নাৎসিরা যেভাবে জার্মান জাতিকে শেকলবন্দী করেছিল

Serajur Rahman

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দুর্ধর্ষ জার্মান ইউবোট (সাবমেরিন) বহরের একজন ডাকসাইটে ক্যাপ্টেন ছিলেন মার্টিন নায়েমোলার। জার্মান মিডিয়া জাতির ও সামরিক বাহিনীর মনোবলকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে তাকে নিয়ে বহু কাহিনী প্রচার করেছে। সে যুদ্ধের পর তিনি নৌবাহিনী ছেড়ে যাজক বৃত্তি গ্রহণ করেন। গোড়ায় তিনি হিটলারের রাজনীতিকে সমর্থন করতেন। হিটলারের দলের পোশাকী নাম ‘ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’ অনেককেই আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু নায়েমোলারের মোহভঙ্গ হতে বেশি দেরি হয়নি। ক্রমেই তিনি নাৎসিদের স্বৈরাচারী ও হিংস্র স্বরূপ দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছিলেন। নায়েমোলার ১৯৩৩ সালের গোড়ায় নাৎসিদের সঙ্গে সম্পর্কছেদ করেন। পরের বছর তিনি পুলিশি নির্যাতন থেকে যাজকদের রক্ষার জন্য একটি ‘সিনোড’ (যাজক সমিতি) গঠন করেন। এ সমিতি হিটলারের বিরুদ্ধে জার্মান জাতির প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

নায়েমোলার ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত নাৎসিদের নীতি ও কার্যক্রমের তীব্র ও ব্যাপক সমালোচনা করেন বহু যাজক সভায় এবং প্রবন্ধে। ১৯৩৮ সালে নাৎসি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে’ (বন্দিশিবির) পাঠায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত (১৯৪৫) তিনি সেই শিবিরে বন্দী ছিলেন। হিটলারের পরাজয় এবং মিত্র বাহিনীর বিজয়ের পর মুক্ত হয়ে তিনি ঘোষণা করেন যে, হিটলার ও তার নাৎসিদের বর্বরতার জন্য জার্মান জাতি সম্মিলিতভাবে দোষী, সে দায়িত্ব থেকে কেউ মুক্ত নন। ১৯৪৫ সালে লেখা তার কিছু পঙ্ক্তি আজো বিশ্বব্যাপী আলোচিত এবং উদ্ধৃত হয়। পঙ্ক্তিগুলো ছিল নিম্নরূপ :

‘প্রথমে ওরা কমিউনিস্টদের ধরতে এলো,/আমি প্রতিবাদ করিনি,/কেননা আমি কমিউনিস্ট ছিলাম না।/তারপর তারা এলো ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের পাকড়াও করতে,/ আমি কিছু বলিনি,/ কেননা আমি ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য ছিলাম না।/ এরপর তারা এলো ইহুদিদের গ্রেফতার করতে,/আমি কিছু বলিনি,/কারণ আমি ইহুদি ছিলাম না,/তারপর তারা ধরতে এলো ক্যাথলিকদের,/আমি প্রতিবাদ করিনি,/কেননা আমি ছিলাম প্রোটেস্ট্যান্ট।/সব শেষে তারা এলো আমাকে ধরতে,/কিন্তু তত দিনে আমার হয়ে প্রতিবাদ করার কেউ অবশিষ্ট ছিল না।’

হয়তো লক্ষ করেছেন নাৎসিরা একসাথে সব বিরোধী শক্তির ওপর হামলা করেনি। এক সাথে সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া মারাত্মক হতো তাদের জন্য। তখনকার জার্মানিতে অনেকেই কমিউনিজমকে ভীতির চোখে দেখত। সুতরাং কমিউনিস্টদের পাইকারি ধরপাকড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠেনি। জার্মান অর্থনীতির ওপর ইহুদিদের অনানুপাতিক প্রভাব বহু জার্মানের ক্রোধের কারণ ছিল। নাৎসিরা প্রচার শুরু করে যে, ইহুদিরাই কমিউনিজম ছড়াচ্ছে। তারপর ইহুদিদের গ্রেফতার করে বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়ায় সাধারণ জার্মান বরং খুশিই হয়েছিল। শিল্পপতিরা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে তাদের শোষণের পথের কাঁটা বিবেচনা করত। প্রভাবশালী শিল্পপতিরা ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের গ্রেফতারে অখুশি হয়নি।

