কবিতা চাষি সিমাস হিনি

seamus heaney
প্রতিদিন তাঁর ঘুম ভাঙত কোদালের মাটি কোপানোর শব্দে। বাবা কৃষক ছিলেন, দাদাও কৃষক ছিলেন। মাটিতে ফসল ফলানোর কাজ ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য ও শতবছরের পেশা। সেই বাড়ির ছেলে সিমাস হিনি হয়ে উঠলেন কবিতার চাষী। কোদাল দিয়ে মাটি নয়, কলম দিয়ে খাতা খুঁড়ে বের করে আনলেন অনবদ্য সব কবিতা।

১৯৩৯ সালের ১৩ এপ্রিল উত্তর আয়ারল্যান্ডের কান্টি ডেরির টুমারব্রিজের এক খামারবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন সিমাস হিনি। আয়ারল্যান্ডের বেলাঘি গ্রামে বেড়ে ওঠেন তিনি। পড়াশোনা করেন ডেরির ক্যাথলিক বোর্ডিং স্কুল সেন্ট কলাম্বসে। পরে বেলফাস্টের কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের অনারারি ফেলো ছিলেন হিনি। ২০১২ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আইরিশ লেখকদের জন্যে সিমাস হিনি প্রফেসরশিপ প্রবর্তন করা হয়। হিনির মতে, এটি তাঁর জীবনের অন্যতম সম্মান।

ডাবলিনে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে তিনি কিছুদিন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যাপনা করেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত হাভার্ডের আবাসিক কবি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন। সেখানে কবিতার অধ্যাপক হিসেবে ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

নয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন হিনি। বাবা প্যাট্রিক হিনি ছিলেন একজন কৃষক। তাঁর দাদা জেমস হিনিও কৃষিকাজ করতেন। সিমাস হিনিদের পরিবার ছিল বিশাল। হিনির বাবা প্যাট্রিক পরিবারের অষ্টম সন্তান। কৃষিকাজ পারিবারিক পেশা হলেও প্যাট্রিকের দায়িত্ব ছিল গবাদি পশু লালন পালন। তিনি খুবই পরিশ্রমী ছিলেন। হিনির লেখায় অসংখ্যবার তাঁর বাবার পরিশ্রমের কথা উঠে এসেছে। হিনির মা মার্গারেট ক্যাথলিন ম্যাককেইন ছিলেন শ্রমিক পরিবারের মেয়ে। ক্যাথলিনের বাড়ির সবাই কাপড়ের মিল-কারখানার শ্রমিক ছিলেন। আয়ারল্যান্ডের এমন একটি পরিবারের বড় ছেলে হয়েও ভাগ্যের জোড়ে কৃষিকাজ কিংবা মিল-শ্রমিক নয়, হিনি হয়েছিলেন কবি। নিজেই দাবি করেন, ভাগ্য ও সময় তাঁকে কবি হিসেবে তৈরি করেছে। ১২ বছর বয়সে প্রথম তিনি আনাহরিশ প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে বৃত্তি পেয়ে সেন্ট কলম্বাস কলেজে পড়তে যান।

এর পরই শুরু হয় অন্যজীবন। কবিতার জীবন। কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া বা প্রথম কবিতা আবিষ্কারের অনুভূতিকে হিনি বিদ্যুতের শক খাওয়ার মতো একটি অনুভূতি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, কবিতার ভাষা যেন বিদ্যুতের তীব্র প্রবাহ ও নতুন জগতের প্রবেশদ্বার।

