ফেব্রুয়ারী মাসের কবিতা

১.
ভুলে গেছি প্রতিশ্রুতি
কাজী সাইফুল ইসলাম

সক্রেটিস তোমার জন্মের বহু আগেই
আদি অন্ধ কবি হোমার বপন করেছিল
মানুষের সভ্য হবার ইতিকথা, তার পর তুমি এলে
হেমলক বিষ পানে নিজেকে দিয়ে গেলে পৃথিবীর জন্য
মিসিসিপি, আলেকজান্দ্রিয়া, সিন্দু, রোম আর এথেন্সের
পথে পথে এগিয়ে চলা মানুষ পিছনে ফেলে রাখেছিল-
বহু পুরাতন জীবনের গাঁট,
কতো কী প্রতিশ্র“তির সুখের জোয়ারে ভাসিয়ে পৃথিবী পেয়েছিল তন্ত্র
আবার সামন্ততন্ত্রের নিষ্ঠুর চাবুকে রক্তাক্ত এই পৃথিবী
আমাদের ছিল শান্তির প্রতিশ্র“তি, সাম্য আর ক্ষুধা মুক্তির প্রতিশ্র“তি
কার্ল মার্কস, লেনিন, ফ্লেডরিক এঙ্গেলস-
তোমাদের দেখানো পথেই চির বিপ্লবী হাতে
অস্ত্র তুলে নিয়েছিল চেগুয়েভারা, সোভিয়ত পাড়ি দিয়ে
বিপ্লবের সুর ধরেছিল হো চি মিন-
চীনের দুঃখ ঘোচাতে জেগেছিল মাও সেতুং
নির্যাতন আর অধিকার বঞ্চিত এই বাংলায়
গণতন্ত্রের প্রতিশ্র“তি নিয়ে জেগেছিল শেখ মুজিব
‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা
ভুলে গেছি সব প্রতিশ্র“তি- আজ সাম্য নেই
নেই গণতন্ত্র- আছে শুধু ক্ষুধা,
ওয়াশিংটন আর লন্ডন যেন সভ্যতার ভুর বাঁধা প্রচ্ছদে-
লেপ্টে দিয়েছে গোটা পৃথিবীকে!
আভিজাততন্ত্রের আগ্রসী মাতাল হাওয়ায় ভূলণ্ঠিত আজ সভ্যতা,
কায়রোর পথে পথে চলে ধর্মযুদ্ধ, বাগদাদে দেখি তারই প্রতিচ্ছবি
রোম, মাদ্রিত আর পেরিসের মুখে আট্টহাসি
তন্ত্র সমীকরণে সিরিয়ায় চলে লাশের মিছিল-
সুদান ভেঙে হয় দু-খন্ড
তবুও যেন শন্তি মেলে নি কোন তন্ত্রে-
কঙ্গো, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া, ইথুপিায়ার
পথে পথে মানুষের হাহাকার, ক্ষুধা আর ক্ষুধা
ভুলে গেছি সব প্রতিশ্র“তি, মানুষ হয়ে জন্ম নেবার প্রতিশ্র“তি
গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের প্রতিশ্র“তি
ভুলে গেছি সব- মাটিতে লেগে থাকে রক্ত, আর
বুভুক্ষেুর রক্তবমি।

২.
কতোটুকু স্বাধীন আমি?
শামীম চৌধুরী

স্বাধীন দেশে থাকবো বলে ছিলাম অভিলাষী
দেশে থেকে গড়বো স্বদেশ হবো না পরবাসী,
মনে ছিল অনেক আশা, রঙিন ছিল জীবন দিশা
ঘুঁচে যাবে দু:খ বাধা, কেটে যাবে আঁধার নিশা।
হাওয়ায় মিশে সব আশা দেশেই আমি দেশহারা
ঝঞ্ঝা মাঝে তরী ডুবে মাল্লামাঝি দিশেহারা
আশার ভরে রাত কেটে যায়, তবু না পায় কুল কিনারা
হায়রে আমার সোনার দেশে সোনার তরী পথহারা।
রক্ত দিলাম স্বাধীন হলাম, সাধ নেবো স্বাধীনতার
কোথায় আমার স্বাধীনতা, কোথায় আমার অধিকার
নাইরে খাবার ঘরে আমার, থাকছি অনাহার,
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
শূন্য হাতে ভয়ে তস্ত্র, অত্যাচার আর অবিচার
শিক্ষালয়ে শিক্ষা নেই ছাত্র খোঁজে টেন্ডার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
নাস্তিকদের ভ্রষ্টাচার, শাসকদের মিথ্যাচার
পানি নিল শিল্প গেল রক্ষক আজ তাবেদার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
সোনাভরা দেশটা আমার করল কে ছারখার?
একি হলো সোনার দেশের ধর মার লাগাতার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
সুধীজনের সাধু কথায় চোখ রাঙায় স্বৈরাচার
অন্যায়ের প্রতিবাদে গুলি চালায় নির্বিচার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
মধ্যরাতে মতিঝিলে মারলো মুমিন বেশুমার
উলামারা কর্ণধার, তাদের উপর অত্যাচার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
জনগণ হারিয়েছে তাদের ক্ষমতা এবার,
অস্ত্র জোরে সরকার চালায় অত্যাচার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
ইতিহাসে আছে নমরুদ ফেরাউনী অত্যাচার
বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে সবার হয়েছে হার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
ভারতের সরকার, শেখ হাসিনা তাবেদার
চাটুকার ইমরানের লাম্পট্য আর মিথ্যাচার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
নির্দোষকে হত্যা করে আওয়ামী দুরাচার
গণমাধ্যমে প্রচার করে এসব এনকাউন্টার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
ক্রসফায়ারে মারলে হয় না কোন বিচার
কেমন এ দেশ যেখানে ঘাতকের অধিকার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
স্বৈরাচারী হতে কত ভূষণ প্রয়োজন হাসিনার
কারাগারের জেলার, মানুষের কিলার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
মানুষ নামের কলঙ্কই তো এই সরকার
কতোটুকু স্বাধীন আমি ভাবছি বারে বার।
আমিও মানুষ, ওরাও মানুষ, অসহ্য এ অবিচার,
ইচ্ছে হয়, এখনই হাতে নেব হাতিয়ার
নিপীড়িত মানুষকে মুক্তি দিতে হব সিপাহসালার।
ভুলতে হবে কে স্বৈরাচার আর কে রাজাকার
করতে হবে নিশ্চিত সকলের অধিকার।
শান্তির আশায় অনুসারী হতে হবে রাসুলে খোদার
নতশিরে অনুগত হতে হবে মহান সৃষ্টিকর্তার

কথা দিচ্ছি কেউ জানবে না
মোকসেদুল ইসলাম
কথা দিচ্ছি কেউ জানবে না, কেউ দেখবে না
কাক-পক্ষীও টের পাবে না
তোমার ভালোবাসার সংবাদ।

ভালোবাসা শিখব বলেই তোমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি আমি
নস্টালজিক হওয়ার আশায় নয় বাস্তববাদী হব আজ।

কেউ জানবে না অনুপুঙ্খ পাঠে পাঠে খসড়া ভালোবাসারা কি করে হৃদয়ে ঠাঁই নেয়
কেউ জানবে না এই পথে আনাড়ী কবি হেঁটেছিল প্রেমের দীক্ষা নিবে বলে
কথা দিচ্ছি কেউ দেখবে না কচুরিপানার মতো একদিন ভাসিয়ে দেব তোমায় সুখে।

কেউ বুঝবে না শুধু তুমি ছাড়া আমার নির্দোষ হৃস্পন্দনের মানে।
সমুদ্র সব পাপ ধুয়ে পুন্য ফিরিয়ে দেয়
মহাসুমুদ্র মাঝে আমি এক নীলকন্ঠ পাখী চিত্তবিন্দু হয়ে বসে আছি
চারিদিকে শুধু জল-অনন্ত নীল জল – দারুন লবনী জল৷
এতো পরিসর – বড় পরিসর যেন বিশুদ্ধতার সমস্ত ‘ভিনাস’
সুদূর ‘প্যারিস আইফেল’ – ঘরের শুভ্র তাজমহল সব দাঁড়িয়ে সামনে৷
বসে আছি আমি নিরন্তর স্বপ্নবেশে-ভালবাসা আমার অন্তরে একা কথা বলে চলেছে৷
কেন জানি মনে হচ্ছে ফেরা হবে না আর দৃশ্যমান পৃথিবীতে৷
না ফেরাটা মনের হলুদ ইচ্ছা৷
আসলে অশুদ্ধতার ভিতরে এই পরিসর বিশুদ্ধতা কোথায় রাখবো
রাখতে গেলে —-
ঘর ভেঙ্গে সাজাতে হবে ধুলোতে৷
সমস্ত পুরানো পুকুরগুলো কেটে ঝিল বানাতে হবে৷
সমস্ত নদীকে ডেকে বলতে হবে তোমার গতি ফিরিয়ে
ঝিলে এসে অন্তঃত একবার মিশে গিয়ে আবার ফিরিয়ে দাও মহাসমুদ্রে৷
পুকুর ঝিলের পাপজল সমুদ্র একবার ধুয়ে মুছে ফিরিয়ে দেবে তার নিজস্ব পুন্যতায়৷

সমুদ্র সব পাপ ধুয়ে পুন্য ফিরিয়ে দেয়৷

৩.
জঠরাগ্নি
বিলকিস আলম

আজ সবকিছুই যেন কেমন অদ্ভুদ লাগছে
অতৃপ্ত স্মৃতির ধূসর ধুলোয় ভারাক্রান্ত এই মন।
বুকের ভেতর অস্থির দীর্ঘশ্বাস,
রক্তে উত্তাপ ছড়িয়ে জ়েগে উঠে ক্ষুধার্ত তৃষ্ণা
মাতাল পিপাশায় ঘোর-নেষা জাগে প্রানে!

অন্তরের আকুল কামনায় প্রলয়ঙ্কারি
ঘণ্টা বেজে ওঠে আজ এ উম্মাদ হৃদয়ে
নিজেকে চিনতে বড় কষ্ট হয় আজ।
কে আমি, এই প্রকৃতির জঠরে বন্দী?

উত্তেজনায় কেঁপে উঠে আমার অস্তিত্বের ভীত…
নগ্ন উল্লাসে নিজেকে হারিয়ে ফেলি।
তৃষিত বুকের নিভৃতে জেগে উঠে মিলন-তৃষা
মিলনের ব্যাকুলতায়…
যুগে যুগে খুঁজবো তোমায় নিরন্তর।

আমি তখনও লাশ হয়ে থাকবো
আহমেদ মুনীর
তুমি ভালোবাসো পদ্মাপারে যমুনার বুনোজলে
বসুন্ধরা বাউনিয়ার গৃহকোণে সামীর জামিউল যুবকের
আকাশ কাঁধ কপোল চিবুক নাঙ্গা অধর
আর আমার নিষ্প্রাণ লাশ ।।

পড়ার টেবিলে নির্ঘুমে জড়াও তাকে যদি বলো ‘ভালোবাসি
আমিতো আছি প্রত্যহ তোমারই’
ক্লাশের ক্লান্তির একঘেয়ে অবসরে
ক্ষুধার্ত তৃষ্ঞার্ত ঘর্মাক্ত উৎসুকে তার হাতে চাপ দিয়ে
নিশ্চিত করো তোমার ভালোবাসা
সিনেপ্লেক্সের কর্ণারে কিংবা মধ্যরাতে
পাশাপাশি শুয়ে আধোঘুমে বুকে চেপে ধরে
প্রমাণ করো নিশ্ছিদ্র ভালোবাসা
দুজনে একত্রে পার্কের রাস্তায় হেঁটে কিংবা দুর্বাঘাসে বসে
তার কাঁধে হাত রেখে বলো ‘সখে, তোমাকেই ভালোবাসি’
প্রত্যুষে খুব ভোরে দিবসে প্রথম আলো আঁধারে
তার কপোলে গালে হাত বুলিয়ে বুকে বুক মুখে মুখ রেখে
একটু বেঁকে ভালোবাসার কবিতাসমগ্র আবৃত্তি করো ।।

কখনও অসুস্থ হলে জ্বরে শরীর কপাল পুড়লে
মাথায় পানি দিতে দিতে তার মুখের দিকে ঝুঁকে
তোমার গরম শ্বাস তার শ্বাসে বয়ে দিয়ে দাও
আর বলো ‘ভালোবাসি ভালোবাসি আর চাই শুধু তোমাকেই’
এমনকি প্রচণ্ড যুদ্বের দামামায় পাগলিনীর বেশে উদ্বিগ্ন হয়ে
তাকেই ভালোবাসার আশ্বাসে নির্ভার করো
পোখারার সাত তারকা ফুলবারীতে তার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে
সুটকেস ফেলে রেখে বড়ো আদরে তাকে বুঝিয়ে দাও
অথবা সরাসরি সোজাসুজি তাকে সঠিক উচ্চারণে বলো
তোমার অনুরাগ ভালোবাসার কথা ।।
প্রচণ্ড ঝড়ে যখন ওড়ে যায় আশ্রয় ঘরবাড়ি
তার বুকে মাথা রেখে মাথা ছুয়ে বলো ‘ভালোবাসি’,
সবশেষে যখন চিরনিদ্রায় মাটির ঘরে হবে তার শেষ বিছানা
সেখানেও যেভাবেই পারো চিৎকার করে ধ্বনিত করো
‘ভালোবাসি ভালবাসি, ভালবাসি’ –
আমি লাশ হয়েও তোমার সেই কণ্ঠস্বর শুনবো, বুঝবো
তুমি ভালো আছো
তাকে ভালোবেসে কোন কষ্ট নেই তোমার এখন আর
আমি তখনও লাশ হয়ে থাকবো নিশ্চল নিশ্চুপ নিরাকার ।।

৪.
আমার কবিতা
মো: সোহাগ মিয়া

আমার কবিতা আমি দিয়ে যাবো
আপনাকে, তোমাকে ও তোকে।
কবিতা কি কেবল শব্দের মেলা,
সংগীতের লীলা?
কবিতা কি ছেলেখেলা, অবহেলা রঙিন বেলুন?
কবিতা কি নোটবই, টু-ইন-ওয়ান,
অভিজাত মহিলা -সেলুন?
কবিতা তো অবিকল মানুষের মতো চোখ-মুখ-মন আছে, সেও বিবেক শাসিত, তারও আছে বিরহে পুষ্পিত কিছু লাল
নীল ক্ষত।
কবিতা তো রূপান্তরিত শিলা,
গবেষণাগারে নিয়ে খুলে দেখো তার সব অণু-পরমাণু জুড়ে
কেবলি জড়িয়ে আছে মানুষের মৌলিক কাহিনী।
মানুষের মতো সেও সভ্যতার চাষাবাদ করে, সেও চায় শিল্প আর স্লোগানের শৈল্পিক মিলন,
তার তা ভূমিকা চায় যতোটুকু যার উৎপাদন।
কবিতা তো কেঁদে ওঠে মানুষের
যে কোনো অ-সুখে,
নষ্ট সময় এলে উঠানে দাঁড়িয়ে বলে,– পথিক এ পথে নয়
‘ভালোবাসা এই পথে গেছে’।
আমার কবিতা আমি দিয়ে যাবো
আপনাকে, তোমাকে ও তোকে।