খুশবন্ত সিং ও তার বইয়ের বাংলা অনুবাদ

khushwant-singh-01

একটি বই অনেক ভাষায় অনুবাদ হয় তখনই যখন তার ভেতর সার্বজনীনতা থাকে। আবার নিজ দেশে জনপ্রিয় হওয়া অনেক সাহিত্যেরই সকলের হয়ে উঠার গুনটা থাকেনা। শিল্প সার্বজনীন, সুর সীমানা ছাড়িয়ে যায় আর সংস্কৃতি জাতীয়। কিন্তু সাহিত্য? সাহিত্যে আসলে এর সবগুলো বিষয় রয়েছে। নির্ভর করে সে সাহিত্যের মান কেমন? আন্তর্জাতিক ভাষায় কোন সাহিত্য পাঠ সবার জন্য সুবিধের নয়। মূল ভাষা থেকে আন্তর্জাতিক ভাষায় অর্থাৎ ইংরেজিতে অনুবাদ করা হলেই ভাষার নিজস্ব যে টেস্ট থাকে তা বদলে যায় এরপর আবার সেই ইংরেজি থেকে যখন আবার বিভিন্ন ভাষায় লেখা অনুবাদ করা হয় তখন তার গ্রহনযোগ্যতার মান বদলায়। তবুও ভালো অনুবাদকে আমি সমর্থন করি কেননা একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাঠক ছাড়া ইংরেজি সবাই পড়তে পারেনা। এতে অনেক বই ই ইংরেজি অপটু পাঠকের স্পর্শের বাইরে থাকে। এখানে অনেক বড় ভ’মিকা অনুবাদকের। অনুবাদ যিনি করেন তার দায়িত্ব সাহিত্যের মান বজায় রেখে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়া। ছোটবেলায় আমার প্রগতি প্রকাশনীর অনুবাদ পড়ে মনে হতো মূল লেখকও হয়ত অতটা ভালো বর্ণনা দেননি। ননী ভৌমিকের অনুবাদ, রবীন ঘোষ … সিটি অফ জয় আর ফ্রিডম এ্যাট মিডনাইট পড়ে মনে হয়েছে সত্যি কি ল্যারি কলিন্স আর লামিনিক দোপিয়ের ভারতকে এতটাই চিনেছিলেন যে এদো কাঁদা ড্রেনের ভেতর দিয়ে ময়লা গেলে সে গন্ধের ভেতরও মাটির ঘ্রাণ মিশে থাকে লিখতে পারেন? (সিটি অফ জয়)।

অনুবাদের প্রসঙ্গ আনলাম একটি বিশেষ কারণে। একজন অনুবাদক যিনি সদ্য প্রয়াত খুশবন্ত সিংয়ের লেখার সাথে বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তার কথা বলার জন্য। খুশবন্ত সিংয়ের যত বই বাংলায় অনূদিত হয়েছে তার দু একটি ছাড়া সবগুলো বই তার অনুবাদ। আমি যখন দিল্লী পড়ার পর সানসেট ক্লাব পড়ছি তখন পুরোপুরি খুশবন্তগ্রস্থ হয়ে আছি। যে বই পড়ি দেখি একজনেরই অনুবাদ। আজীজে যেয়ে অনুবাদক সম্পর্কে জানতে চাই কেউ কিছু বলতে পারেনা। স্ট্রেঞ্জ। আমার বন্ধু নাজলা একদিন নাম শুনে ফেসবুকে একজনের প্রোফাইল লিংক দিয়ে বললো, জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো ইনি সেই অনুবাদক কিনা। আমি ফেসবুকে অনুরোধ পাঠালাম। প্রথম কথা ছিল আপনি কি খুশবন্ত সিংয়ের বইগুলো অনুবাদ করেছেন? এত স্বল্পভাষি এবং আত্ম প্রচারণা বিমুখ মানুষ আমি আমার চারপাশে কম দেখেছি। তিনি শুধু বললেন, জি আমি। এটুকুই। আমি তার একটি নোটে পড়লাম, ‘খুশবন্ত সিং আমার অনুবাদ কাজের মেন্টর’।