রোম্যান ক্যাথলিক ধর্মমত জার্মান গির্জার মূল ধারা প্রোটেস্ট্যান্টদের চক্ষুশূল ছিল। কাজেই বিনা প্রতিবাদে ক্যাথলিকদের ধরে নেয়া হয়। শেষে দেখা গেল হিটলার ও নাৎসিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দূরের কথা, ভিন্ন মত প্রকাশের সাহসও কারো ছিল না। হিটলার গোটা জার্মান জাতিকে ক্রীতদাসের মতো নীরব কর্মীতে পরিণত করেছিলেন। নাৎসি বাহিনীর কোনো-না-কোনো শাখায় যোগ না দিয়ে জার্মান যুবকদের উপায় ছিল না। রাষ্ট্রের নির্বাচিত সুদর্শন ও সুস্বাস্থ্য ‘আর্য’ পুরুষের সাথে সঙ্গম করে নিখাঁদ ‘প্রভুর জাতি’ আর্য সন্তানের জন্ম দেয়া নারীদের নৈতিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হিটলারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র ইতস্তত ভাবও নাৎসিরা গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

আমি সাংবাদিকতা করছি ৬৪ বছর ধরে। সংবাদ ও তথ্যের বিশ্বরাজধানী লন্ডনে আছি ৫৪ বছর। ৩৪ বছর বিবিসিতে কর্মরত অবস্থায় আমার মূল কাজকারবার ছিল বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে। রাজনৈতিক আনুগত্য বলে আমার কিছু ছিল না। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য ছিল। বড় ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে তাকে আমি আজীবন মুজিব ভাই ডেকেছি, বড় ভাইয়ের মতোই ভালোবেসেছি। বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লীগ সরকারের দয়ায় ভণ্ড ও প্রতারক মুক্তিযোদ্ধা পথের কাঁকরের মতোই সর্বব্যাপী। তাদের কথা আমি বলছি না। আমি বলছি তাদের কথা যারা জীবনপণ করে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন। সৌভাগ্যবশত তাদের কেউ কেউ এখনো বেঁচে আছেন। একাত্তরে তাদের মতো আমারো ভূমিকা ছিল এবং সে ভূমিকার জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়ে মুজিব ভাই প্রকাশ্যে আমাকে পুরস্কৃত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

পাকিস্তান থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যে জনপ্রিয়তা জাতি তাকে দিয়েছিল একমাত্র কারামুক্ত নেলসন ম্যান্ডেলা ছাড়া আধুনিক ইতিহাসে তার আর কোনো তুলনা খুঁজে পাই না। গত বছরের শেষ প্রান্তে এসে ম্যান্ডেলা শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন। তার প্রয়াণে সারা বিশ্ব শোকে মুহ্যমান হয়েছে, অশ্রুপাত করেছেন অজস্র সহস্র মানুষ। অন্য দিকে শেখ মুজিবের মৃত্যু? আমি এবং আমার স্ত্রী ছাড়া এমন আর কাউকে জানি না যিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অশ্রুপাত করেছেন। এই বেদনাদায়ক বৈসাদৃশ্যের কারণ সৃষ্টি করেছেন তিনি নিজে।

