মার্কিন সামরিক খাতে ব্যয় কত?

বলা নিষ্প্রয়োজন, ইরাক যুদ্ধ আর আমাদের সাম্রাজ্যবাদী বৈশ্বিক নেতৃত্বের আবর্তে আজ আমরা যে ঘোঁট পাকিয়েছি তার তুলনায় এমনকি ভিয়েতনাম যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে আমাদের সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স ও সামরিক ব্যয়ের চিত্রটাকে নেহাতই ম্লান মনে হবে। সেই সময়ে যে সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলাম, সচেতনভাবে আজও আমি সেটির পুনরুল্লেখ করছি : ‘জনগণের কণ্ঠস্বর শোনার এখনই সময়। জনগণের দাবি – সামরিক বাহিনীর দিকে চোখ রাখা ও তাদের ওপর সিভিলিয়ান নিয়ন্ত্রণের অভিভাবক হিসেবে কংগ্রেসকে আবারো তার সাংবিধানিক দায়িত্বটি পালন করতে হবে; প্রতিরক্ষা বাজেট সম্পর্কে কংগ্রেসকে তার সিদ্ধান্ত প্রয়োগের শক্তি যোগাতে পারে কেবলমাত্র জনগণ।

হতাশাজনক ব্যাপার হলো, ৩৭ বছর ধরে আমি যেসব সমস্যার কথা বলে আসছি, সেগুলোর অবস্থা এখন আরো খারাপ হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সমাধানে কংগ্রেসের অমতায় হতাশ হয়ে ও অন্য আরো ব্যাপারে মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থতার মধ্যে ১৯৮১ সালে আমি সিনেট ত্যাগ করি। ওই সময় আমার আবেদনের মূল কথা ছিল জনগণকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়া। আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া কংগ্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করতে জনগণের হাতে প্রয়োজনীয় শক্তি দেয়ার কাজটি শুরু করেনি।

আমি সেদিন যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলাম, আজ অধিকাংশ আমেরিকান সেই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে : কংগ্রেসে ভালো লোককে নির্বাচিত করুন, সবকিছু ঠিক পথে চলবে। দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রতিনিধিত্বশীল সরকার সেই পথে চলছে না; বরং মিডিয়া পণ্ডিতেরা এই কল্পকথাই অবিরাম বলে যাচ্ছেন যে জনগণ, সরকারের মূলশক্তি – আইন প্রণয়নের মতা – ছাড়াই সরকারি নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

আমরা একটি দেশ – ইরাক নয়, নিজেদেরটি, হারাতে যাচ্ছি। এই যুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় আঘাতটা লেগেছে আমাদের নিজেদের ইমেজে এবং আমরা যেটায় পরিণত হয়েছি তার বাস্তবতায়। পরিস্থিতি এমন হলো কিভাবে? আমরা কিভাবে নরম্যান রকওয়েলের আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরে আসলাম, যেখানে সহিংসতা, নির্যাতন, মিথ্যাচার, গুপ্তচরবৃত্তি, প্রপাগান্ডা, আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন নতুন দেশপ্রেমে পরিণত হলো?

সিনেটর লওয়েল উইকার, ২০০৭
[মজার একটা ঘটনা বলছি : সিনেটে লওয়েল আমার সঙ্গে কাজ করতেন এবং আমি যে বিল্ডিং অ্যান্ড গ্রাউন্ডস সাব কমিটির চেয়ারম্যান ছিলাম, তিনি ছিলেন সেটার মর্যাদাসম্পন্ন সদস্য। এই সাবকমিটির মাধ্যমেই আমি পেন্টাগন পেপার্স প্রকাশ করেছিলাম। এই কাজের জন্য আমাকে শাস্তি দিতে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক ওয়ার্ক কমিটি জানালো, পেন্টাগন পেপার্স প্রকাশের ব্যয় বাবদ সাবকমিটির যে প্রায় ৪০০ ডলার খরচ হয়েছে, সেটা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে দিতে হবে। লওয়েল দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, অর্ধেক খরচ তিনি দেবেন।]

আমাদের বিভ্রান্তকর সামরিক ব্যয়ের পূর্ণ চিত্র প্রকাশ করতে আমি ফোর্ট ওর্থ স্টার-টেলিগ্রাম ও ম্যাককাচি-ট্রিবিউন নিউজ সার্ভিসে ২০০৭ সালের ৪ মার্চ প্রকাশিত উইনস্লো টি. উইলারের ‘রিংগিং আপ দ্য বিল ফর আমেরিকা’স ডিফেন্স’ থেকে ২০০৮ সালের প্রতিরা বাজেটের তথ্য উল্লেখ করেছি। প্রতিরা দফতরের সাবেক কর্মকর্তা মি. উইলার পেন্টাগনের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলেন এবং বর্তমানে সেন্টার ফর ডিফেন্স ইনফরমেশনের সঙ্গে স্ট্রাউস মিলিটারি রিফর্ম প্রজেক্টের পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।

