পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান

lines_by_jfkpaint_portrait

নাজমুল আলম সিজার

নাজমুল আলম সিজার

প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জ। এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত পেতে রাখা প্রতিটি চেয়ারই আমন্ত্রিত দর্শকে ভর্তি। সাংবাদিক ভাইয়েরা স্টেজের দু’পাশে, দর্শকদের সারির ধার ঘেঁষে দাঁড়ানো। তাদের কারো-কারো হাতে ক্যামেরা, তো কারো হাতে রাইটিং-প্যাড। ঘরের ভেতর গমগমে অবস্থা। আয়োজকরা ভাবতেও পারেননি যে এধরনের অনুষ্ঠানে এতো মানুষ হবে। নইলে “ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ইন্সটিটিউড” অথবা “বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র” ভাড়া নেয়ার ব্যবস্থা করা যেতো।

স্টেজেও দু’সারি আসন। প্রধান অতিথি আর বিশেষ অতিথিদের সাথে স্পন্সর কোম্পানির অফিসারবৃন্দ একপাশে, আর ডায়াসের অপর পাশটায় পুরস্কার গ্রহীতাদের বসার আয়োজন। পেছনের দেয়াল ঘেঁষে অ্যানাউন্সার এবং ভলেন্টিয়ার। অর্থাৎ একেবারে ঠাসাঠাসি অবস্থা। রুমটায় এখন তিল ধারণের স্থান আর নেই। নিঃশ্বাস নেয়াই যেন দায় হয়ে পড়েছে। অথচ লোক আসা এখনও শেষ হয়নি। কাচের দরজা বরাবর ইতোমধ্যেই আরও জনাদশেক এসে দাঁড়িয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে বিরক্তি আর অস্বস্তির ভাব। ভিড় দেখে কেউকেউ হয়তো ভাবছেন ফিরে যাবেন কিনা। দেরিতে আসায় সীট পাননি বলে একেকজনের মুখ বেজার। তবে নিচতলা থেকে বেঞ্চ আনার ব্যবস্থা হচ্ছে।

সুতরাং এ অবস্থায় দেরি করারও কোনো অবকাশ নেই। তাই যথাসময়ের সামান্য পরেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। প্রথমেই উদ্বোধনী ভাষণ ; সাথে অনুষ্ঠানসূচির ঘোষণা। প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী। বিশেষ অতিথি হিসাবে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত ভাইস চ্যান্সেলর। অর্থাৎ প্রোগ্রাম জমজমাট। প্রথম শ্রেণীর মর্যাদাভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে অনুষ্ঠানটিতে আর কোনো ফাঁক নেই।

নাম-ঘোষণা অনুযায়ী বক্তারা একেএকে উঠে এলেন। স্ব-স্ব বিদ্যা এবং রুচি মাফিক আপন-আপন বক্তব্য পেশ করলেন। আর স্বভাবতই জনসমাগম দেখে সবার বক্তব্য প্রস্তুতির তুলনায় একটুখানি লম্বাই হয়ে গেল।