ব্রিটিশ কবি জেরার্ড ম্যানলি হপকিন্সকে নিজের কবিগুরু মানতেন হিনি। ম্যানলি হপকিন্সের কবিতাকে তাঁর বড় আপন মনে হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, ‘আমি হপকিন্সের কবিতা পড়েই কবিতার জগতে প্রবেশ করেছি, তাঁর কবিতা আমাকে বিদ্যুতায়িত করেছিল।’ পরবর্তীতে তিনি নিজের কাব্য-পথের প্রদর্শক হিসেবে টেড হিউজকে বেছে নেন। সহজ ভাষা, আইরিশ ঐতিহ্য ও আধুনিক কাব্যরীতির সংমিশ্রণে তিনি এক অনন্য কাব্য-ঢংয়ের সৃষ্টি করেছিলেন। এসবই নাকি ইংরেজ কবি টেড হিউজের অবদান। আদ্যোপান্ত হিউজ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন হিনি। বিভিন্ন কবিতাতে কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁর স্বীকৃতিও দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘কাস্টিং অ্যান্ড গ্যাদারিং’ টেড হিউসকে উত্সর্গ করে লিখেছিলেন তিনি। হিনির কবি জীবন : শুধু যে কবিদের কবিতায় অনুপ্রাণিত হয়ে হিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন তা কিন্তু নয়। কবি হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠার অন্যতম উপাদান ছিল আয়ারল্যান্ডের জনজীবন ও রাজনীতি। নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেও ফেলে দেওয়া যাবে না। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ডিগিংয়ে তিনি বলেছিলেন, কীভাবে চাষবাসের জীবন ছেড়ে তিনি কবি হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর দাদা মাটি কুপিয়ে আলু চাষ করতেন আর তিনি শুরু করলেন কবিতার চাষ।

হিনির এক ভাই ক্রিস্টোফার চার বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। হিনি তখন সেন্ট কলম্বাসের ছাত্র। ভাই হারানোর এই কষ্ট হিনিকে নাড়া দেয় গভীরভাবে। স্বজন হারানোর বেদনা থেকে হিনি লিখেছিলেন, ‘মিড টার্ম ব্ল্যাক’ ও ‘দ্য ব্ল্যাকবার্ড গ্ল্যানমোর’ কবিতা দুটি। নিজের ব্যক্তিজীবনের নিদারুণ বেদনা ফুটে উঠেছিল এই কবিতায়।

হিনি কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন বিংশ শতকের ষাটের দশকে। সেই হিসাবে মাত্র তিন দশকের মধ্যে নিজেকে বিকশিত করেছেন একজন কাব্যপ্রতিভা হিসেবে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ডেথ অব অ্যা ন্যাচারালিস্ট’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। এরপর কবি হিসেবে হিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ১৯৯৫ সালে সাহিত্যে চুরানব্বইতম নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পূর্ণ করেন তাঁর সাফল্যের সীমা। দীর্ঘ কবিজীবনে নোবেল পুরস্কার ছাড়াও তিনি তাঁর কাব্যগ্রন্থের জন্য ফরওয়ার্ড প্রাইজ, টিএস এলিয়ট প্রাইজসহ বহু সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বলা হয়ে থাকে, কাব্যিক সৌন্দর্য ও নৈতিক গভীরতাসমৃদ্ধ সাহিত্যকর্মের জন্যই তিনি নোবেল পেয়েছিলেন।

তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে—ডেথ অব অ্যা ন্যাচারালিস্ট (১৯৬৬), ডোর ইনটু দ্য ডার্ক (১৯৬৯), উইন্টারিং আউট (১৯৭২), স্টেশনস (১৯৭৫), নর্থ (১৯৭৫), ফিল্ড ওয়ার্ক (১৯৭৯), স্টেশন আইল্যান্ড (১৯৮৪), দ্য হ ল্যান্টার্ন (১৯৮৭), সিইং থিংস (১৯৯১ এবং দ্য সিপরিট লেভেল (১৯৯৬) অন্যতম।

ইংরেজি সাহিত্যের আদি নিদর্শন বিউলফের (Beowulf) আধুনিক অনুবাদ করার অনন্য সাধারণ কৃতিত্ব সিমাস হিনির। তিনিই এই আদি কাব্যগ্রন্থকে আধুনিক পাঠকদের কাছে তুলে ধরেন।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ ডেথ অব অ্যা ন্যাচারালিস্ট-এ তাঁর কৈশোরের গ্রামীণ-জীবনের অনুভূতির সরল প্রকাশ ঘটেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংঘাত ক্রমশ তাঁর লেখাকে অন্য খাতে প্রবাহিত করেছিল।

