আট মাসে ঢাকা টু নিউইয়র্ক: কারাগারে ১৬৫ দিন

দুঃসাহসী বাংলাদেশী তরুণের শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী

গল্প উপন্যাসের কাহিনীকেও তা হার মানায়। জীবন বাজি রেখে এক বাংলাদেশী তরুণ গত বছর মে’ মাসের শুরুতে ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়েছিলেন বলিভিয়ার পথে ভাগ্যান্বেষনের আশায়। পথে নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে শুধু বুকভরা সাহস, অনিশ্চিতকে জয় করার অদম্য বাসনা আর অসীম মনোবল অর্থ পৃথিবী পরিভ্রমণ করে তাকে নিয়ে আসে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়। আর এজন্য তাকে মূল্যও দিতে হয়েছে অনেক। দীর্ঘ আট মাস তাকে কাটাতে হয়েছে পথে পথে। উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়েছেন বোটে করে। রাতের পর রাত কাটিয়েছেন জঙ্গলে। ট্রাকের কন্টেইনারে শুয়ে পাড়ি দিয়েছেন সুদীর্ঘ পথ। প্রায় ৬ মাস আটক থাকতে হয়েছে জেল থেকে জেলে।

সিলেট কুলাউড়ার ভাটারা গ্রামের কামরুল ইসলাম। স্থানীয় কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। বন্ধুদের আগ্রহে নাম লেখান ছাত্র রাজনীতিতে। সরকার বিরোধী সংগঠনে যোগ দেয়ায় কোপ দৃষ্টিতে পড়তে হয় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন নেতৃবৃন্দের। পর পর ৫বার বেধড়ক পিটুনির শিকার হন তিনি। শেষ বার রামদা হাতে কোপাতে এলে প্রাণভয়ে গ্রাম ছেড়ে আশ্রয় নেন দূরে আত্মীয়ের বাড়ীতে। পলাতক জীবন শুরু হয় তাঁর।

জীবনের এই দুঃসময়ে এক দালাল আশার বাতিঘর দেখান তাকে। বলে বলিভিয়া এখন বিদেশ যাত্রীদের স্বর্গরাজ্য। পোর্ট এন্ট্রি ভিসা। গেলেই কাজ। ডলারে বেতন। আরো কত কি।

দুঃসময়ে আশার আলো জ্বলে বুকে। ধার দেনা করে দালালের হাতে তুলেদেন এক কাঁড়ি টাকা। তবে কথা রাখেন দালাল। তার রোড ম্যাপ ধরে দুবাই-ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা হয়ে বলিভিয়া এসে পৌঁছান কামরুল।

কাষ্টমস কোন সমস্যা করেনি। এক মাসের ভিসা পেয়ে যান কামরুল। তার পরই শুরু হয় তার জীবনে এক নতুন অধ্যায়। নতুন স্বপ্ন আর স্বপ্ন ভঙ্গের কাহিনী।

কামরুল বাংলা পত্রিকাকে জানান, বলিভিয়ায় হোটেল ভাড়া শস্তা। ১০০ ডলার দিয়ে ১০ দিনের জন্য রুম ভাড়া করলাম। প্রতিদিন সকালে বেরোই কাজ খুঁজতে। সন্ধ্যায় ফিরে আসি এক বুক হতাশা নিয়ে। অবশেষে ধৈর্য্যরে বাধ ভাঙ্গার আগে একজন সহৃদয় ব্যক্তি জানালেন এখান থেকে পেরুর অবস্থা ভাল। সেখানে সহজে কাজ পাওয়া যায়। তিনি দয়াপরবশ: হয়ে একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার ঠিক করে দিলেন যে বর্ডার ক্রশ করে পেরুতে ঢুকিয়ে দিবে। ট্যাক্সি ড্রাইভার কথার ব্যত্যয় করেনি। এ পথ ওপথ ঘুরে কামরুলকে পৌঁছে দেয় রাজধানী লিমার একটি হোটেলে।