সব শেষে মন্ত্রী মহোদয়ের মূল্যবান ভাষণ। হাস্যরসিক বিশালবপু মানুষ তিনি। বলেনও ভালো। ইংরেজি-বাংলা দুটোতেই সমান পারদর্শিতা। এমনকি কোনটা মাতৃভাষা আর কোনটা বিদেশিভাষা, সেইটাই বরং বুঝা মুশকিল। যাই হোক, তাঁর ভাষণের পর দিয়েই পুরস্কার বিতরণীর প্রোগ্রাম। এবার মোট পাঁচজনকে পাঁচটি বিষয়ের উপর পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। কবিতা, উপন্যাস, ভাষ্কর্য, জনসেবা এবং শ্র্রেষ্ঠ শিল্প-উদ্যোক্তা। শেষেরটাই প্রধান। কেননা যাবতীয় ব্যয় তিনিই বিয়ার করছেন। অলিখিত চুক্তি হয়েছে গোপনে। কারণ প্রবাসী এই ভদ্রলোকের একটা সার্টিফিকেট দরকার। এটা দিয়ে তিনি নাকি বিদেশের মাটিতে কী এক বিরাট দাও মারবেন। অতএব মানি ইজ নো প্রবলেম। আর না-চাইতেই যা দিয়েছেন, তাতে খরচপাতি বাদ দিয়েও অর্ধেকের বেশি থেকে যাবে আয়োজকবৃন্দের হাতে। তবে তিনি ব্যতিরেকে বাকি আর যে চারজনকে সিলেক্ট করা হয়েছে সেগুলোতে অবশ্য কোনো ভেজাল নেই Ñ স্ব-স্ব বিষয়ে তাঁরা সবাই যোগ্য, এবং অবশ্যই গুণী মানুষ। তাছাড়া তাঁদের মতো গুণবান কাউকে হাজির করাতে না পারলে তো অনুষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতাই সৃষ্টি হতো না। সুতরাং এটাও এক ধরনের বাণিজ্য। বলা যায় অভিনব ব্যবসা। এ ব্যবসা ডিস্ট্রিক্ট লেভেল থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত বিস্তৃত। অতএব সারা দুনিয়া জুড়ে পুরস্কারের ভেতর এখন আর নিরেট সম্মাননা বলে কিছু নেই। এগুলোর সাথে অবশ্যই জড়িত থাকে কারো-না-কারো স্বার্থ অথবা কোনো-না-কোনো অর্থ। কোথাও-কোথাও আবার দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা গোষ্ঠীগত গুরুত্বই প্রাধান্য পায়।

তবে, থাক এখন সেকথা। কারণ ঘোষকের অনুরোধে কবি আল মাহমুদের পর এবার অনুভূতি ব্যক্ত করতে ডায়াসের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন বছরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসিক কথাশিল্পী আহমেদ ফয়েজ। গুণধর এ মানুষটির আসল নাম হচ্ছে ফয়েজ আহমেদ। লেখক-লেখক ভাব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে শুভাকাক্সক্ষী বন্ধুরা শব্দদুটোকে জাস্ট আগপিছ করে দিয়েছিলেন কোনো এক সময়ে। নামের আগে প্রথম দিকে “চৌধুরী” শব্দটাও লাগানো হয়েছিলো। কিন্তু নিতান্ত সজ্জন ব্যক্তি বলে এটিকে তিনি খুব শিগগীর নিজ থেকেই বাদ দিয়ে ফেলেছেন। মাঝবয়সি, বেঁটেখাটো চেহারা ভদ্রলোকের। বোকা-বোকা ভাব সারাটা মুখ জুড়ে। পোশাক-আশাকেও দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট।

অযথা দেরি না করে বুক পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করলেন তিনি। তারপর মাউথপিসে ফুঁ দিয়েই নিজের বক্তব্য শুরু করে দিলেন। এবং সেটা এইভাবেঃ