শেখ মুজিব: অঙ্গীকার আর বাস্তবতা
গণতন্ত্রের কথা বলে বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন তিনি অর্জন করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হলে গণতন্ত্র আসবে, এ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তারা তার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ৯৩ হাজার সৈন্যের একটা অত্যাধুনিক ও সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বলতে গেলে খালি হাতে লড়াই করতে গিয়েছিল। কিন্তু মুজিব তাদের হতাশ করেছেন। ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, গণতন্ত্রকে অবাধে বৃদ্ধি পেতে না দিলে সে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হয়ে কিছু দুষ্ট লোকের পরামর্শে তিনি একদলীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে ভিন্ন মত দলনের সব প্রচেষ্টা শুরু করেন।

তার রক্ষীবাহিনী ১৯৭২-৭৩ সালে ৪০ হাজার সমালোচক ও ভিন্ন মত পোষণকারীকে হত্যা করেছিল। রক্ষীবাহিনীর অধিপতি বর্তমান বিতর্কিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীপদে আসীন আছেন এবং ঘন ঘন রাজনৈতিক বিরোধীদের ‘নির্মূল’ করার হুমকি দিচ্ছেন। তিনি কথায় কথায় সমাজতন্ত্রের জপ করতেন। বাংলাদেশের সংবিধানেও সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রাদর্শের অন্যতম খুঁটি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ বিশেষ একটা শ্রেণীর কুক্ষিগত করার এমন সুযোগ পাকিস্তানি আমলেও ছিল না।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও অন্তত এক ডজন উপলক্ষে একান্তে মুজিব ভাইয়ের সাথে কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ কিংবা আবদুর রাজ্জাক (প্রয়াত) প্রায় অনিবার্যভাবেই এসব সাক্ষাতের সময় উপস্থিত থাকতেন। অনেক সুপরামর্শ আমি তাকে দিয়েছি। হয়তো ওই দুই নেতার পরামর্শেই তিনি আমার প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেননি। প্রকাশ্যে আমি প্রথম তার সমালোচনা করি ১৯৭৪ সালে লন্ডন বিমানবন্দরে। বাংলাদেশে জরুরি ক্ষমতা আইন ও পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ করা নিয়ে ফিট স্ট্রিটের প্রায় দুই ডজন সাংবাদিকের উপস্থিতিতে আমাদের উষ্ণ বাদানুবাদ হয়।

আমার প্রায়ই মনে হয়, যে চক্রটি ১৯৭২-৭৫ সালে ভুল পরামর্শ দিয়ে এবং কুপথে পরিচালিত করে শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বনাশ অনিবার্য করে তুলেছিল সে চক্রটি মুজিবের সাথে কবরে যায়নি [খুবই দুঃখের কথা]। মুজিব ভারতবান্ধব ছিলেন। ভারতের সহযোগিতায় স্বাধীনতা লাভের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে আগরতলা গিয়েছিলেন তিনি। একটি গণ-অভ্যুত্থান না হলে পাকিস্তানিরা নিশ্চয়ই দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তাকে ফাঁসিতে লটকাত।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর হাতে ভাত খেতে রাজি হননি। তাজউদ্দীন একাত্তর সালে দিল্লির সাথে যে সাত দফা চুক্তি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত অনুরোধ সত্ত্বেও মুজিব সে চুক্তি মানতে রাজি হননি। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছিলেন, দিল্লির দাবি অনুযায়ী বিডিআর বাহিনীকে ভেঙে দিতে এবং বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির দায়িত্ব ভারতের হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করেছিলেন। মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা যে পিতার নীতির বিরোধিতা করে চলেছেন, তার কারণ খুব সম্ভবত পিতার মতো তার নীতি ও কার্যও নিয়ন্ত্রণ করছেন এমন ব্যক্তিরা যারা তার পিতারও সর্বনাশ করেছিলেন।

