দ্রোহের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

William Milam

এডমন্ড বার্ক বলেছিলেন ভাল মানুষকে দূরে রাখতে পারলে যে কোন খারাপ কাজ সহজে করা যায়। বিপরীতে ভাল মানুষ সামনে থাকলে সহজে খারাপ কাজ করা যায় না। প্রয়োজন হলে যে কোন কাজ করা যায়। যে কোন অসাধ্য কাজকে সাধন করা যায়। এই প্রয়োজন, এই চাহিদার ভিত্তিতে বিগত ৩২৫ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়ে আসছে। ইতিহাস স্বাক্ষী এই প্রয়োজন মানব ইতিহাসের অনেক চিত্র পাল্টে দিয়েছে। প্রয়োজন, আন্দোলন স্বৈরাচারী শাসককে বাধ্য করেছে সাধারণ জনগণের হাতে ক্ষমতা হ¯ত্মাšত্মর করতে।

উদাহারণ হিসাবে বলা যায় ইংল্যান্ডের ১৬৮৮ সালের রাজনৈতিক বিপ্লব। এই বিপ্লবের ফলে শাসনকারী রাজা-রানীদের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়। সাধারণ নাগরিকদের অধিকারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে সমাজের উঁচু শ্রেণীর কর্তাব্যক্তিরা ক্ষমতা আকড়ে ধরে থাকে। ক্ষমতার লোভ অন্যরকম সহজে কেউ ক্ষমতাহীন হতে চায় না।

তবে সময়ের বির্বতনে সমাজের ভাল মানুষেরা সমাজ, রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের শাসন ক্ষমতা সংকুচিত করে সাধারণ জনগণের অধিকার বিষয়ে বেশ আন্দোলন করেছেন। কখনো আবার সফলও হয়েছেন আবার কখনো কর্তাব্যক্তিরা এই আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করে ক্ষমতা তাদের হাতেই রেখেছেন। ক্ষমতা বিভাজন আন্দোলনের ফলে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি দেখা গেছে। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। সাধারণ মানুষ কিছুটা স্ব¯িত্ম পেয়েছে।

১৬৮৮ সালের পর আন্দোলন, বিপ্লব অনেকটা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ক্রমাগত আন্দোলনের ফলে ১৭৬৫-১৭৮৩ সালের আমেরিকা বিপ্লব সফল হয়। যার ফলে আমেরিকায় একটি সফল, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়। রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটে একটি গণতন্ত্রের নতুন পদযাত্রা শুরু হয়। ঠিক সেরকম সুফল বয়ে এনেছিল ফ্রান্স বিপ্লব। বিপ্লবের কারণে সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষা পেয়েছিল।

তবে বিংশ শতাব্দীর আন্দোলনগুলো আবার কিছুটা ভিন্ন ছিল। রাশিয়া বিপ্লব, নাৎসি আন্দোলন ফলে সমাজের সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। তবে শাসক শ্রেণীর মানুষেরা রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খা, চাহিদা উপেক্ষা করে ক্ষমতা দখল করে। পূর্বের শাসক শ্রেণীর দোষ-ত্রুটি দূর করে নতুন করে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নব্য ক্ষমতা গ্রহণকারীরা অন্যায়, অনাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার করে। অনেক সময় রাষ্ট্র পরিচালনার অযুহাতে, ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য শাসকরা গণহত্যার মত ঘৃণ্য কাজ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি।

বার্ক তার রাজনৈতিক লেখার মধ্যে তুলে ধরেছেন অসফল শাসন প্রক্রিয়ার ফলে কিভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চলমান থাকার পরেও স্বৈরাচার, একনায়কতন্ত্রের মত ঘৃণ্য শাসন আগমনের ভয় সব সময় রয়ে যায়। বার্ক ১৭৭০ সালে ক্ষমতাসীন রাজা-রানীদের ক্ষমতা সংকুচিত করে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে একটি লেখা লেখেন। যাতে করে রাজ পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন। তিনি লেখেন যে যখন খারাপ মানুষরা একত্রিত হয়ে কোন কাজ করতে চায়, বিশেষ করে রাষ্ট্র সম্পর্কিত কোন কাজ সেক্ষেত্রে ভাল মানুষদেরও উচিত তাদের সাথে যোগদান করা। নতুবা রাষ্ট্র সংশোধনের সেই মহৎ কাজটি মাঝ পথেই থেমে যায়।

তবে বর্তমান বিশ্বে বিপ্লব শুধুমাত্র ইসলামিক দেশগুলোতে সংগঠিত হচ্ছে। বার্ক যদি বেঁচে থাকতেন তবে বিপ্লবের এই দৃশ্য দেখে চরম কষ্ট পেতেন। তিনি চেয়েছিলেন ক্ষমতা বিভাজনের পর সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ এমন একটি সমাজে বসবাস করবে যেখানে কোন অন্যায়, অনাচার, শ্রেণীবিভাগ থাকবেনা। মানুষ শুধুমাত্র মানুষ হিসাবে পরিচিত হবে।

কিন্তু বর্তমান ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে যা হচ্ছে তা বিপ্লব নয়। কিছু মানুষ নির্দিষ্ট আদর্শ নিয়ে, অস্ত্র হাতে ক্ষমতাসীন সরকারে বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সাধারণ জনগণের কোন চিšত্মা করছে না। তাদের মতের কোন দাম দিচ্ছেনা। সুতরাং এটি বিপ্লব হতে পারেনা।

যেমন ধরা যাক বাংলাদেশের কথা। দেশটির সরকার গণতান্ত্রিক পদযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য সবধরনের চেষ্টা করছে। কিšত্ম বা¯ত্মবে তা হচ্ছেনা। সরকার এক তরফা নির্বাচন করে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। সাধারণ জনগণের কথা চিšত্মা না করে তারা দেশ শাসন করছে। দেশে প্রায় দৃশ্যমান একনায়কতন্ত্র বিরাজমান। বিরোধীদল ছন্নছাড়া অবস্থায় রয়েছে। তাদের অবস্থা অনেকটা ‘ক্লিনিক্যালী ডেড’ রোগীর মত। ম¯িত্মষ্ক সচল কিন্তু সারা শরীর অচল। এর মধ্যে আবার সরকারের নিপীড়ন, অত্যাচার তো রয়েছেই। আবার ইসলামী দলটির অবস্থা আরও খারাপ। তাদের অ¯িত্মত্ব সংকটে। দেশটির মিডিয়া, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিভাজিত, শংকিত। সরকার নতুন করে রাষ্ট্রের ইতিহাস লিখতে যাচ্ছে। এখানে বার্কের কথা মনে পড়ে গেল। দুষ্টু লোকদের থামাতে ভাল মানুষগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে, একত্রিত হতে হবে। নাহলে তারা একে একে হারিয়ে যাবেন।

গণতন্ত্র চর্চা, জনগণের অধিকার রক্ষা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশকে এক সময় রোল মডেল হিসাবে দেখা হত। কিšত্ম বর্তমানে দেশটির অবস্থার ভাল নয়। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মত বাংলাদেশেও একনায়কতন্ত্রের অদৃশ্য ছায়া দেখা যাচ্ছে। এসময় যদি রাষ্ট্রের ভাল মানুষগুলো এই পরিস্থিতিতে চুপ থাকেন তবে দেশটিতে দুর্নীতি, সংঘাত, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বেড়ে যাবে, যা ভবিষ্যতে দেশটির জন্য সুফল বয়ে আনবে না।