‘মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, মঞ্চে আসীন বিশেষ অতিথিবৃন্দ, কর্মব্যস্ত কলাকুশলী এবং আমার সাংবাদিক ভাইয়েরা সহ সামনে উপবিষ্ট সম্মানিত দর্শকম-লী। সবাইকে আমার আন্তরিক সালাম ও মোবারকবাদ। বিশালায়তন এই অট্টালিকায়, অত্যাধুনিক এমন এক অডিটরিয়ামে, এবং মঞ্চে আসীন এতো গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, আর বিপুল সংখ্যক দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিতে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলার সুযোগ পেয়ে আমি আজ আনন্দিত। একই সাথে যার-পর-নাই গর্বও অনুভব করছি মনেমনে। এবং আমাকে এহেন একটি দুর্লভ সুযোগ দানে বাধিত করার জন্য আয়োজকবৃন্দের প্রতিও জানাচ্ছি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। সত্যি, বড় আনন্দের দিন আজ। বড় ঈর্ষাকাতরতার ক্ষণ এটা ! কিন্তু তারপরও বুকের গহীনে কোথাও যেন একটা দুঃখ-দুঃখ স্রোত বয়েই চলেছে। বেজে চলেছে বেদনার রাগিনী Ñ বেহালার অতি সকরুণ সুর। কারণ যে-বিষয়টির উপর আমাকে এখানে Ñ মানে এই জমজমাট মিলনায়তনে Ñ পুরস্কার দেয়া হবে বলে ডেকে আনা হয়েছে, সেটি আজ মিউজিয়ামে রাখার মতো একটা পরিত্যক্ত বস্তুই বটে। কারণ এর চল্ সমাজে এখন আর মোটেও সমাদৃত অবস্থায় নেই। এ জিনিস বহু আগেই পুরনো হয়ে গেছে, বাসি হয়ে পড়েছে। আর সেজন্যেই, মানে সেকারণেই আনন্দঘন এই মুহূর্তের মাঝেও আমার কেন যেন মনে হচ্ছে যে, বড় দেরি করে জন্মলাভ করেছি আমি পৃথিবীর এই বুকে। কেননা যে জিনিসটি নিয়ে আমার চর্চা, অর্থাৎ যে বিষয়ের ওপর আমার সাধনা বা চেষ্টা Ñ তার কারিশমা তো শেষ হয়ে গেছে আরও পঞ্চাশ বছর আগেই। চলমান এই বিশ্বে তথাকথিত সেই উপন্যাসের Ñ আই মিন Ñ কথাসাহিত্যের সেই কদর এখন আর অবশিষ্ট নেই। আপনারাও হয়তো আমার সাথে এ ব্যাপারে একমত হবেন কেউকেউ। কেননা ভাষার কারুকার্য কিংবা এর গভীরতা, ভাব ও শব্দের বুনন অথবা বিষয়ভিত্তিক বর্ণনার ছন্দবদ্ধতা এখন অবশ্যই আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবার মতোই একটা সাবজেক্ট মাত্র।’

এই পর্যন্ত এসে লেখক সাহেব দর্শকুলের এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত নিজের ব্যথিত দৃষ্টি একবার সযতনে বুলিয়ে নিলেন। এসময় তাঁর ভাব দেখে মনে হলো যেন আরও কঠিনকিছু, মানে বিশেষকিছু বলবেন এবার ; এটা যেন তারই একটা সঘন প্রস্তুতি।

‘হ্যাঁ। ভাইয়েরা আমার,’ বলে তিনি শুরু করলেন আবার। এবং কিছুটা রুক্ষèভাবেই। ‘যদি আমার কথা আপনাদের বিশ্বাস না হয়, তাহলে বাজার থেকে চলতি উপন্যাসের একটা বই কিনে আনুন। এনে দেখুন কী তার হালচাল। হাতে নিলেই বুঝতে পারবেন কতো ভগ্নদশা সেটার। এই এতটুকু তার সাইজ। টেনেটুনে ফর্মা তিন অথবা চার ; আর খুব বেশি হলে বড়জোর পাঁচ না-হয় সাড়ে পাঁচ। তাও সামনে থেকে নয় কিংবা এগারোটা পৃষ্ঠা নেই। নেই মানে হাবিজাবি অন্যকিছু আরকি। তবে পেপার-ব্যাক হলে তখন অবশ্য অন্য কথা। পৃষ্ঠা ভরাতে পারলেই তো পয়সা। সেজন্যে ইয়া বড়বড় অক্ষর, ফাঁক-ফাঁক লাইন। প্রতিটি বাক্যই একেকটি প্যারা।’

দর্শকদের ভেতর এসময় একটা হালকা হাসির হুল্লোড় উঠলো। তিনিও তাই স্বস্তি বোধ করতে লাগলেন।