মনে রাখতে হবে মুক্তিযুদ্ধের সময় দিল্লির নীতিনির্ধারকেরা ধরে নিয়েছিলেন পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা কিছুতেই শেখ মুজিবকে জীবিত স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসতে দেবে না। সে জন্য তারা বাংলাদেশের জন্য নেতৃত্ব তৈরির উদ্যোগ নিলেন। ভারতে তাদের আশ্রিত কয়েকজন অপেক্ষাকৃত তরুণ আওয়ামী লীগ নেতাকে নিয়ে মুজিব বাহিনী গঠন করেন এবং সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য তাদের ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে পাঠান। অবশ্যই ধরে নিতে হবে তারা বরাবর দিল্লির প্রতি অনুগত থাকবেন বলে তাদের কাছ থেকে মুচলেকা আদায় করে নেয়া হয়েছিল। অদৃষ্টের পরিহাস, তাদের প্রশিক্ষণের মাঝপথেই জীবিত মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলেন। একটা কম জানা ঐতিহাসিক ঘটনার কথা এখানে আগ্রহজনক হতে পারে। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুজিব যখন পাকিস্তান থেকে লন্ডনে আসেন, তখন তাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইন্দিরা গান্ধী একটি ভারতীয় এয়ারলাইনার পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি এবং আমরা কয়েকজন ভারতীয় বিমানে দেশে না যাওয়ার পরামর্শ তাকে দিয়েছিলাম এবং মুজিব আমাদের পরামর্শ নিয়েছিলেন।

অধিকার আর মর্যাদাহানি রোবোট তৈরি করে
আলোচনা শুরু করেছিলাম জার্মানির প্রসঙ্গ দিয়ে। হিটলারের নাৎসিরা যেসব কৌশলে জার্মান জাতির মানবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে তাদের ‘অটোমেটনের’ (রোবটের মতো স্বয়ংক্রিয়) মতো যুদ্ধযন্ত্রে পরিণত করেছিল সে দিকে আলোকপাত করাই ছিল উদ্দেশ্য। মানুষের মানবাধিকার যদি হরণ করা হয়, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার যদি পদদলিত করা হয়, আর তাদের আত্মমর্যাদা যদি কেড়ে নেয়া হয় তাহলে পশুর সাথে সে মানুষের বিশেষ কোনো তফাত থাকে না। মেষপালক কিংবা রাখাল যেমন তাদের পশুগুলোকে যদৃচ্ছ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, গণতন্ত্র মানবাধিকার ও আত্মমর্যাদা হারানো মানুষকেও তেমনি দুরভিসন্ধি ব্যক্তি আত্মস্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। হিটলার ও মুসোলিনি ঠিক তাই করেছিলেন। তার পরিণতি যে বিশ্বজোড়া সবার জন্যই অশুভ হতে বাধ্য সেটা বিবেচনা করার ধৈর্য কিংবা সময় তাদের ছিল না।

বিচারবুদ্ধির সীমা কিংবা দৈন্য থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু দীর্ঘ কর্মজীবনে বিশ্বপরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ থেকে ত্রিশের দশকের জার্মানি আর বর্তমান বাংলাদেশের মধ্যে হুবহু মিল আমি দেখতে পারছি, আর দেখে আতঙ্কিত হচ্ছি। হিটলারের অপকৌশল অনুকরণ করে বাংলাদেশের মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্রীতদাসে পরিণত করার সঙ্কল্প নিয়েই কি ২০০৯ সালে একটা সরকার যাত্রা শুরু করেছিল? তা না হলে আজ আমরা যেখানে পৌঁছেছি তার ব্যাখ্যা কোথায় খুঁজে পাবো?