কামরুল জানান, পেরুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বলিভিয়ার চেয়েও খারাপ। লিমার হোটেলে ৪দিন থেকে হোটেল ম্যানেজারের পরামর্শে চলে আসি ইকুয়েডরের কিউটো শহরে। এখানে ভাগ্য কিছুটা সুপ্রসন্ন হলো। সাক্ষাত পেলাম কয়েকজন বাঙ্গালীর। তাদের কেউ মাদারীপুর কেউ নোয়াখালী আবার কেউ সিলেটের বাসিন্দা। তারা ওখানকার রেষ্টুরেন্টে কাজ করেন। আমাকে দারুন আদর আপ্যায়ন করলো তারা। তাদের বাসায় নিয়ে গেলো। খেতে দিলো। ভাবলাম যাত্রা বুঝি শেষ হলো। কিন্তু তারাও আমাকে নিরাশ করলেন। বল্লেন অবৈধ অভিবাসীদের ধরতে পুলিশ এসে যখন তখন হানা দেয়। তার চেয়ে আমি যদি পার্শ্ববর্তীদেশ কলাম্বিয়া চলে যাই তাহলে জীবন গড়া অনেক সহজ হবে। বাঙ্গালী ভাইয়েরা একটা ট্যাক্সি ঠিক করে দিলেন। চাঁদা তুলে ভাড়া পরিশোধ করে দিলেন ২০০ ডলার। তারপর ফি আমানিল্লাহ বলে বিদায়।

ট্যাক্সি আমাকে নিয়ে এলো কলাম্বিয়ার বগোতা নামের একটি শহরে। ৩০ ডলার মাসে একটি বাসা নিলাম। খাওয়া নিজের। প্রতিদিন কাজ খুঁজি পাইনা। কলাম্বিয়া এমনিতেই উন্নত দেশ নয়। তার পর রয়েছে ভাষা সমস্যা। রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে পরিচয় হলো আমার মত আরো দু’জন ভাগ্যান্বেষীর সাথে। তারা সুমালিয়ান মুসলিম। ওরা পানামা যাবে। আমাকে সাথে নিবে কিনা জানতে চাইলে আগ্রহ সহকারে রাজী হলো তারা।

এক দালালের সাথে কন্ট্রাক্ট হলো। তারা আমাদের নিরাপদে পৌঁছে দেবে পানামায়। তারা একটা বোটে নিয়ে উঠালো আমাদের। ঘড়ি ধরে ৪ ঘন্টা ১৬ মিনিট ছিলাম সাগরে। আল্লাহর নাম জপছিলাম। টাকা পয়সা কেড়ে নিয়ে যদি তারা ঠেলে সাগরে ফেলে দেয়! কিন্তু ভাগ্য সহায়। নিরাপদেই সাগর পাড়ি দিলাম। এর পর তারা অন্য দালালের কাছে আমাদের হস্তান্তর করলো। মাথা পিছু ১০০ ডলার দিতে হবে তাদেরও।

নতুন দালালের সাথে ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ৫দিন ৪ রাত হাঁটলাম। ফলমূল আর ঝর্ণার পানি খেলাম পথে।

জঙ্গলের শেষ প্রান্তে এসে দালাল আমাদের বসতে বলে কোথায় যেন গেলো। এসময় একজন বুড়ো ভদ্রলোক আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন। জানতে চাইলেন আমরা কারা। সোমালিয়ার দু’জন আমাদের অবস্থার কথা জানালে বৃদ্ধ বল্লেন এক মুহুর্ত তোমরা এখানে দেরী করোনা। দালাল লোক আনতে গেছে তোমাদের আটক করতে। তারপর তোমাদের জিম্মি করে দেশ থেকে টাকা আনানোর ব্যবস্থা করবে।

বুড়ো বল্লেন, দ্রুত সামনের দিকে ছুটে যাও। আধা মাইল পরেই পানামা বর্ডার। ইমিগ্রেশনে গিয়ে ধরা দাও। সেখানে জেলে দিলেও খাদ্য ও আশ্রয় পাবে। কিন্তু দালালদের হাতে আরেকবার পড়লে অত্যাচারে জীবন দূর্বিসহ হয়ে উঠবে।

আমরা তার কথা মত ছুটে গিয়ে পানামা বর্ডারে ইমিগ্রেশনের হাতে ধরা দিলাম। তারা আমাদের নিয়ে সোজা জেল খানায় ঢুকিয়ে দিল।

