মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাক্ষাৎকার: নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের নীলনকশা করছে আওয়ামী লীগ

Mirza Fakhrul Islam Alamgir
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ আগস্ট ঠাকুরগাঁওয়ে। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। এরপর যোগ দেন ভাসানী ন্যাপে। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর থেকে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে দিনাজপুর সরকারি কলেজে অর্থনীতিতে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ১৯৮৯ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর শামিল হন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সঙ্গে। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির টিকিটে সংসদ নির্বাচন করে অকৃতকার্য হলেও ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের প্রথমে কৃষি ও পরে বেসামরিক বিমান প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর দলের ৫ম কাউন্সিলে তাকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়। ২০১১ সালের মার্চে বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম তার। বাবা মির্জা রুহুল আমিন আইনজীবী ছিলেন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে স্বাধীনতার আগে ও পরে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এরশাদ সরকারের সময় তিনি ছিলেন কৃষিমন্ত্রী। তিনিও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মির্জা ফখরুলের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। জিয়াউর রহমানের সময়ে সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ঢাকার একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। দুই মেয়ের বাবা তিনি। দুজনেই বাবার আদর্শকে ধারণ করে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতা পেশা।

৬ ফেব্রুয়ারি উত্তরায় তার বাসভবনে দৈনিক যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, বিএনপির বিগত আন্দোলন, দলের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়, নতুন করে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কৌশলসহ দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন তিনি।

প্রশ্ন: একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমঝোতায় সরকার কি আগ্রহী?
উত্তর: আমরা সরকারকে বারবার আলোচনার মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করার আহ্বান জানাচ্ছি। কিন্তু সরকারের মন্ত্রীদের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে না তারা রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের উদ্যোগ নেবে। সরকার যদি উদ্যোগ না নেয় আবার আন্দোলন শুরু হবে। জনগণ সেই আন্দোলন করবে। খুব শিগগিরই সরকার সমঝোতায় বাধ্য হবে বলে।

প্রশ্ন: সহিংসতা ও জামায়াত ছাড়লেই সংলাপ, এটা কি সরকারি দলের কৌশল?
উত্তর: এটা তাদের কৌশল নয়, অপকৌশল। তারা বলছে, জামায়াতকে ছেড়ে আসুন। আমরা ছাড়ব কিনা এটা তো তাদের বলার কথা নয়। তারা যদি এতই জামায়ত বিদ্বেষী হয়, জামায়াতকে তারা পছন্দ করে না। তারা সহিংসতা করে, জামায়াত ওদের ভাষায় সন্ত্রাসী দল, তাহলে সরকার কেন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করছে না। কেন আমাদের ছাড়তে চাপ দিচ্ছে। আর এই জামায়াতকে নিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করেনি! তারা এই জামায়াতের সঙ্গে বোঝাপড়া করে ‘৯৬ সালে নির্বাচন করেনি! জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেনি।

প্রশ্ন: জামায়াত নিয়ে বিএনপির অবস্থান কি
উত্তর: জামায়াত একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের নির্বাচনকালীন জোট হয়েছে, আছে। এবার আন্দোলনের জোট। এবার ১৮ দলের ঘোষণায় স্পষ্ট ছিল এটা কোনো সরকার গঠনের বা স্থায়ী কোনো জোট নয়। জামায়াতের সঙ্গে জোট করতে বাধাটা কোথায়।

স্বাধীনতা যুদ্ধে তারা বিরোধিতা করেছিল, মানবতাবিরোধী কাজের অভিযোগে তাদের তো বিচার হচ্ছে। যদিও সেই বিচারের কোনো স্বচ্ছতা নেই। এটা ইতোমধ্যেই অনেক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সেটার সঙ্গে এটার সম্পর্ক কি। আওয়ামী লীগেও অনেক স্বাধীনতাবিরোধী লোক রয়েছে। তারা সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছে, মন্ত্রীও বানিয়েছে। বিভিন্ন দলেই এ ধরনের লোক আছে। যারা অন্যায় করে অপরাধ করে মানবতাবিরোধী কাজ করে তাদের বিচার হবে, শাস্তি হবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে একটা রাজনৈতিক দল তার মতবাদ নিয়ে আসতে পারবে না। জনগণ যদি তাদের গ্রহণ না করলে সংসদে তার প্রতিনিধিত্ব থাকবে না। কিন্তু তাকে তো তার রাজনীতি করতে বাধা দেয়া যাবে না।

প্রশ্ন: কি ধরনের আন্দোলন নিয়ে আবারও আপনারা এগোচ্ছেন?
উত্তর: যে কোনো আন্দোলনেই জনগণের সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ মুহূর্তে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির দিকেই আমাদের নজর থাকবে। তবে সরকার যদি গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করতে না দেয় তবে বিকল্প ব্যবস্থা নেব। সেভাবে আন্দোলন চালাতে আমাদের কৌশলও আমরা নির্ধারণ করব। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে জোটের পাশাপাশি সব দলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হবে।

প্রশ্ন: ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আপনাদের অংশ না নেয়া কি সঠিক ছিল?
উত্তর: অবশ্যই। যে নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই সেই নির্বাচনে প্রদত্ত ৫ ভাগ ভোটকে তারা ৪০ ভাগে করল। কেন্দ্রের কোনো হিসাব না দিয়ে প্রত্যেক প্রিসাইডিং অফিসার নিজেদের ইচ্ছামতো ফল ঘোষণা করেছে। উদাহরণ হিসেবে ঠাকুরগাঁয়ের কথা বলছি, নির্বাচনের দিন দুপুরে প্রিসাইডিং অফিসাররা বলল, ৭০টি কেন্দ্র স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু রাতে বলল, নির্বাচন হয়েছে এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ৮৪ হাজার ভোট পেয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে গেলে এটাই হতো। কারণ নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট। সরকারি কর্মকর্তারা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সুতরাং নির্বাচনের ফলাফল এটাই হতো। এই আশঙ্কায় আমরা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাইনি।

প্রশ্ন: নির্বাচন এবং নতুন সরকারের কর্মকা- নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর: ৫ জানুয়ারি আমরা সরকারকে ফেলে দেব এ রকম কোনো ব্যাপার ছিল না। এটা অতীতে কখনও হয়নি, সম্ভব নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিশ্ব সম্প্রদায় এবং দেশের মানুষ গ্রহণ করেনি এটা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যে রাজনৈতিকভাবে একটা দেউলিয়া দলে পরিণত হয়েছে এটা এবার প্রমাণিত হয়েছে। জনগণ তাদের পাশে নেই। তাদের প্রধান শক্তি হচ্ছে পুলিশ, বিজিবি আর র‌্যাব। ১৯৮৬ ও ৮৮ সালে জাতীয় পার্টি এমন প্রহসনের নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। আমাদের বেলায়ও এমনটা হয়েছে। ‘৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আমরা ক্ষমতায় থাকতে চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি।

প্রশ্ন: কয়েকটি রাষ্ট্র এ সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে
উত্তর: বিষয়টি বুঝতে হবে। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় একটি নির্বাচন হয়েছে, একটি সরকার গঠন হয়েছে। সাধারণত নির্বাচনের পর নতুন সরকারকে সব দেশই অভিনন্দন জানায়। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, ইউরোপের কোনো দেশ, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ভারত ছাড়া কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর কেউ এই সরকারকে অভিনন্দন জানায়নি। চীন এবং রাশিয়ার সমর্থনের বিষয়টিও তেমন গুরুত্ব বহন করে না। মূল কথা হল নির্বাচন এবং সরকার নিয়ে তারা নৈতিক সমর্থন পেল কিনা। এটা পায়নি। এটাই আওয়ামী লীগের মূল দুর্বলতার জায়গা।

প্রশ্ন: বাকশাল প্রতিষ্ঠার ব্লুপ্রিন্ট করছে আওয়ামী লীগ, এমন অভিযোগের কারণ?
উত্তর: আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনে আওয়ামী লীগ নেত্রী সাজেদা চৌধুরী বলেছিলেন, দ্বিতীয় বিপ্লবকে আমরা বাস্তবায়িত করব। অর্থাৎ তাদের সেই একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল তারা বাস্তবায়িত করবে। তাদের চিন্তাভাবনায় সব সময় এটা ছিল। তাদের ব্ল-প্রিন্টটা হচ্ছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে, হামলা চালিয়ে, খুন-গুম করে তাদের দুর্বল অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। তাদের রাজনীতি করার সক্ষমতাকে হারিয়ে ফেলা। এ রকম একটা অবস্থা তৈরি করার জন্য তারা চেষ্টা করে। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সব সময় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছে। ‘৭২ থেকে ৭৫ সালেও তারা একই কর্ম করে। এবারও তামাশার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসে ভাবছে তারা স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। এটা হয় না। দেশে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চালু করার নীলনকশা করছে আওয়ামী। কে রাজনীতি করবে, কে করবে না, তা নির্দেশ করতে চাইছে তারা। তারা বলছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিশ্বাসীরা রাজনীতি করতে পারবে না। রাজনীতি তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করা না করার বিষয় নয়। কারণ বাংলাদেশ একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর যে সংবিধান আছে সে অনুযায়ী এখানে যে দলগুলো আছে তারা রাজনীতি করবে। জনগণ নির্ধারণ করবে কে রাজনীতি করবে। কিন্তু মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়ার অধিকার তো আওয়ামী লীগকে কেউ দেয়নি।

প্রশ্ন: দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় সম্পর্কে আপনার অভিমত?
উত্তর: এই মামলার রায় একশত ভাগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ অস্ত্রগুলো তো বিএনপি সরকারের সময় উদ্ধার করা হয়েছে। বিএনপি সরকার যদি চাইত তবে এটা বেমালুম চেপে যেতে পারত।

দশ ট্রাক অস্ত্র কি জন্য কাদের জন্য এসেছে এটা তো তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। যেটা বোঝা যায়, বলা হচ্ছে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সরবরাহের জন্য বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এই ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী জড়িত এটা কিভাবে প্রমাণিত তা আমার বোধগম্য নয়। সর্বোপরি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নাম বলা; তিনি নীরব ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নীরব ছিলেন কি ছিলেন না এটা তো প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে তো জিজ্ঞাসা করা হয়নি। এক ব্যক্তির কথার ওপর ভিত্তি করে বলে দিলেন তিনি নীরব ছিলেন।

একজন সেনসিবল প্রধানমন্ত্রী এসব ঘটনা শুনে সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেবেন যে তুমি এটা তদন্ত করো এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নাও। সাবেক প্রধানমন্ত্রী সেটাই করেছেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন এটা তদন্ত করো এবং কারা কারা জড়িত আছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নাও। আসলে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এসব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তারেক রহমানের নামও ইঙ্গিত করা হয়েছে শুধু তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য। খুব পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগ এসব কাজ করছে।

প্রশ্ন: দুদকের ভূমিকা তো বলা হয় নিরপেক্ষ
উত্তর: বিরোধী দলকে কিভাবে দমন করা যায় তাদের বিরুদ্ধে কতগুলো মামলা তৈরি করা যায় সে লক্ষ্যেই ব্যবহার করা হচ্ছে দুদককে। দেখেন, হলমার্কের মতো এতবড় একটি আর্থিক কেলেঙ্কারির যারা কুশীলব কর্মকর্তা দুদক তাদের খুঁজে পায় না। অথচ দেশের একজন বিশিষ্ট ভদ্রমহিলার (তারেক রহমানের শাশুড়ি) সম্পত্তির হিসাব সময়মতো না দেয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হল। এটা তো এখন স্পষ্ট বিরোধী দলকে নাজেহাল করতে দুদককে ব্যবহার করছে। দুদক অনেকটা তাদের দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন: সন্ত্রাসীদের জন্য মায়াকান্না বন্ধ করতে প্রধানমন্ত্রী যে পরামর্শ দেন, সে সম্পর্কে বলুন।
উত্তর: আমাদের চেয়ারপারসন নেতাকর্মীদের গুম-খুনের যে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে সেটা স্বীকার করে নিয়েছেন। যারা গুম ও খুন হয়েছেন তাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে সেজন্য মায়াকান্না করতে না করেছেন। এর অর্থ হল সরকার এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। বিচারবহির্ভূতভাবে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। যে অপরাধীই হোক তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। এতে যদি কারও মৃত্যুদ- হয় হবে। কিন্তু সরকারকে কেউ এই লাইলেন্স বা অধিকার দেয়নি যে আপনি কাউকে গ্রেফতার করে তাকে গুলি করে মেরে ফেলবেন। বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই অধিকার দেয়া হয় না। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ যে নারকীয় ঘটনা ঘটিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ওইসব ঘটনাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে। তবে আত্মরক্ষার অধিকার কি অন্যদের নেই।

আমি একটা অশনি সংকেত দেখছি। স্বাধীনতার সময় আমি ভারতে অবস্থান করছিলাম। তখন দেখেছি তৎকালীন কংগ্রেস সরকার নকশালপন্থী বলে হাজার হাজার তরুণকে হত্যা করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেখেছি তৎকালীন আওয়ামী সরকার হাজার হাজার তরুণ-যুবককে সেদিন নিশ্চিহ্ন করেছে, হত্যা করেছে, গুম করেছে। আজকের যুগে আমরা সেই আলামত দেখছি।

প্রশ্ন: গণমাধ্যমের ভূমিকা কেমন?
উত্তর: খুব রহস্যজনক মনে হচ্ছে। নির্বাচনের দিন এবং তার পরের দিন গণমাধ্যমের যে ভূমিকা দেখলাম কিন্তু তার পরই দেখলাম গণমাধ্যমের ভূমিকা অন্যরকম। মনে হচ্ছে কারা কোথায় থেকে যেন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছে। নিয়ন্ত্রণ করার ফলে অনেক কথা বন্ধ হয়ে গেল, অনেক ভাষার পরিবর্তন হয়ে গেল। পত্রিকায় কি লেখা হবে, কি হবে না, টিভির টকশোতে কে থাকবে আর কে থাকবে না, সেটা একটা রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে।

প্রশ্ন: বলা হচ্ছে আপনাদের আন্দোলনে কোনো জনসম্পৃক্ততা ছিল না।
উত্তর: এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। জনগণকে বিভ্রান্ত করতেই এসব কথা বলা হচ্ছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় এমন জনসম্পৃক্ত আন্দোলন কখনও দেখিনি। বিগত সময়ে দেখেছি আন্দোলন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক হয়েছে। কিন্তু এবার গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে হরতাল হয়েছে, জনগণ রাস্তায় নেমে অবরোধ করেছে। এটা ছিল বাস্তব চিত্র।

আপনি দেখেন, অনেকে দাবি করছে সহিংসতার কারণে ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় তো কোনো সহিংসতা হয়নি। ত্রাস, সন্ত্রাস বোমাবাজি হয়নি। কিন্তু ঢাকার ভোট কেন্দ্রে তো ৫ ভাগের বেশি ভোটার ভোট দিতে আসেনি। আমাদের আন্দোলনের প্রতি জনগণের সম্পৃক্ততা ছিল বলেই তারা ভোট দিতে যায়নি।

প্রশ্ন: আন্দোলনে রাজধানীতে নেতাকর্মীদের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি
উত্তর: রাজধানীতে এই সরকার প্রথম থেকেই বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের রাস্তায় দাঁড়াতে পর্যন্ত দেয়নি। সরকারের প্রথমদিকে আমরা একটা মানববন্ধন করেছিলাম কিন্তু তারা তাও করতে দেয়নি। এরপর বেশির ভাগ সময়েই আমাদের মিছিল, মিটিং করতে দেয়নি। সর্বশেষ গত দুই বছর ধরে মিছিল-মিটিংয়ের অনুমতি তো দেয়নি উল্টো তাতে সরাসরি গুলি চালিয়েছে। ফলে এখানে রাজপথে অবস্থান নেয়ার বিষয়টি সেভাবে করা সম্ভব হয়নি। আপনি হয়তো দেখেছেন ঢাকার মহাসমাবেশে যাতে নেতাকর্মীরা আসতে না পারে সেজন্য তিনদিন ধরে তারা বাস, ট্রেন, লঞ্চ এমনকি হোটেল পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। সর্বশেষ ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেচি কর্মসূচিতেও একই ঘটনা ঘটালো। অনুষ্ঠানের অনুমতি তো দেয়নি তিনদিন পর্যন্ত সরকারই সারাদেশ অবরোধ করে রাখল।

নেতাকর্মীদের রাজপথে না নামার পেছনে একটি বিষয় আমরা ফেল করেছি। দীর্ঘ অবরোধের কারণে নেতাকর্মীদের সঙ্গে টাইম টু টাইম যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। আন্দোলন সফল করার জন্য যেভাবে যোগাযোগ বাড়ানো উচিত ছিল বিশেষ করে ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেচি কর্মসূচিতে আমরা সেটা করতে পারেনি। এর মূল কারণ ছিল গ্রেফতার, ফোন ট্র্যাকিং।

প্রশ্ন: অনেক সিনিয়র নেতা আত্মগোপনে চলে যাওয়ার সমালোচনা হয়েছে, এখনও হচ্ছে।
উত্তর: দুঃখজনক হলেও সত্য কিছু কিছু গণমাধ্যম আত্মগোপনের বিষয়টি এমনভাবে প্রকাশ করেছে, মনে হয় ওই বিষয়টিই আগে এসেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে যখন গ্রেফতার এড়িয়ে চলছি, এটা তো আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এটা দলের সিদ্ধান্ত। দলের চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্তেই আমি গ্রেফতার এড়িয়ে চলেছি। এর মূল কারণ হচ্ছে সারা দেশে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ও আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করা। যারা বলছেন আত্মগোপনে যাওয়ার কারণে আন্দোলন সফল হয়নি, এটা কোনো যুক্তির কথা নয়। আমাদের একমাত্র ব্যর্থতা ২৯ ডিসেম্বর। যোগাযোগের অভাবে ওই কর্মসূচিতে আমরা ফেল করেছি।

প্রশ্ন: আপনারা তো উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
উত্তর: দলীয়ভাবে উপজেলা নির্বাচনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে। স্থানীয় নেতারা সেখানে বেশ জনপ্রিয়। স্থানীয়ভাবে যদি তারা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তবে আমাদের কোনো বাধা থাকবে না। এছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরাও অনেকটা সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে।

প্রশ্ন: দল পুনর্গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে।
উত্তর: প্রায় সব সাংগঠনিক জেলা কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। আন্দোলনের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাউন্সিল করতে পারেনি। বিষয়টি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে। কত দ্রুত এই বিষয়গুলো শেষ করা যায় সে ব্যাপারে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে সিদ্ধান্ত হবে। দীর্ঘদিন আন্দোলন করা, নেতাকর্মীদের নামে মামলা নির্যাতন করা হয়েছে। নিজেদের গুছিয়ে নিতে কাজ করা হচ্ছে।

প্রশ্ন: দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আপনি। এতে সাংগঠনিক অসুবিধা হয়?
উত্তর: এ অবস্থায় স্বাভাবিক কাজকর্ম অনেক সময় সহজ হয় না। কিন্তু আমাদের যে গঠনতন্ত্র আছে তাতে মহাসচিব নির্বাচিত হন কাউন্সিলের মাধ্যমে। যেহেতু কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়নি, সেহেতু এটা হয়নি। এ নিয়ে কোনো অসুবিধা হয় না। আমি তো কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়া বিএনপির মতো দলে কাজ করার বিশাল একটি নেটওয়ার্ক আছে। আর মানসিক ব্যাপারটা রাজনীতিতে একটাই। সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেই আমাদের রাজনীতি করতে হয়।

প্রশ্ন: অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে আন্দোলনে কোনো প্রভাব পড়ছে কিনা।
উত্তর: বিএনপি একটি সুনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক দল। এখানে বড় ধরনের কোনো অসুবিধা নেই। বিশেষ করে কেন্দ্রে তো নেই-ই। বিএনপিতে সব সময় সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সব সময় যে সব সিদ্ধান্ত সঠিক হয় তা নয়। দেখেন বিএনপির ওপর সব সময় আঘাত এসেছে। কিন্তু বিএনপি বরাবরই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। কারণ একটাই আমাদের দলের চেয়ারপারসনের নেতৃত্বের প্রতি সবাই আস্থাশীল। খালেদা জিয়ার দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব এবং নেতাদের দলের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য। বিএনপি ভাঙতে সরকার কতরকম চেষ্টা করেছে। বিএনএফ তৈরি করে বিএনপির নেতাদের টেনে নেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু একজন নেতাকেও নির্বাচনে অংশ নেয়াতে পারেনি। এটা আমাদের অনেক বড় অর্জন।

প্রশ্ন: কেউ কেউ বলেন, মাত্রাধিক কূটনৈতিকনির্ভর তাই আন্দোলন ব্যর্থতার জন্য দায়ী।
উত্তর: এটাও আরেকটা অপপ্রচার। কূটনীতিকদের ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীলতার তো প্রশ্নই ওঠে না। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে অতীতে বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এমনকি জাতিসংঘ ভূমিকা রেখেছে। গণতান্ত্রিক দল হিসেবে তাদের সঙ্গে আমাদের সবসময় যোগাযোগটা রাখতেই হয়। তাদের বিষয়গুলো অবহিত করতে হয়। কিন্তু তাদের উপর নির্ভর করে তো আন্দোলন পরিচালিত হয় না। আন্দোলনের নিজস্ব কৌশল আছে।
কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগও বলতো বিএনপি আন্দোলন করতে জানে না। কিন্তু এবার টের পেয়েছে বিএনপি আন্দোলন করতে পারে কিনা। ৫ জানুয়ারির আগে আওয়ামী লীগের একটা নেতাও নির্বাচন করতে এলাকায় যাননি।

প্রশ্ন: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
উত্তর: ধন্যবাদ আপনাকে এবং আপনার পত্রিকার অগণিত পাঠককে।