সাহিত্যবোদ্ধারাও স্বীকার করেন, হিনির প্রথমদিকের কবিতা ছিল নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে অপাপবিদ্ধ এক মানুষের উচ্ছল ও প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতার সমাহার। আইরিশ ঐতিহ্যের সরল উপস্থাপনের জন্য শেকড়ের কবি হিসেবেও সুনাম কুড়িয়েছিলেন হিনি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ডেথ অব অ্যা ন্যাচারালিস্টের নামকরণের মধ্যেও লক্ষ করা যাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছোঁয়া। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর কবিতা হয়ে উঠতে থাকে আইরিশ-ব্রিটিশ সমাজের রূঢ় প্রতিচ্ছবি। সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে প্রাধান্য দিতে থাকেন তিনি। হিনির কবিতায় সামাজিক সংঘাতের বাস্তবচিত্র উঠে আসায় বহুবার তাকে মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

৭০-এর দশকে লেখা হিনির কবিতাগুলোতে আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টদের ধর্মীয় সংঘাত জায়গা করে নেয়। ধর্মের সংঘাত কীভাবে তাঁর কবিতাকে ক্ষতবিক্ষত করে সেটিই উঠে আসে পাতায় পাতায়। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত নর্থ ও ১৯৭৯ সালের ফিল্ড ওয়ার্ক কাব্যগ্রন্থে হানাহানি, ভয়-ভীতি, সামপ্রদায়িক দ্বন্দ্বই উপজীব্য হয়েছে। তাঁর এক কবিতায় ব্রিটেনকে তিনি রীতিমতো পেশীবহুল পুরুষশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ডকে তিনি তুলে ধরেছেন এক কোমল নারী হিসেবে। এই নারীকে কষ্ট দিচ্ছে তাঁর সন্তান উত্তর আয়ারল্যান্ড।

আইরিশ গণহত্যা নিয়ে লেখা তাঁর অনবদ্য সংকলন ‘বগ পয়েমস’-কে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলেই আখ্যা দিয়েছেন অনেক বিশ্লেষক। অতীত খুঁড়ে কান্না-দুঃখ-কষ্ট আর হারানোর বেদনা তুলে এনেছিলেন হিনি।

অক্সফোর্ড বক্তৃতায় হিনি তুলে ধরেছিলেন নাদেজদা মান্দেলস্তামের সেই মহান বাণী ‘কবিতা বিশ্বসংহতির বাহন’। হিনির এই দৃষ্টিভঙ্গি, আইরিশ জাতির দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে অভিনব ছিল। উগ্র জাতীয়তাবাদ নয়, ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত (প্রোটেস্টান-ক্যাথলিক) আয়ারল্যান্ডের পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ অভিন্ন এক আইরিশ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। ‘কবিতা হচ্ছে একধরনের প্রতিষেধক। মানবতার পক্ষেই তাকে কাজ করতে হবে’—এই ছিল হিনির কবিতা বিশ্বাস।

তিনি ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আচরণ দিয়ে ক্ষুব্ধ করতে চাননি। ঘৃণ্য ও বিদ্বেষপূর্ণ সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল বিতৃষ্ণা। যা ঘৃণা সৃষ্টি করে, হিনি তা কখনো সমর্থন করেননি। তাঁকে এককভাবে শুধু কবিই বলা যাবে না। তিনি ছিলেন কবি, গদ্যকার ও কবিতার গবেষক। গদ্য রচনায় তাঁর পারদর্শিতা বোঝা যায় তাঁর প্রবন্ধগুলো পড়লেই। রিপজেশনস নামক নির্বাচিত গদ্যগ্রন্থে কবিতা নিয়ে টিএস এলিয়টের কবিতা সমপর্কিত ভাবনাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে তুলে ধরেছিলেন নিজস্ব চিন্তাভাবনা। আধুনিক কবিতা ধাপে ধাপে কোন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে কবিতা হয়ে উঠবে, সেটি ছিল এলিয়টের কবিতা-ভাবনা। কিন্তু হিনি সার্বিকভাবে কবি ও কবিতার পুনর্জন্ম বা নতুন নতুন আবির্ভাবের কথা তুলে ধরেন তাঁর গদ্যে।

