সাংবিধানিক প্রশ্নগুলোর সূরাহা জরুরী ছিল

প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত। তাছাড়া সংসদ সদস্যগণ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। সংসদ কিভাবে গঠিত হবে সে বিষয়ে সংবিধানের দিক নির্দেশনার প্রতি আলোকপাত করলে দেখা যায় একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা হতে মহিলা ও পুরুষ উভয়ের জন্য উন্মুক্ত প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত ৩০০ সদস্য এবং উক্ত সদস্যদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত ৫০টি সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য সর্বমোট ৩৫০ সদস্য সমন্বয়ে সংসদ গঠিত।

উন্মুক্ত ৩০০টি আসনে নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে নির্বাচিত প্রার্থীর গেজেট প্রকাশের কথা থাকলেও নির্বাচন পরবর্তী কতদিনের মধ্যে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে সে বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্টরূপে কোন কিছু উল্লেখ নেই। অতীতে দেখা গেছে প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে ৩০০ আসনের নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ হতে প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়া সংক্রান্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হতো। কিন্তু গত ০৫ জানুয়ারি, ২০১৪ দশম সংসদ নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পর দেখা গেল ০৮টি আসনের পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন অবশিষ্ট রেখে নির্বাচন কমিশন ০৯ জানুয়ারি, ২০১৪ ২৯০টি আসনের প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়া সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করেছে এবং তদ্পরবর্তী ১১ জানুয়ারি, ২০১৪ স্পিকার কর্তৃক নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানো হয়।
যদিও চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে – গেজেট প্রজ্ঞাপিত হওয়ার তারিখ হতে পরবর্তী ৩ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণ করতে হবে কিন্তু একটি সংসদ বহাল থাকাবস্থায় অপর একটি সংসদের জন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সন্নিবেশিত অনুচ্ছেদ নং ১২৩(৩)(ক) ও (খ) এর শতাংশ পাঠ করলে দেখা যায় আগের সংসদ অর্থাৎ নবম সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্বে শপথ গ্রহণের কোন সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সংবিধানের ১৪৮(৩) এর বিধানের প্রতি আলোকপাত করলে দেখা যায় সাংবিধানিক পদধারীরা শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর কার্যভার গ্রহণ করেন। তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে কোন যোগদানপত্র দিতে হয় না। আমাদের দেশের সংবিধান বিশ্লেষকদের অভিমত অনুচ্ছেদ নং ১৪৮(২ক) এর সাথে অনুচ্ছেদ নং ১২৩(৩)(ক) ও (খ) এর শতাংশের সাংঘর্ষিতা পরিহার্থে নির্বাচন কমিশনের উচিৎ ছিল গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ এমনভাবে নির্ধারণ করা যাতে কোনভাবে উপরোক্ত বিধান দু’টির একটি অপরটির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।

দশম সংসদ নির্বাচন সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ১২৩(৩)(ক) অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়েছে যাতে বলা হয়েছে- মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নবম সংসদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫ জানুয়ারি, ২০০৯ এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৭২(৩) এর বিধান অনুযায়ী ৫ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ২৪ জানুয়ারি, ২০১৪ নবম সংসদ আপনাআপনিভাবে ভেঙ্গে যাবে।

স্পষ্টতঃ নবম সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্বে দশম সংসদের জন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ দেয়ায় এবং শপথ পরবর্তী উক্ত সংসদ বহাল থাকাবস্থায় মন্ত্রীসভা গঠন করায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে শপথ গ্রহণ ও মন্ত্রীসভা গঠন সংবিধান সম্মত হয়েছে কিনা?

নবম সংসদ বহাল থাকাবস্থায় দশম সংসদের জন্য নির্বাচিত সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হওয়ায় ২৪ জানুয়ারি, ২০১৪ পর্যšত্ম উভয় সংসদ হতে নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা ৬৩৮ এবং এ ৬৩৮ জনের মধ্যে অনেকে একইসাথে নবম ও দশম সংসদের সদস্য আবার অনেক ক্ষেত্রে একই আসনে দু’জন সদস্য রয়েছেন।এ বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৭১(১) এর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যায় – কোন ব্যক্তির একই সময় দু’বা ততোধিক নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য হওয়া বারিত করা হয়েছে। তাছাড়া অনুচ্ছেদ নং ৬৫(২) এর বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সময়ে কখনও ৩৫০ এর উর্ধ্বে হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ১১ জানুয়ারি, ২০১৪ পরবর্তী নবম ও দশম সংসদের ৬৩৮ জন সদস্য একই সময়ে পদে বহাল থাকায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ২৪ জানুয়ারি, ২০১৪ পর্যšত্ম নবম না দশম কোন্ সদস্যদের সমন্বয়ে সংসদ গঠিত?