‘আসলে ভায়েরা আমার, দিন তো বদলে যায় Ñ যুগও পাল্টে যায়। পরিবর্তন জিনিসটাই নিয়তির একটা অমোঘ, অলঙ্ঘনীয় নীতি। একে রুখে দেবার সাধ্য কারো নেই। হয়তো সেজন্যই উপন্যাসগুলোর আজ এই দুরাবস্থা Ñ মানে কঙ্কালসার চেহারা। সুতরাং সেগুলোতে যখন চোখ বুলাই আমি, তখন ভীষণ কষ্ট হয় বুকে। তবে উপন্যাস ছোট হলেই যে খারাপ হবে, তা কিন্তু আমি বলছি না। কারণ এমন অনেক ভালোভালো উপন্যাসের উদাহরণ এই পৃথিবীতে আছে আকারে যেগুলো অত্যন্ত ছোট। সুতরাং সাইজ নিয়ে আমার তর্ক নেই। আমার শুধু ভাবতে অবাক লাগে যে, যে-উপন্যাসে নানাবিধ শব্দের বহুবিধ ব্যবহার নেই ; বাক্যগঠনের চমৎকারিত্ব নেই, প্যারার পর প্যারা সাজানোর টেকনিক নেই, নেশা নেই Ñ সে-উপন্যাস আবার উপন্যাস হলো কিভাবে ? সেটি যেন আমার বুঝেই আসে না। দুঃখে শুধু বুকটা ফেটে যায়। মন জারজার হয়। কারণ এসব উপন্যাস সময়ের একটা সামান্য স্তরকেই ধরে রাখতে অক্ষম ; কালকে ধারণ করার কোনো শক্তিই যেন তার মধ্যে নেই। এগুলোর ভেতরে দর্শন, সমাজের সমকালীন বিশ্লেষণ কিংবা মানবিক আবেদন-নিবেদনের কিছুই খুঁজে পাবেন না। ভূ-জগতের রূপ-রস-গন্ধও সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত এগুলোতে। পাতার পর পাতা উল্টিয়ে যাবেন Ñ দেখবেন কোনো নিসর্গ নেই, প্রকৃতি নেই। আলো নেই, বাতাসও নেই ; মেঘ-বৃষ্টি-নদীনালা কিছুই নেই। মনের চাওয়া বা পাওয়া, আবেগ বা অনুরাগের বিচ্ছুরণ এগুলোতে খুঁজতে যাওয়াটাই যেন বোকামি। ভাব ও ভাষার সরস-বিরস বিবরণও সেগুলোর মাঝে নেই। শিল্পসিঞ্চিত উপমা কিংবা মনমাতানো বিশেষণ থেকে এর শীর্ণ শরীর লজ্জাজনকভাবে উলঙ্গ।’

কথার এই ফাঁকে এবার তাঁকে খানিকটা ক্লান্ত দেখালো। তিনি একটুখানি বিরতি দিয়ে মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথিবৃন্দের দিকে সহানুভূতির প্রত্যাশায় ঘাড় বেঁকিয়ে তাকিয়ে নিলেন। দর্শকসারিতে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা।

‘বন্ধুগণ, প্রথমেই বলেছি, যুগ পাল্টে যায় Ñ দিন বদলে যায়। একেক যুগের চাহিদাও একেক রকমের হয়। সুতরাং আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না ; কিংবা কাউকে খাটো করে দেখার অভিপ্রায়ও আমার নেই। আমি শুধু তুলে ধরছি দিন বদলের ধারা। দোহাই লাগে, আমাকে ভুল বুঝবেন না যেন।’ তাঁর স্বর অনুনয়ের ভঙ্গিতে এসময় খাটো হয়ে এলো।