হিনি দাবি করেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আর নেই, কিন্তু ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয়সূত্রে গড়ে উঠেছে গ্রেট ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্ত সমগ্র দ্বীপাঞ্চলের কবিতা। ব্রিটেন বিষয়ক এক প্রবন্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষমতা যে আজ ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে সেটি উল্লেখ করেছিলেন নিপুণভাবে। টেড হিউজ, জিওফ্রে হিল আর ফিলিপ লারকিনের কবিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আমেরিকান ও ব্রিটিশ ইংরেজি সাহিত্যের এক বিশাল মেলবন্ধন তুলে ধরেন।

দীর্ঘসময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হিনি দুই মহাদেশের একই ভাষার সাহিত্যকে তাঁর কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধে একীভূত করার চেষ্টা করেছেন অনেকবার।

২০১০ সালে তাঁর নির্বাচিত কবিতার সংকলন ‘দ্য হিউম্যান চেইন’-এর কেন্দ্রীয় কবিতা মিরাকল, তাঁর স্ট্রোকের কারণে অসুস্থতার সময় লিখেছিলেন। সেটিই ছিল হিনির সর্বশেষ গ্রন্থ। শেষদিন পর্যন্ত কবিতার সঙ্গেই ছিল তাঁর বসবাস। হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় হিনি তাঁর সন্তান ও পরিজনের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘ভয় পেয়োনা’। মৃত্যুকে ভয় করার কিছু নেই কারণ দেহ শেষ হয়ে গেলেও বেঁচে থাকবে হিনির অসাধারণ সব সৃষ্টি।

অন্যচোখে হিনি : বিখ্যাত মার্কিন কবি রবার্ট লাওয়েল তাঁকে বলতেন, ডব্লিউ বি ইয়েটস-এর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইশির কবি। শুধু লাওয়েল নন, সমসাময়িক কবিরাও তাঁকে আইরিশ কবিতার গুরু বলেই গণ্য করছেন। ব্রিটিশ সাহিত্যিক জন সাদারল্যান্ডের মতে, হিনি হচ্ছেন তাঁদের যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। আমেরিকান কবি রবার্ট পিনস্কি প্রশংসায় সবার থেকে এক ধাপ এগিয়ে। পিনস্কির মতে, হিনি শুধু কবিই নন, বর্তমান মানবজাতির জন্য উপহারস্বরূপ। হিনি নিজেই একটা গল্প। আর বলে গেছেন অনবদ্য সব গল্পকথা। পিনস্কি দাবি করেন, সম্ভবত হিনিই সবচেয়ে পরিচিত কবি। হিনিকে সবাই যেভাবে চেনে সেভাবে আর কোনো কবিই নাকি পাঠকদের এত কাছে যেতে পারেননি।

এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদ গ্রন্থে কবি হিনিকে সমকালীন আইরিশ কবিতার প্রধান প্রতিনিধি বলে উল্লেখ করেছিলেন। সাইদের মতে, আইরিশ সাহিত্যে গতশতকের প্রথম দিকে একধরনের পুনর্জাগরণ হয়েছে। সেদেশের লেখক ও চিন্তাবিদরা নিজেদের লেখার উপাদান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন জাতীয় অভিজ্ঞতা। সমকালীন ভাবনা দ্বারা তাঁরা নবায়িত হয়েছিলেন। তাঁদের লেখায় ফুটে উঠেছে জাতিগত আত্মপরিচয়, স্থানিকতা ও শেকড়ের প্রতি তীব্র টান। এই অভিজ্ঞতা হিনির কবিতা ও গদ্য যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়ে যায়।

হিনিকে আইরিশ কবিতার নেলসন ম্যান্ডেলা বলেও দাবি করেন তাঁর গুণমুগ্ধরা। ম্যান্ডেলা যেমন কৃষ্ণাঙ্গদের জাগিয়ে তুলেছিলেন, হিনিও তেমন করে আইরিশ জনগণের না-বলা দুঃখ-কষ্টগুলো তুলে এনেছিলেন পাতায় পাতায়। এক কথায় তিনিই আইরিশ কবিতার মহীরুহ।

কবি হিসেবে তিনি খ্যাতির এমন চূড়ায় অবস্থান করছিলেন, পুলিত্জার বিজয়ী নিউ ইয়র্কার-এর কবিতা সমপাদক মালডুন বলেন, ইয়েটস অনেক খ্যাতিমান কবি ছিলেন, পাশাপাশি জনকল্যাণে যুক্ত ব্যক্তিত্ব, কিন্তু সিমাস হিনির তারকাসম ব্যক্তিত্ব কিংবা সবধরনের মানুষকে ছুঁয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ঈর্ষণীয়। তিনি তাঁর দেশের জন্য অমর একটি অধ্যায়। তিনি এমন এক কবি যিনি প্রায় রকস্টারের মতো জননন্দিত।

ব্রিটিশ অভিনেতা ও সাহিত্য সমালোচক লিয়াম নেসনের একটাই কথা—এ যাবতকালের কবিতার বটবৃক্ষ ছিলেন হিনি। সেটি আইরিশ ও ইংরেজি দুই ভাষারই। ব্রিটিশ কবি অ্যান্ড্রু মোশন হিনি সমপর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে একটি শব্দই বলেছিলেন—অনবদ্য। মোশন আরও বলেন, লক্ষ লক্ষ পাঠককে তৈরি করেছিলেন হিনি। কবিতা পড়তে শিখিয়েছিলেন আমাদের।

সবাই যে হিনি-ভক্ত তা নয় কিন্তু। সময়ে-অসময়ে কঠোর সমালোচনার শিকারও হতে হয়েছে হিনিকে। ব্রিটিশ লেখক ও সাংবাদিক শন থমাস নিজেকে হিনির সবচেয়ে বড় সমালোচক হিসেবে দাবি করে আসছেন শুরু থেকেই। তার মতে, কাউকে জিজ্ঞাসা করলে হিনির লেখা দুটো লাইন বলতে পারবেন না। মনে রাখার মতো কোনো কবিতাই হিনি লিখতে পারেননি। সমসাময়িকদের মধ্যে আর কেউ আইরিশ জাতীয়তাবাদ ও লড়াই নিয়ে সাহিত্য রচনা করেননি বলেই হিনি এত সামনে উঠে এসেছেন। অন্যদিকে, শন নিজেই হিনিকে আইরিশ কবিতার নেলসন ম্যান্ডেলা বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

অনেকে আবার হিনিকে আইরিশ ভাষার অমর কবি বলতেও নারাজ। ডব্লিউ বি ইয়েটস ছাড়া নাকি আইরিশ ভাষায় আর কোনো কবিই নেই—এমন কথাও শুনতে হয়েছে হিনিকে।

হিনির মৃত্যুর পর টেলিগ্রাফের সাহিত্যপাতায় সাহিত্যিক থমাস নক্স লেখেন, মৃত্যুর পর কোনো ব্যক্তির সমালোচনা লেখা উচিত নয়। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে পৃথিবী ও দুনিয়া থেকে মুছে যাবে হিনির সৃষ্টি। বড়জোড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে তাঁর লেখা কবিতার জোড়েই বেঁচে থাকবেন তিনি। আইরিশ জাতীয়তাবাদের ধারক বাহক বলে আরও বেশিদিন আইরিশরা তাঁকে মনে রাখবেন।

তবে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না হিনিই সব শেষ আইরিশ প্রতিভা। বিশ্বখ্যাত আইরিশ কবি সাহিত্যিকদের সর্বশেষ জগত্ কাঁপানো উত্তরাধিকার হিনিই ছিলেন। জর্জ বানার্ড শ, ডব্লিউ বি ইয়েটস, অ্যাডমান্ড জে এম সিঞ্জ, জেমস জয়েস আইরিশ সাহিত্যের যে ধারা সৃষ্টি করেছিলেন হিনি তা বয়ে এসেছেন আমৃত্যু। নিজের উত্তরাধিকার সৃষ্টি করে যেতে পারেননি হয়তো। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে হিনি অমর, অনবদ্য এবং অনস্বীকার্য। হিনির পর আরেকজন আইরিশ জিনিয়াসকে খুঁজে পেতে হয়তো অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক শতক।