খুশবন্ত সিংয়ের লেখা নিয়ে অনেকের অপছন্দের বিষয় রয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, সিং কুরুচির মানুষ। যৌনাচার নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। তাদের ব্যক্তিগত মতামতের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলি। ব্যক্তি মানুষের জীবনের অপরিহার্য একটি বিষয় যৌনাচার নিয়েও যে এভাবে লেখা যায় যে লেখার ভেতর সুক্ষ রাজনৈতিক খোঁচা, দুর্দান্ত সেন্স অফ হিউমার, সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা, সরকারের ব্যর্থতা একই সাথে নি¤œবিত্তের সাথে উচ্চবিত্তের সম্পর্ক -পরিহাস এমন করে আর কোন সাহিত্যিক লিখেছেন আমাদের অঞ্চলের? যারা শুধু যৌনতা নির্ভর বলে খুশবন্তকে উড়িয়ে দেন তাদের বলি, আর একটু মুক্ত মনে এবং নিউট্রাল যায়গা থেকে তার লেখা বিচার করার দাবি রাখে। শুনেছি, সাদাত হোসেন মান্টুকেও অশ্লীলতার অভিযোগে অনেকবার কাঠগড়ায় দাড়াতে হয়েছে। কিন্তু তার ‘ঠান্ডা গোশত’র মত গল্প কি দ্বিতীয়টি আছে? আমিত খুশবন্তের ট্রেন টু পাকিস্তানের মত মর্মস্পর্শী সাহিত্য দ্বিতীয়টি পাইনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে। একজন লেখকের যেটা পছন্দ নয় তাই দিয়েই আপনি তাকে বিচার করতে পারেন না যেখানে তার ইতিহাস ভিত্তিক কাজ বিশ্বখ্যাত। আমার কাছে বরং যথেষ্ট সাহসী ও সৎ লেখক তাদেরই মনে হয় যারা নিজে যা বিশ্বাস করেন সমাজের তোয়াক্কা না করে তাই লেখার সাহস রাখেন। যে প্রসঙ্গে তার বইয়ের অনুবাদ নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম, এই অনুবাদকের অনুবাদ পড়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি সিংয়ের সাথে সাথে থেকে দেখেছেন। যেভাবে সারমাদের কবিতার অনুবাদ, ইকবাল রুমী এসেছে তার অনুবাদে। যেমন করে দিল্লীর স্থাপত্যের বর্ণনা ও ইতিহাস একেছেন তা শুধু শব্দের অনুবাদে সম্ভব নয়। কথার ভেতরের টুইস্ট, মজা ধরতে না পারলে সেই অনুবাদ সাহিত্য নষ্ট করে দেয়। কিন্তু এই আত্ম প্রচার বিমুখ অনুবাদক তার কাজে এতটাই উতরে গেছেন বলেই বলতে গেলে সব বইয়ের বাংলাই তিনি করেছেন। সিংয়ের দুটি বই আমি অন্য দুজন অনুবাদকের পড়েছি। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।

মানুষের সম্পর্ক কখন কিভাবে তৈরি হয় তার কোন গতিপথ আগে থেকে তৈরি করে দেয়া যায়না তাই হয়ত বিস্ময় থাকে এত ! এই সম্পর্ক রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস চেতনা, খাবারের পছন্দ, প্রিয় গানের শিল্পী এসব থেকেও অনেক বেশি কিছু। এর কোনটিতে না মিলেও একজন মানুষ খুব কাছের মানুষ হয়ে যায় আবার সব কিছু মিলেও সখ্যতা হয়না কখনো। জীবন অদ্ভুত সত্যি! আজ দেখলাম রকমারি ডটকমে তালিকা প্রকাশ করেছে সেই অনুবাদকই খুশবন্ত সিংয়ের ৯৯ ভাগ বই বাংলায় অনুবাদ করেছেন।

1655017_10152332419799668_1510927921_o গতকাল খুসি’র চলে যাবার খবরটা পাবার কয়েক ঘণ্টা আগে আমি নিউইয়র্কের রাস্তায় বৃষ্টির ভেতর হেঁটেছি যার সাথে তিনি আমার পিতৃতুল্য। এই মানুষটা আমার মাথার উপর ছাতা ধরে ছিলেন যেন ভিজে না যাই। আমরা তখনো জানতাম না একটু পরই আমরা দুজন একটা খবর শুনবো যে খবর মুহূর্তে আমাদের স্তব্ধ করে দেবে। সেই সেদিন যে খুশবন্ত সিংয়ের বেশিরভাগ বই কি আপনারই অনুবাদ কিনা জানতে চেয়েছিলাম যার কাছে তিনি আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। খুশবন্ত সিংয়ের লেখা থেকে তার সাথে আমার পরিচয়। আমাদের প্রিয় লেখকের মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে এই ছবিটা তুলেছিলাম। প্রচারবিমুখ মানুষটা আমাকে ছোটো মা ডাকেন। বাংলাদেশের মানুষকে খুশবন্ত সিংয়ের সাহিত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার দাবি আমি যাকে নিয়ে করতেই পারি।

আশ্চর্য আমাদের পরিচয়ই যাকে নিয়ে তার মৃত্যুর খবর পেলাম নিউইয়র্কে একসাথে বসে।

জীবন অদ্ভুত।

২১ মার্চ ২০১৪