‘মানুষের কথা কী আর বলবো, ভাই Ñ আমার পরিবারের ভেতরেই তো বেহাল অবস্থা। আমার ছেলেমেয়েরাই বিমল জানে না, শংকর চেনে না ; শরৎ’এর বইও ধরে না তারা। এই তো সেদিন আমি নিজে সুনীলের “সেই সময়” পড়লাম আবার। আহা, কী শক্তি উপন্যাসের ! কী বিন্যাস তার ভাব আর ভাষার ! একটা শতাব্দিকে, বন্ধুগণ Ñ হ্যাঁ, পুরো এই ভারতবর্ষটাকেই যেন বেঁধে ফেলা হয়েছে ঐ একটা বইয়ের মধ্যে ! কী বিশালত্ব সেই উপন্যাসের ! মৈত্রেয় দেবীর “ন হন্যেতে”, সমরেশের “কালবেলা” কিংবা বুদ্ধদেবের “একটু উষ্ণতার জন্যে” যখন প্রথম পড়েছিলাম, বিশ্বাস করুন Ñ ঘুমুতে পারিনি সারারাত। শুধু মনে হচ্ছিলো কী পড়লাম, মনের কী ব্যঞ্জনা শুনলাম ! ভেবে-ভেবে তাই আকূল হয়েছিলাম ! যাযাবরের “দৃষ্টিপাত” কি পড়েন নাই আপনারা ? রাজবংশীর সেই “মরুতীর্থ হিংলাজ” ? কোথায় গেল, ভায়েরা আমার Ñ কোথায় হারালো সেইসব বই আজ ? এখন তো আমার আলমারি এতিম হয়ে গেছে। কেঁদে-কেঁদে সেটা প্রতিনিয়তই অস্থির হচ্ছে Ñ হতাশার আবেশে ঝিমিয়ে পড়ছে বারবার। কারণ আমার প্রজন্ম সেদিকে তাকায়ই না, হাতে ধরে নাড়াচাড়া করা তো দূরের কথা। তবে তারা যে একেবারেই বই পড়ে না, এমন নয় ; তারাও বই পড়ে। কিন্তু সেটা অন্যকিছু। কী পড়ে, শুনবেন ?’ মাউথপীসটাকে আঁকড়ে ধরে তিনি এবার যেন নিজের পতন ঠেকাতে চাইলেন। নাকের বাঁশিতেও অবজ্ঞার যাতনা। চোখের কোণে হেঁয়ালি।

‘তারা পড়ে “হ্যারি পটার”, “তিন গোয়েন্দা”। তাদের হাতে থাকে “হিমু”। হিমু আর মিশির আলীর জন্যে তো দোকানে-দোকানে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। ঠেলাঠেলি থামানোর জন্য মাঝেমধ্যে পুলিশও ডাকতে হয়।’ বলেই মাউথপীস ছেড়ে খানিক সোজা হলেন ভদ্রলোক। দৃষ্টিতে তখন ঘোর অন্ধকার।

‘আমি কিন্তু কাউকে খাটো করছি না, বন্ধুগণ। নতুনদের আগমনে আমার কোনো ঈর্ষাও নেই। আমি শুধু ব্যক্ত করতে চাচ্ছি আমাদের হারানোর বেদনাগুলিকে। বলতে চাচ্ছি, যুগ পাল্টে যায় Ñ সময় বা দিনের বদল হয়। সুতরাং কোনো দোষ নেই লেখকের। ভুলও তাঁরা করছেন না কেউ। পাঠক যা চায়, তাঁরা তো তা-ই লিখবেন Ñ নাকি ? আমার মতো মিউজিয়ামের বস্তু নিয়ে কেন ঘাঁটাঘাঁটি করতে যাবেন তাঁরা, বলুন ? পাঠকরা তো এখন বর্ণনা চায় না ; তারা চায় শুধু ঘটনা, কাহিনী Ñ শুধুই জিস্ট। আইলাম, গেইলাম, খাইলাম Ñ ইত্যাদি ধরনের শর্টকাট কাসুন্দি। ব্যস্। ভাষার প্যাঁচালি শোনার সময় বা রুচি কোনোটাই যে তাদের নেই। থাকার কথাও নয়। সুতরাং দোষ কেন দেবো লেখকদের ? যুগের স্রোতে পাঠকরাই তো বদলে যান, বদলে যাচ্ছেনও। কারণ এটিই হলো বিবর্তনের দাবি। সময়ের চাহিদা। এককালে পুঁথি ছিল ; জারি-সারি-পালাগান ছিল। তারপরে এলো যাত্রা। এখন সে-জায়গা দখল করে নিয়েছে সিনেমা-নাটক। তবে এগুলোও একদিন থাকবে না। অন্যকিছু আসবে এর স্থলে। কেননা পৃথিবীটা নিজেই পরিবর্তনশীল। অত্যন্ত দ্রুত গতি তার, সময়কে আবর্তন করার।’ বলতে-বলতে চোখের চশমাটা সোজা করে নিলেন বেচারা।

