুধু আধুনিকতাই নয় নিজের পায়ের ওপরেই দাঁড়ানো না। অথচ এবারের টি-২০ ক্রিকেট বোর্ড আয়োজিত বিশ্বকাপের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমরা ভারতের শিল্পী কলাকুশলিদের শুধু ধারই করিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি আমাদের মাটির শিল্পী কলাকুশলিদের। এসব নিয়ে এই দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে যতটা সোচ্চার হতে দেখলাম ঠিক ততটাই নৈশব্দের ভূমিকা পালন করতে দেখলাম আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের তথাকথিত চেতনাধারীদের। তথাকথিত এই কারণে যে, এসব চেতনাধারীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে বুক উঁচিয়ে, সিনা ফুলিয়ে মুখে ফেনা তুলে যখন-তখন যেকোনো উপলক্ষ্যে এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয়গান গেয়ে যান। অথচ আমাদের শিল্পীরা, আমাদেরই মাটিতে, আমাদেরই আয়োজিত এই রকম একটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে যখন বিদেশি বিশেষত ভারতীয় শিল্পীদের ধারে কাছে স্থান করে নিতে পারেন না, তখন কি নির্বিঘœ চিত্তে এই চেতনাধারীরা নিরবতা পালন করেন। আমাদের স্বনামধন্য লেখক-অধ্যাপক জনাব জাফর ইকবাল একবার আমাদের জাতীয় সঙ্গীত আমরা সঠিক ভাবে গাইতে পারিনা বলে আক্ষেপ করতে যেয়ে পাকিস্তান সময়েরর জাতীয় সঙ্গীতকে (পাক সার জামিন…) দুর্বোধ্য বলে আখ্যায়িত শুধু করেননি সেইসঙ্গে গানটি তার মস্তিষ্কে বহুদিন বেজে ছিলো বিধায় অত্যন্ত অনুশোচনায় ভুগেছেন বলে জানিয়েছিলেন (দৈনিক প্রথম আলো, ২৮ ফেব্রয়ারি, ২০১১)। তার এই অনুশোচনা আমরা স্বশ্রদ্ধ চিত্তে গ্রহণ করতাম যদি তিনি এবারও হিন্দী গানের জন্যে না হলেও এই অনুষ্ঠানে বাংলা গানের দৈন্যতার জন্যে সামান্য অনুশোচনা বোধ করতেন। যাক, এটা তার ব্যক্তিগত অভিরুচির বিষয়, কারো ব্যক্তিগত রুচির প্রশ্নে আমাদের মতামত না দেয়াই ভালো। শুধু দুঃখ হয় তার মতো আরো অনেক চেতনাধারীরা কীভাবে এসব দেখেও না দেখার ভান করেন।

তবে ভারতীয় শিল্পীদের এই নির্লজ্জ্ব শিল্প-তোষণ যে এবারই প্রথম তা মনে করার কোনো কারণ নেই। গত ২৪ ফেব্রয়ারি ২০১১, “ডেসটিনি ট্রাই ন্যাশনাল বিগ শো”, তেও একই ভাবে বিসিবি (মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিলো এ.টি.এন. বাংলা এবং বৈশাখী টিভি চ্যানেল) ভারতীয় শিল্পীদের নিয়ে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলো। নামে ‘তিন জাতি’ (বাংলাদেশ, শ্রিলংকা ও ভারত) হলেও, শ্রিলংকা থেকে শুধুমাত্র একটি ব্যান্ড দল ‘এসেলা ফার্নালদো’ কে আনা হয়। ফরিদা পারভিন, চিত্র তারকা সাকিব খান সহ গুটিকয়েক দেশীয় শিল্পীরা থাকলেও মূল মঞ্চ দাপিয়ে বেরিয়েছে ভারতীয় শিল্পীরা। শাহরুখ খান যখন এলেন তখন টিকেটের হার উঠেছিলো তিন হাজার থেকে পঁচিশ হাজার আর এবার তার সীমা ছাড়িয়ে টিকেটের হার হয়েছে পঁচাত্তর হাজার। আর টিকেটের হার বেশি হবেই বা না কেনো, বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের হাতে কোটি টাকার ওপরে ক্যাশ ঘোরাঘোরি করছে। কাজেই টিকেটের হার পঁচাত্তর হাজার হলো না এক লাখ হলো তাতে তাদের কিছু এসে যায় না। এসে যায় শুধু তাদের যারা চোখের সামনে তাদের বহুকষ্টে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ভূমির ওপর বিজাতীয় আর্থিক, রাজনৈতিক, সামাজিক,সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে শুধু নিজেদের অর্থবলই হারাচ্ছেননা সেই সঙ্গে নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি সর্বপোরি ভাষা নামক যে সম্পদ ছিলো, আছে সবই হারাতে বসেছে। এসব অনুষ্ঠান যখনই হয়, তখনই শুধু আমরা কিঞ্চিত সোচ্চার হয়ে উঠি। কিন্তু সারা বছর বিভিন্ন ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে যে নিরব সাংস্কৃতিক আগ্রাসন দিনের পর দিন চলছে তা কিন্তু লক্ষ্য করিনা। বিভিন্ন বিয়ে-হলুদের অনুষ্ঠানে বাংলা গানের চাইতে হিন্দী নাচ-গানই এখন আমাদের অধিকতর প্রিয় বিষয়। সব থেকে জনপ্রিয় মুম্বাই ছবি বা টিভি সিরিয়ালের নামাঙ্কিত শাড়ি-কাপড় প্রতি বছর ঈদ-পুঁজা পার্বণে ভারত থেকে স্রোতের মতো আসে আর আমরাও সেসব পরিধান করে সেই স্রোতে ভেসে যেতে থাকি। ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের কল্যাণে আমাদের গৃহবধূ আর গৃহস্বামীরা বাংলাদেশের পারিবারিক মূল্যবোধ নয় ভারতীয় পারিবারিক মূল্যবোধে নিজেদের সমৃদ্ধশালী (?) করছে। ‘কন বানেগা ক্রোড়পতি’র আদলে আমরা নির্মাণ করি ‘ কে হবেন কোটিপতি’।

সাংস্কৃতিক লেনদেন কোনো একটিয়া কারবারি প্রতিষ্ঠান নয়। ‘বিশ্বায়ন’ এর অর্থ নিজের দরজা খোলা রেখে অন্যের দরজায় নিজেদের প্রবেশ নিশেধ নয়। আমরা অবশ্যই অন্যের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবো, শ্রদ্ধা করবো কিন্তু নিজেরটা নিঃশেষ করে দিয়ে নয়। এভাবে যদি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলতে থাকে তাহলে আমাদের অবস্থা দাঁড়াবে কেনিয়ার লেখক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর “উইজার্ড অফ দ্যা ক্রো” উপন্যাসের সেসব কালো বর্ণের ক্রীতদাসদের মতো যেসব ক্রীতদাস তাদের বর্ণ শ্বেতকায় করার উন্মত্ত বাসনার জন্যে প্রথমে হারিয়ে ফেলেছিলো তাদের নাম পরে মুখের ভাষা। যেসব ক্রীতদাসেরা উপন্যাসের শেষে চিৎকার করে বলছিলো “ উই ওয়ান্ট আওয়ার ভয়েজ ব্যাক” বা “আমরা আমাদের ভাষা ফিরে পেতে চাই”। এবং আমাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন হারিয়ে যাওয়া বা বিলুপ্তি যতটা সহজ ফিরে পাওয়া কিন্তু তত সহজ কাজ নয়।