মি. উইলারের জানান, প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৮ সালের পেন্টাগন বাজেটের জন্য ৪৮১ বিলিয়ন ডলার প্রদানের অনুরোধ করেন। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের মোট নিরাপত্তা ব্যয় নির্ধারণ করতে গিয়ে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের আনুমানিক ব্যয় হিসেবে আরো ১৪২ বিলিয়ন ডলার; পরিপূরক হিসেবে ৪০ বিলিয়ন ডলার; জ্বালানি দফতরের পরমাণু অস্ত্র ব্যয়ের জন্য আরো ১৭ বিলিয়ন ডলার; জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’স ন্যাশনাল ডিফেন্স স্টকপাইল, সিলেক্টিভ সার্ভিস, এবং কোস্ট গার্ড ও এফবিআইয়ের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের মতো বিভিন্ন ধরনের প্রতিরা ও এজেন্সির ব্যয়ের জন্য আরো ৫ বিলিয়ন ডলার; এবং সব মিলিয়ে ২০০৮ সালের সর্বমোট ব্যয় দাঁড়ায় ৬৮৭ বিলিয়ন ডলার।

তবে আমাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের সংজ্ঞাকে আরো ব্যাপক করা হলে তাতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ব্যয়; সেই সব ব্যয় (ইতোমধ্যে যেগুলো প্রতিরক্ষা দফতরে রয়েছে, সেগুলো ছাড়া) মিলিয়ে বাড়বে আরো ৩৬ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়াও রয়েছে কূটনৈতিক কার্যক্রমের জন্য পররাষ্ট্র দফতরের বাজেট, মিত্রদের জন্য অস্ত্র সাহায্য, জাতিসঙ্ঘ শান্তিরা, ইরাক ও আফগানিস্তানে পুনর্গঠন সাহায্য, অন্যান্য দেশে বিদেশী সাহায্য; এর সঙ্গে যোগ করুন আন্তর্জাতিকবিষয়ক সব বা অধিকাংশ বাজেট (৩৮ বিলিয়ন ডলার)।

এর সঙ্গে আরো যোগ করতে হবে অতীত ও বর্তমান যুদ্ধগুলোর জন্য মানবিক ব্যয় তথা সাবেক সৈনিকবিষয়ক দফতরের জন্য ৮৪ বিলিয়ন ডলার। জাতীয় ঋণের সুদ বাবদ বার্ষিক প্রদত্ত ৭৫ বিলিয়ন ডলারও যোগ করতে হবে, এই অর্থও প্রতিরা দফতরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ছাড়াও রয়েছে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অবসর গ্রহণ সম্পর্কিতসহ ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন ব্যয়। ২০০৮ সালে চিহ্নিত ওইসব ব্যয়ের পরিমাণ ছিল অন্তত ৯২০ বিলিয়ন ডলার, পরিমাণটা বিপুল, তবে সম্ভবত আরো কিছু রয়ে গেছে।

অনেক বছর ধরেই কংগ্রেসের বাজেট অফিস (সিবিও) দেখছে, প্রতিরক্ষা দফতর যুদ্ধব্যয় ছাড়াও তার উন্নয়ন, উৎপাদন ও অস্ত্র সংরণে নিজস্ব ব্যয় এবং সামরিক ব্যক্তিত্বদের সহায়তার ব্যাপারে হিসাব কম করে দেখায়। সিবিও যদি ঠিক হয়ে থাকে (প্রতিটি পেন্টাগন বাজেট বিশ্লেষক ঠিক এমনই বলছেন) তবে শুধু ২০০৮ সালের জন্যই আরো ৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার যোগ করতে হবে।

২০০৮ সালের সত্যিকারের মোট ব্যয় অজ্ঞাত; তবে তা উপরিল্লেখিত ৯২০ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। ২০০৮ সালে শুধু পেন্টাগনের ব্যয় মুদ্রাস্ফীতির আলোকে তুলনা করলে দেখা যাবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সত্যের খাতিরেই বলতে হয়, নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই প্রতিরা দফতর অ-নিরীণযোগ্য এবং দশকের পর দশক ধরে তা এভাবেই চলছে। এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে বিপুল বাজেট আত্মস্থকারী হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দফতর।

লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০০৫ সালে অবশিষ্ট বিশ্ব প্রতিরা খাতে ৬১১ বিলিয়ন ডলারের সামান্য কিছু বেশি ব্যয় করেছিল। আর আমরা ওই বছর শুধু পেন্টাগনের পেছনেই ব্যয় করেছি ৫১০ বিলিয়ন ডলার। অন্য দিকে এখন অন্যান্য দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট স্থির বা সঙ্কুচিত হওয়ায় এবং আমাদেরটি দ্রুততার সঙ্গে বাড়তে থাকায় আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে প্রতিরা খাতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় অবশিষ্ট বিশ্বের সর্বমোট ব্যয়কে ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্বের পরবর্তী বৃহত্তম প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যয়কারী সিআইএ’র ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্ট বুকের তথ্যানুযায়ী, ২০০৫ সালে চীন ৮১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিপুল ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের পরের স্থানে ছিল। চীনের এই ব্যয় ২০০৮ সালে পেন্টাগনের সরাসরি ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত ৬২৫ বিলিয়ন ডলারের মাত্র ১৩%।

সুইডিশ ইনস্টিটিউটের এক সমীায় দেখা যায়, বিশ্বের মোট প্রতিরা ব্যয়ের ৪৬% করে যুক্তরাষ্ট্র একাই; ব্রিটেন ও ফ্রান্সের খরচ ৫% করে, জাপান ৪%। চীনের ব্যয় ৪% ও রাশিয়ার ৩%।

* সিনেটর মাইক গ্রাভেল ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। এটি তার সিটিজেন পাওয়ার গ্রন্থের আমেরিকান ইম্পেরিলিজম থেকে নেয়া।

অনুবাদ: হাসান শরীফ