‘সুতরাং ভাইয়েরা আমার, উপন্যাস আর উপন্যাস রূপে নেই। ডিজিটাল আবহাওয়ায় পাল্টে গেছে তার আদল। বদলে গেছে যাবতীয় ব্যাকরণ। এগুলো এখন মঞ্চ-নাটকের লেখ্যরূপ মাত্র। সেজন্যেই আমি তার নাম দিয়েছি “নাট্যাপোন্যাস”।’ বলেই তাকালেন কুঁজো হয়ে। ‘একই অবস্থা সঙ্গীতেও। বরং আরও ভয়াল সিচুয়েশন সেখানে। কানে এয়ারপীস লাগিয়ে ছেলেমেয়েরা কী শুনছে আজকাল, আপনারাই বলুন ? নজরুল-রবীন্দ্র আছে সেখানে ? ভাটিয়ালি-পল্লীগীতি আছে ? নেই। এমনকি সনাতনী আধুনিকও পাবেন না। কবর হয়ে গেছে উচ্চাঙ্গ আর মেলোডিরও। চলছে শুধু সিঙ্গেল বীট। কান ঝালাপালা করা ব্যান্ড। ভয়ানক চিৎকার ! কথার চাইতে বাজনা বেশি, বাজনার চাইতেও নাচ বেশি।’ এই কথায় হাসির একটা ঢেউ বয়ে গেল সারা হল জুড়ে।

তবে থেমে নেই ভাষণ। ‘প্রিয় ভাই ও বোনেরা, মাইকেল জ্যাকশন আর সাকিরা মিলে কিভাবে তোলপাড় করে চলেছে দুনিয়াটা, দেখছেন না ? নিজেরাই তো সাক্ষী এসবের। অথচ স্বয়ং মেহেদি হাসান আর জগজীদ শিংকে এনে গজল সন্ধ্যা লাগান একবার। একটা রুমও ভরবে না। বয়াতিদের আসর নাকি বসেই না আজকাল। সারা সপ্তাহ মাইকিং করেও মোটে দু’পাঁচশো লোক। কিন্তু নিয়ে আসেন মিলাকে, ডাকেন মেহরীন কিংবা আইয়ুব বাচ্চুকে। দেখবেন তখন আসল কারিশমা। স্টেডিয়ামে জায়গা দিতে পারবেন না। দর্শক সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে লাখ। বিকাল থেকেই ঢল নেমে যাবে মানুষের।’

কথাটা শুনে খানিক মুচকি হাসি দিয়ে একটা অস্পষ্ট ধরনের খ্যাসখ্যাসে ধ্বনি তুললেন মাননীয় মন্ত্রীবর। লেখক সাহেব তখন পুরো ফর্মে। কোনোদিকেই আর খেয়াল নেই তাঁর। কথাশিল্পের ভেতর যেন পুরোই সেঁধিয়ে গেছেন।

‘এইটাই স্বাভাবিক। কারণ যুগটাই তাদের, আমাদের নয়। যা-হোক, আমি এতোক্ষণ উপন্যাস আর গানের কথাই শুধু বললাম, কিন্তু কবিতার অবস্থাটা যে আরও মারাত্বক। বন্ধুগণ, চারিদিকে শুধু কবি-কবি ভাব অথচ কবিতার বড়ই অভাব। আমার একটু আগেই মাইকের সামনে এসেছিলেন কবি আল মাহমুদ। আমাদের শ্রদ্ধেয় মাহমুদ ভাই। ঐ যে বসে আছেন Ñ পক্ককেশ বৃদ্ধ এখন। খুব সম্ভব তিনিই আমাদের সেইসব প্রজন্মের শেষ বাতি। এ বাতি নিভে গেলেই আমরা আঁধার হয়ে যাবো, বন্ধুগণ। ঝুপ করে গভীর তিমিরে তলিয়ে যাবো। তিনি লিখেছিলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় এখন ডাকাতের গ্রাম।” আহ্, কতো শক্তি ঐ কবিতার ! কী দ্যোতনা শিক্ষাঙ্গনের এই রূঢ় বাস্তবতার ! একটা মাত্র পঙতি, বন্ধুগণ Ñ একটা মাত্র লাইন ! সেই একটা লাইনের মধ্যেই যেন পুরো শিক্ষা-ব্যবস্থাটা উঠে এসেছে দেশের। আমাদের ছেলেপিলেরা কি এখন লেখাপড়া করে সেখানে, বলুন ? করে না। স্টাডি বাদ দিয়ে তারা আজ দা-কিরিচ নিয়ে কোপাকুপি করছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি আর ভর্তিবাণিজ্য সেখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু ছাত্ররাই নয়, শিক্ষকদেরও অবস্থা তথৈবচ। নীলদল আর সাদাদল মিলে কামড়াকামড়ি। ক্লাশে মন নেই ; মন পড়ে থাকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। মাসে দুতিনটা ক্লাশ নিতে পারলেই তো তিরিশ হাজার, চল্লিশ হাজার।’ এ কথায় মন্ত্রীমহোদয় গা ঘুরিয়ে তাকালেন বাঁ দিকে। সম্মানিত ভাইস চ্যান্সেলরের মুখেও তখন মোহনীয় হাসি।

লেখক সাহেব ওদিকে ননস্টপ। ‘তাঁর আরেক সতীর্থ কবি লিখেছিলেন, “অদ্ভুত উটের পিঠে চলিতেছে এ দেশ।” হ্যাঁ, আমি কবিশ্রেষ্ঠ শামসুর রাহমানের কথাই বলছি। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। চলে গেছেন দুনিয়া ছেড়ে। তবে মহান সেই কবির একটি লাইনের মধ্যেই ব্যাদান হয়ে ফুটে রয়েছে আমাদের দেশের এই ঘৃণ্য রাজনীতি আর লোলুপ অর্থনীতির নিরাবরণ চেহারা। কী শক্তি সেই কবিতার ! কী পরিষ্ফুটন এ চলমান বাস্তবতার ! এই দুই কবির ঐ দুই পংতিতে যেন দুই-দুইটি মহাকাব্য সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধুগণ, এই দেশে তেমন কবি আ…র জন্মাবে না। কারণ কবিতার যুগও শেষ হয়ে গেছে ; মানুষও পাল্টে যাচ্ছে। ’ বলেই তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

‘শুধু যে মানুষই বদলেছে, এমন নয়। ভায়েরা আমার, পরিবর্তন এসেছে প্রকৃতিজগতেও। পাল্টে গেছে গোটা দুনিয়াটা Ñ এবং তার আবহাওয়া-ম-ল, ঝড়-বাদলও।’ বলেই তিনি মাউথপীস ধরে নিচু হলেন পুনরায়। সরু হয়ে আসা চোখদুটোয় তখন সুতীক্ষè কটাক্ষ। উৎসুক জনতাও তাঁর কথার যাদুতে পুরোপুরি বিভোর।