একমাস জেল খাটার পর ডাক পড়লো গেটে। একজন অফিসার আমাদের বল্লেন তোমাদের ২ সপ্তাহ সময় দিলাম দেশ ছেড়ে চলে যেতে। এরপর তোমাদের দেখা গেলে আজীবনের জন্য জেলে পুরে রাখবো।

আমরা তিনজনের গ্রুপ আবার রাস্তায় নামি। এরপর ঘুরতে ঘুরতে কোষ্টারিকায়। এবার এক দালালের বাড়ীতে আশ্রয়। সে জানায় মাথা প্রতি ৫ হাজার ডলার দিলে সে আমাদের মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছে দিবে। সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আমরা পৌঁছতে পারবো যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। এবার চরম হতাশার মধ্যেও আশার আলো দেখতে পেলাম। দালালের কথামত ওয়েষ্টার্ন ইউনিয়ন মারফত দেশ থেকে ৫ হাজার ডলার এনে তুলে দিলাম তার হাতে। সে কথা রাখলো। কোষ্টারিকা থেকে একটা কন্টেইনার ট্রাকে শুইয়ে আমাদের নিয়ে এলো প্রথমে নিকারাগুয়া, তারপর হন্ডুরাস হয়ে গুয়েতেমালায় এসে বিরতি।

এবার দালাল পরিবর্তন। তারাই অন্য দালালের কাছে আমাদের হস্তান্তর করলো। ১দিন গুয়েতেমালায় রেখে তারা পরদিন আমাদের মেক্সিকোতে পৌছে দেয়। মেক্সিকোতে হোটেল খুঁজতে বেরোতেই একেবারে পুলিশের হাতে। তারা আমাদের ইমিগ্রেশনের কাছে হস্তান্তর করে। ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাদের জেলে নিয়ে যায়।

এক নাগারে ৭৫ দিন ছিলাম মেক্সিকোর জেলে। সোমালিয়ান ২ জন কিভাবে যেন ১৫ দিন পরেই বেরিয়ে যায়। এখানকার জেলে আরো কয়েকজন বাংলাদেশীর দেখা পাই। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমেরিকা যাবার পথে এখানে এসে ধরা পড়ে জেল খাটছে।

৭৫ দিন পর ভাগ্য কিছুটা সহায় হলো। এবারও আমাদের ২০ দিন সময় দিয়ে দেশ ত্যাগ করতে বলা হলো।

এই কয়েকমাসে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছে। তাই নতুন একজন দালাল পেতে বেশী বেগ পেতে হলো না। তারাই একজন বাস ড্রাইভার ঠিক করে দিলো। সে আমাদের ক্যালিফোর্নিয়ার বর্ডারে নামিয়ে দিয়ে যাবে।

দালাল আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলো বর্ডারে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে। তার কথামত তাই করলাম। বর্ডার পুলিশ আমাকে স্থানীয় একটি জেলে নিয়ে যায়। একজন বাঙ্গালী ইন্টারপ্রেটার ডেকে এনে আমাকে ৪দিন জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তারা আমাকে সানদিয়াগো কারেকশান জেলে পাঠিয়ে দেয়। সানদিয়াগো জেলে আটক থাকি ২ মাস ২৫ দিন। একদিন একজন অফিসার এসে বলে বাইরে কেউ স্পন্সর করলে তার জিন্মায় আমাকে ছেড়ে দিবে এবং তার মাধ্যমে আমি উকিল দিয়ে এসাইলাম কেস ফাইল করতে পারবো।

জেল থেকেই আমি দেশে যোগাযোগ করি। আমার মা বাবার কাছ থেকে খবর পেয়ে নিউইয়র্কের এক আত্মীয়ের জিম্মায় জেল থেকে ছাড়া পাই। এখন আমি উকিলের মারফত এসাইলাম কেস দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছি।

কামরুল জানান, সামনে আমার অনিশ্চিত জীবন হলেও এখানে প্রচুর বাংলাদেশী। আমার কাছে- দূরের বেশ কয়েকজন আত্মীয় স্বজনও এখানে আছেন। এখান থেকে অন্তত লড়াইটা আমি দিতে পারবো। ৭ মাস ১৩ দিনে কয়েক হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ৫ মাস ১৫ দিন জেল খেটে আমার বিশ্বাস এখানেই আমি আমার স্বপ্নের ঠিকানাটা খুঁজে পাবো।