প্রসঙ্গ: সামরিক আইনে জিয়া হত্যা মামলার বিচার

Ziaur_Rahman দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অসংখ্য গ্রুপিং, পরস্পরের প্রতি পরস্পরের সন্দেহ ও অবিশ্বাস—একের প্রতি অপরের ঈর্ষা, নেতৃত্বের কোন্দল, চেতনাবিমুখ প্রবণতা প্রভৃতির কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের বারবার অপবাদ কাঁধে নিয়ে পরাজিত সৈনিকের মতো মুখ লুকিয়ে থাকতে হয়েছে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন অংশের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়া হত্যাকাণ্ড নি.সন্দেহে বেশি নিন্দিত, আলোচিত এবং বেদনাদায়ক ঘটনা। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে, প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও বিচার শেষে দোষী হিসেবে প্রমাণিতদের শাস্তি দেয়া হয়েছে।

অনেক সুধীজন বিভিন্নভাবে তাদের লেখনীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হলেও এ বিষয়ে অনেক কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। তবে সত্য ভাষণ নিয়ে জাতির সামনে অদ্যাবধিও কোনো আইন বিশেষজ্ঞ সরাসরি মঞ্চে অবতীর্ণ হওয়ার মতো সাহসী ভূমিকা রাখতে পারেননি। এমনকি গোপন সামরিক আদালতে সংঘটিত বিচারকাজের প্রসিডিংয়ের অনেক ত্রুটি তুলে ধরে হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টে রিট আবেদন করা হলেও মানবতার এই আবেদন কোনোভাবেই মূল্যায়িত হয়নি।

৩০ মে প্রত্যুষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হন এবং জিয়া হত্যার দায়-দায়িত্ব বর্তানো হয় চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের (বীর উত্তম) ওপর। কথিত আছে, মঞ্জুর বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি সেনা বিদ্রোহ হয়। জিয়া নিহত হওয়ার পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসে জেনারেল মঞ্জুরের ভূমিকায় তার কাঁধে জিয়া হত্যার দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়ার একটা সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। আর পর্দার অন্তরালে যে ঘটনাগুলো অতি দ্রুত ঘটেছিল, সেগুলো অদ্যাবধি জাতির সামনে প্রকাশ করা হয়নি।

জে. মঞ্জুরকে পুলিশ গ্রেফতার করে বা তিনি আত্মসমর্পণ করেন। গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণের সময় তার সঙ্গে ছিলেন মেজর রেজাউল করিম রেজা। জে. মঞ্জুর পুলিশ হেফাজতে থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে থাকতে দেয়া হয়নি। পুলিশের হাত থেকে সামরিক বাহিনী তাকে নিজ হেফাজতে নিয়ে নেয়। পরে জে. মঞ্জুরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি যখন নিহত হন, তখন তিনি সামরিক বাহিনীর হেফাজতে ছিলেন।

সেনাবাহিনী আইনের এখতিয়ারভুক্ত কোনো ব্যক্তি সেনাবিদ্রোহ অথবা অবাধ্যতা, বৈধ কমান্ড অমান্য অথবা সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো কোনো সামরিক অপরাধ করলে কোট মার্শাল গঠন করা হয়। জিয়া হত্যা মামলায় অর্থাত্ চট্টগ্রাম সেনাবিদ্রোহের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সবাই সেনাবাহিনী আইনের এখতিয়ারভুক্ত এবং সেনা আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, অর্থাত্ তাদের বিরুদ্ধে সেনাবিদ্রোহ ও অবাধ্যতার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই সেনাবিদ্রোহ ও অবাধ্যতার পরিণতিতেই রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে। এটা এক গুরুতর সামরিক অপরাধ। সেনাবিদ্রোহ এমনই এক গুরুতর অপরাধ, যা কেবল আর্মি কমান্ড ও শৃঙ্খলাকে বিঘ্নিত করে না, বরং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তোলে। সেনাবাহিনী আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী সেনাবিদ্রোহ ও অবাধ্যতার অপরাধে অপরাধী হলে:

এই আইনের এখতিয়ারভুক্ত কোনো ব্যক্তি নিম্নলিখিত কোনো অপরাধ করলে, অর্থাত্—১. বাংলাদেশের স্থল, নৌ অথবা বিমানবাহিনীতে কিংবা তাদের সঙ্গে সহযোগিতাকারী যে কোনো বাহিনীতে কোনো বিদ্রোহ করতে অথবা বিদ্রোহে যোগ দিতে শুরু করা উত্সাহিত করা, বিদ্রোহ করা কিংবা বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র করা অথবা ২. এ ধরনের কোনো বিদ্রোহে উপস্থিত থাকা, এ ধরনের বিদ্রোহ দমনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা না করা, অথবা ৩. এ ধরনের কোনো বিদ্রোহের অস্তিত্ব অথবা এ ধরনের বিদ্রোহের কোনো অভিলাষ কিংবা এ ধরনের কোনো ষড়যন্ত্রের কথা জানা সত্ত্বেও বা অস্তিত্ব আছে বলে মনে করার কারণ থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত বিলম্ব না করে তার কমান্ডিং অফিসারকে অথবা অপর কোনো ঊর্ধ্বতন অফিসারকে খবর না দিলে; অথবা ৪. বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, নৌ অথবা বিমানবাহিনীর কোনো ব্যক্তিকে তার কর্তব্য থেকে বিরত রাখা অথবা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তার আনুগত্য থেকে বিরত রাখার জন্য উসকানি দিলে কোর্ট মার্শালের বিচারে তার প্রাণদণ্ড দেয়া হবে। অথবা উল্লিখিত এই আইনের অধীনে লঘু শাস্তি দেয়া হবে।

সেনা আইনের ১৩৩ ধারায় বলা হয়েছে, এ ধরনের কোর্ট মার্শালের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদের ব্যবস্থা নেই। ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করতে একাধিক অথবা বড়জোড় সংখ্যক সদস্যদের নিয়ে একটি কোর্ট মার্শাল সাধারণত গঠিত হয়ে থাকে।

জিয়া হত্যা মামলার চারজন পলাতক আসামির কথা উল্লেখ রয়েছে মেজর রফিকুল ইসলাম লিখিত ‘স্বৈরশাসনের ৯ বছর’ শীর্ষক গ্রন্থে। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মেজর আবদুল কাইয়ূম খানকে রহস্যজনক কারণে এরশাদের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। মেজর খালেদের ব্যাংককে মৃত্যু ঘটে। মেজর মোজাফফর ও মেজর মঈনুল পলাতক ছিলেন।’

১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক প্রথম আলোয় জেনারেল মঈনুল হোসেন চৌধুরী ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষী’ লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৮১ সালের মে মাসের প্রথম দিকে আমেরিকাতে সামরিক প্রশিক্ষণে মনোনয়নের জন্য তত্কালীন লে. ক. মতিউর রহমান, লে. ক. ইমামুজ্জামান ও পাকিস্তান প্রত্যাগত লে. কর্নেল সাখাওয়াতকে একত্রে সেনাসদরে বাছাইয়ের জন্য ডাকা হয়। সেনাপ্রধান ইমামুজ্জামানও মতিকে বাদ দিয়ে সাখাওয়াতকে আমেরিকায় প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত করেন। মনোনয়ন না পেয়ে লে. কর্নেল মতি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হন।’

কর্নেল মতি সেনাসদর থেকে সরাসরি বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব জেনারেল সাদেকের সঙ্গে দেখা করেন এবং মনোনয়নে অনিয়মের কথা জানান। তিনি অভিযোগ করেন, মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা আর্মিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন-ব্যাপারটি জেনারেল সাদেক যেন রাষ্ট্রপতি জিয়াকে জানিয়ে দেন। এরপর কর্নেল মতি রাষ্ট্রপতির সামরিক স্টাফ অফিসার লে. কর্নেল মাহফুজের সঙ্গে দেখা করেন। লে. কর্নেল মাহফুজ কর্নেল মতির ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সব কথা শুনে মাহফুজ আশ্বাস দেন যে, তিনি মতিকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবেন। পরে জিয়ার চট্টগ্রাম সফর সম্পর্কিত সব তথ্য আগাম মতিকে জানিয়ে দেন মাহফুজ। লে. কর্নেল মতিউর ছিলেন ২৪ পদাতিক ডিভিশনে এবং-১ (সিআই)। তিনি চট্টগ্রামে ফিরে গিয়েই রিউমার ছড়িয়ে দেন, অল্পদিনের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নিধন করা শুরু হবে। তোমরা যদি বাঁচতে চাও তবে জিয়াকে বন্দি করে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সময় নেই। মতির এই রিউমারটি মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যে জাদুর মতো কাজ করেছিল। এই ব্যাপারটিতে মতিকে সাহায্য করেছিল মেজর কাইয়ূম। কাইয়ূম সেনাবাহিনীর খুব উঁচু পর্যায়ে প্রণীত এ রকম একটি চক্রান্তের নীলনকশা উদঘাটন করেছেন বলে দাবি করেন। সেনাবাহিনী এবং সাবেক জাতীয় রক্ষীবাহিনী, যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা আরও অধিক সংখ্যায় ছিল—এই উভয় ক্ষেত্রের মুক্তিযোদ্ধাদের এক অভিন্ন প্ল্যাটফরমে এনে বিদ্রোহীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উজ্জীবিত করাই ছিল গুজবের আসল উদ্দেশ্য। ১৯৮১ সালের ২৫ থেকে ২৬ মে সেনানিবাসে ক্যাপ্টেন থেকে মেজর পদোন্নতির পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সে উপলক্ষে ২৪ ডিভিশনের সংশ্লিষ্ট সব অফিসার চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সমবেত হন। অধিকাংশ অফিসার পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের অগ্রবর্তী ফাঁড়ি থেকে আসেন, পরীক্ষা শেষ হলেও তারা চলে যেতে পারেননি। কারণ তাড়াহুড়ো করে একটি অনির্ধারিত এক ট্রেনিং ক্যাডারের অসিলায় অর্থাত্ ২৭ মে ১৯৮১-তে অনুষ্ঠিতব্য প্রিভেন্টিভ মেইনটেন্যান্স ক্যাডারে তাদের আটকে রাখা হয়। পরে দেখা যায়, সার্কিট হাউসে যারা হামলা করেছিল তাদের বেশিরভাগ অফিসারই এসব গ্রুপ থেকে আনা হয়েছিল। ২৪ ডিভিশনের অধিকাংশ ব্যাটেলিয়নের সিও অথবা সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অথবা উভয়ই মুক্তিযোদ্ধা অফিসার হবেন এটা সুনিশ্চিত করা হয়। ২৪ ডিভিশনে চারটি ব্রিগেডের মধ্যে তিনটি ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন মঞ্জুরের বিশ্বস্ত মুক্তিযোদ্ধা। ঘটনার প্রাক্কালে অফিসারদের যে এক বিরাট অংশ চট্টগ্রাম ক্যান্টনেমেন্টে রয়ে যান তাদের অধিকাংশই হয় মুক্তিযোদ্ধা অথবা বিদ্রোহের নেতাদের পছন্দসই অফিসার। এটা করা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিরোধের ইস্যুটিকে সেনাবিদ্রোহের পক্ষে কাজে লাগানো এবং বিদ্রোহের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে তাদের এক ঐক্যবদ্ধ শক্তিরূপে নিয়োগের জন্য।

অনেকে মনে করেন, ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শাল অনুষ্ঠিত হয়, সেটাই জিয়া হত্যার মামলা ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল মে মাসে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে তথাকথিত সেনাবিদ্রোহের মামলা। এই মামলায় আসামি ছিলেন তিন সেনা অফিসার। ১৯৮১ সালের ১ জুন থেকে ৩ জুন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ৩০ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে ১০ জুলাই চট্টগ্রাম কারাগারের ভেতর ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শাল বসে এবং পলাতক ৩ কর্মকর্তাসহ ৩৩ সেনা কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে বিচার আরম্ভ করা হয় এবং ২৮ জুলাই শেষ হয়।

এই সামরিক আদালতের চেয়ারম্যান ছিলেন মেজর জেনারেল আবদুর রহমান। সদস্য — ১. ব্রিগেডিয়ার নাসরত আলী কোরেশী, ২. কর্নেল মোহাম্মদ মতিউর রহমান বিপি, ৩. কর্নেল মফিজুর রহমান চৌধুরী, ৪. লে. কর্নেল মোহাম্মদ মাসুদ আলী খান (ইঞ্জিনিয়ার্স), ৫. লে. কর্নেল এম মকবুল হায়দার (সিগন্যাল), ৬. লে. কর্নেল মোহাম্মদ হারিস এএসসি।

মেজর জেনারেল আবদুর রহমান জে. এরশাদের সময়ে প্যারিসে রাষ্ট্রদূত হন এবং সেখানেই নিদ্রিত অবস্থায় মারা যান। কর্নেল মতিউর রহমান নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

সেনাবাহিনীর আইনের ৬৪তম বিধির ব্যবস্থা অনুযায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আদালতকে সাহায্য করতে সব ঘটনা ও বিষয় আদালতের সামনে হাজির করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে কোনো অন্যায় সুবিধা গ্রহণ না করা অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে কোনো প্রমাণ চেপে না যাওয়া মামলার জন্য বাধ্যতামূলক। এই উদ্দেশ্যে কোর্ট মার্শাল গঠনকারী কর্তৃপক্ষ সিনিয়র অফিসার—১. ব্রিগেডিয়ার নাজিরুল আজীজ চিশতি পিএসসি, ২. কর্নেল এএমএসএ আমিন পিএসসি, ৩. লে. কর্নেল আবু নঈম আমিন আহমেদ পিএসসিকে কৌঁসুলি হিসেবে নিযুক্ত করেন।

সেনা আইনের ২৩তম বিধি অনুযায়ী কোর্ট মার্শালের বিচারের জন্য কোনো ব্যক্তিকে আটক করা হলে তাকে বিচারের জন্য আনার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টার আগে সংক্ষিপ্ত তথ্য প্রমাণের সারাংশ সরবরাহ করা হবে। সেনা আইনের অষ্টাদশ বিধিতে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তির পছন্দসই আত্মপক্ষ সমর্থনকারী অফিসার দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। সেনা আইনের ৮২তম বিধি অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনে কৌঁসুলি নিয়োগ করতে নাও দিতে পারেন। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছে।

আর্মি অ্যাক্ট অনুযায়ী অভিযুক্তদের পক্ষ সমর্থন করার জন্য তিনজন ডিফেন্ডিং অফিসার নিয়োগ করা হয়। তারা ছিলেন ব্রিগেডিয়ার আনোয়ার হোসেন পরে মেজর জেনারেল হন, দ্বিতীয় জন ছিলেন কর্নেল মুহম্মদ আইন উদ্দিন বীর প্রতীক (মুক্তিযোদ্ধা), পরে মেজর জেনারেল হন এবং তৃতীয় জন ছিলেন কর্নেল সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহিম বীর-প্রতীক, ইনিও পরে মেজর জেনারেল হন। শেষোক্ত দু’জন ১৯৯৬-এর ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন এবং সেনাবাহিনী থেকে তাদের অবসর দেয়া হয়।

কোর্ট মার্শালে বিচার আরম্ভ হওয়ার আগে ডিফেন্ডিং অফিসার নিয়োগের সময় অভিযুক্তদের পছন্দের কথা জিজ্ঞাসা করা হয়। এসব মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে বিচারের সময় এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, ডিফেন্ডিং অফিসার এবং অভিযুক্তদের মধ্যে সাক্ষাত্ এবং আলোচনার যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি। ন্যায়-বিচারের প্রধান বিষয় হলো পক্ষ সমর্থনকারী প্রতিনিধির অভিযুক্তরা পূর্ণ উপদেশ দেবেন পক্ষ সমর্থনের জন্য। তা না হলে ডিফেন্ডিং অফিসারদের পক্ষে সম্ভব নয় পূর্ণ ঘটনায় অভিযুক্তদের কী ভূমিকা ছিল কতখানি এবং কী প্রকার। এর অপ্রতুলতার কারণে ডিফেন্ডিং অফিসারদের পক্ষে তাদের কর্তব্য পরিপূর্ণভাবে পালন না করতে পারার কারণে অভিযুক্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। তৃতীয়ত, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অভিযুক্তদের দেখা-সাক্ষাতের পূর্ণ সুযোগ দেয়া হয়নি। যার ফলে আত্মীয়স্বজনরা ডিফেন্ডিং অফিসারদের সঠিক উপদেশ দিতে পারেননি। এতেও অভিযুক্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে অভিযুক্তদের দেখা-সাক্ষাতের জায়গা নির্ধারিত হয়েছিল তখনকার দেওয়ানহাট ওভার ব্রিজের উত্তর প্রান্তে টিলার ওপর এমইএস বাংলোয়।

বিচার কাজটি শেষ করার মধ্যে যথেষ্ট তাড়াহুড়া লক্ষ করা গিয়েছিল। ৩৩ জন যেখানে অভিযুক্ত হয়েছিলেন যার মধ্যে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা; তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ বিচার যার ফলে ১৩ জন অভিযুক্তকে ফাঁসির হুকুম দেয়া হয়েছিল এবং তা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ১৮ দিনে সমাপ্ত করা হয়। যে তিনজন ডিফেন্ডি অফিসার অভিযুক্তদের পক্ষ সমর্থন করেছিলেন তারা বলতে পারবেন কোর্ট মার্শালে বিচার চলাকালীন সময় তারা অভিযুক্তদের নির্দোষ প্রমাণ করার পূর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা এবং কোর্ট মার্শালের বিচারকগণ নিরপেক্ষভাবে বিচার কাজ করেছিলেন কিনা? এই বিষয়টি কখন প্রকাশ্যে খোলাখুলিভাবে আলোচিত হয়েছে তা জানা যায়নি।

জিয়াকে হত্যা ও সামরিক অভ্যুত্থানের অভিযোগে ১৯৮১ সালে ২০ জন সামরিক কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। ৩ জন অফিসার পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। সামরিক আদালতে যাদের বিচার করা হয় তাদের মধ্যে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। এদের ১২ জনের ফাঁসি কার্যকর হয় ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। ওই দিন রাত ১২টা ১ মিনিটে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয় ব্রিগেডিয়ার মহসিন উদ্দিন আহমেদ, কর্নেল নওয়াজ উদ্দিন, কর্নেল আবদুর রশিদ, লে. কর্নেল মাহফুজুর রহমান, লে. কর্নেল দেলোয়ার হোসেন, মেজর এ জেড গিয়াস উদ্দিন, মেজর কাজী মোমিনুল হক, মেজর রওশন ইয়াজদানী, মেজর মুজিবুর রহমান, ক্যাপ্টেন আবদুস সাত্তার, ক্যাপ্টেন জামিল হক ও লে. রফিকুল হাসান খানকে। আহত লে. কর্নেল ফজলে হোসেন অসুস্থ থাকায় তাকে ফাঁসি দেয়া হয় সুস্থ হয়ে ওঠার পর। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন মেজর শওকত, মেজর লতিফ, মেজর রেজা, মেজর ফজলুল হক, মেজর গিয়াস, ক্যাপ্টেন মুনীর, ক্যাপ্টেন ইকবাল ও লে. মোসলেহ উদ্দিন। দেশের বাইরে পালিয়ে যান মেজর মইন, মেজর এসএম খালেদ ও মেজর মোজাফফর হোসেন।

গ্রেফতার থেকে ফাঁসি দেয়া পর্যন্ত একটি বিষয় প্রকট হয়ে উঠে। সমস্ত প্রক্রিয়া ছিল একটা অতিমাত্রায় দ্রুততা। মেজর জিয়া নিহত হন। ১ থেকে ৩ জুনের মধ্যে ৩০ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। ১০ জুলাই কোর্ট মার্শালে ৩৩ জন সামরিক কর্মকর্তার বিচার শুরু হয়। ২৮ জুলাই বিচার কাজ সমাপ্ত হয় এবং অভিযুক্তদের বিভিন্ন কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কেন, তার কোনো কারণ প্রকাশ করা হয়নি। ১১ আগস্ট ১২ জন সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফাঁসির হুকুম হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে ৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করা হয়। ৭ সেপ্টেম্বর রিট আবেদনটি হাইকোর্ট খারিজ করে দেয়। ১৭ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রিট আবেদনটির শুনানি হয়। ২২ তারিখে আপিল বিভাগ রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে খারিজ করে। এ দিনই ওই রায়ের পুনর্বিবেচনার জন্য একটি আবেদন করায় তাও বিনা শুনানিতে খারিজ হয়ে যায়। ২৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ১২ মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হয়ে যায় এবং ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩-তে ত্রয়োদশ মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হয়।

ব্রিগেডিয়ার মহসিন মেজর (সাবেক) রেজাউল করিম রেজাকে বিচার চলাকালীন সময়ে বলেছিলেন—‘এরশাদ মনে হয় আমাকে বাঁচতে দেবে না।’ বিষয়টি কি, তাঁকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলছিলেন যে, তিনি যখন উরত্বপ.ড়ত্ গরষষর.বত্ু ওহ.বষষবমবহপব (উগও) ছিলেন, তখন নাকি রাষ্ট্রপতি জিয়া তাঁকে দুর্নীতিবাজ আর্মি অফিসারদের লিস্ট করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত সতর্কভাবে খোঁজখবর করে লিস্টটি তৈরি করেছিলেন। এই লিস্টে প্রথম নামটি ছিল সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, এনডিসি, পিএসসি-এর। তিনি বলেছিলেন, সবাই জানে আমি তিন দিন যাবত ঘরে ছিলাম। ঠিকমতো চোখ খুলতে পারতাম না। এরপরেও যেভাবে অমানুষিক নির্যাতন করে জোরপূর্বক আমার স্বাক্ষর ওরা নিয়েছে, এতে আমি নিশ্চিত যে, এরশাদ আমাকে বাঁচতে দেবে না।’

ব্রিগেডিয়ার মহসিনের ধারণাটা ফলে গিয়েছিল। এরশাদ দায়ী ছিল কিনা জানি না—তবে ফাঁসির দড়িতে তাঁকে বিদায় নিতে হয়েছে।

ফাঁসিতে নিহত সবচেয়ে কনিষ্ঠ সেনা ১৯৭৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকার ভিত্তিতে চতুর্দশ স্থানের অধিকারী, মাত্র ১৩ বছর বয়সে যিনি পিতার সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের এককালের সেই কৃতী ছাত্র লে. রফিক মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেয়ে তাঁর বন্ধুকে লিখেছিলেন—‘বুঝতেই পারছি সাম্প্রতিক ঘটনায় আমি জড়িত। অনিচ্ছাকৃত ও অজ্ঞাতে। বস্তুত এটুকুই আমি বুঝি আমার অপরাধ—জীবনের অনভিজ্ঞতা, সরলতা, আদেশ পালনকারিতা। (মর অথবা বাঁচ), কর্তব্যনিষ্ঠতা ও বিশ্বাসভাজন হওয়া। বস্তুত জিয়াকে রক্ষা করতে গিয়ে হঠাত্ দেখি তাঁকে খুনের দায়ে আমি জড়িত…। আল্লাহ যদি চান সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই এবং সবই জানবি। (সাফাই গাওয়া হয়ে যাবে যা অপরাধ জগতে স্বাভাবিক)। তবে এটুকু নির্বিঘ্নে বিশ্বাস করতে পারিস আমি অপরাধপ্রবণ নই—বরঞ্চ নৈতিক আর শেষে নৈতিকতা বোকামিই আমার কাল। গত ১১ আগস্ট মৃত্যুদণ্ডাদেশ হাতে পেয়ে আলহামদু লিল্লাহ ছাড়া কিছুই আসেনি আমার মনে—ব্যক্তিগতভাবে আমি আন্তরিকভাবে নিরপরাধ, পরিবেশের নির্মম শিকার হিসেবে মেনে নিয়েছি। তুই বোধ হয় জানতি জিয়াকে আমিও ভালোবাসতাম।

এভাবেই একে একে বিদায় নিয়েছিলেন ওরা স্বজনদের কাছ থেকে। শেষ দেখা বা শেষ বিদায় নেয়ার সুযোগ থেকেও ওদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা বা ধরা যাক ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসির হুকুম কার্যকর করার জন্য যে কোর্ট মার্শাল হয়েছিল তা আর্মি এ্যাক্ট অনুযায়ীও কতখানি নিরপেক্ষ ছিল এবং কোর্ট মার্শাল ন্যাচারাল জাস্টিস এর রীতি-নীতিগুলো কতখানি মেনে বিচার কাজ সম্পন্ন করেছিল। কোর্ট মার্শালকেও ন্যাচারাল জাস্টিস এর রীতি-নীতি মেনে চলতে হয়। এই বিচারের বেলায় কোর্ট মার্শাল এগুলো মেনেছিল বলে প্রতীয়মান হয় না। বিচার প্রক্রিয়া এবং হুকুম অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। ১০ জুলাই বিচার শুরু হয় এবং ২৮ জুলাই বিচার শেষ হয় এবং তার তিন সপ্তাহ পরে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসির হুকুম কার্যকর করার মধ্যে একটি অস্থিরতা লক্ষ্য করা যায়।

ফাঁসি হয়ে যাওয়া অফিসারদের আত্মীয়-স্বজন এবং অন্যান্য সাজাপ্রাপ্ত অফিসারগণ বিভিন্ন সময় বলেছেন যে, সমস্ত বিচার প্রক্রিয়াই ছিল প্রহসনমূলক, ষড়যন্ত্রমূলক এবং সাজানো। এই সন্দেহ আরও বেশী হয় যখন দেখা যায় যে, ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধাই দোষী হলো। হঠাত্ করে কেন মুক্তিযোদ্ধারা বিদ্রোহ করল কি তার কারণ ছিল এই বিষয়টি কোন মার্শাল কত বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছিল তা হিসাবে নিতে হবে বিশেষ করে। কোর্ট মার্শালের রায়ের বিরুদ্ধে আর্মি এ্যাক্ট অনুযায়ী কোন আপীল না থাকলেও আর্মি এ্যাক্ট দেশের আইন এবং সেই কারণে এর বৈধতা সংবিধান অনুযায়ী হতে হবে। সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরাও এদেশের নাগরিক। সেই কারণে আর্মি এ্যাক্ট সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদের আওতায় আসে সংবিধানের ১০২(৫) অনুচ্ছেদ থাকা সত্ত্বেও।

আর্মি এ্যাক্ট অনুযায়ী আপীল না থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কোর্ট মার্শালের রায় পর্যালোচনা করতে পারেন। হাইকোট বিভাগ দেখতে পারেন তার ‘রিট অব সার্টিওরেরাই’ এর আওতায় (ক) কোর্ট মার্শালের ঐ অভিযুক্তদের বিচার করার অধিকার ছিল কিনা। হয়ত ছিল তবুও হাইকোর্ট বিভাগ বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে পারতেন। (খ) আইন প্রদত্ত কোর্ট মার্শাল নাগরিকদের অধিকার সংক্রান্ত বিষয় নিষমত্তির অধিকার ছিল কিনা। (গ) কোর্ট মার্শালকে আইন মোতাবেক বিচার করতে হবে। এখানেই ন্যাচারাল জাস্টিস এর প্রশ্নটি আসবে। অভিযুক্তরা যদি আত্মপক্ষ সমর্থন করার পূর্ণ সুযোগ না পেয়ে থাকে, ডিফেন্ডিং অফিসার নিয়োগ ও তাদের সঙ্গে তাদের অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে বা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ডিফেন্ডিং অফিসারদের পূর্ণভাবে ব্রিফ করার সুযোগ না পেয়ে থাকে। বিভিন্ন লেখা এবং এই বিচার সংক্রান্ত যেসব বই লেখা হয়েছে তা থেকে এটুকু পরিস্কার হয় যে, অভিযুক্তরা ডিফেন্ডিং অফিসার নিয়োগ দানে তাদের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে আলোচনা বা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে অপরাধ সংক্রান্ত যথেষ্ট আলোচনা করার সুযোগ অভিযুক্তরা পায়নি। (ঘ) কোর্ট মার্শাল (১) তার আওতা বহির্ভূত বিষয় যা আওতার অধীন ছাড়া বিচার করতে পারে না। (২) কোর্ট মার্শাল ন্যাচারাল জাস্টিস-এর রীতি নীতি মেনে চলতে বাধ্য এবং (৩) কোর্ট মার্শাল তার বিচারে এমন কোন ভুল করেছিল কিনা যা তার নথি থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয়।

অভিযুক্তদের পক্ষে রিট আবেদন হাইকোর্ট বিভাগে করা হয়েছিল কিন্তু তা গ্রহণীয় হয়নি। হাইকোর্ট বিভাগের ঐ রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে একটি আপীল করা হয়। আপীল বিভাগে তা গৃহীত হয়নি। আপীল বিভাগের ঐ রায়ের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার জন্য একটি আবেদন করা হয় কিন্তু সেটিও শুনানি না করেই খারিজ করা হয়। (সূত্র. স্মরি ২৩ সেপ্টেম্বর, কে এম সোবহান, দৈনিক ইত্তেফাক ৫ অক্টোবর ১৯৯৮)

মেজর (প্রাক্তন) রেজাউল করিম রেজা লিখেছেন, ‘…….২৪ পদাতিক ডিভিশন হেডকোয়ার্টারের একজন স্টাফ অফিসার হিসেবে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আমার অবস্থান এবং জিয়া নিহত হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে জেনারেল মঞ্জুরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল বিধায় অনেক কিছু দেখার, শোনার এবং উপলব্ধি করার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমার সেই উপলব্ধি থেকে আজ অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছি যে, ষড়যন্ত্রকারী যেই হোক না কেন—তারা অনেক চতুর, একতাবদ্ধ এবং তাদের লক্ষ্যবস্তু থেকে একটুও তারা পিছিয়ে নেই…..।

……জেনারেল মঞ্জুর বহু পীড়াপীড়ি করছিলেন তাঁকে চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠানোর জন্য। তিনি বলেছিলেন—“দেশের রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছেন। আমার ট্রায়াল হওয়া উচিত। আমার অনেক কিছু বলার আছে—আমাকে তাড়াতাড়ি কারাগারে পাঠান।” তিনি ক্যান্টনমেন্টে তাঁকে না পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। তিনি বলেন— “ক্যান্টনমেন্টে আমাকে পাঠাবেন না। তাহলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।” আমার মনে হয় সেখানে উপস্থিত সেদিনের কারও স্মৃতি থেকে এ দৃশ্য মুছে যাওয়ার কথা নয়।

পুলিশ পারেনি জেনারেলকে Safe Custody তে পাঠাতে। সেনাবাহিনীর একটি দল এসে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন জেনারেলকে। জেনারেলের হাত ধরে হেঁচকা টানে যে সুবেদারটি পুলিশের লরি থেকে জেনারেলকে নামিয়ে চোখ এবং পিঠমোড়া করে হাত বেঁধে দিলেন— তার পকেটের উপর লাগানো রিবন দেখে আমি ঠিক চিনেছিলাম—সুবেদারটি একজন পাকিস্তান প্রত্যাগত, মুক্তিযোদ্ধা নয়। জেনারেলকে নামানোর পূর্বে দলটির সঙ্গে আসা ক্যাপ্টেনের উদ্দেশ্যে চিত্কার করে তিনি বলেছিলেন—“ তোমাদের লজ্জা করে না। ৩ সাড়ে ৩ বছর যাবত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমি তোমাদের জন্য কি না করেছি—তোমরা সব ঘটনা ঘটাইলা, তোমরা সব সারেন্ডার করলা, আবার তোমরাই এসেছ আমাকে ধরে নিতে? তোমাদের লজ্জা কর না? যাও—আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না। আমি পুলিশের কাছে সারেন্ডার করেছি—আমি জেলখানায় যাব।” আমারও চোখ হাত বেঁধে নিয়ে গেল ওরা—তবে জেনারেলের সঙ্গে একই গাড়িতে নয়—ভিন্ন গাড়িতে।

শুরু হলো তদন্ত মেজর জেনারেল মোজাম্মেলের নেতৃত্বে। এদিকে কর্নেল (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) আশরাফের নেতৃত্বে শুরু হলো টর্চারিং—অমানুষিক নির্যাতন। লে. কর্নেল দেলাওয়ার, ব্রিগেডিয়ার মহসীন, লে. কর্নেল মাহফুজ, মেজর মুজিবসহ অনেককে আশরাফের নেতৃত্বে গঠিত দলের নির্যাতন ভোগ করতে হয়। লে. কর্নেল দেলাওয়ার ও ব্রিগেডিয়ার মহসীনের কাছ থেকে টর্চারিং সম্পর্কে যতটুকু শুনেছি তা বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এভাবে অমানুষিক টর্চারিং করে ওদের মনগড়া স্টেটমেন্ট জোরপূর্বক এসকল সেনা কর্মকর্তার স্বাক্ষর নেয়া হয়। শুরু হলো সাজানো বিচার। বাংলাদেশ আর্মি এ্যাক্ট-৩১ ধারায় চার্জ গঠন করা হয়েছিল আমাকেসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে। মোট ১৯ দিন চালু ছিল কোর্ট। আমাদের ডিফেন্সের দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন নির্দোষ মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচানোর জন্য—কিন্তু আদালতের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল আব্দুর রহমানের আচরণ দেখে মনে হয়েছে যে তিনি পক্ষপাত করছেন। টর্চার করে স্টেটমেন্ট স্বাক্ষর নেয়াসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঢ়ড়রহ. হড়.ব এর প্রতি হাজার চেষ্টা করেও আমাদের ডিফেন্স অফিসার কোর্টের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার কোন সহযোগিতা পায়নি। পক্ষান্তরে প্রসিকিউশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্নেল (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) চিশতি ডিফেন্সে নিয়োজিত সেনা কর্মকর্তাদের সকলের সামনে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন পূর্বক বেশ গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন—“কোন লাভ হবে না।” শেষ পর্যন্ত চিশতির কথাই ঠিক হয়েছে। কোর্টে কোন প্রকার রায় না শুনিয়ে হঠাত্ করেই একটি কোর্ট মুলতবি হয়ে যায়।

কোর্ট মুলতবি হয়ে যাওয়ার পর আমাদেরকে পাঁচজনের এক-একটি গ্রুপ করে ‘কুমিলা, যশোর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। আমাকে, ব্রিগেডিয়ার মহসীন, মেজর মোমিন, মেজর মুজিব ও ক্যাপ্টেন ইলিয়াসকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

রাজশাহী জেলে যাওয়ার পর আমাদের পাঁচ জনকে পৃথক ৫টি সেলে রাখা হলো। কিছু দিন পর একজন মেজর সাহেব এলেন রায় হাতে নিয়ে। ধরিয়ে দিলেন এক কপি আমার হাতে। চমকে উঠলাম রায় দেখে—কোর্ট কর্তৃক ১৪ বছর—কিন্তু সেনাপ্রধান ৪ বছর কমিয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড কনফার্ম করেছে। মনে পড়ল কর্নেল (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) আশরাফের কথা। তদন্তের কার্যক্রমের পর ঢাকা থেকে ফিরে এসে যখন এক এক করে টর্চারের মাধ্যমে তিনি কয়েকজনের স্বীকারোক্তি নেয়ার দায়িত্ব পালন করছিলেন—তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, “রেজা মিয়া, ভালা, তোমার কপাল বেঁচে গেছ, তবে ফড়ুব তুমি খাবা।” আমি তাকিয়ে ছিলাম তার মুখপানে। বেশ গর্বের সঙ্গে কথাটি বলে তিনি বলেছিলেন— “জেনারেল মঞ্জুরের সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করেছ যখন—তুমি তো অনেক কিছুই জান। মীর শওকত, আনিসুল হক, ফার্স্ট এসএস (স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন প্রথম অফিসার্স ব্যাচ), সেকেন্ড এসএস (স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ২য় অফিসার্স ব্যাচ) এর অনেকেইতো এর সঙ্গে জড়িত—তুমি নাম বল?” আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, “আরে আমি এর কি জানি? এরপরেও তিনি অনেক পীড়াপিড়ী করে পরে ক্ষান্ত হয়ে বললেন— “ঠিক আছে-কি আর করা যাবে। ফড়ুব তোমাকে খেতেই হবে। তবে গলা তোমার বেঁচে গেছে।” আশরাফের কথাই সঠিক হয়েছিল। বিচারের রায়ে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছিল আমার। (সূত্র. ২৩ সেপ্টেম্বর ১৩ মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্মকর্তার ফাঁসি, দৈনিক জনকণ্ঠ ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮)

জিয়া হত্যাকান্ড যে একটি ষড়যন্ত্রের ফসল এ বিষয়ে কারও সন্দেহ ছিল না। তাই জিয়া হত্যাকান্ডের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্তের জন্য ১৯৮১ সালের ৬ জুন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। প্রাথমিকভাবে এই কমিটির তদন্তের জন্য সরকার কর্তৃক বিশেষ কিছু বিষয় নির্দিষ্ট করা হয়। কিন্তু সপ্তাহ পার না হতেই অজ্ঞাত কোন কারণে এই তদন্ত কমিশনের নির্দিষ্ট ধারা পরিবর্তন করা হয়। ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদ তাঁর বইতে লিখেছেন, “For some strange and undivulged reason these terms of reference were changed just seven days later. Consequently, the commission could avoid looking for answers to those vital question.’’ এই তদন্তের ফলাফল কি হয়েছিল তা জানা যায়নি। এমাজউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, “No report of this findings was ever made public.’’

এই তদন্ত সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান লিখেছেন, ‘আমি চাচ্ছিলাম কোনভাবেই যাতে মঞ্জুর সেনাবাহিনীর হাতে না পড়ে। কারণ ষড়যন্ত্রের নায়করা যে তাকে বেঁচে থাকতে দেবে না, এটা অনুমান করতে পারছিলাম। আমার সেই আশংঙ্কা সত্যে পরিণত হতে বেশি সময় লাগল না। চট্টগ্রামের সেনাবাহিনীর একটি ট্রুপ মঞ্জুরকে বলা চলে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে এরা জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করে। প্রকৃতপক্ষে মঞ্জুরকে মাথার পিছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়, তার আলামত থেকে বোঝা যায়, মঞ্জুর পালাতে চাননি, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। শহীদ জিয়া হত্যার পিছনের রহস্য উদঘাটনে বাধা প্রদানই ছিল এই হত্যাকান্ডের মূল উদ্দেশ্য। অথচ দেশ ও জাতির কাছে প্রকৃত রহস্য উম্মোচনের জন্য মঞ্জুরকে বাঁচিয়ে রাখা খুবই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা ব্যর্থ হলাম। আর এভাবে ব্যর্থ হলাম বলে ইতিহাসের খলনায়ককে আমরা তখনই সরাসরি ধরতে পারলাম না। দেশবাসী জানতেও পারল না কে কলকাঠি নাড়াচ্ছে, দেশের সেনাবাহিনী ও গণতন্ত্রকে কারা হুমকির সম্মুখীন করে তুলছে। পর্দার আড়ালে থেকে গেল ইতিহাসের কলঙ্কময় ঘটনার এই খলনায়ক’।

জিয়া হত্যাকান্ডে মঞ্জুর ও মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের জড়িত করার বিষয়টি নিয়ে সেই সময়ই বিভিন্ন মতভেদ দেখা দেয়। মুস্তাফিজুর লিখেছেন, ‘পুরো সামরিক বিদ্রোহটি সম্পর্কে আমার অঙ্ক মিলতে চাইছিল না। জেনারেল মঞ্জুর খুব মেধাবী এবং চৌকস অফিসার ছিলেন। সামরিক অভ্যূত্থান করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টার অভিপ্রায় থাকলে সেটা যে চট্টগ্রাম থেকে হবে না এটা মঞ্জুরের না জানার কথা নয়। কিন্তু তারপরও কেন তিনি চট্টগ্রাম থেকে অভ্যূত্থান করতে যাবেন, প্রকৃতপক্ষে জিয়া ও মঞ্জুরের মধ্যকার সম্পর্ক এই সময় একটা নাজুক পর্যায়ে এসে ঠেকেছিল। আমি সন্দেহ করছিলাম, এই অবস্থাকে কেউ কাজে লাগল কি?’

জিয়া হত্যাকান্ডের পর রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিটি সংস্থা বা সংগঠন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা যে হুমকির সম্মুখীন ছিল-এ কথা বিভিন্ন সময়ে জোর দিয়ে বলেছেন। কিন্তু সংস্থাগুলো রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার বিষয়ে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল তার কোনো বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। জিয়ার হত্যাকান্ডের সময় প্রশাসনিকভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রপতির চট্টগ্রামের অবস্থানের সময় স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাদের উপর অর্পিত ছিল তারা হচ্ছেন-(১) মাহাবুবুজ্জামান, স্বরাষ্ট্র সচিব, (২) সাদেকুর রহমান চৌধুরী, রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, (৩) মেজর জেনারেল মহব্বতজান চৌধুরী, ডিজি এফ আই, (৪) এসএ হাকিম, ডিজি, এনএসআই, (৫) গোলাম কিবরিয়া, আইজিপি, (৬) আবুল খায়ের মুসলেহ উদ্দিন, পরিচালক, এসবি, (৭) মো. শাহজাহান, বিভাগীয় কমিশনার চট্টগ্রাম, (৮) জিয়াউদ্দিন মো. চৌধুরী, জেলা প্রশাসক চট্টগ্রাম, (৯) লে. কর্নেল আবু লায়েস চৌধুরী, ডিজিএফআই চট্টগ্রাম সেক্টর কমান্ডার, (১০) লে. কর্নেল আব্দুলাহ আজাদ, বিডিআর, (১১) মুসা মিয়া চৌধুরী, এনএসআই, চট্টগ্রাম, (১২) এবিএম বদিউজ্জামান, ডেপুটি সিএমপি কমিশনার, (১৩) লে. কর্নেল মাহফুজুর রহমান, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব, (১৪) লে. কর্নেল আরেফুর রহমান, রাষ্ট্রপতির উপ-সামরিক সচিব ও (১৫) লে. কর্নেল মঈনুল আহসান, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা অফিসার ।

মোস্তাফিজুর লিখেছেন, ‘আমি জানতামও না প্রেসিডেন্ট ঢাকার বাইরে ঠিক কোথায় গিয়েছেন’। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার বিষয়টি যার প্রাথমিক দায়িত্ব সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই উদাসীনতা জনগণের কাছে কিভাবে মূল্যায়িত হবে তা আমাদের জানা নেই। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপারে মওদুদ আহমদ উলেখ করেছেন-“The president was also cautioned by the head of some intellegence agencies that his life was apprehended to be in danger.’’
“The Director General of National Security Intelligence told that, his agency was aware that, Manzoor is a potential threat to the security of land Lawful government and this matter was frequently discussed with the late President together with DGFI.”

দেশের সকল গোয়েন্দা সংস্থা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে সকল সংবাদ রাখতেন এবং নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলেই এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করেছেন। সেনা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও বিষয়টি উলিখিত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা জোরদারের ব্যবস্থা করা কিংবা এ বিষয়ে বলিষ্ঠ কোন পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে, এমন কোন তথ্য কোথাও প্রতিফলিত হয়নি। ‘অবশ্যই পালনীয়’ এই বিষয়টি নিয়ে কোন ব্যক্তি বা সংস্থা উলেখযোগ্য কোন ভূমিকা পালন করেছে এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।

এই হত্যাকান্ডের ওপর গঠিত তদন্ত কমিশনের এক প্রতিবেদনের সূত্র ধরে উলেখ করা যায়-“Despute the tactical advantage of defending the President from inside the for like building, there was none to protect the President. It observed one expected the DG NSI, DG DGFI, and the Military Secretary to the President to exhibit more initiative, responsibility and leadership in the matter of the security of the President, particularly during his last visit to Chittagong. On the Contrary, the commission noted, not even half the usual security measures were provided.’’

প্রচলিত নিয়মে রাষ্ট্রপতি দেশের যেখানে অবস্থান করেন সেই স্থান বা এলাকার নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণেই রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থার নির্দেশ দেয়া হয়ে থাকে। ২৯/৩০ মে ’৮১ রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার প্রয়োজনে যে পরিমাণ নিরাপত্তা কর্মী নিয়োজিত দরকার ছিল এবং বাস্তবে যা কর্মরত ছিল, সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্রের সূত্রে তার বিবরণ তুলে ধরা গেল। ইউনিফর্ম পরা পুলিশের প্রকৃত নির্ধারিত সংখ্যা এবং সেই সময়ের উপস্থিতি (১) বিচ্ছিন্ন বেষ্টনীতে প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ৩, ছিল ১, (২) ভিতরের বেষ্টনীতে প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ১২, ছিল ৪, (৩) বাইরের বেষ্টনীতে প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ১৫, ছিল ৪৪, (৪) বেষ্টনী তদারকীতে প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ৩, ছিল ১, (৫) প্রধান ফটকে প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ৬, ছিল ২। সাদা পোশাকে কর্মরত পুলিশ/স্পেশাল ব্রাঞ্চের নির্ধারিত সংখ্যা ও সেই সময়ের উপস্থিতি (১) হাউস গার্ড, প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ৩৪, ছিল ৮ (২) ভিতরে বেষ্টনী, প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ৩০, ছিল ১৪, (৩) বাইরের বেষ্টনী, প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ৩৬, ছিল ১৭, (৪) প্রধান ফটক, প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ১২, ছিল ৪, (৫) বাইরের ফটক, প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ৮, কেউ ছিল না, (৬) পানির ট্যাংক, প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ৪, ছিল ১, তদারকি, প্রয়োজনীয় পুলিশের সংখ্যা ৩, ছিল ১।

সরকারের প্রশাসনের কোন স্তরেই গুরত্বপূর্ণ এই সমস্ত সংস্থার কার্যকলাপের অথবা কর্তব্য পালনে অনীহার কোন হিসাব কেউ নিয়েছিল কিনা জানা যায়নি এবং পরবর্তীতে যে সমস্ত ব্যক্তির নাম শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তালিকায় প্রকাশিত হয়েছে তার কোন তালিকায় এই সমস্ত উচ্চপদস্থ ব্যক্তি নামের কোন উলেখ দেখা যায়নি। জিয়ার হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্রে উত্তরণ হতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ সরকার গেজেটের পাতা উল্টালে অনেক বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া যাবে। সেই সময় দায়িত্ব পালনের সফলতা এবং ব্যর্থতা কোন মাপকাঠিতে নির্ধারিত হয়েছিল তা আজও বিচার্য হয়ে আছে। একই সময়ে সেনা সদর কর্তৃক চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহের বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এই তদন্ত কমিটির রিপোর্টে রাষ্ট্রপতি হত্যার মতো বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব না দিয়ে সেনা বিদ্রোহের বিষয়টি প্রাধান্য পায়।

জে. মঞ্জুরের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না কাজেই তাঁর হত্যার বিচারের দাবি রাখে যেমন বিচারের দাবি রাখে জে. জিয়ার হত্যা। নিহত দু’জনই সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। একজন ছিলেন রাষ্ট্রপতি, অপরজন ছিলেন চট্টগ্রাম সেনা নিবাসের জিওসি। একজন নিহত হন নিদ্রিত অবস্থায় অপরজন বন্দী অবস্থায়। দু’জনারই অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। দুটি হত্যার কোনটির বিচার হয়নি। কেন হয়নি? এর উত্তর দিতে পারেন তদানীন্তন সরকার।

Email: jiblu78.rahman@gmail.com