কেন এ উল্লাস

rezwan-s প্রচলিত আছে, কাকেরা কোনো একটি জিনিস লুকিয়ে রাখতে চোখ বন্ধ করে রাখে। ধরে নেয়, সে নিজে যেহেতু দেখতে পায়নি, অতএব পৃথিবীর কোনো কাকপক্ষিও দেখতে পাবে না- জিনিসটা সে কোথায় লুকিয়ে রাখল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে তেমন ঘটনাই ঘটল। ৫ জানুয়ারি দেশে যে কোনো নির্বাচনই হয়নি, বরং সিলেকশন হয়েছে; সেটি দেশের মানুষ এবং সমগ্র পৃথিবীর মানুষ দেখতে পেয়েছে। কিন্তু কিছু অন্ধ আওয়ামী লীগার এর ব্যতিক্রম। এরা দেখেছেন আর নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। নির্বাচিত হওয়াটা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে ঘটেনি। সেটি ঘটেছে আওয়ামী লীগ নেতাদের ইচ্ছায়। এই ইচ্ছা বা অভিলাষ পূরণের জন্য তিনি বেশ আগে থেকে হয়তো কোনো ভিনদেশী মিত্রের পরামর্শে সংবিধান থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গৃহীত তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিল করে দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সরকার গত পাঁচ বছরের শাসনকালে ভারতকে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সব কিছু উজাড় করে দিয়েছে। এমনকি ভারতের পত্রিকাগুলোও বিস্ময়ের সাথে বলেছে, শেখ হাসিনা সরকার ভারত না চাইতেও ভারতকে অনেক কিছু দিয়ে দিয়েছে। এর বিনিময়ে এরা ভারত সরকারের কাছে কিছুই চায়নি। দেশের ভেতরে যখন এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠল তখন প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা বলে বসলেন, ভারতকে দেয়া ট্রানজিট-করিডোরের বিনিময়ে ফি চাওয়া হবে অসভ্যতা। জাতীয় স্বার্থবিরোধী এমন কথা কেউ উচ্চারণ করতে পারে, এটা কারো ধারণায় ছিল না। অতএব, এ সরকারকে আরো এক মেয়াদে ক্ষমতায় রাখতে হবে। তারই ফলাফল সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী প্রহসন।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনী প্রহসনের পর সারা বিশ্ব এবং দেশের সর্বস্তরের মানুষ এই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু ভারত শেখ হাসিনাকে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন জানিয়েছে, এখনো যাচ্ছে। ভারতের গোটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্ভবত এখন সমগ্র পৃথিবীতে শেখ হাসিনার জন্য সমর্থন কুড়াতে ব্যস্ত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমনিতে কোনো কাজ নেই। কার্যত এই মন্ত্রণালয়ের কাজ ভারত নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছে। ফলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখন দায়িত্ব দাঁড়িয়েছে, পৃথিবী থেকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য অভিনন্দনবার্তা জোগাড় করা। ভুটান, তাজিকিস্তান, নেপাল বিভিন্ন দেশ থেকে অভিনন্দনবার্তা নিয়ে আসা হয়েছে। এ উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারি প্রপাগান্ডা মেশিন ও অনুগত মিডিয়া এ কথা বলতে দ্বিধা করছে না যে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে বৈধতা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বলেই ফেলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রদূত ও মিডিয়া প্রচার করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান সরকারকে বৈধতা দিয়েছে- যা সত্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার মনে করে, বাংলাদেশে যথাশিগগির সবার অংশগ্রহণমূলক জনপ্রতিনিধিত্বসম্পন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নিয়েও সরকার এমনই আজগুবি প্রচারণা চালিয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো আলাদা আলাদাভাবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্মিলিতভাবে বলেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণের আকাক্সার পতিফলন ঘটেনি। তাই অবিলম্বে একটি গ্রহণযোগ্য ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। এক দিকে সরকার ভাব দেখাচ্ছে, বিদেশীদের থোড়াই পরোয়া করে। কিন্তু বিদেশীরা তাদের বৈধতা দিয়েছে এ কথা বোঝানোর জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। খড়কুটো আঁকড়ে ধরছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এর আগেও সুস্পষ্টভাবে বলেছে, ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু সরকার সেসব বিষয়কে ভুলভাবে চিত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্সে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডস ও হাউজ অব কমন্সের সদস্যরা। এই দুটো হাউজই একযোগে বলেছে, গণতন্ত্রের স্বার্থে সব দলের অংশগ্রহণে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। এরা বলেছেন, গত ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তা দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত না হলে বিশ্বসম্প্রদায় থেকে বাংলাদেশ ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে এরা রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দেন।

ব্রিটিশ লর্ডস সভার সদস্য ব্যারোনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিরোধী দল অংশগ্রহণ না করায় বিদেশী কোনো পর্যবেক্ষক যাননি। নির্বাচনের আগে আলোচনার মাধ্যমে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো উচিত ছিল। সাইমন ডান্স জ্যাক এমপি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি- এই মর্মে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এর আগেই প্রস্তাব পাস হয়েছে এবং সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি সম্পর্র্কেও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ও এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে -রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের জন্য বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা ‘ক্রসফায়ার’ নাটক ঘটাচ্ছে। প্রতিদিন এমন ঘটনা ঘটছে। যেন হত্যা করে সরকার বিরোধী দলকে নির্মূল করতে চায়। এর একটি ঘটনার হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন বিএনপির যুগ্মমহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে খোকন জানান, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলামকে রাজধানীর প্রেস কাব এলাকা থেকে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। তৌহিদ গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি স্থানীয় জেলা প্রশাসক, র্যাব কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার ও বিভিন্ন থানার পুলিশকে বিএনপি নেতা তৌহিদকে ‘ক্রসফায়ার’ না করতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তারা সে অনুরোধ রাখেননি। র্যাব-পুলিশ সদস্যরা শেষ পর্যন্ত তৌহিদকে হত্যাই করেছে। এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। যারা খুন হচ্ছে, গুম হচ্ছে তাদের স্বজনেরা হামেশাই জানেন যে, র্যাব-পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেছিল; কিন্তু র্যাব-পুলিশ থেকে সেটি অস্বীকার করা হয়। এখন এই এক বাংলাদেশ। মনুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই। বাক, ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই। এমন জনপদ, এমন স্বাধীনতা সম্ভবত কেউ চায়নি।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওই সেমিনারে ব্যারিস্টার টবি কিডম্যান বলেছেন, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের প্রক্রিয়া চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিচার হচ্ছে। এ বিচার আন্তর্জাতিক মানদ-ে হয়নি বলে ইতোমধ্যে বিশ্বসম্প্রদায় উদ্বেগ জানিয়েছে। কিন্তু সরকারের এসব নিয়ে কী যে উল্লাস! আর যেই সরকারের বিরোধিতা করে সেই নাকি যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে চায়।

৫ জানুয়ারির নির্বাচন যে একেবারে তামাশা- মুখে ভিন্ন চিৎকার করলেও সরকারও বোধ করি সেটা উপলব্ধি করে। আর সে কারণেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কথা জনগণ যাতে বেমালুম ভুলে যায়, তার জন্য অনেক নাটক সাজানো হয়েছে। ওই তামাশার পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, উপজেলা নির্বাচন, সর্বশেষ ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় প্রকাশ করা হয়েছে। যেন ওই তামাশার নির্বাচনের কথা জনগণ ভুলে যায়। নতুন ইস্যুতে তারা মনোনিবেশ করে। এখন প্রশাসন, আইন, বিচার- সব কিছুর ওপর থেকে জনগণ আস্থা হারিয়েছে। নইলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, হাইকোর্ট যেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে হয়রানি না করতে আগাম জামিন দিলেন, তা কেমন করে রদ করা হয়। তার অর্থ কি এই যে, পুলিশ প্রশাসন এখন মির্জা আলমগীরকে হয়রানি করতে পারবে? কখনো কখনো সরল বিশ্বাসে এসব সিদ্ধান্তকে রাজনীতি বলে মনে হয়। সরকারের অঙ্গুলি হেলনে কেউই যেন এই রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারছে না। এটিও যেন দেশকে দেউলিয়াত্বের দিকে নিয়ে যাওয়ার সহায়ক।