সংসদ সদস্যদের শপথ বিষয়ে অনুচ্ছেদ নং ১৪৮(২ক) তে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হতে ৩ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণের যে বিধান রয়েছে সে বিধানের সাথে একজন সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হবে- যদি তার নির্বাচনের পর প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে ৯০ দিনের মধ্যে তিনি শপথ গ্রহণে ব্যর্থ হন অনুচ্ছেদ নং ৬৭(১) এ বর্ণিত বিধানটি বিবেচনায় নিলে দেখা যায় গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৩ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণ করতে না পারলেও একজন সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হচ্ছে না। এখানে উল্লেখ্য যে, অনুচ্ছেদ নং ৬৭(১) এর বিধান অনুযায়ী সংসদের একজন সদস্য নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৯০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণে ব্যর্থ হলেও স্পিকার যথার্থ কারণে এ সময় বর্ধিত করতে পারেন। অতএব, শপথ গ্রহণ বিষয়ক এ দু’টি অনুচ্ছেদের বিধানাবলি হতে এটি স্পষ্ট যে, অনুচ্ছেদ নং ১৪৮(২ক) এর লঙ্ঘন একজন সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়ার কারণের উদ্ভব ঘটায় না যদিও অনুচ্ছেদ নং ৬৭(১) এর লঙ্ঘন একজন সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়ার কারণের উদ্ভব ঘটায়। তবে এ বিষয়টি স্পষ্ট উভয় ক্ষেত্রে সংবিধান লঙ্ঘনের কারণের উদ্ভব হয়।

বর্তমান দশম সংসদে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোট্ েনির্বাচনের জন্য উন্মুক্ত ৩০০টি আসনের প্রার্থীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ১৫৩টি আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় এবং ১৪৭টি আসনে প্রকৃতপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ নির্বাচন না হওয়ায় দশম সংসদের জন্য নির্বাচিত ৩০০ আসনের সদস্যদের নির্বাচনকে যে কোন বিবেচনায় অনুচ্ছেদ নং ৬৫(২) এর চেতনার আলোকে বৈধ নির্বাচন বলার অবকাশ আছে কিনা এ প্রশ্নে বির্তক রয়েছে।

এ বিষয়ে কোন দ্বিধা নেই যে, নবম সংসদের কার্যকরতা কালে দশম সংসদের জন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অবৈধ হলে তাদের দ্বারা গঠিত মন্ত্রীসভাও অবৈধ। সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রীসভা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে তাঁর আকাঙ্খানুযায়ী অপরাপর মন্ত্রী সমন্বয়ে গঠিত যদিও প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যšত্ম তিনি স্বপদে বহাল থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুরূপ তাঁর মন্ত্রীসভার অপরাপর সদস্যরাও তাঁদের উত্তরাধিকারীগণ কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাঁরা স্ব স্ব পদে বহাল থাকেন।

সংবিধান বিষয়ে অভিজ্ঞ এমন অনেকে ধারণা ব্যক্ত করেছেন যে, একান্তই যদি নবম সংসদের মেয়াদ অবসানের পূর্বে দশম সংসদের জন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের আবশ্যকতা দেখা দিতো সেক্ষেত্রে নবম সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু তাঁদের এ বক্তব্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৭(২) বিবেচনায় নিলে প্রতীয়মান হয় প্রধানমন্ত্রী যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর পক্ষে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার পরামর্শ দানের সুযোগ অনুপস্থিত।

আমাদের দেশে ইতোপূর্বে কখনও সংসদ বহাল থাকাবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচন পরবর্তী দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীর দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হওয়ায় তাঁর উত্তরাধিকারী তিনি স্বয়ং। এ ক্ষেত্রে তাঁকে পদত্যাগ করে নাকি পদে বহাল থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়ে সংবিধান স্পষ্ট নয়। তবে অনেকের অভিমত দশম সংসদের সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি যেহেতু নতুনভাবে শপথ নিয়েছেন সে কারণে পুনঃ প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ পরবর্তী তাঁর শপথ গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে। আবার অনেকের অভিমত নবম ও দশম উভয় সংসদের সংসদ সদস্যদের আস্থাভাজন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রয়োজন নেই। আর সে কারণে একটি সংসদ অবলুপ্ত হওয়ার পূর্বে অপর সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন হিসেবে শপথ গ্রহণ না করাই শ্রেয়। এমনও অভিমত রয়েছে যদি বলা হয় নবম সংসদের সংসদ সদস্যদের আস্থাভাজন থাকাবস্থায় পদত্যাগ করে দশম সংসদের সংসদ সদস্যদের আস্থাভাজন হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগলাভের জন্য পদত্যাগ করেছেন সেক্ষেত্রে বলতে হবে তা অবশ্যই নবম সংসদের মেয়াদ অবসানের পর হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল।

একটি সংসদ বহাল থাকাবস্থায় অপর সংসদের জন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ ও তাঁদের সমন্বয়ে মন্ত্রীসভা গঠন এবং কার্যভার গ্রহণ বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৭(১)ও (২), ৬৭(১), ৭১(১), ১২৩(৩)(ক) এর শর্তাংশ, ৭২(৩), ১৪৮(২ক) ও (৩) এর সম্মিলিত অধ্যয়নে প্রতীয়মান হয় পূর্বের সংসদের মেয়াদ অবসান ব্যতীত এ ধরণের শপথ গ্রহণ সংবিধান অনুমোদন করে না। আর শপথ গ্রহণ যখন সংবিধান দ্বারা অননুমোদিত তখন পূর্বের সংসদের মেয়াদ থাকাবস্থায় পদত্যাগ করে বা পদত্যাগ ব্যতীত নতুন মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণের সুযোগ আছে কিনা ভবিষ্যতের যে কোন বিতর্ক পরিহার্থে এ প্রশ্নটিসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রশ্নের সূরাহা জরুরী ছিল।