ছিয়ানব্বইয়ে তো জামায়াত যুদ্ধাপরাধী ছিল না!
নিউ ইয়র্ক আর ওয়াশিংটনে ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আলকায়েদাদের সন্ত্রাসের পর পশ্চিমে, বিশেষ করে আমেরিকায় ইসলামি সন্ত্রাস সম্বন্ধে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বলতে গেলে তারা রজ্জুতে সর্পভ্রমের মতো এবং পঞ্চাশের দশকে ‘খাটের নিচের লুকোনো’ কমিউনিস্টদের মতো সর্বত্র ইসলামি সন্ত্রাস আবিষ্কার করতে থাকে। এ দিকে ভারতের শাসক চক্র ধরে নিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ যে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য অংশ এবং বাণিজ্যে ভারসাম্য স্থাপনের দাবি করে, সীমান্তে বিএসএফের উৎপাত বন্ধ করতে বলে, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয়দের জমি দখল ও ফসল লুণ্ঠনের অবসান চায়, এগুলো ‘জামায়াতের অপরাধ’। তারা বাংলাদেশের মানুষকে ভারতের প্রতি বৈরী করে তুলছে বলেই এমনটা হয়। শেখ হাসিনার দ্বিতীয় দফার সরকারে নিশ্চয়ই এমন অতিচালাক কেউ ছিল যারা ধরে নিয়েছিল যে, পাইকারিভাবে ধর্মভীরু মুসলমান ও জামায়াতের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে, ওয়াশিংটন আর নয়া দিল্লির অনুগ্রহ পাওয়া যাবে একই সাথে।

জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইতিহাস যারা জানেন তারা হঠাৎ করে জামায়াতকে সন্ত্রাসবাদী বলে ফতোয়া দেয়ার আর কোনো কারণ খুঁজে পাবেন না। সামরিক স্বৈরশাসক লে. জে. এরশাদ ১৯৮৬ সালে লোকদেখানো সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতসহ ছয় দলের জোট সে নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রাতারাতি জামায়াতকে দলে ভিড়িয়ে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন যে, তারা এরশাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে শেখ হাসিনা আন্দোলন করেছিলেন জামায়াতকে সাথে নিয়ে। মনে পড়ে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও অন্যান্য জামায়াত নেতার পাশে বসে শেখ হাসিনার আন্দোলনের কলাকৌশল নিয়ে আলোচনার আলোকচিত্র মিডিয়ায় দেখেছিলাম। ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক গরিষ্ঠতা পায়নি। শেখ হাসিনার তখন মনে হয়নি যে, একাত্তরে জামায়াতের কোনো কোনো নেতা যুদ্ধাপরাধী ছিলেন কিংবা জামায়াত একটি জঙ্গি দল। বাংলা প্রবাদে বলে ‘কাজের সময় কাজী, কাজ ফুরালে পাজি’।

ধর্মীয় চরমপন্থী আমি নই এবং কখনো ছিলাম না। আমার ধারণায় বাংলাদেশের ৯৮-৯৯ শতাংশ মুসলমানই ধর্মীয় উগ্রপন্থী নন। সুতরাং ‘ধর্মীয় চরমপন্থী’ আখ্যায়িত করে এবং হেজবুত তাহরীর কিংবা জেএমবি অপবাদ দিয়ে হাজারে হাজারে টুপি-দাড়িওয়ালা এবং মসজিদে নামাজ পড়া মানুষকে পাইকারি ধরপাকড় করা হলে ‘আলট্রা সেকুলারিস্টদের’ আপত্তি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমেরিকা ও ভারতের স্বল্পবুদ্ধি সাধারণ মানুষের বাহবা পাওয়া যায় তাতে। দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল ৪৩ বছর আগে। সে যুদ্ধে ভ্রান্তমতির কিছু লোক পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য আঁকড়ে ধরেছিল। তাদের কেউ কেউ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে নির্বংশ করার চেষ্টা করেছে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। তাদের বিচারের তাগিদ সার্বজনীন। দেশের মানুষের আবেগের ঝড় তুলে বুদ্ধিজীবী হত্যার কিংবা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বকে (এবং বিএনপিরও দু’জনকে) বিতর্কিত আদালতে বিতর্কিত বিচারে চড়ানো হলো; কিন্তু যেসব যুদ্ধাপরাধী মুজিব কোট পরে রাতারাতি আওয়ামী লীগার বনে গেলেন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সাথে আত্মীয়তা পাতালেন, বিচারের আওতা থেকে তারা বাদ পড়লেন। এটা সমর্থন করি কী করে?