‘মেঘের ডাক শোনেন এখন ? বলুন ? আষাঢ় গেল, শ্রাবণ গেল Ñ ঝমঝমে বৃষ্টির ঘুমপাড়ানি সঙ্গীতমূর্ছনা কি একটিবারও বেজেছে আপনাদের কানে ? বাজেনি। মূর্ছনা বাজবে কী, বৃষ্টিই তো নেই আকাশে। নদীগুলোও আর নদী নেই আজকাল। বর্ষাকালে সেগুলো যেন বন্যাকবলিত বিলের মতোন ; আর শুকনো সিজিনে দেখবেন ভিন্ন দৃশ্য সেগুলোয়। উষর মরু, ধূসর প্রান্তর। সেগুলো দিয়ে তখন নৌকো চলে না, বন্ধুগণ Ñ ট্রাক চলে। দু’দিন পর হয়তো মিনিবাস কিংবা প্রাইভেট কারও চলবে। কারণ যে অবস্থা যানজটের, রাস্তায় Ñ তাতে বাইপাস হিসাবে সেগুলোর ব্যবহার শুরু হওয়াটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’

এই কথায় আবারও হাসির হুল্লোড় বয়ে গেল দর্শক সারিতে। অতিথিবৃন্দের মধ্যেও পুলকিত ভাব। তাঁরা ঠোঁট টিপে একে অপরের দিকে তাকালেন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।

‘দিন বদলে গেছে, ভাই…..। যুগ পাল্টে যাচ্ছে। জগতের হাওয়া ঘুরে গেছে, বোনেরা আমার। খালে-বিলে, নালা-পুকুরে কিংবা ডোবা-খন্দকে আর কাকচক্ষু জল নাই। টলমলে উর্মির দেহজুড়ানো নাচনও আর পাবেন না সেগুলোয়। ডোবা মানেই এখন ঘিনঘিনে কাদা, পলিথিন। নালা মানেই কলকারখানার বর্জ্য পদাথের্র আধার। তীব্র ঝাঁঝ সেসবে ! বিষাক্ত কেমিক্যালের নহর যেন ! কী যে সুরত একেকটার ! কোথাও গাঢ় সবুজ, তো কোথাও বেগুনি রং। কোথাও-কোথাও আবার আলকাতরার মতোন কালো বরণ ! স্টিকী বার্জার পেইন্ট, ড্যাম্পপ্রুফ ইমালশন। তুলি ভিজিয়ে ছবি আঁকতে পারবেন। বাচ্চাদের জন্য পেইন্টও কেনা লাগবে না আপনাদের।’

রসালো এই বর্ণনা শুনে মহিলারাও এবার হেসে উঠলেন সশব্দে। তবে তিনি আর সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। ভেতরে-ভেতরে একটা তাগিদ অনুভব করলেন বক্তব্য শেষ করার। তাই নিচের বাক্যক’টি জুড়ে দিলেন ফিনিশিং হিসাবে।

‘সুতরাং এ-ই যখন মানুষের মনমস্তিষ্কের বাস্তব অবস্থা, প্রকৃতিজগতের ভয়াল বিবর্তন Ñ তখন আয়োজকবৃন্দ যে আজ আমাকে আলোচ্য বিষয়ে পুরস্কৃত করতে এসেছেন ; সেটা কি তারা সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, নাকি দুঃসাহস দেখিয়েছেন Ñ তা আপনারাই বিচার করবেন। তাই আমি এখন বেশি কিছু আর বলবো না, বলতে চাইও না। কারণ আপনাদের মূল্যবান সময় অপচয় করার কোনো অভিসন্ধিই আমার নেই। তবে শুধু একটুখানি অনুরোধ করবো এই বলে যে, আসুন না ভাই ও বোনেরা আমার Ñ আসুন। অন্তত একটিবার Ñ আমরা আমাদের সনাতনী সাহিত্যের দিকে শেষবার Ñ দৃকপাত করি ; সাহিত্যের ভেতর মিনিমাম গ্রামারটা অন্তত খুঁজে দেখি। এবং সর্বপরি আমাদের এই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে খোলা বাতাসে একটুখানি নিঃশ্বাস নিতে শেখাই। কারণ আজকের এহেন ডিজুসমার্কা সংস্কৃতি থেকে তাদের বের করে আনাটা বড়ই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

সুতরাং ধন্যবাদ। ধন্যবাদ সবাইকে। অসংখ্য ধন্যবাদ।’