সরস্বতী কি যৌনপ্রতিমা?

sarasvati

নদী সরস্বতী-গণিকা সরস্বতী কীভাবে বাগ্ দেবী হলেন?

মা সরস্বতী দেবী সাদা বসনে সজ্জ্বিত, মনের সকল মলিনতা দূর করে পুজো করতে হয়। পুজোর দিন ছাত্রছাত্রীরা সকালে পূজার অঞ্জলি দেওয়ার জন্য সববেত হন। পুজোর পরদিন পুনরায় পুজোর পর চিড়ে ও দই মিশ্রিত করে দধিকরম্ব বা দধিকর্মা নিবেদন করা হয়। সন্ধ্যায় আরাধনা ও প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে মায়ের পুজো সম্পন্ন করেন। সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এ তো গেল ভক্তিরসের দিক, এবার যাব উৎসের সন্ধানে। সরস্বতী কি দেবী? তিনি কি নদী? নাকি গণিকামাত্র?

ভৌগোলিক দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই বলা যাবে কি সরস্বতী নদী শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ছিল? অনুমান করা যায় যে বৈদিক সরস্বতী (আঞ্চলিক নাম সরসুতী) হরিয়ানার থানেশ্বর অঞ্চলে প্রবাহিত। ঋগ্বেদে (VIII, 36.6 সূক্ত) বলা হয়েছে সপ্তথি সরস্বতী নদীগুলির মাতা (সিন্ধুমাতা) একসাথে দুগ্ধ ও স্রোতস্বিনীদের নিয়ে বিপুল গর্জনে তীব্র স্রোতে প্রভূত জলধারায় স্ফীত হয়ে প্রবাহিত।

ঋগ্বেদে দুই ধরনের সরস্বতীর উল্লেখ আছে। একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস্ ধাতু তদুত্তরে অস্থর্থে বতু এবং স্ত্রী লিঙ্গে ঈপ্ প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন হয়েছে সরস্বতী-এ মত স্বামী নির্মলানন্দের। আলোকময়ী বলে সর্বশুক্লা। শংকরনাথ ভট্টাচার্যের মতে, সরস+বতী=সরস্বতী অর্থ জ্যোতিময়ী। ঋগ্বেদে এবং যর্জুবেদে অনেকবার ইড়া, ভারতী, সরস্বতীকে একসঙ্গে দেখা যায়। বেদের মন্ত্রগুলো পর্যালোচনায় প্রতীতী জন্মে যে, সরস্বতী মূলত সূর্যাগ্নি। দেবীভাগবতে সরস্বতী জ্যোতিরূপা। ভৃগুপনিষদে জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী ও জলময়ী সরস্বতীর সমীকরণ করা হয়েছে। এই উপনিষদে জলে জ্যোতি প্রতিষ্ঠিত, জ্যোতিতে জল প্রতিষ্ঠিত। কবি বিহারীলাল চক্রবতী সারদামঙ্গল কাব্যে জ্যোতির্ময়ী সরস্বতীর আবির্ভাব বর্ণনা করেছেন। রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি যখন ক্রৌঞ্চ হননের শোকে বিহবল হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী তার ললাটে বিদ্যুৎ রেখার মত প্রকাশিত হয়েছিলেন। ঋগ্বেদে ইন্দ্রের সঙ্গে সরস্বতীর সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ তেমনি ঘনিষ্ঠ মরুদ ও অশ্বিনীদ্বয়ের সঙ্গে। সরস্বতী কখনো ইন্দ্রের পত্নী আবার কখনো শত্রু, কখনো-বা ইন্দ্রের চিকিৎসক। শুক্ল যজুর্বেদে তিনি চিকিৎসক রুপে রুদ্র অশ্বিদ্বয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। সরস্বতীর রোগ নিরাময় শক্তির কথা প্রবর্তী সময়েও জনশ্রুতিতে ছিল। ‘কথা সরিৎসাগর’-এ সোমদেব (একাদশ শতক) জানিয়েছেন, পাটলিপুত্রের নারীরা রুগ্ন ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য সরস্বতীর ঔষধ ব্যবহার করতেন। নিরুক্তকার যাস্কের মতে, সরস্বতী শব্দের অর্থ যাতে জল আছে। সৃ ধাতু নিস্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী। নদী সরস্বতী আর্যভূমির অন্যতম নদীরূপে ঋগ্বেদে বহুবার কীতির্ত ও স্তোত হয়েছে। ঋগ্বেদে সরস্বতী সিন্দু ও তার পাঁচটি উপনদী নিয়ে সপ্তসিন্ধুর বারংবার উল্লেখ আর্যভূমিতে এদের অপরিসীম গুরুত্ব প্রমাণ করে। ‘অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী’ – অর্থাৎ নদী হিসাবে সরস্বতীকে। সম্ভবত সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। তাই হয়তো শিক্ষার সঙ্গে সরস্বতীর অচ্ছেদ্য বন্ধন এবং এর জন্যই পৌরাণিক যুগে সরস্বতী বিদ্যার দেবী হয়ে উঠেছেন। সরস্বতীর আর-এক নাম ভারতী। তিনি ‘ব্রাহ্মণ’-এ বাক্ নামে পরিচিতা। দেবী সরস্বতীর সঙ্গে নদী সরস্বতীর এই একাত্মতা সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত থাকলেও সরস্বতীকে ব্রহ্মার মানসকন্যা হিসাবে কল্পনা করা হয়।

হিন্দু পুরাণে বলা হয়েছে, ব্রহ্মা তাঁর কন্যার সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হন। এহেন বিষয়ে কলকাতার জাদুঘরের একটি প্রস্তর মূর্তি থেকে তার যথেষ্ট প্রমাণ মেলে। এই মূর্তিটি ব্রহ্মার বামজানুর উপর সরস্বতী বসে আছেন, তাঁ এক হাতে ব্রহ্মার স্কন্ধবেষ্টিত। সরস্বতীর সঙ্গে ব্রহ্মার এই সম্বন্ধের সন্ধান ঋগ্বেদেও পাওয়া যায়। এখানে ব্রহ্মার সঙ্গে বাক্ দেবীর একটি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ সূচিত হয়েছে। বাক্ই যে সরস্বতী তা নিয়ে তো কোনো দ্বিমত নেই। ব্রাহ্মণ যুগে এই সম্বন্ধ আরও ঘনিষ্ঠতর। এখানে দেখা যাচ্ছে “প্রজাপতি ব্রহ্মা পুনরায় নিজেকে আপ্যায়িত করিলেন, বাক্ তাহার দিকে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি বাক্-কে আত্মবশ করিলেন। এখানে তিনি বাক্য দ্বারা আপ্যায়িত হইলেন, বলবান হইলেন”। এইভাবেই বোধহয় আমরা সরস্বতীকে ব্রহ্মার স্ত্রী হিসাবে পাই। বেদের উষাই পরবর্তীতে সরস্বতী রূপে পাই। তাই উষার মতো সরস্বতীও শুভ্র এবং জ্ঞানের প্রতীক। সেই কারণে সরস্বতী একদিকে সূর্যের কন্যা ও অন্যদিকে স্ত্রী।

সরস্বতীর বাহন হাঁস ছাড়াও মেষ আর বরাহকে পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক এন এস ভট্টসারি একটি লেখায় বলেছেন, “একসময় ইন্দ্রের শরীরের শক্তি চলে যাওয়ার ফলে তিনি মেষ আকৃতি গ্রহণ করেন। সেসময় ইন্দ্রের চিকিৎসার দায়িত্ব ছিল স্বর্গের অশ্বিনীদ্বয়ের উপর এবং সেবা-শুশ্রুষার ভার ছিল সরস্বতীর হাতে। সংগীত ও নৃত্যপ্রেমী ইন্দ্র সরস্বতীর গানবাজনা ও সেবায় সুস্থ হওয়ার পর তাকে মেষটি দান করেন। সেই থেকেই সরস্বতীর সঙ্গী এই মেষ। তাহলে কি সরস্বতী স্বর্গের সেবাদাসীও! সরস্বতীর বাহন বরাহ (শুয়োর), কারণ তিনি নাকি বিষ্ণুরও স্ত্রী ছিলেন। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ রচিত ‘সরস্বতী’ গ্রন্থটিতে এ তথ্য পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণকেও স্বামী হিসাবে কামনা করেছিলেন তিনি – “ইয়েষ কৃষ্ণং কামেন কামুকী কামরূপিনী”।‘ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ’-এ শ্রীকৃষ্ণ-সরস্বতীর কেচ্ছাকাহিনি যথাযথভাবেই বর্ণিত আছে। ডঃ শ্যামল চক্রবর্তী ‘নারী’ প্রবন্ধে বলেছেন, সরস্বতী গণেশেরও স্ত্রী। মহারাষ্ট্রের কোনো কোনো পূজারী মনে করেন, গণেশের পত্নী সরস্বতী কিংবা সারদা। হয়তো সরস্বতী এবং গণেশ দুজনই বিদ্যা ও সংগীতের অধিষ্ঠাতা দেবতা বলেই এই পতি-পত্নীর কল্পভিত্তি। আর-এক তথ্য অনুসারে জানা যাচ্ছে, দুর্গার কন্যা এই সরস্বতী দুর্গার কুমারী সত্তা। আবার বাঙালিরা মনে করেন গণেশ ও সরস্বতী ভাইবোন, দুর্গার সন্তান। অথচ চিরকুমারী (!) সরস্বতীকে স্বর্গের দেবতারা কখনও স্ত্রী, কখনও সেবাদাসী, কখনও গণিকা, আবার কখনও অসুরদের রূপে ভুলিয়ে কাত করাবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

হিন্দুদের দেবী হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধ ও জৈনদের কাছেও পুজো পেয়েছেন। গান্ধারের পাওয়া বীণাবাদিনী সরস্বতীর মূর্তি থেকে বা সারনাথে সংরক্ষিত মূর্তিতে এর প্রমাণ মেলে। পাথরের একটি ছোটো মূর্তি আছে তাতে সরস্বতী বীণা বাজাচ্ছেন, এর সঙ্গে হিন্দুদের সরস্বতীর কোনো পার্থক্য নেই। মথুরায় জৈনদের প্রাচীন কীর্তির আবিষ্কৃত নিদর্শনে সরস্বতীর যে মূর্তি পাওয়া গেছে সেখানে দেবী জানু উঁচু করে একটি চৌকো পীঠের উপর বসে আছেন, এক হাতে বই। শ্বেতাম্বরদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর অনুমোদিত ছিল। জৈনদের ২৪ জন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ১৬ জন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অন্যতম হলেন সরস্বতী। শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর জৈন সম্প্রদায় উভয়েই সরস্বতীকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে গৃহীত একজন প্রধান দেবীরূপে স্থান হয়ে গেল।

749px-Indian_-_Sarasvati_-_Walters_2550

তবে উপপত্নী বা গণিকাদের লক্ষ্মীপুজো থেকে বঞ্চিত করা হলেও সরস্বতী পুজো করতে পারেন। সরস্বতী কেন? সরস্বতী জায়গা কী তবে গণিকালয়ে? তা না-হলে লক্ষ্মী নয় কেন? দক্ষিণ ভারতে যে ময়ূরবাহন সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া গেছে সেটা কৌমারীর সঙ্গে অনেকটা মিলজুল হয়। কৌমারী কার্তিকের পত্নী। তাই বোধহয় গণিকাদের দেবতা কার্তিকের পাশাপাশি সরস্বতীর পুজোও গণিকালয়ে হয়ে থাকে। যুগে যুগে ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন উপাসনালয় থেকে গণিকালয় – সর্বত্র পুজো পায় সরস্বতী। সরস্বতী তাঁর কৌমার্য হারিয়েছে বহু পুরুষের বাহুডোরে। নেপালে চতুর্দশ শতকের পাওয়া শিলালিপিতে লেখা আছে – “সারদা তুমি মাতৃরূপী, তুমি কামমূর্তি”| তাই কি স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের উচ্চারণ করতে হয় – “ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে”| তিব্বতে এমন অনেক সরস্বতী পাওয়া গেছে যাঁর উর্ধ্বাঙ্গে কোনো বসনই ছিল না। তাই হয়তো মকবুল ফিদা হোসেনের সরস্বতীর পরনে আব্রু নেই! সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ – এরা কেউ কারোর ভাই-বোন নয়, এটা বাঙালিদের মনগড়া রূপকল্প। ভিত্তি নেই, সমর্থনও নেই।

আদি পুরাণ বলছে, সরস্বতী ব্রহ্মার মুখজাত। মুখজাত – এর অর্থ জ্ঞান। মুখনিঃসৃত কথাই তো বেদ। ফলে ব্রহ্মার মুখজাত সৃষ্টি সরস্বতী জ্ঞানেরই। আবার শিবপুরাণ তো অন্য কথা বলছে। কী বলছে? বলছে – ব্রহ্মা কাম পরবশ হয়ে সরস্বতীর পিছনে পিছনে গিয়েছিলেন ছেলেদের বাধায় ব্রহ্মা দেহত্যাগ করেছিলেন। এখানেই আছে ব্রহ্মার এই কুপ্রস্তাবে সরস্বতী ব্রহ্মাকে অভিশাপ দেন, ফলে তার একটি মাথা খসে পড়ে। সেই থেকে ব্রহ্মা চতুরানন। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণেও সরস্বতী বিষ্ণুর মুখজাত, কিন্তু ব্রহ্মার স্ত্রী। বিষ্ণু ব্রহ্মাকে গোলকে পাঠাচ্ছেন। প্রকৃতির অংশরূপী ভারতীকে সেখানে মানে গোলকে দেখতে পাবেন এবং তাকে দেখার পর তার সঙ্গে যৌনমিলনে ব্যস্ত হবেন। এও আছে ব্রহ্মা ভারতীর সঙ্গে রতিক্রিয়া করেছেন স্থানে স্থানে নির্জনে নির্জনে। যিনি ভারতী, তিনিই সরস্বতী।

শুধু বৈদিক যুগে নয় পরবর্তীকালে মহাভারত, পুরাণ, কাব্যে পূতসলিলা সরস্বতীর মহিমা বর্ণিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল ছিল হিমালয়ের সিমুর পর্বতে, এখান থেকে পাঞ্জাবের আম্বালা জেলার আদবদ্রী নামক স্থানে সমভূমিতে অবতরণ করেছিল। যে প্রসবণ থেকে এই নদীর উৎপত্তি তা ছিল প্লক্ষ্ণাবৃক্ষের নিকটে, তাই একে বলা হতো প্লক্ষ্ণাবতরণ। এতি হিন্দুদের তীর্থস্থান। ঋগ্বেদের যুগে গঙ্গা যমুনা ছিল অপ্রধান নদী, পক্ষান্তরে সরস্বতী নদী ছিল সর্বপ্রধান ও সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয়। এর তীরে ছিল প্রসিদ্ধ তীর্থভূমি। সরস্বতী ও দৃষদ্বতীর মধ্যস্থান দেবনির্মিত স্থান হিসেবে বিবেচ্য হত। ব্রাহ্মণ ও মহাভারতে উল্লেখিত সারস্বত যজ্ঞ এই নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হত। মহাভারত রচনা হওয়ার আগেই রাজপুতনার মরূভূমিতে সরস্বতী নদী অদৃশ্য হয়ে গেলেও কয়েকটি স্রোতধারা অবশিষ্ট ছিল। এই স্রোতধারা হল চমসোদ্ভেদ, শিবোদ্ভেদ ও নাগোদ্ভেদ। রাজস্থানের মরূভূমির বালির মধ্যে চলুর গ্রামের নিকটে সরস্বতী অদৃশ্য হয়ে ভবানীপুরে দৃশ্য হয়। আবার বলিচ্ছপুর নামকস্থানে অদৃশ্য হয়ে বরখের নামক স্থানে দৃশ্য হয়। তান্ডমহাব্রাহ্মণে সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল হিসাবে প্লক্ষ্ণপ্রস্রবণ ও বিনাশস্থল হিসেবে বিনশনের নামোল্লেখ আছে। ভারতের বর্তমান উদয়পুর, মেওয়াড় ও রাজপুতনার পশ্চিমপ্রান্তে মরূ অঞ্চলে সিরসা অতিক্রম করে ভূটানের মরূভূমিতে সরস্বতীর বিলোপ স্থানই বিনশন। লাট্যায়ণের শ্রৌতসূত্র মতে, “সরস্বতী নামক নদী পশ্চিম মুখে প্রবাহিত, তার প্রথম ও শেষভাগ সকলের প্রত্যক্ষ গোচর, মধ্যভাগ ভূমিতে নিমগ্ন হয়ে প্রবাহিত, সে অংশ কেউ দেখতে পায় না, তাকেই বিনশন বলা হয়”। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের মতে, বৈদিক সরস্বতীর লুপ্তাবশেষ আজও কচ্ছ ও দ্বারকার কাছে সমুদ্রের খাড়িতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর বিনাশ ঘটেছিল অবশ্যই বৈদিক যুগের শেষভাগে। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে, খ্রিস্টের দেড় হাজার বছরেরও আগে। মহাভারতে আছে যে নিষাদদের চোখের আড়ালে থাকার জন্য বিনাশণ নামক স্থানে মরুভূমিতে অদৃশ্য হয়েছে। নদীর স্থানীয় নামই এই ঐতিহ্য বহন করছে। অনেকেই বলেন, সিন্ধুনদই সরস্বতী। সরস্বতী ও সিন্ধু দুটি শব্দের অর্থই নদী।

সরস্বতী পূজা হিন্দু বিদ্যা ও সঙ্গীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব। পুরোহিত দর্পণ (শাস্ত্রীয় বিধান?) অনুসারে মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা আয়োজিত হয়। তিথিটি শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। উত্তর ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, নেপাল ও বাংলাদেশে সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। শ্রীপঞ্চমীর দিন অতি প্রত্যুষে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রীদের গৃহ ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপে দেবী সরস্বতীর পূজা করা হয়। ধর্মপ্রাণ হিন্দু পরিবারে এই দিন শিশুদের হাতেখড়ি, ব্রাহ্মণভোজন ও পিতৃতর্পণের প্রথাও প্রচলিত। পূজার দিন সন্ধ্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়। পূজার পরের দিনটি শীতলষষ্ঠী নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে কোনো কোনো হিন্দু পরিবারে সরস্বতী পূজার পরদিন অরন্ধন পালনের প্রথা রয়েছে।

নদী সরস্বতী বৈদিক সাহিত্য থেকে পুরোপুরি বাগ্ দেবী হয়ে দাঁড়ান ব্রাহ্মণ গ্রন্থে। সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজা বর্তমান রূপটি আধুনিক কালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীন কালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতী-সদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির উপর তালপাতার তাড়ি ও দোয়াতকলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্রেরা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। ইংরেজি ম্লেচ্ছ ভাষা হওয়ায় সরস্বতী পূজার দিন ইংরেজি বইয়ের পূজা নিষিদ্ধ ছিল। গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিংশ শতাব্দীতেও প্রচলিত ছিল। শহরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করতেন। বর্ধমান মহারাজার পূজায় বিশেষ সমারোহের আয়োজন করা হয়। দূর দুরান্ত থেকে মানুষ এই পূজার বিসর্জন দেখতে আসত। পূজা উপলক্ষে দুই ঘণ্টা আতসবাজিও পোড়ানো হত। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে সরস্বতী দেবী হলেও মেয়েরা অঞ্জলি দিতে পারত না। কিছু পণ্ডিতের মতে সমাজপতিরা ভয় পেতেন হয়তো এই সুযোগে ধর্মের নামে মেয়েরা দাবি করে বসেন লেখাপড়ার স্বাধীনতা!

শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা যায়। সরস্বতীর পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়। তবে এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যেমন অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ। পূজার জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলও প্রয়োজন হয়। লোকাচার অনুসারে, ছাত্রছাত্রীরা পূজার পূর্বে কুল ভক্ষণ করেন না। পূজার দিন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথা প্রচলিত আছে। পূজান্তে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের দল বেঁধে অঞ্জলি দিতে দেখা যায়।

কেউ কেউ বলেন, মর্ত্য ধামে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে প্রথম বারের মতো শ্রীশ্রী সরস্বতী দেবী পূজার প্রচলন করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শৈশব কাল থেকেই সরস্বতী পূজা প্রচলন করে সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষার্থীদের সরস্বতী পূজার গুরুত্ববহ বিদ্যার্জন ও বিদ্যালয় সমূহে সরস্বতী পূজার প্রচলন করে গেছেন, যা এখনও পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত রয়েছে। সরস্বতী পূজা স্বর্গমর্ত্যে, উভয়লোকে দেবতা, গন্ধর্ব, কিন্নর, ঋষি, মহর্ষি, রাজা-প্রজা সবাই শ্রদ্ধার সাথে করে আসছে। সরস্বতী পূজার অঞ্জলী দেয়ার সময় পলাশ ফুলের ব্যবহার ভগবান শ্রীকৃষ্ণই প্রচলন করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বয়স তখন ৭ বছর।

পুষ্পাঞ্জলী মন্ত্রঃ
ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীনারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।
নমঃভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ।
বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ।।
এস স-চন্দন পুষ্পবিল্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বতৈ নমঃ।।

প্রণাম মন্ত্রঃ
নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাংদেহি নমোহস্তুতে।।
জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।

সরস্বতীর স্তবঃ
শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেত পুষ্পোপশোভিতা।
শ্বেতাম্ভরধরা নিত্যা শ্বেতাগন্ধানুলেপনা।।
শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চ্চিতা।
শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারবভূষিতা
বন্দিতা সিদ্ধগন্ধর্ব্বৈর্চ্চিতা দেবদানবৈঃ।
পূঝিতা মুনিভি: সর্ব্বৈঋষিভিঃ স্তূয়তে সদা।।
স্তোত্রেণানেন তাং দেবীং জগদ্ধাত্রীং সরস্বতীম্।
যে স্মরতি ত্রিসন্ধ্যায়ং সর্ব্বাং বিদ্যাং লভন্তি তে।।

নদী সরস্বতীর মহিমা ভারতবাসীর মনে এত রেখাপাত করেছিল যে পরবর্তীকালে গঙ্গা সরস্বতীর স্থান দখল করলেও তারা তাকে ভুলতে পারেনি। প্রয়োগে অন্তঃসলিলারূপে গুপ্তভাবে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে সরস্বতীর সঙ্গম, পশ্চিমবঙ্গে হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে গঙ্গার স্রোত ধারা থেকে সরস্বতীর মুক্তি হিন্দুদের প্রিয় ও পবিত্র বিশ্বাস। সরস্বতী নিয়ে নানা ব্যাখ্যা নানা বিশ্লেষণ প্রচলিত আছে। তাই সঠিক সিদ্ধান্তে যাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা, তবে অসম্ভব নয়।

উপসংহারে একটা বলতে চাই, সরস্বতী মূলত হিন্দুদের দেবী। হিন্দুদের উপাস্য। খ্রিস্টান, মুসলমান, শিখ এবং অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের দেবী নয়। স্কুল-কলেজে সরস্বতী পুজোর আয়োজন করা শুধু অশোভনীয়ই নয়, অন্যায়। ভারতবর্ষ কোনো হিন্দু রাষ্ট্র নয়, এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের কোনায় কোনায় স্কুল-কলেজগুলিতে শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীরাই পাঠ নেন না, পাঠ নেয় সব ধর্মের ছাত্রছাত্রীরা। অন্য ধর্মের ছাত্রছাত্রীদের ভিন্ন ধর্মের সরস্বতী বন্দনা চাপিয়ে দেওয়া অসাংবিধানিক। যদি জোর করে সরস্বতী-বন্দনা চাপিয়ে হয়, তবে তা হবে সাংবিধানিক অধিকার হরণের সামিল। সরকারি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পুজোর কোনো নিয়ম নেই, তবু বিদ্যার দেবী হিসাবে সরস্বতী স্কুল, পাঠশালা কিংবা কলেজে পুজো পেয়ে থাকে। হিন্দু ধ্বজাধারী কোনো স্কুল-কলেজে পুজো-পার্বণ হতেই পারে, তাই বলে সর্বসাধারণের স্কুল-কলেজগুলিতে এই পুজো কতটা প্রাসঙ্গিক, প্রশ্ন উঠতে পারে। ভেবে দেখতে বলি সবাইকে।