বাংলাদেশ কি জঙ্গি দেশ?
জামায়াতকে ইসলামি সন্ত্রাসী বলে মেনে নিতে মার্কিন সরকারও রাজি হয়নি। তাতে কী? মনমোহন সিং তো মনে করেন যে, জামায়াত বাংলাদেশের মানুষকে ভারতের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন করে তুলছে। সুতরাং আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করাও, শাহবাগে বিভ্রান্ত তরুণদের দিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলো, তাহলেই ঢাক পেটানো যাবে যে জামায়াত জঙ্গি দল, তাকে নিষিদ্ধ করতে হবে। জঙ্গিদের কারা মসজিদে নামাজ পড়তে যায় দেখার জন্য মসজিদে আওয়ামী লীগের গুণ্ডাদের পাঠানো হচ্ছে। তারা মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট করছে। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। এই সরকার বিশ্বব্যাপী ধারণা সৃষ্টি করছে যে, তারা সবাই জঙ্গি এবং বাংলাদেশ একটি জঙ্গি দেশ।

ইদানীং একই ব্র্যাকেটে বিএনপিকেও অন্তর্ভুক্ত করার জোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির প্রতি কটাক্ষ করে বলেছেন, জঙ্গিদের দোসরদেরও ছাড় দেয়া হবে না। খালেদা জিয়া কথা বললে মাহবুব-উল আলম হানিফ সন্ত্রাসের গন্ধ পান। মন্ত্রী হাছান মাহমুদ সকাল-সন্ধ্যা যেভাবে খালেদা জিয়ার নাম জপ করছেন, সে রকম ঐকান্তিকতা নিয়ে আল্লাহর নাম জপ করলে তার জান্নাতবাসী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেত। তিনি বিএনপি ও জামায়াতের নাম জপ করছেন একই দমে। ভারতের দুই নম্বর প্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু বলেছেন, জামায়াতশিবির নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত সংসদ নির্বাচন হবে না। অন্য কোনো কোনো মন্ত্রী বিএনপিকেও নির্মূল করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। ইতোমধ্যে মোনাফিকি এবং ফেরেববাজি করে জাতীয় পার্টিকেও প্রায় নির্মূল করে ফেলা হয়েছে। এ দলটি এখন নিছক শেখ হাসিনার ‘ডোমেস্টিকেটেড অপোজিশন’। রওশন এরশাদ এখন এরশাদকে ছেড়ে হাসিনার প্রেমে মজেছেন।

সার কথা হচ্ছে, দেশে যাতে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল না থাকতে পারে সে ব্যবস্থা অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে সরকার। যেমন করে জার্মানিতে নাৎসি দল আর আর সব রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এ দেশের মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়েছে কি? আমার মনে হয় না। অন্যকে গুম করে খুন করা হয়েছে, সে তো আমার ভাই-বেরাদর কিংবা আমার দলের কেউ নয়। রুনি-সাগর কিংবা মাহমুদুর রহমানও তো আমার আত্মীয় নন। অন্যের দল বিলোপ করা হচ্ছে, তাতে আমার কী? তাতে হয়তো আমার দলেরই সুবিধা হবে। শাসক দলের গুণ্ডারা অন্যের জমি দখল করে নিচ্ছে, অন্যের মেয়েকে ধর্ষণ করেছে, তাতেও আমার বিশেষ কিছু এসে যায় না। শুধু আমার গায়ে হাত না পড়লেই হলো। কিন্তু আমার গায়ে যে দিন হাত পড়বে সে দিন প্রতিবাদ করার, আমার পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য কেউ অবশিষ্ট থাকবে কি? নায়েমোলারের মতো আজ আমারো মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, সে জন্য আমরা সবাই সমানে দোষী।

লেখক: বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান