পলাশীর পরাজয়ে নাগরিক অনুভূতি ও বর্তমান বাংলাদেশের পরিণতি

আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষীর সঙ্গে লন্ডনের এক অফিসে দেখা। তার সঙ্গে দেখা হলেই অতীত ইতিহাস বলেন। তিনি খুবই ইতিহাস চর্চা করেন কথায় বোঝা যায়। সেদিন তিনি বললেন মনোযোগ দিয়ে শুনুন। ইতিহাসের একটা সত্য ঘটনা বলছি। পরাধীনতায় নিপতিত হওয়ার একটি ঘটনা জেনে রাখুন। সঙ্গে একটি ইতিহাস গ্রন্থের ও ঐতিহাসিকের নাম বললেন। সেটা আমার এখন মনে পড়ছে না। তবে ঘটনাটা আমাকে সাংঘাতিক মর্মাহত করে। সেই ঘটনা শুনে মনে হচ্ছে আমরা আবার সেই দিকেই যাচ্ছি।

১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরের কথা বললেন তিনি। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী কেন পরাজিত হয়েছিল সেটা সবাই জানেন। প্রধান সেনাপতি মিরজাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল বাহ্যিক বিষয়। আরও নানা কারণ ছিল পেছনে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেই পরাজয়ের নেপথ্যে শুধু মীর জাফর আলী খান দায়ী নন। দায়ী ছিলেন সাধারণ মানুষও। তারা সেদিন অন্যায়ের প্রতিবাদ করেননি। নির্বিঘ্নে মেনে নিয়েছেন মীর জাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতা। কেউ এগিয়ে যায়নি নবাবকে রক্ষা করতে। দেশের স্বাধীনতা বাঁচাতে কেউ শব্দ করেনি। পরাধীনতা মেনে নিয়েছেন কেউ সগৌরবে, কেউ নীরবে, কেউ মনের আনন্দে।

সিরাজউদ্দৌলাকে বিশ্বাসঘাতকদের ক্রীড়নকরা আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। তখন রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখেছেন। তাদের শাসক নবাবকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সবাই তাকিয়ে দেখছেন আর আপসোস করছেন। এই আমাদের নবাবকে নিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে মাতম করছেন। মাত্র অল্প কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক ও দখলদার বাহিনীর সদস্য নবাবকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলো পাথরের ঢিল ছুড়লেও এভাবে নির্বিঘ্নে নিতে যেতে পারতো না সিরাজকে। সেই দৃশ্য নির্বোধের মতো প্রত্যক্ষ করা ছাড়া আর কিছু করেনি নীরব দর্শকরা। সিরাজের পতনের মাধ্যমে নিজের দেশ অন্যের করায়ত্ত হয়ে যাচ্ছে সেটা তাদের খেয়ালই নেই।

শুধু তাই নয়, গ্রামের কৃষক কৃষাণিরা মনের আনন্দে মাঠে ফসল বুনছেন তখন। পল্লীগীতি আর ভাটিয়ালি গাইছেন। তাদের কথা হলো, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে তো আমাদের কী! রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে। সিরাজ বাহিনী পরাজিত হয়েছে। নতুন রাজা এসেছে। এই অনুভূতি ছিল গ্রামের সাধারণ নাগরিকদের। কারও ভেতরে তখন আর অনুভূতি জাগেনি সিরাজের পরাজয়ে আমাদের স্বাধীনতার সূর্যটা অস্তমিত হয়েছে।

ইতিহাসের সেই ঘটনা শোনার পর মনে হচ্ছে আজ আবার আমরা একই পরিণতির দিকে যাচ্ছি। সিরাজের পতনের সময়কার দৃশ্য আর বর্তমান অবস্থার মধ্যে পার্থক্য নেই। এক দল মানুষ আছেন যারা কথায় কথায় দুই নেত্রীকে গালি দেন। তাদের কথা হলো দুই নেত্রীর জেদ দেশটাকে শেষ করে দিচ্ছে। কেউ কেউ মনের সুখে আমোদ ফুর্তি করছেন। এই শ্রেণীর মানুষের কথা হলো, আমরা রাজনীতি বুঝি না বাবা। খেয়ে পরে বাঁচতে পারলেই হলো। আরেক শ্রেণীর মানুষ রয়েছেন যারা বুঝতে পারছেন আমাদের সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অস্তিত্বের হুমকিতে। এই মানুষগুলো শুধু মনে মনে আপসোস করছেন। সত্য সঠিক কথাটা বলছেন না বা বলার হিম্মত দেখাচ্ছেন না। নিজেকে রক্ষার চেষ্টায় ব্যস্ত। কিছু বললে নিজের ওপর যদি আবার আঘাত আসে। এই চিন্তায় নীরবে শুধু হায় হুতাশ করছেন। গুটি কয়েক মানুষ রয়েছেন কিছু ব্যতিক্রম। এর মধ্যে দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান অন্যতম।

দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের কথাই ধরা যাক। এই মানুষটি আঁচ করতে পেরেছিলেন আমাদের স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত আসছে। সম্প্রসারণবাদী হিন্দুস্থান এবং সাম্রাজ্যবাদীরা স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে নানা খেলায় লিপ্ত। রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদে তিনি নীরব থাকতে পারেননি। শিক্ষা ও কর্মদক্ষতায় অর্জিত পেশা ত্যাগ করে হাতে কলম তুলে নেন তিনি। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির জরুরি আইনের সরকারের আগে মাহমুদুর রহমানের পরিচয় ছিল একজন শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে। প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান হিসেবে মানুষ চিনতো তাকে। তার শিক্ষাজীবনের পর কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। বেসরকারি শিল্পাঙ্গনে ছিল তার অসাধারণ সাফল্য। বহু প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। কর্মসংস্থান হয়েছে বহু লোকের। রফতানি হয়েছে তার তৈরি শিল্পকর্ম। আয় হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা।

চাইলে তিনি বিলাসী জীবনযাপন করতে পারতেন। একমাত্র স্ত্রী এবং মা ছাড়া তার অতি আপনজন বলতে কেউ নেই। সন্তান নেই। নেই কোনো ভাইবোন। কর্মজীবনের আয় দিয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারতেন দেশ-বিদেশে ঘুরে। তার সততার কোনো তুলনা নেই। সব আরাম আয়েশের কথা ভুলে গেছেন তিনি। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর কলম হাতে তুলে নেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে চুপ থাকার সুযোগ নেই। মানুষকে আগে সচেতন করতে হবে। এর মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন লেখনী। ১/১১-এর জরুরি আইনের সরকারের দাপটে সবাই যখন চুপ, মাহমুদুর রহমান তখন কলম হাতে প্রতিবাদে সরব। জরুরি আইনের সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিতে এসেছে সেটা তিনি লিখেছেন অকপটে। কারও রক্তচক্ষুর তোয়াক্কা তিনি করেননি তখন। জরুরি আইনের সরকারের শেষ সময়ে এক চরম দুর্দিনে আমার দেশ-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এর আগে তিনি নিয়মিত লিখেছেন দৈনিক নয়া দিগন্তে। আমার দেশ-এ দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপট নিয়ে আগে একাধিকবার আলোচনা করেছি। এখানে আর পাঠকের বিরক্তি ঘটাতে চাই না।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সাজনো নির্বাচনের আগে তিনি একটি বিশেষ মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলেন। নির্বাচনের আগেই তিনি লিখেছিলেন ‘নবরূপে বাকশাল’। তার তীক্ষ্ম ধীশক্তির মাধ্যমে আজকের পরিণতির ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল সেই লেখায়। আজ বাকশালের নবরূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন শেখ হাসিনা। সেটা এখন সবাই বলছেন। মাহমুদুর রহমান বলেছিলেন ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের আগে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের ওপর কিভাবে আঘাত আসছে প্রতিটি ধাপে তিনি লিখেছেন। তার লেখা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেতনাকে শানিত করতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পথে। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদ প্রতিটি লেখায় তিনি দিয়েছেন। তার লেখায় আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে হিন্দুস্থান কিভাবে আগ্রাসন চালাচ্ছে। সার্বভৌমত্ব কিভাবে হিন্দুস্থানের কাছে জিম্মি করা হচ্ছে। হিন্দুস্থানের তাঁবেদাররা কিভাবে স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দিচ্ছে। সবকিছুই তিনি বলেছেন সরল ভাষায়।

ট্রানজিটের নামে করিডোর, নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, সীমান্তে হত্যা, নির্যাতন, অপহরণসহ ভারতীয় আগ্রাসনের নমুনাগুলো প্রতিটি ধাপে তিনি দেখিয়েছেন। মানুষকে জাগানোর চেষ্টা করেছেন পত্রিকায় লেখনী এবং সভা সেমিনারের মাধ্যমে। তার লেখা পড়ে এবং বক্তব্য শুনে সবাই হায় আপসোস করছেন। কিন্তু কেউ ক্ষমতায় যাওয়ার প্রত্যাশায়, কেউ নিজের গা-বাঁচানোর তাগিদে, কেউ আরাম আয়েশের কথা ভেবে মাহমুদুর রহমানের সতর্ক বাণী এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ মাহমুদুর রহমানের সমালোচনা করেছেন। মাহমুদুর রহমানের সতর্ক বাণীগুলো আমলে নিয়ে যখন যেরকম পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেটা করা উচিত ছিল। সেই পদক্ষেপ নিতে পারলে আজকের পরিণতি থেকে হয়তোবা রক্ষা পাওয়া যেত। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কূলের কাছে থাকতে তরীতে ওঠার চেষ্টা হয়নি। এখন কূল পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু হাবুডুবু খাচ্ছেন আর সিরাজের প্রজাদের মতো আপসোস করছেন। দিন যত যাচ্ছে তীরে ভিড়া তত কঠিন হচ্ছে।

আজ হিন্দুস্থান প্রকাশ্যে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে খেলছে। এর আগে কখনও এরকম নগ্ন খেলায় দেখা যায়নি তাদের। বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে হিন্দুস্থানিরা নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে। প্রকাশ্যে হিন্দুস্থানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ বলছেন, ভারতের চোখ দিয়ে বিশ্ববাসীকে বাংলাদেশ দেখতে হবে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশ সফরে এসে বলে যাচ্ছেন নির্বাচন কেমন হতে হবে। কারা ক্ষমতায় আসা দরকার। যা প্রকাশ্যে বলেছিলেন জাতীয় পার্টির বেইমান চেয়ারম্যান এরশাদ। তিনি নিজেই মিডিয়ায় বলেছিলেন হিন্দুস্থানি পররাষ্ট্র সচিব তাকে বলেছেন নির্বাচনে না গেলে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসবে। সুতরাং এর থেকে স্পষ্ট নগ্ন হস্তক্ষেপ আর কি হতে পারে। মাহমুদুর রহমান বহু আগেই হিন্দুস্থানের সেই আগ্রাসী তত্পরতার কথা বলেছিলেন।

কিন্তু তা দেখেও আমরা কেউ চুপ করে আছি নিজেক বাঁচানোর তাগিদে। কেউ আপসোস করছি। এই বুঝি স্বাধীনতা চলে গেল। কেউ কেউ সব বুঝেও কিছুই বলছি না। কেউ বলছি হাসিনা-খালেদার দ্বন্দ্ব। যেমনট বলা হয়েছিল ১৭৫৭ সালে পলাশীর পরাজয়ের পর রাজায় রাজায় যুদ্ধ!

এই দ্বন্দ্ব যে হাসিনা-খালেদার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুধু নয় এটা অনেকেই বুঝতে চান না। এই দ্বন্দ্ব হচ্ছে ভারতীয় আধিপত্যবাদের অধীনে থাকা না থাকার দ্বন্দ্ব। হিন্দুস্থানিরা প্রকাশ্যে বলছেন হাসিনাকে তারা ক্ষমতায় দেখতে চায়। শেখ হাসিনা হিন্দুস্থানের সব স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করে। বিপরীতে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের কথা মাথায় রেখে কাজ করেন। এখানেই হলো মৌলিক পার্থক্য। আর কিছু নয়। কিন্তু এই সরল জায়গাটাই একশ্রেণীর সচেতন মানুষ বোঝেও না বোঝার ভান করছেন। সরলভাবে বলছেন হাসিনা-খালেদার দ্বন্দ্ব। এই সরল উক্তি বাংলাদেশকে পরাধীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হিন্দুস্থানের চোখে শুধু বিশ্ববাসী বাংলাদেশ দেখছে না। বাংলাদেশের নাগরিকদেরও নিজের দেশকে দেখতে হচ্ছে হিন্দুস্থানের চোখ দিয়ে।

ফিরে যেতে চাই মাহমুদুর রহমানের প্রসঙ্গে। মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার, নির্যাতন, কারাগারে আটক রাখায় এক শ্রেণীর মানুষ মনে মনে কষ্ট পাচ্ছেন। তার শেষবেলার স্বপ্ন দৈনিক আমার দেশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় মনবেদনায় ভুগছেন। কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না। সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় দেখে যেভাবে হায় আপসোস করছিলেন সেভাবে হায় আপসোস করছেন। চোখের সামনে স্বাধীন নবাবকে নির্মমভাবে হত্যার দৃশ্য বিনাবাক্যে হজম করেছেন নীরব স্বাধীনচেতা লোকেরা। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে আঘাতের বিরুদ্ধে যিনি সর্বদা সোচ্চার নেই লোকটির করুণ পরিণতি একইভাবে নীরবে সহ্য করা হচ্ছে। তার স্বপ্নের আমার দেশ পত্রিকাটির আলো যে কোনো মুহূর্তে নিভে যেতে পারে। তখন আর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে আঘাতের বিষয়ে কথা বলার জায়গা থাকবে না। সবাইকে শুধু আপসোস করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। ১৯৫৭ সালের পর ২০০ বছর লেগেছে স্বাধীনতা ফিরে পেতে। এবার কতো বছর লাগবে সেটা ভবিষ্যত্ বলে দেবে।

লেখক: দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত।