এই সংসদের কাছে কী আশা করতে পারি?

mahfuz anam জনগণের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সংসদ। একটি দেশের জনগণকে দিক-নির্দেশনা দেয়ার জন্য তাদেরই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে গঠন করা হয় সংসদ। আর জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের স্বার্থে নিজেদের করণীয় সম্পর্কে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করেন এই সংসদে এসেই। এই সংসদে বসেই নির্ধারণ করা হয় একটি দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। দেশটির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশ ও জনগণের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বার্থে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে মতের ঐক্য কিংবা অনৈক্য যাই হোক না কেন, নিজেদের মতবিনিময়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে এই সংসদে বসেই তারা নির্মাণ করেন দেশের ভবিষ্যৎ।

সংসদ এমন একটি জায়গা যেখানে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় পরিকল্পনা গৃহীত হয়। এই সংসদেই জনগণ নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পরিবর্তে দেশ ও জনগণের স্বার্থের জন্য লড়াই করতে দেখে উপলব্ধি করে যে, তাদেরই নির্বাচিত সরকারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত ও চাহিদার সঠিক মূল্যায়নে সক্ষম।

সংসদ এমন একটি জায়গা যেখানে একটি দেশের সরকারকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এই সংসদেই একটি দেশের সরকারকে তাদের ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত করা হয়। দুর্বল পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের জন্য হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে অযথা ব্যয়বহুল কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইলে একটি দেশের সরকারকে এই সংসদের মাধ্যমেই সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়া হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সম্প্রতি ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বাধীন বৃটিশ সরকার মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়াতে অভিযান চালানোর ব্যাপারে যে দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্তটি নিতে যাচ্ছিল, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারেও দেশের সংসদই সে দেশের সরকারকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে। এই সংসদের কারণেই সমষ্টিগত বোঝাপড়ার মাধ্যমে ব্যক্তিবিশেষের হাতে ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া থেকে রক্ষা পায়।

মোটকথা, এই সংসদের মাধ্যমেই দেশের জনগণ বুঝতে পারে যে তাদের দেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটি সঠিক অর্থে ঠিক কতটা কার্যকর।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ধরনের সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা আমাদের দেশে নেই। এদেশের জন্মলগ্নে আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থা প্রাথমিক অবস্থাতেই ধাক্কা খেয়েছিল যখন এখানে বাকশালের নামে একদলীয় এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। এরপর প্রায় ১৬ বছর আমরা সামরিক সরকার এবং সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে থেকেছি, যেখানে জনগণের হয়ে কথা বলার জন্য সংসদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

১৯৯১ সালে যখন প্রথমবার এদেশের মানুষ এদেশে আবারো গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল তখন একটি কার্যকর সংসদের প্রয়োজনীয়তাও তারা উপলব্ধি করেছিল। কিন্তু তাদের সেই চাহিদাও পূরণ হয়নি। কারণ এরশাদ সরকারের পতনের পর এদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রথম নির্বাচনেই নিজেদের পরাজয় মেনে নিতে পারেনি। ফলে সে সময়ে দলটি আক্ষরিক অর্থেই জাতীয় সংসদ গঠনের প্রথম দিন থেকে সরকার পতনের ডাক দিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল। দেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংসদের শেষ অধিবেশনের বছরখানেক আগেই সদলবলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত দলটি অত্যন্ত উদ্ধ্যতভাবে নিয়মিত সংসদ বর্জন করে এসেছে।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে সংসদ বর্জনের একই ধারা কার্যকর রেখেছিল। পরবর্তীতে ২০০১ এবং ২০০৬ সালে এই ধারাটি ভাঙার সুযোগ থাকলেও দুই দলের কোনোটিই তা গ্রহণ করেনি। এ পর্যন্ত যতবারই এই দল দুটি পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় থেকে কিংবা প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে গিয়েছে ততবারই তারা একই কাজ করেছে। এভাবেই বিগত ২৪ বছরে জাতীয় সংসদকে ব্যবহার করা হয়েছে অর্ধসত্য কিংবা সত্যের অন্যরকম ব্যাখ্যা এবং উদ্ধ্যত বাচনভঙ্গির ক্ষেত্র হিসেবে। দিনে দিনে এই অবস্থা এতটাই খারাপের দিকে গেছে যে সর্বশেষ নবম জাতীয় সংসদে নির্বাচিত কয়েকজন নারী সংসদ সদস্যের মুখের ভাষার কারণে ভদ্রলোকের সংসদ অধিবেশন দেখার বা শোনার অবস্থা ছিল না।

এই ধরনের ‘সংসদীয় ইতিহাসের’ পর গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া দশম জাতীয় সংসদের কাছ থেকে আমরা কী আশা করতে পারি?

বর্তমান সংসদের পরিসংখ্যান দেখলে নিচের চিত্রটি পাওয়া যায়-
২৯৮টি আসনের মধ্যে সরকারি দল আওয়ামী লীগের আসন ২৩২টি বা ৭৭%, জাতীয় পার্টির (জেপি) আসন ৩৪টি বা ১১%, ওয়ার্কার্স পার্টির (মেনন) ৬টি বা ২%, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ, ইনু) ৫টি বা ২%, জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) ২টি, তরিকত ফেডারেশনের ২টি, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১৬টি বা ৫.৩%। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭৭% আসনের তথ্যটিও পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ বাকি দলগুলো আওয়ামী লীগের অধীনে থেকে নির্বাচন করেছে এবং কয়েকটি দল আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়েই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিল, যা ছাড়া নির্বাচনে জয়লাভ তাদের পক্ষে আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব হতো।

কিছুদিনের মধ্যেই যখন সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নির্বাচিত হবেন তখন আওয়ামী লীগ পাবে আরো ৩৬টি আসন অর্থাৎ মোট ৫০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পাবে মোট ২৬৮টি আসন, পরে আরো দুটি আসন যোগ করা হতে পারে। এমনকি স্বতন্ত্র হিসেবে সংসদে আসীন ১৬জন এমপিও যেকোনো সময় সরকারি দলে ঢুকে যেতে পারেন।

এর মধ্যে আবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক ৩৪টি আসন নিয়ে সংসদে এরশাদের জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তো আছেই, অবিশ্বাস্যভাবে তারা আছেন মন্ত্রীসভাতেও! এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি- দুটি দলই যখন প্রধান বিরোধী দল থাকাকালীন সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি বজায় রেখেছেন, তখন এই ‘প্রকৃত অর্থে বিরোধী দল’টি সংসদে ঠিক কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

গত বুধবার দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের দেয়া ভাষণ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছানুযায়ীই সংসদকে তার প্রতি প্রায় উৎসর্গই করে দেয়া হবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের কোথাও আগের কোনো ভুলভ্রান্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি গত ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অন্যতম দল বিএনপির নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও তিনি কোনো কথাই বলেননি।

প্রকৃতপক্ষে, আন্তর্জাতিকভাবে এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি না দেয়া হলেও দেশে সরকারিভাবে নির্বাচনটিকে ‘সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং নির্বাচনের দিন ও নির্বাচনপরবর্তী সময়ে সব ধরনের সহিংসতার জন্য দায়ী করা হয়েছে বিএনপিকেই। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে বর্তমান সরকার বিগত বছরগুলোতে চলে আসা রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই একটি রূপ মাত্র।

অন্য ভাবে বলতে গেলে বোঝাই যাচ্ছে যে, যেহেতু বর্তমান সংসদ পুরোপুরি আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে তাই যেকোনো প্রসঙ্গে বিরোধিতা বা দ্বিমত পোষণ করলেও তা এই দলটির দিকনির্দেশনা অনুযায়ী করাটাই হবে বাকিদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ এবং ‘দক্ষ’ সরকারবিরোধী দলের পরিচয়।

একটি গণতান্ত্রিক সরকারের মৌলিক বৈশিষ্ট্য যদি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে থাকে, সুশাসনের চাবিকাঠি যদি কর্তৃপক্ষের ভারসাম্যপূর্ণ তত্ত্বাবধান হয়ে থাকে এবং সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো- বিচারব্যবস্থার প্রথম ও প্রধান শর্ত যদি জনগণের কষ্টার্জিত সম্পদের হিসাব সম্পর্কে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা হয়ে থাকে; তাহলে আজকের বাংলাদেশের অবস্থা কখনোই এরকম হতো না।

বর্তমানে সবচাইতে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো- ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই নেতাদের মধ্যে দায়বদ্ধতার মনোভাব সৃষ্টি করা এবং বিলুপ্তির পথে থাকা জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াটিকে পুনরুদ্ধার করা।

কিন্তু, বর্তমান দশম জাতীয় সংসদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত এই প্রতিবন্ধকতা দুটি দূর করার মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ তো করেইনি, উপরন্তু এই বিষয়ে কোনোরকম দিক নির্দেশনাও তারা দিচ্ছে না।